ইতিহাসের বিভিন্ন সময়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, চরিত্র ও স্থান নিয়ে রচিত উপন্যাস বিরল নয়। যদি সময়ের সেই বিশেষ অংশকে ধরা যায়, তবে সেই লেখনির আলাদা সমাদর আছে। এইসব উপন্যাস তর্কের উর্ধ্বে নয়, বরং ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রের রূপায়নে ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্কের শেষ নেই। তবুও কালে কালে বিখ্যাত-অখ্যাত লেখকেরা ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রতি টান অনুভব করেছেন। বিবৃত করতে চেয়েছেন ঐতিহাসিক কোন মুহুর্তিক ভাষ্য। এমন সব উপন্যাস থেকে সেরা দশটি খুজেঁ বের করার কঠিন কাজ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ। সেই দশটি উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো- ১. ফ্লাশম্যান - জর্জ ম্যাকডোনাল্ড ফ্রেসার ফ্লাশম্যান ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। এটা ফ্লাশম্যান সিরিজের বারোটি উপন্যাসের প্রথমটি। টমাস হিউগেজের টম ব্রাউনস স্কুল ডেজ নামের আধা আত্মজৈবনিক (১৯০০ এবং ১৯০৫ মধ্যে লেখা) ‘দি ফ্লাশম্যান পেপার্স’ অবলম্বনে এটি লেখা। সেই সুত্র ফ্রেসার তার লেখার শেষে বিশদ ফুটনোটই দেয়া হয়েছে। এটা উপস্থাপনা করে ঐতিহাসিক পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। এতে ১৮৩৯ ও ১৮৪২ সালের মধ্যকার ফ্লাশম্যানের কল্পিত আফগানিস্তান মিলিটারি শোষণের বর্ণনা আছে, যার পরিণতি ছিল কাবুল থেকে হটে যাওয়া। আশ্চর্যজনকভাবে বর্ণনাগুলো নিখুঁত। এর কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন পরিচালক বিচার্ড লেস্টার এবং প্রযোজক স্টানলি বেকার। কিন্তু আর্থিক কারণে প্রকল্পটি বেশি দূর যেতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে রয়্যাল ফ্লাশ চিত্রায়িত হয়, যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে।
২. ওয়ার এন্ড পিস- লিও টলস্টয় টলস্টয়ের এই এপিক মাস্টারপিসের নাম বইপ্রেমীদের মধ্যে খুব কমজনেরই অজানা। বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। যুদ্ধের আবহের মধ্যে পারিবারিক জীবনের গল্প এটি- যখন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী খুবই দ্রুত ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রবেশ করে, এই সময় রাশিয়াও আক্রান্ত হয়। এই উপন্যাসে পাঁচ রাশিয়ান অভিজাত পরিবারের চোখে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। বইটি দি রাশিয়ান মেজেঞ্জার ম্যাগাজিনে ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৭ সালে দি ইয়ার ১৮০৫ নামে প্রকাশিত হয়। ২০০৯ সালে নিউজউইক বইটিকে সেরা ১০০ বইয়ের তালিকায় স্থান দেয়। ২০০৩ সালে বিবিসি পরিচালিত দি বিগ রিড জরিপে বইটি বিশতম তালিকায় যুক্ত হয়। কাজের ধরণে থেকে এটি মহাকাব্য মানের। অনেকক্ষেত্রে এতে বর্ণনার চেয়ে দার্শনিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। এটাকে ধরা হয় টলস্টয়ের সবচেয়ে ভালো কাজ আকারে। একই সাথে এখনো পর্যন্ত লেখা মহত্তম উপন্যাসগুলোর একটি ধরা হয় একে। এরমধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসসুলভ ফর্মের সাথে সাথে আছে কাব্যত্ব। যা টলস্টয়ের লেখনির বৈশিষ্ঠ্যসূচক। ৩. মাস্টার অ্যান্ড কমান্ডার- প্যাট্রিক ও’ব্রায়ান এটি বিখ্যাত আরবেরি/মাতুইয় সিরিজের বিশটি উপন্যাসের প্রথমটি। ইংলিশ লেখক প্যাট্রিক ও’ব্রায়ানের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে আমেরিকা, ১৯৭০ সালে যুক্তরাজ্যে। এতে বিবৃত হয় ক্যাপ্টেন জ্যাক আরবেরি ও স্টিফেন মাতুইয়ের বন্ধুত্ব। যেখানে ও’ব্রায়ান ডিটেইলস বর্ণনা ও ঐতিহাসিকতাকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য প্রশংসিত হন। সেখানে দেখানো হয় উনিশ শতকের যুদ্ধকালীন মানুষ, তাদের অস্ত্র, খাবার-দাবার, কথাবার্তা ও আবহকে ধারণ করেছে। এটি লর্ড ককরানের ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে লেখা। এর সময়কাল নেপোলিয়নের যুদ্ধ। ঐতিহাসিক, সাহিত্য সমালোচক ও পাঠকদের সমাদর পাওয়া বইটির থিম অবলম্বনে চিত্রায়ন ঘটে ২০০৩ সালে মাস্টার এন্ড কমান্ডার: দি ফার সাইড অব দি ওয়ার্ল্ড সিনেমার মাধ্যমে। এতে অভিনয় করে রাসেল ক্র এবং পল বিটানি।
৪. আইভানহো- ওয়াল্টার স্কট ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে স্যার ওয়াল্টার স্কট একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। যিনি একজন কবিও বটে। বারো শতাব্দীর ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে রচিত আইভানহো প্রকাশিত হয় ১৮১৯ সালে। এটি মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত ও ব্যক্তি জীবনের চিত্রায়নের জন্য উল্লেখযোগ্য। আইভানহোর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক কাহিনীকে অনন্য দক্ষতায় ফুটিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, স্কট মধ্যযুগীয় মনস্তত্ত্ব বেশ ভালোই বুঝেন। আইভানহো একজন ক্রুসেড ফেরত যোদ্ধা, যিনি রাজা রিচাডের সহযোদ্ধা। যিনি তার প্রেমিকার কাছে ফিরতে গিয়ে সহসা নিজেকে রিচার্ড ও তার ভাই জনের রাজনৈতিক কুটচালের মধ্যে আবিষ্কার করেন। ৫. দি ইনহেরিটরস- উইলিয়াম গোল্ডিং উইলিয়াম গোল্ডি তার লর্ড অব দ্যা ফ্লাইস উপন্যাসের জন্য বেশি পরিচিত। ইনহেরিটরস লিখেন ১৯৫৫ সালে। এটি কম পরিচিত একটি কাজ। নিজের থেকে উচ্চতর ও নিষ্ঠুর শ্রেণির হোমো সেপিয়নস দ্বারা নিয়ান্ডারথাল মানুষদের একটি গোষ্টির ধ্বংস হয়ে যাবার কাহিনি এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। লোক নামের এক নিয়ান্ডারথাল এদের সম্পর্কে বলে, তারা শীতের মতো।
৬. দি ব্লু ফ্লাওয়ার- পেনোলোপি ফিটজারল্ড আটারো শতকের শেষ দিকের জার্মানির প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস এটি। এই গল্পের মূল চরিত্র মেধাবি ফিটজ ভস হারডেনবার্গ (মে ০২, ১৭৭২- মার্চ ২৫, ১৮০১), নোভিলাস ছদ্মনামে হয়ে উঠেন বড় মাপের রোমান্টিক কবি ও দার্শনিক। তিনি প্রেমে পড়েন বারো বছর বয়েসী সোফি ভন কুনের। এছাড়া গেটে ও ভন স্লিগেলসহ অন্যান্য বাস্তব চরিত্র উপন্যাসটিকে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। ফিটজারল্ডের বহু আদরণীয় এই শেষ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। ২০১২ সালে দি অবজারভারের মতে এটি সেরা দশটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি। ৭. রোস্টেরেশন – রস ট্রিমাইন রস ট্রিমাইনের এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। এটি সে বছরের বুকার পুরষ্কার এবং সানডে এক্সপ্রেসের বর্ষসেরা বইয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলো। ১৯৯৫ সালে এটি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়। এটি একজন তরুণ উচ্চাকাঙ্খী মেডিকেল ছাত্র মেরিভেলের কাহিনি, যেখানে হঠাৎ করে সে নিজেকে রাজা দ্বিতীয় চালর্সের দরবারে হাজির হয়। এখানে মেরিভেলের উত্থান-পতনের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। ট্রিমাইন এই বইয়ের আরো একটি পর্ব লিখেন। যেটি ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। ৮. রিজেনারেশন – প্যাট বার্কার বার্কারের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ত্রয়ী উপন্যাসের প্রথর্মটি ১৯৯১ সালের বুকারের জন্য মনোনয়ন পায়। তৃতীয় বই ‘দি ঘোস্ট রোড’ ১৯৯৫ সালে বুকার জিতে নেয়। এটির প্রেক্ষাপট ১৯১৭ সালের স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের ক্রেগলকহার্ট যুদ্ধ হাসপাতাল, সেখানে এক আর্মি মনস্তত্ববিদের গল্প বলা হয়। উইলিয়াম রিভার্স কিভাবে শেলাহত বন্দীদের সাহায্য করে। নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ মতে, এটি সে বছর প্রকাশিত সেরা চারটি উপন্যাসের একটি। এটি শিথিলভাবে সত্য ঘটনাকে অবলম্বন করে রচিত। ১৯৯৭ সালে গিলিস ম্যাককিননের পরিচালনায় এর চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। সেটি বিহাইন্ড দ্য লাইনস নামে আমেরিকায় মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালে।
৯. গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়ারিং – ট্রেসি চিভ্যালিয়র ১৭ শতকের হল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাস দুই মিলিয়ন কপির চেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এটা খুবই মজাদার যে, চিত্রে আঁকা একজন বালিকা এই উপন্যাসের অনুপ্রেরণা। গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়ারিং ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ডেলফ ধারার চিত্রকর জোহানেস ভার্মার চিত্র গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়ারিং থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। এখানে মূল চরিত্র আকারে চিভ্যালিয়র একটি কাল্পনিক চরিত্রকে বেছে নেন। চরিত্রটি হলো এই ছবিটির মডেল। আরো আছে ভার্মা ও তার চিত্রকলা। এই উপন্যাস অবলম্বনে একই নামের চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০০৩ সালে, নাটক মঞ্চায়িত হয় ২০০৮ সালে। ১০. উলফ হল- হিলারি মেন্টেল উলফ হল হিলারি মেন্টেলের বিভিন্ন পুরষ্কারজয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয়েই ২০০৯ সালের ম্যান বুকার ও ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল পুরষ্কার জিতে নেয়। এই উপন্যাসের কাহিনির পটভূমি ১৫০০ সাল থেকে ১৫৩৫ সালের। এই কাল্পনিক উপন্যাসটিতে আছেন টমাস ক্রমওয়েল, অস্টম হেনরি ও স্যার টমাস মুর। বুঝা যায় এতে ক্রমওয়েলের উত্থান ও হেনরির আদালতও আছে। ২০১২ সালে দি অবজারভারের মতে সেরা দশটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি। প্রথম থেকেই বইটি ট্রিলজি করার ইচ্ছে ছিলো হিলারির। এর আরেকটি সিক্যুয়েল প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এর নাম বিইং আপ দ্যা বডি।