এই লেখাটি প্রিয়.কম-এ প্রকাশিত মোবাইল তরঙ্গ কেন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ? (প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব ও তৃতীয় পর্ব) এর ধারাবাহিকতায় লেখা।
প্রথম পর্বে সম্পূর্ণ তরঙ্গের (Entire Electromagnetic Spectrum) একটি সামগ্রিক চিত্র দেখান হয়েছিলো। দ্বিতীয় পর্বে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির নিচের দিকের চারটি ভাগ (VLF, LF, MF, HF) নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছিল। তৃতীয় পর্বে মাঝের দুটি ভাগ (পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাগ যথাক্রমে VHF ও UHF) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আজকে এই কিস্তিতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির শেষ দুটি ভাগ (SHF ও EHF) নিয়ে আলোচনা করা হবে।

নীচের ছবিতে সম্পূর্ণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির (৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত) একটি সামগ্রিক চিত্র দেওয়া হল। প্রিয় পাঠক, খেয়াল করুন যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিকে মোট ৮টি ভাগে ভাগ করে দেখান হয়েছে (কম থেকে বেশি ফ্রিকোয়েন্সি ক্রমানুসারে) এবং কোন ভাগ প্রধানত কি কি ধরনের টেলিযোগাযোগে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা এখানে দেখান হয়েছে। দেখান হয়েছে যে কেবল মোবাইল ফোনের জন্যই সবগুলো ব্যান্ড দিয়ে দেওয়া হয়নি। মোবাইল ছাড়াও আরও বিভিন্ন টেলিযোগাযোগের প্রযুক্তি আছে যারাও কিনা ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড পাবার যোগ্য দাবিদার। আজকে এই চতুর্থ পর্বে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির শেষ দুটি ভাগ (SHF ও EHF) নিয়ে আলোচনা করা হবে।

৭. RF: Super High Frequency (SHF):
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সপ্তম ভাগটি হল Super High Frequency (SHF) যা কিনা ৩ গিগাহার্জ থেকে ৩০ গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ব্যান্ডের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১ সেন্টিমিটার থেকে ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় এই ব্যান্ড সেন্টিমিটার ওয়েভ ( centimeter wave) হিসাবেও পরিচিত। বর্তমানে এই ব্যান্ড বিভিন্ন ধরনের টেলিযোগাযোগে খুবই ব্যবহৃত হয়। যেমন: ওয়্যারলেস ল্যান (IEEE 802.11a Wireless LANs), স্যাটেলাইট আপলিঙ্ক-ডাউনলিন্ক (C-band), টেরেস্ট্রিয়াল হাইস্পিড ডাটা লিঙ্ক (microwave), মোবাইল ফোনের কোর নেটওয়ার্কের মধ্যে ডাটা আদান-প্রদানে (back-haul), বিভিন্ন মাইক্রোওয়েভ (microwave) যন্ত্রপাতিতে, ওয়্যারলেস ইউএসবি (Wireless USB)। এই ব্যান্ডে মোবাইল ফোন চালানোতে তেমন কোন প্রযুক্তিগত সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে হয়তো এই ব্যান্ডে আমরা মুঠোফোন দেখতে পাবো। তবে এক্ষেত্রে ফোনের ব্যাটারি বড় করা দরকার কেননা ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ার সাথে সাথে সিগন্যাল ক্ষয়ের পরিমাণ বাড়ে ফলে বেশি পাওয়ারে ব্যাটারি দরকার হয়ে পরে। ছোট্ট মুঠোফোনে যা আঁটানো কিনা একটি বড় ধরনের ডিজাইন চ্যালেঞ্জ। মনে রাখা দরকার যে মোবাইলের জন্য ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ দিতে গেলে না আবার অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যান্ডউইথ কম পরে যায়। তাই এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা দরকার।

আরও মনে রাখা প্রয়োজন যে এই ব্যান্ড অনেক প্রযুক্তির জন্য মোবাইলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই মোবাইলকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা যাবে না। যেমন ধরুন, স্যাটেলাইট টেলিযোগাযোগের জন্য এমন ব্যান্ড দরকার যার সিগন্যালের বৃষ্টিতে কম ক্ষয় হবে এবং যা কিনা বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আকাশে যেতে পারবে। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই যে শর্ট ওয়েভ সিগন্যাল কেমন বায়ুমণ্ডলে বাঁধা পেয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসছে; স্যাটেলাইটে তা হলে চলবে না। সাধারণত ১ গিগাহার্জের বেশি সিগন্যাল ভেদ করে আকাশে যেতে পারে (Space Wave)। একটি বাস্তব জীবন উদাহরণ বলা যায় GPS স্যাটেলাইট সিস্টেম। সারা পৃথিবীর মানুষ এই স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া সিগন্যাল তাদের GPS রিসিভারে ধরে তার নিজের অবস্থান নির্ণয় করে এবং এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় (Navigation)। এই GPS স্যাটেলাইট গুলো সিগন্যাল পাঠায় ১৫৭৫.৪২ মেগাহার্জে। এখন মোবাইলে হাই-স্পীড ডাটা দিয়ে হাই-ডেফিনিশন (HD) ভিডিও দেখার চেয়ে নিশ্চয়ই GPS ন্যাভিগেশন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৮. RF: Extreme High Frequency (EHF):
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ ভাগটি হল Extremely High Frequency (EHF) যা কিনা ৩০ গিগাহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ব্যান্ডের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১ মিলিমিটার থেকে ১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় এই ব্যান্ড মিলিমিটার ওয়েভ ( millimeter wave) হিসাবেও পরিচিত। বর্তমানে এই ব্যান্ড মূলত ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায়, যেমন: রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি (Radio Astronomy), ৬০ গিগাহার্জে স্যাটেলাইটে ভিত্তিক রিমোট সেন্সিং (Remote Sensing), ৫৭ – ৫৯.৩ গিগাহার্জে আবহাওয়া বিষয়ক স্যাটেলাইট। বর্তমানে খুব সীমিত পরিসরে যোগাযোগের জন্য এই ব্যান্ড ব্যবহৃত হচ্ছে, তাও আবার অল্প কিছু ফ্রিকোয়েন্সিতে। যেমন: আমেরিকাতে ৩৮.৬ - ৪০.০ গিগাহার্জে উচ্চগতির (high-speed) মাইক্রওয়েভ (microwave) ডাটা লিন্ক (লাইসেন্স সাপেক্ষে), ৪০.০ গিগাহার্জে স্বল্প দূরত্বের (প্রায় ২ কিঃমিঃ রেডিয়াসে) টেলিযোগাযোগ (লাইসেন্স-বিহীন বা উন্মুক্ত), ৭১ - ৭৬, ৮১ - ৮৬, এবং ৯২ - ৯৫ গিগাহার্জ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট উচ্চ ব্যান্ডউইথ টেলিযোগাযোগে (লাইসেন্স সাপেক্ষে)। নীচের ছবিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মাইক্রোওয়েভ রেডিও রিলে লিংক দেখা যাচ্ছে।
এই ব্যান্ডে রেডিও সিগন্যাল দেওয়া-নেওয়া যায়, টেলিযোগাযোগ খুবই সম্ভব। তারপরও দেখা যাচ্ছে যে খুবই সীমিত টেলিযোগাযোগের জন্য এই ব্যান্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিওবা ব্যবহৃত তা কেবল পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট টেলিযোগাযোগে, মুঠোফোনে একেবারেই না। প্রশ্ন হোল কেন? এই মূল ব্যান্ডের সমস্যা হোল সিগন্যাল যখন বায়ুমণ্ডলের (traveling medium of signal) মাঝ দিয়ে যায় এবং প্রকৃতির (গাছ-লতাপাতা, বাড়িঘর, পাহাড়-পর্বত, বৃষ্টি-তুষার ইত্যাদি) সাথে interact করে তখন এই তুলনামূলক উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে সিগন্যাল অনেক বেশি করে পাওয়ার হারায় (atmospheric attenuation or propagation loss)। একটি বড় সমস্যা হোল বাতাসে অক্সিজেন অনেকটুকু শক্তি শুষে নেয় (মূলত ৫৭-৬৪ গিগাহার্জে)। তারচেয়েও বড় সমস্যা হোল বৃষ্টি (rain fade), সিগন্যাল ফ্রিকোয়েন্সি যত বাড়বে বৃষ্টিতে তত বেশি শক্তি ক্ষয় হবে, আবার বৃষ্টির পরিমান বাড়লেও বেশি শক্তি ক্ষয় হবে। সুতরাং তত্বগত ভাবে সিগন্যাল আনা নেওয়া গেলেও, বাস্তববিকভাবে এর প্রয়োগ খুবই কম। কেননা মুঠোফোন বা স্যাটেলাইট দুটোই এত ছোট যে সেখানে অনেক পাওয়ার দেওয়া সম্ভব না। তবে যেহেতু এই ব্যান্ড ফাঁকা ফ্রিকোয়েন্সি আছে এবং কিছু বাস্তব সমস্যা থাকা স্বত্বেও ওয়্যারলেস যোগাযোগের জন্য এর কিছু সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান সেহেতু এই ব্যান্ডে ভবিষ্যতে হয়তো কিছুটা হলেও হয়তো ওয়্যারলেস টেলিযোগাযোগ বাড়বে। ইতিমধ্যে ৩৮ ও ৬০ গিগাহার্জ মোবাইল যোগাযোগের জন্য গবেষণা শুরু হয়েছে, তবে দিল্লী বহুদূর। EHF ব্যান্ড ৩০ গিগাহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে বলা যায় যে ১০০ গিগাহার্জের উপরে মোবাইল যোগাযোগের তেমন কোন আশাই নেই।
এই পর্বে আপাতত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির শেষের দুটি ভাগ নিয়ে আলোচনা করা হল। আগামী কিস্তিই হয়তো লেখাটির শেষ কিস্তি হবে। মাঝের পর্বগুলো একটু বেশি টেকনিক্যাল হয়ে গেলো। শেষের পর্বে আবার লেখার মূল বক্তব্যে ফিরে আসার চেষ্টা করব এবং উপসংহার টানার চেষ্টা করব কেন মোবাইল তরঙ্গ যেকোন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ।
(চলবে)
|
প্রিয়.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রিয় বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করছি আমরা। এখানে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিষয়। সঙ্গে থাকুন প্রতি মুহুর্তে। যারা আমাদের সাইটে লেখা দিচ্ছেন, তারা অবশ্যই নিজেদের অ্যাকাউন্টে ছবি যুক্ত করুন। সঠিক নাম এবং ছবি ছাড়া সাধারনত কোনও লেখা প্রকাশ করা হয় না। সহযোগী: ইউএনবি, চ্যানেল আই © ২০১৩ প্রিয়.কম ॥ ইমেল: info@priyo.com ফোন: +৮৮০-২-৯৬৬ ৫৩২৫-৬, +৮৮০-১১-৯৩১৭ ৬৩৫৬ |
আমাদের অন্যান্য সাইট: |