
বাঙালি হয়েছেন আর মণ্ডা মিঠাইর নাম শোনেননি, তা কি হয়? উৎসব অনুষ্ঠান পালা পার্বণ কিংবা নেহাতই অকারণে... মিষ্টিমুখ করবার জন্য আজও বাঙ্গালির বাহানার অভাব হয়না। ভোজন রসিক বাঙালি মাত্রই জানেন কি স্বাদ এত শত রকমের মিষ্টান্নের বাহারে!
এই বাংলার মিষ্টিকে যে দুই ভাগে ভাগ করেছেন সুকুমার সেন, তা কি জানেন? প্রথম ভাগে আছে একক উপাদানে তৈরি মিষ্টি। এ ধরণের মিষ্টিতে গুড় বা চিনির সাথে আর কিছু মিশ্রিত থাকে না। যেমন- গুড় বা চিনির নাড়ু ও চাকতি, পাটালি, বাতাসা, খাজা, ছাঁচ ইত্যাদি।
দ্বিতীয় ভাগে আছে আবার একক উপাদানে তৈরি মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের সাথে অন্য কোনও উপাদানে তৈরি মিষ্টি। এই দ্বিতীয় ধরণের মিষ্টিকে কিন্তু আরো দু’ রকমে ভাগ করা চলে।
গুড় বা চিনির সাথে দুগ্ধজাত কোনও উপকরণ ছাড়া অন্য দ্রব্য সহযোগে তৈরিকৃত মিষ্টান্ন। যেমনঃ নারকেল, তিল এসবের নাড়ু, চিঁড়া, মুড়ি, খৈ-এর মোয়া ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় ভাগে আছে দুগ্ধজাত মিষ্টি- যেমন রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ।
দুগ্ধজাত দ্রব্য দিয়ে তৈরি নানান ধরণের মিষ্টি বাঙ্গালির সুপরিচিত। কে না জানে যে দুধের ছানা দিয়ে তৈরি মিষ্টি রসে ডুবিয়ে তৈরি হয় রসগোল্লা, দুধে ডোবালে রসমালাই। বেসনের ছোট ছোট দানা ঘিয়ে ভেজে তৈরি হয় বুন্দিয়া, যা দেখতে ছোট বিন্দুর মতো। কড়া পাক দিয়ে ভাজা এই বুন্দিয়াই মতিচুর লাড্ডুর কাঁচামাল। আবার চিনির সাথে ছানার সংযোগে তৈরি হয় সন্দেশ ও মন্ডা...
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। আমাদের আজকের গল্প সেই মণ্ডাকে নিয়েই। তাও যেনতেন মণ্ডা নয়, একেবারে জগৎবিখ্যাত মুক্তাগাছার মণ্ডা! একশত ভাঘ বাংলাদেশী মিষ্টান্ন বলতে যা বোঝায়, এই মণ্ডা ঠিক তাই। জন্ম এই দেশের মাটিতে, আর দেশের নাম উজ্জ্বল করে আজও টিকে আছে সগৌরবে।
ময়মনসিংহ থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছার অবস্থান। ইতিহাস-ঐতিহ্যে এই উপজেলা যেমন বিখ্যাত, তার চাইতেও বেশি বিখ্যাত সম্ভবত এই মণ্ডার খাতিরে। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে ১৮২৪ সালে রামগোপাল পাল খাঁটি দুধ ও চিনি সহযোগে তৈরি করেন এই মণ্ডা। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তাগাছার তৎকালীন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রসনা তৃপ্ত করা। বলাই বাহুল্য যে সেই উদ্দেশ্য বিফল হয়নি এতটুকু। আর কেন হয়নি, সেতো আজও মণ্ডার খ্যাতি দেখে সহজেই অনুমেয়।
উল্লেখ্য যে তৎকালীন সময়ে জমিদারদের মাঝে এই মণ্ডা অতিপ্রিয় খাদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছিল। কথিত আছে যে তাঁদের প্রাতঃরাশের থালায় অতি অবশ্য মিষ্টান্ন ছিল এই মুক্তাগাছার মণ্ডা। এছাড়াও ষোলহিস্যা জমিদার বাড়ির দেব-দেবীর পূজা-অর্চনায় ভোগের অন্যতম উপকরণ ছিল। এই মণ্ডা জমিদার পরিবারের নিজস্ব গৌরবময় মিষ্টান্ন সম্পদ মনে করা হতো। জমিদাররা বিভিন্ন রাজা-বাদশার বাড়িতে বেড়াতে গেলে মিষ্টান্ন হিসেবে মণ্ডা নিয়ে যেতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মণ্ডা দিয়ে আপ্যায়িত করতেন।
মণ্ডার গল্প তো অনেক হচ্ছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন মণ্ডা আসলে কি? মণ্ডা হচ্ছে এক রকম সন্দেশ। গোল-চ্যাপ্টা আকৃতির দেখতে, অনেকটা পেঁড়ার মত হয়ে থাকে মণ্ডা। ছানাকে চিনি দিয়ে কড়া পাক দেয়া হয়, যে পাকের আসল রেসিপি আজও কেবল সত্যিকারের কারিগরেরাই জানেন। এই পাক দেয়া মণ্ডাকে শক্ত কোন তলের উপর বিছানো কাপড়ের উপর হাতদিয়ে চেপে সাধারণত চ্যাপ্টা করার কাজটি করা হয়। পরে ঠাণ্ডা হলে চিনি জমে শক্ত হয়ে যায় ও তখন কাপড় থেকে খুলে নেওয়া হয়। এবং মোটামুটি চারকোনা আকৃতিতে কেটে কাগজে মুড়িয়ে বিক্রি করা হয়। ক্ষীরের রঙের উপর নির্ভর করে মণ্ডা সাদা বা ঈষৎ হাল্কা খয়েরি রঙের হয়ে থাকে।
মণ্ডার স্রষ্টা রামগোপাল পাল ১৯০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার বয়স ছিল ১০৮ বছর। তাঁর পঞ্চম বংশধর রমেন্দ্রনাথ পাল, রবীন্দ্রনাথ পাল, রথীন্দ্রনাথ পাল, শিশির কুমার পাল ও মিহির কুমার পাল বর্তমান মণ্ডার দোকানের স্বত্বাধিকারী। তারা গোপাল পালের চুলাতেই এখনো মণ্ডা তৈরী করেন। এবং অতি অবশ্যই এই দোকানের মণ্ডার তুলনা যে জগতে নেই তা তো বলাই বাহুল্য।
শুনেছি মুক্তাগাছার মণ্ডা নাকি উপহার হিশাবে পাঠানো হয়েছিল রাশিয়ার কমরেড স্ট্যালিনের কাছে। স্ট্যালিনের মতন কঠিন হৃদয় লোককে দ্রবীভূত করেছিল সেই মণ্ডা, এমনই নাকি ছিল তার স্বাদ। এবং তিনি রাশিয়া থেকে মণ্ডা-প্রেরক মুক্তাগাছার তৎকালীন মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে একটি প্রশংসাপত্রও পাঠিয়েছিলেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীও মণ্ডা নিয়ে একবার চিনে গিয়েছিলেন। আপ্যায়িত করেছিলেন মাও সেতুংকে। এখানেই অবশ্য শেষ নয়, মুক্তাগাছার মণ্ডার ভক্ত তালিকায় আছেন বহু আরও জগৎবিখ্যাত মানুষেরা।
তো, ভোজন রসিক বাঙালি... যাবেন নাকি একবার মুক্তাগাছা?
দেখবেন চেখে প্রস্তর হৃদয় তরল বানাবার ক্ষমতাধারী সেই অনবদ্য মিষ্টান্ন... নাম যার মুক্তাগাছার মণ্ডা?
ছবি- ইন্টারনেট
|
প্রিয়.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রিয় বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করছি আমরা। এখানে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিষয়। সঙ্গে থাকুন প্রতি মুহুর্তে। যারা আমাদের সাইটে লেখা দিচ্ছেন, তারা অবশ্যই নিজেদের অ্যাকাউন্টে ছবি যুক্ত করুন। সঠিক নাম এবং ছবি ছাড়া সাধারনত কোনও লেখা প্রকাশ করা হয় না। সহযোগী: ইউএনবি, চ্যানেল আই © ২০১৩ প্রিয়.কম ॥ ইমেল: info@priyo.com ফোন: +৮৮০-২-৯৬৬ ৫৩২৫-৬, +৮৮০-১১-৯৩১৭ ৬৩৫৬ |
আমাদের অন্যান্য সাইট: |