রাজধানীর শনির আখড়ায় দনিয়া কলেজের সামনে লাইসেন্স পরীক্ষা করার সময় এক ছাত্রকে চাপা দিয়ে পালাচ্ছে একটি পিকআপ ভ্যান। ছবি: সংগৃহীত

আর কতদিন এই বেপরোয়া পরিবহন?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন।

মাজেদুল হক তানভীর
সহ-সম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়
প্রকাশিত: ০১ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১০ আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১৬


রাজধানীর শনির আখড়ায় দনিয়া কলেজের সামনে লাইসেন্স পরীক্ষা করার সময় এক ছাত্রকে চাপা দিয়ে পালাচ্ছে একটি পিকআপ ভ্যান। ছবি: সংগৃহীত

জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য। এটাই জগতের ধ্রুব সত্য। এরপরও কিছু মৃত্যু, যা মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে বাসচালকদের বিবেকহীনতায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর পরিণতিতে ঘটা একের পর এক অকালমৃত্যু।

দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ও একই কলেজের ছাত্রী দিয়া খানমের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। জীবনের নতুন অধ্যায়ে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগেই দপ করে নিভে গেল তাদের জীবনের প্রদীপ।

সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন শিক্ষার্থী। জাবালে নূর পরিবহন লিমিটেডের বাসটির চালক সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি উঠিয়ে দেন। একই জায়গায় গত ১ জুলাই বসুমতী পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র শাহরিয়ার সৌরভ। তার একদিন পরেই ২ জুলাই মিরপুরে দিশারী পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সৈয়দ মাসুদ রানা। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল দুই বাসের রেষারেষিতে হাত বিচ্ছিন্ন হয় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের। টানা কয়েক দিন আইসিইউতে সংজ্ঞাহীন থেকে তিনি মারা যান। এ ছাড়া গত ১৭ মে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে দুই বাসের রেষারেষিতে আহত হওয়ার পর প্রাণ হারান ঢাকা ট্রিবিউনের কর্মকর্তা নাজিমউদ্দীন।

এভাবে বেড়ে চলছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা। কিন্তু এই দুর্ঘটনা রোধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। গত রবিবারের ঘটনায় দুই বাসচালক ও দুই সহকারীকে মিরপুর থেকে সোমবার গ্রেফতার হলেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

ঘটনার দিন রবিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ভারতের মহারাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মানুষ মারা গেলেও নাকি কেউ প্রশ্ন করেননি।

মন্ত্রী আরও বলেন, দায়ী ব্যক্তিরা অবশ্যই সাজা পাবেন। কিছুতেই রেহাই পাবেন না। আগের ঘটনাগুলোতেও এমন প্রতিশ্রুতি অনেকেই বহুবার দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে যথাযোগ্য শাস্তির ঘটনা বিরল? পত্রপত্রিকায় বারবার খবর প্রকাশিত হয়, সমব্যথীরা রাজপথে নামে, কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি আর হয় না। ঢিমেতালে গড়ানো বিচারপ্রক্রিয়ায় তা আটকে থাকে, নয়তো একপর্যায়ে ঘটনাই হারিয়ে যায়, অন্য সব ঘটনার আড়ালে।

গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। যেখানে লেখাপড়া, খেলাধুলা, আড্ডা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা সেখানে বন্ধু, সহপাঠী হারানোর বেদনা নিয়ে তারা রাজপথে। একদিকে সরকার দেশে ৫-জি (পঞ্চম জেনারেশন) ইন্টারনেট সেবার পরীক্ষা চালাচ্ছে অন্যদিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে। তাদের অপরাধ তারা দোষীদের শাস্তি এবং নিরাপদ সড়ক চায়।

এমন থমথমে পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? সেসব বাস চালকের বিবেকহীনতা, আইনের অভাব নাকি কোনো তৃতীয় শক্তির ইন্ধন? গাড়িতে উঠলেই চালক, হেল্পাররা আগ্রাসী হয়ে যাচ্ছে কেন?

গণপরিবহন সেক্টরের অনিয়মের কারণে অনেকদিন থেকেই আলোচনায়। কিন্তু তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে কখনোই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তাদের এত ক্ষমতার উৎস আসলে কোথায়? আজকাল স্কুল-কলেজের বাচ্চাদেরও প্রতিবাদ করতে মাঠে নামতে হচ্ছে। এসব মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে, প্রধানমন্ত্রী এসব কারণে সম্প্রতি নৌ-পরিবহন মন্ত্রীকে তিরস্কার করেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও বিব্রত বলে প্রকাশ্যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। পরিবহন সেক্টর নিয়ে সরকার যে বিব্রত, তা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করছেন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা।

রাজধানীর রাস্তায় স্কুল-কলেজের ছাত্ররা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে নেমেছে, তারা গাড়ি থামিয়ে জানতে চাচ্ছে— লাইসেন্স আছে কি না? যদি থাকে তাহলে গাড়ি যেতে দেওয়া হচ্ছে, না হলে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। রাস্তায় থেকে ছাত্রদের সরাতে পুলিশও তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত সময় পার করছে। শিক্ষার্থীদের হাতে লাইসেন্স চেক করার অনুমতি থাক কিংবা না থাক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশের হাতে তো লাইসেন্স আছে। সুতরাং তারা অ্যাকশনে যাচ্ছে। এরই প্রমাণ স্কুল-কলেজের ইউনিফর্মধারীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশন।

পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো বীরত্বের বিষয় নয়, এসব ঘটনার ছবি যত ছড়াবে তত সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে। ততই ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। যার খেসারত দিতে হবে সরকারকেই।

বাংলাদেশে দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেকেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন। এ সময় আহত হয়েছেন অপর সাড়ে ২১ হাজার জন। দুর্ঘটনা বেশির ভাগই ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহতের অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না নিতে পেরে কিংবা ডাক্তারদের শিডিউল না নিতে পেরে যথাসময়ে চিকিৎসার অভাবে মারা যান। অপচিকিৎসায় পঙ্গুত্ববরণকারীদের সংখ্যাও কম নয়।

দুর্ঘটনাগুলোর মূল সমস্যা পরিবহন সেক্টরের দৌরাত্ম্য। এর স্থায়ী সমাধান এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন কোনো দেশ নেই। তবে উন্নত দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা খুবই সুনির্দিষ্ট হয়। বাংলাদেশে এখন এই সেক্টরের যা অবস্থা, এটা স্পষ্ট দৌরাত্ম্য। দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা এবং উপযুক্ত বিচারহীতনতার সংস্কৃতির কারণেই এটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এতে লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়েছে এখন। আর এই লাগাম এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষতে ফল যে অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তা স্পষ্টই দৃশ্যমান।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
ফেসবুক বইয়ের নেশা কেড়ে নিয়েছে
শাওন রহমান ১২ আগস্ট ২০১৮
মুক্তমনা হওয়ার মনোকষ্ট অনেক
জীবেন রায় ১০ আগস্ট ২০১৮