You are here

নাফ নদীর বুকে কিছুক্ষণ

নাফ নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছলাম সকাল সোয়া আটটায়। এখান থেকেই সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে কয়েকটি জাহাজ ছেড়ে যায়। জায়গাটির নাম দমদমিয়া জাহাজ ঘাট। বাস থেকে নামতেই হালকা মৃদু হাওয়া আর সূর্যের মিষ্টি আলো আমাদের স্বাগত জানাল। আমাদের মতো আরও অনেকেই ভিড় করছে জাহাজঘাটে। সবার গন্তব্য সেন্টমার্টিন। এখান থেকে জলপথে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ভ্রমণপিয়াসুদের কোলাহলে তখন জাহাজঘাট গমগম করছে। আমরা দুটি টিকেট কেটে সকালের নাস্তা করে ফেললাম।

নয়টার দিকে কাঠের জেটি পার হয়ে জাহাজে উঠে পড়লাম। আমাদের সিট দুটোয় ব্যাগ রেখে একপাশে দাঁড়ালাম। সারারাত বাসে বসেই কাটাতে হয়েছে। আর কী বসে থাকা যায়! আমরা চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে থাকলাম।

কিছুক্ষণ পরই জাহাজ রওনা দিল প্রবাল দ্বীপের উদ্দেশ্যে। একপাশে বাংলাদেশের পাহাড় অন্যপাশে মায়ানমার। দুই দেশের মাঝ বরাবর নাফ নদী দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জলযানটি। আমি আর বন্ধু মতিউর জলযানের চারপাশে হেঁটে হেঁটে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছি। একটু পরই দেখি বেশ কিছু গাঙচিল আমাদের জাহাজকে ধাওয়া করেছে! যতই সময় গড়াচ্ছে, গাঙচিলের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। পরে বুঝতে পারলাম ওরা আসলে খাবারের জন্য জাহাজের পিছু পিছু ছুটছে। কেউ চিপস, বিস্কুট ছুঁড়ে দিচ্ছে। উড়ন্ত অবস্থায় চিপস বা বিস্কুট মুখ দিয়ে ধরে ফেলছে। দৃশ্যটি বেশ মজার। বাচ্চারা তো মজা পাচ্ছে, বুড়ো-বুড়িরাও বাদ যাচ্ছে না এই দৃশ্য দেখার জন্য। বন্ধু মতিউরও একটা চিপস কিনে ওদের উদ্দেশ্যে একটা একটা করে ছুঁড়তে থাকল। আমি ক্যামেরা বের করে গাঙচিলের এই দৃশ্য ধারণের চেষ্টা করলাম। খাবারের জন্য কত কষ্ট! এরা একটুকরো চিপসের আশায় জাহাজের পিছু পিছু সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উড়তে থাকে! প্রায় ৪০ কিলোমিটার! কী শক্তি আর ধৈর্য তাদের। বারবার অন্যদের কারনে একটা চিপস ধরতে না পারলেও পিছু হটে না কেউ। আর আমরা কত সহজে ধৈর্য হারিয়ে ফেলি।

প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার পথে জাহাজ থেকেই দেখা যায় মায়ানমার। ওপারের দুই একটি ঘরও চোখে পড়ে। মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার সীমান্ত চৌকিও আমাদের চোখ এড়ায় না। মাঝে মাঝেই নজর কাড়বে মাছ ধরার দৃশ্যগুলো। বিশাল জলরাশির মাঝে ছোট্ট একটা নৌকায় দুইজন বা তিনজন মাছ ধরতে বৈঠা চালাচ্ছে। ওদের কী সাহস। বড় বড় ঢেউকে উপেক্ষা করে ওদের ছোট নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে।

এক সময় আর দুইপাশে কিছু চোখে পড়বে না। চারপাশেই পানি আর পানি। পানি ছাড়া আর থাকবেই বা কী। তখন যে নাফ যদি পেরিয়ে সাগরের বুকে এসে পড়েছে জাহাজ। আহা কী বিশাল এই সাগরের বুক। নীল রঙের পানির সে কী রূপ! যত দেখি, ততই যেন প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে ইশ! এই সাগরের বুকেই যদি থেকে যেতে পারতাম! মাঝে মাঝে নীল বর্ণের পানিও বাহারি রূপ ধারণ করছে! জলরাশি কখনও কখনও সূর্যের আলোয় লালটে দেখায়।

প্রায় তিন ঘণ্টা পর সাগরের মাঝে একটা ছোট কী যেন দেখা গেল। আস্তে আস্তে তা সবুজ বর্ণ ধারণ করল। এটাই নিশ্চয়ই সেন্টমার্টিন। আমার ধারণা ভুল নয়। আরও জাহাজ দেখা গেল সেন্টমার্টিনের তীরে নোঙর করে আছে। আমাদেরটাও নোঙর করল। জাহাজে তো কম লোক নয়। নামতেই অনেক সময় লাগবে। তাই মতিউর জাহাজের জানালা দিয়ে সামনের জাহাজে গিয়ে উঠল। আমার একটু ভয় করল। নিচে পানি, কাঁধে এত বড় ব্যাগ। যদি পড়ে যাই। শেষে সাহস করে আমিও ওর পথ অবলম্বন করলাম। এত ভয় পেলে চলে নাকি! অন্যদের পেছনে রেখে তিন চার মিনিটের মধ্যেই পা ফেললাম সেন্টমার্টিনের মাটিতে...

বিভাগ: