সাল ১৯৯৯ ইং । বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় । এস এস সি প্রাতঃ শাখা ব্যাচ...............
আমি এবং আমার তিন বন্ধু সিরাজ, মাহবুব ও প্রত্যুষ। যথাক্রমে রোল নং-১,২,৩ এবং আমি ছিলাম ৪।
আমরা ছিলাম এক দেহে চার প্রাণ। আমাদের বন্ধুত্বের গভীরতাও ছিল অসীম । মাহবুবের কাছে যদি কেউ কখনও দশটা টাকা চাইতো, তবে সে যদি পকেটে হাত দিয়ে ১০০ টাকার নোট পেত তাহলে কখনোই তা ভাংতি করে দিতনা। ঐ ১০০ টাকার নোটটা পুরোটাই দিয়ে দিত। সে সারাজীবন বন্ধুদের জন্য সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছে। সে যখন ভার্সিটি শেষ করে চলে আসে, তখনও তার ভার্সিটির বিভিন্ন ক্যান্টিনে ৪০/৫০ হাজার টাকা লোন ছিল, যা আমরা পরে জেনেছি। লোন করে দাওয়াত খাওয়াতে এর মত বড় ওস্তাদ আমি দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি। সেই লোন সে চাকরিতে জয়েন করার পর পরিশোধ করে ।
বান্দরবানে যখন মোবাইল নেটওয়ার্ক আসে তখন আমি ছাত্র। মাহবুবের মোবাইল চুরি হয়েছে শোনে আম্মা থেকে টাকা নিয়ে আমি তাকে মোবাইল কিনে দিয়েছিলাম। প্রত্যুষ গীটার কিনে দিয়েছিল, এরকম হাজারো প্রমাণ আছে আমাদের বন্ধুতবের-ভালবাসার। আমার বাসা ছিল বালাঘাটা শহর থেকে ২-৩ কিলো দূর, সিরাজ হাফেজঘোনা শহর থেকে ১ কিলো দূর, মাহবুব সওজ কোয়ারটার-শহর এলাকায়, প্রত্যুষ কালাঘাটা শহর থেকে ২-৩ কিলো দূর, মধ্যপথে আবার নদী পাড়ি দিতে হত। আমাদের ক্লাস শেষ হত বারটা কি সাড়ে বারটায়।
আমাদের আড্ডা দেয়ার স্থান ছিল পুরাতন সাঙ্গু ব্রিজ। যে যেখানেই থাকি না কেন প্রতিদিন বিকালে বন্ধুরা সাইকেল নিয়ে হাজির হতাম। যদি কোনদিন কেউ অনুপস্থিত থাকত, তবে সকলে মিলে তার বাসার দিকে রওনা দিতাম। তখন তো আর মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না যে, ফোন করে খবর নিয়ে নিব। সকলে মিলে শুরু করতাম আড্ডা । বিবিসি রেডিওর মত দুনিয়ার সব খবর সম্প্রচার করতাম, গলা উচিঁয়ে গান করতাম। সিগারেটের ধোঁয়াই সুখ খুজে নিতাম। আর কারও পকেটে টাকা থাকলে পাশের আর্মি ক্যান্টিনে গিয়ে চা-বসনিয়, বাজেট থাকা সাপেক্ষে কাবাব চিকেন ফ্রাই খেতাম। আড্ডা দেয়ার স্থান হিসেবে পুরাতন সাঙ্গু ব্রিজ বেছে নেয়ার কারণ ছিল- মুরুব্বী শ্রেণীর কম আনাগোনা, সাঙ্গু নদীর ফ্রেশ বাতাস। প্রত্যুষ গীটার বাজাতে পারত-ভাল গানও করত। মাহবুব অসম্ভব গাইত। আমি টুকটাক লিখতাম তবে লেখার হাত আমার চাইতেও মাহবুব-প্রত্যুষের ভাল ছিল। এর মধ্যেই আড্ডার জন্য গান লেখা হল...............
সোডিয়ামের আলোয় দেখা হয় অবয়ব
আসা যাওয়া হয় একটাই সময়
দু হাতে করতালি ,চিৎকারে গান ধরি
বাতাসের ছোঁয়াই ভাঙ্গে অভিমান।
সিগারেটের ধুয়াই বেচা হয় স্বপন
সঙ্গিহারা সবাই হলাম আপন।
থাকবনা চিরকাল ছায়া হয়ে, পাশে পাশে
মনেরি আলোতে দেখ চেয়ে
তুমি আমি খুব কাছে।
দু হাতে করতালি.........
গান লিখেছিলাম আমি, সুর করেছিল প্রত্যুষ ।
সাল ২০০৩ ইং। মাহবুব চিটাগং ভার্সিটি তে এলএলবি পড়ছে, সিরাজ চিটাগং ভার্সিটি তে ফরেস্ট্রি পড়ছে, প্রত্যুষ চলে গেল দিনাজপুর এমবিবিএস পড়তে। প্রত্যুষ যেদিন দিনাজপুর চলে যাচ্ছে, সেদিন তাকে বিদায় দিতে সবাই ষ্টেশনে এল, আমি ছাড়া। আমি সারাদিন বাসায় বসে বসে কান্না করলাম। আমি ছিলাম না তাই প্রত্যুষ অনেক মন খারাপ করেছিল। কিন্তু আমি কখনও বলিনি যে, আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি, আমারও অনেক মন খারাপ ছিল। আমি রয়ে গেলাম বান্দরবান। তখনও মোবাইল নেটওয়ার্কহীন বান্দরবান। মাসের শুরুতে চিঠি পাঠালে জবাব পেতে পেতে মাসের শেষ। মাঝে মাঝে ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে প্রতি মিনিট ২০ টাকা ব্যায়ে বন্ধুদের সাথে কথোপকথন হত।
সাল ২০১০ ইং। আমি একটা এনজিওতে কর্মরত ছিলাম। প্রত্যুষ বান্দরবান হাসপাতালে জয়েন করে। মাহবুব বান্দরবান জর্জ কোর্টে যাওয়া আসা করে। সিরাজ সিলেটে নেসলে বাংলাদেশে আছে। মোবাইল ফোনে সবসময় সবার সাথে যোগাযোগ থাকছেই। প্রতিদিন অফিস শেষ করে হত মোটরসাইকেল ভ্রমণ। হয় নীলাচল না হয় শৈলপ্রপাত, তাও না হলে নদীতে গোসল। প্রতি সন্ধ্যায় আড্ডা দেয়ার একটাই স্থান পুরাতন সাঙ্গু ব্রিজের পাশে নতুন স্থাপিত কাসেম ভাইয়ের দোকান। প্রতি শুক্রবার চলত ক্রিকেট খেলা। আমরা চার বন্ধু সবসময় চেষ্টা করতাম নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে। এই বছরই আমাদের ফেসবুক এর সাথে পরিচয়।
সাল ২০১২ ইং, ৯ই জুন। বর্তমানে আমি গাজীপুর কৃষি গবেষনায়, মাহবুব উকালতি করবে না সে চাঁদপুর সোনালী ব্যাংকে,সে যেদিন বান্দরবান ছেড়ে চলে গেল সেদিনের কষ্ট বলে আর শেষ করা যাবে না। প্রত্যুষ কিছুদিন কক্সবাজার আর কিছুদিন বান্দরবান, সিরাজ সিলেটে আছে। প্রতিদিন অফিস শেষ করে এখন আর নীলাচল-শৈলপ্রপাত যাওয়া হয় না, ক্রিকেট খেলা হয় না, প্রত্যুষ আর আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। নদীতে গোসল বা মোটরসাইকেল ভ্রমণ কোনটাই হয় না।
তবে ফেসবুক এ প্রতিদিন শত ব্যস্ততার মাঝেও আড্ডা হয়। নিজের স্ট্যাটাস জানাই। বন্ধু/বান্ধবীদের সাথে আলাপ করে সিরাজ/মাহবুবের জন্য পাত্রী খুঁজছি। নিজের পরিবারের সব খবর নিমিষেই জেনে নিচ্ছি। আমার আট মাসের কন্যা যাহী একটু হাসলেই সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দিচ্ছি। সাংসারিক এবং চাকরি জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝে আমাকে সবার মাঝে সব আনন্দের একজন করে দিয়েছে - ফেসবুক। ফেসবুক আমাকে দূরে থাকার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। ধন্যবাদ ফেসবুক। জীবন তার গতিময়তার কারণে ভিন্ন দেশের ভিন্ন বন্দরে নোঙ্গর ফেলবেই, তবে ফেসবুক আমাকে সব ঘটনার সাক্ষী করে রাখবে। তোমার মাধ্যমে আরও একবার বলি-বন্ধুরা ভালবাসি তোমাদের।
মোঃ মাসুম চৌধুরী
|
প্রিয়.কম একটি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট মিডিয়া। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রিয় বিষয়গুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করছি আমরা। এখানে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিষয়। সঙ্গে থাকুন প্রতি মুহুর্তে। যারা আমাদের সাইটে লেখা দিচ্ছেন, তারা অবশ্যই নিজেদের অ্যাকাউন্টে ছবি যুক্ত করুন। সঠিক নাম এবং ছবি ছাড়া সাধারনত কোনও লেখা প্রকাশ করা হয় না। সহযোগী: ইউএনবি, চ্যানেল আই © ২০১৩ প্রিয়.কম ॥ ইমেল: info@priyo.com ফোন: +৮৮০-২-৯৬৬ ৫৩২৫-৬, +৮৮০-১১-৯৩১৭ ৬৩৫৬ |
আমাদের অন্যান্য সাইট: |