Dhaka, Fri, 25 Apr 2014, 3:42 am | লগ-ইন করুন | নিবন্ধন করুন   অন্যান্য সাইট: | ইসলাম | রিডার | টেক | জটিল | English News

You are here

পুরনো ঢাকার বিরিয়ানী

পুরনো ঢাকার মানুষের হাজারো খাবার তালিকায় নিঃসন্দেহে বিরিয়ানী খাবারটি প্রথম সারিতেই রয়েছে। পুরান ঢাকার খাবার তালিকায় বিরিয়ানী হবার অনেক কারণও রয়েছে। মোঘল আমলে পাকুড়তলী ছিল যেমন পুরনো ও নতুন ঢাকার সীমানা, তেমনি এখন ফুলবাড়িয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন ও পুরনো ঢাকার সীমানা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকা শহরের সবচেয়ে দামি এলাকা ছিল পুরাতন ঢাকার গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, নাজিরা বাজার, লালবাগ সহ বিভিন্ন এলাকা। আর এখানে বসবাস করতো ভারতবর্ষের নানা স্থানের লোকজন। তেমনি ছিল মোঘলরা। তাদের ছিল বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের প্রতি ছিল দুর্বলতা। অনেকটা সেখান থেকেই পুরাতন ঢাকার মানুষদের মুখরোচক খাবারের প্রতি রয়েছে আকর্ষণ। আর বিরিয়ানী সব খাবারের মধ্যে অন্যতম।

সেই ঐতিহ্য পুরানো ঢাকাবাসী আজও ধরে রেখেছে। কারণ যত দিন যাচ্ছে এলাকাগুলোতে বিরিয়ানীর দোকান দিয়ে ছেঁয়ে যাচ্ছে। তবে শুধু পুরনো ঢাকাবাসীদের বিরিয়ানিপ্রীতি আছে এটা বললে ভুল হবে, নতুন ঢাকার মানুষদেরও বিরিয়ানির প্রতি আসক্তিটা কোন অংশে কম নয়। পুরান ঢাকার বিখ্যাত বিরিয়ানির দোকানগুলোতে অনেক দূর থেকে মানুষ বিরিয়ানী খেতে আসে।

পুরনো ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, নাজিমুদ্দিন রোড, উর্দ্দু রোড, বংশাল, সিদ্দিকবাজার, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, ওয়ারী, মালিটোলা এবং মৌলভীবাজার এলাকায় কাচ্চি বিরিয়ানীর দোকানগুলো গড়ে উঠেছে। ভাল মান এবং ভাল স্বাদের জন্য কাজী আলাউদ্দিন রোডের হাজীর বিরিয়ানী, হানিফ বিরিয়ানী, মৌলভীবাজার রোডের নান্না মিয়ার বিরিয়ানী, উর্দ্দু রোডের রয়েল বিরিয়ানী, নারিন্দার ঝুনার কাচ্চি বিরিয়ানী, মালিটোলার ভুলুর বিরিয়ানী, নবাবপুরের ষ্টার হোটেলের কাচ্চি বিরিয়ানী, সুরিটোলার রহিম বিরিয়ানী এবং নাজিমুদ্দন রোডের মামুন বিরিয়ানী ঢাকায় বিখ্যাত। এখানে প্রস্তুতকৃত কাচ্চি বিরিয়ানির অতুলনীয় স্বাদ এবং গন্ধের কারনে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন ছুটে আসেন এই পুরনো ঢাকায়। দোকানগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই সুস্বাদু কাচ্চি বিরিয়ানির সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।

হাজীর বিরিয়ানী
১৯৩৯ সালে এক ডেকচি বিরিয়ানী নিয়ে হাজী মোহাম্মদ হোসেন বিরিয়ানীর দোকান দিয়েছিলেন পুরনো ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে । তারপর তাঁর ছেলে হাজী গোলাম হোসেন বাবার ব্যবসার হাল ধরেন। ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে হাজির বিরিয়ানীর নামডাক। সেই হাজির বিরিয়ানী এখন পুরান ঢাকা, মতিঝিল বিমান অফিস ও বসুন্ধরায় আবাসিক এলাকায় তিনটি দোকান নিয়ে সাফল্যের সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছে। আলাউদ্দিন রোডে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে হাজী বিরিয়ানী অত্যন্ত সুনামের সাথেই ব্যবসা করে চলছে। বর্তমানে ব্যবসার পুরো দেখভাল করছেন হাজী মোহাম্মদ হোসেনেরনাতি হাজী মোহাম্মদ শাহেদ।

হাজীর বিরিয়ানীর স্পেশালিটি হচ্ছে-ওরা বিরিয়ানী রান্নায় ঘি/বাটার অয়েল এর পরিবর্তে শুধু সরিষার তেল ব্যবহার করে। এই দোকান/হোটেলের কোনো সাইন বোর্ড নেই-কিন্তু এক নামেই সকলে চেনে। বর্তমানে হাজী বিরিয়ানির প্রতি প্লেট ৭০/৮০ টাকা(বিরিয়ানীর সাথে বোরহানী নিলে ৮০ টাকা)।

সকাল ৭ টা থেকে সকাল ৯ টা এবং সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত সাড়ে নয় টা এই দুই সময়ই বিরিয়ানী পাওয়া যাবে আলাউদ্দিন রোডের এই ঐতিহ্যবাহি হাজীর বিরিয়ানীর দোকানে। তবে যত চাহিদাই থাকুক-সকালে ২ ডেকচি ও বিকেলে ৩ ডেকচির বেশি বিক্রি করা হয় না। তবে ইদানীং কালে এখান থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে মতিঝিল এবং গুলশানে দুটি ব্রাঞ্চ পরিচালিত হচ্ছে-যা শুধু দুপুড়েই পাওয়া যায়। আলাউদ্দিন রোডের মেইন দোকান থেকে বিরিয়ানী কিনে বাসায় নিতে চাইলে তা নিতে হবে ওদের বানানো "কাঁঠাল পাতার" পার্সেল প্যাকেট করে।

হানিফ বিরিয়ানী
কাচ্চি বিরিয়ানীর জন্য কাজী আলাউদ্দিন রোডে হানিফ বিরিয়ানীর যথেষ্ট নামডাক রয়েছে। সিদ্দিকবাজার কমিউনিটি সেন্টারের ঠিক পাশেই দেখা মিলবে হানিফ বিরিয়ানীর। সেখানে উঁচু প্লাটফর্মের ওপর বড় পাতিলে রাখা রয়েছে হানিফ বিরিয়ানী। হানিফের বিরিয়ানী রান্না হয় খাসির মাংস দিয়ে। প্রতি প্লেট বিরিয়ানী ১৩০ টাকা। হাফপ্লেট মিলবে ৬৫ টাকায়। আর ঘরোয়া কোনো অনুষ্ঠানে এখান থেকে খাবার নিতে চাইলে সে ব্যবস্থাও রয়েছে। খাবারের ফরমায়েশ দিতে হলে আসতে হবে ৩০ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোডে। এখানে কাচ্চি বিরিয়ানীর পাশাপাশি পাবেন শাহী মোড়গ পোলাউ, খাসির রেজালা, লাবাং।

রয়েল বিরিয়ানী
লালবাগের উর্দ্দু রোডের রয়েল বিরিয়ানীর কাচ্চি বিরিয়ানী খুবই সুস্বাদু। এখানে প্যাকেটজাত কাচ্চি বিরিয়ানী বিক্রির পাশাপাশি ৩ জনের জন্য এক বোল হিসেবে বিক্রি করা হয়।

নান্না মিয়ার বিরিয়ানী
লালবাগ কেল্লার মোড় কাছাকাছি আছে আরো একটি ঐতিহ্যবাহি বিরিয়ানির দোকান-যার নাম "নান্না মিয়ার বিরিয়ানী"!এই দোকানের বিরিয়ানী আসলেই খুব মজা। ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে বিরিয়ানি দিয়েই এখানকার মানুষের দৃষ্টি কাড়েন বাবুর্চি নান্না মিয়া। সে আমলে মাত্র দেড় টাকায় এক প্লেট পোলাও এবং আস্ত একটা মুরগিসহ শাহি মোরগ পোলাও উপভোগ করেছে মানুষ।

তখন মোরগ পোলাওয়ের সঙ্গে কোনো ঝোল দেওয়া হতো না। শুধু পোলাও এবং রোস্টের সঙ্গে যে ঝোলটুকু থাকত আর যে মিষ্টি সুগন্ধ বের হতো, তাতেই মানুষের মুখে স্বাদ লেগে থাকত বহু দিন। বাবুর্চি নান্না মিয়া রান্না করতেন আর ছোট্ট একটি ঘরে আর মাটিতে চাটাই পেতে খেতে হতো সবাইকে। সময় গড়িয়েছে, চাটাইয়ের বদলে এসেছে চেয়ার-টেবিল, খাবারের স্বাদেও এসেছে নতুনত্ব। এখন প্রতি প্লেটের দাম ১২০ টাকা।

মামুন বিরিয়ানী
মামুন বিরিয়ানীর যাত্রা শুরু হয় নাজিমুদ্দীন রোডে। কিন্তু মামুন বিরিয়ানী খ্যাতি পায় নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় শাখা খোলার পরে।প্রথম দিকে শুধু গরুর মাংসের বিরিয়ানি বেচলেও এখন মামুন বিরিয়ানীতে মিলবে পাঁচ পদের বিরিয়ানী। এক প্লেট গরুর কাচ্চি বিরিয়ানি মিলবে ৯০ টাকায়। খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি ১২০ টাকা প্লেট, আস্ত মোরগ মোসাল্লাম ১৮০ টাকা প্লেট, গরুর তেহারি ৭০ টাকা প্লেট, ডিম পোলাও ৬০ টাকা প্লেট, গরুর রেজালা ৪৫ টাকা বাটি আর ফিরনির বাটি ১৫ টাকা।

এ ছাড়া প্রতি মাসের ৪ তারিখে আস্ত মোরগ মোসাল্লাম দিয়ে বানানো বিশেষ প্যাকেজ মিলবে ২২০ টাকায়। নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় রয়েছে মামুন বিরিয়ানির তিনটি শাখা। এসব দোকানে দিনের পুরোটা সময় পাওয়া যায় বিরিয়ানি।

কাচ্চি বিরিয়ানীর আয়োজন শুরু হয় বেলা ১২ টা থেকে। আগে হাজীর বিরিয়ানী বিক্রি শুরু হতো সন্ধ্যা ৬ টা থেকে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে কাজী আলাউদ্দিন রোডে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। বর্তমানে সকাল বেলা, দুপুর এবং রাত, এই তিন বেলা কাচ্চি বিরিয়ানী পাওয়া যায়। নান্না মিয়া এবং রয়েলের বিরিয়ানীও ঠিক একই সময় বেলা ১২ টা থেকে পাওয়া যায়। ঠিক একইভাবে অন্যান্য বিরিয়ানী দোকানগুলো সেই সময় কাচ্চি বিরিয়ানী বিক্রয় করে থাকে।

এসব বিরিয়ানী হাউজ ছাড়াও ইসলামপুর, চকবাজারে বেশ কয়েকটি অভিজাত বিরিয়ানীর দোকান রয়েছে। মোটকথা সমস্ত পুরাতন ঢাকায় প্রচুর বিরিয়ানীর দোকান রয়েছে যেখান থেকে খুব কম দামে সুস্বাদু মুখরোচক বিরিয়ানী আপনি খেতে পারেন।