নোবেল বিজয়ী তুর্কী লেখক ওরহান পামুক খুবই পরিচিত একটি নাম সাহিত্য জগতে। তার একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘মাই নেম ইজ রেড’, যার বাংলা অনুবাদ ‘আমার নাম লাল’। মূল বইটি প্রকাশিত হয় তাঁর স্বদেশী ভাষায়, ১৯৯৮ সালে। ইংরেজীতে অনুবাদ হয় ২০০১ সালে। এটি তার ষষ্ট উপন্যাস। বইটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশের পাঁচবছর পর তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। নিঃসন্দেহে এটি তাকে পুরষ্কার অর্জনে সাহায্য করেছিল। ভিন্নধর্মী বিষয় ও বয়ানের কারণে বিভিন্ন ভাষায় বইটির অনুবাদ প্রকাশের পরপরই পাঠক ও বোদ্ধামহলে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। বেশ ক’টি পুরষ্কারও জিতে যায় দ্রুত। মোট ৫৯ অধ্যায়ে বাইশটি চরিত্রের বর্ণনার মাধ্যমে বইয়ের গল্পটি এগিয়ে চলেছে। উত্তম পুরুষে লেখা বইটিতে সে সময়কালের বিখ্যাত শিল্পী ও অন্যান্য চরিত্রের জবানের সাথে সাথে কথা বলেছে মুদ্রা, চিত্রে আঁকা কুকুর বা লাল রঙের মতো বিভিন্ন বস্তু। এমনকি শুরুতেই একজন শিল্পীর মৃতদেহ নিজেই নিজের হাল-হকিকত জানাচ্ছে। নয় দিনের গল্পের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে ইতিহাসের দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ সময়, তৎকালীন চিত্রশিল্পের ধারাগুলোর বয়ান, পারষ্পরিক বিরোধ- যা একসময় রূপ নেয় পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে চলে আসা প্রতিদ্বন্ধিতা, মিল ও অমিলের কাহিনিতে। শুরুতে মনে হতে পারে- এটি একটি হত্যা রহস্যের উদঘাটনের কাহিনী। আসলে ইসলামী সাম্রাজ্যে চিত্রশিল্প বিকাশ ও উত্থান-পতনের কাহিনী এটি। কাহিনীর সময়কাল ১৬ শতকের শেষ দিকের ওসমানিয়া সুলতান তৃতীয় মুরাদের রাজত্বকাল। শিগগির উদযাপিত হতে যাচ্ছে হিজরী সহস্রাব্দ। এই উপলক্ষ্যে তিনি ওস্তাদ এফেন্দীকে দায়িত্ব দেন একটা একটা নতুন অনুচিত্রের বইয়ের। যে বই হবে তার রাজত্বকালের গৌরব গাঁথা নিয়ে চিত্রিত। এফেন্দী রাজ্যের বিখ্যাত চারজন শিল্পীকে নিয়ে একটা দল করেন। তাদের একেকজনের চিত্রশৈলী ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য একেক রকম।
তিনি ঠিক করে দেন কে কোন ছবিটি আঁকবেন। অনুচিত্রীদের এই দলের কাজ নিয়ে বাজারে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- এই বইটি আঁকা হচ্ছে বিধর্মীদের রীতিতে। এটি নিয়ে হোজাদের (ধর্মতাত্ত্বিক) একটি দল নানা কথা ছড়ায়। এরমধ্যে খুন হয়ে যায় এক অনুচিত্রী শিল্পী। তার মৃত্যুর ঘটনা, হত্যা রহস্য উদঘাটন নিয়ে এই বইয়ের নয়দিনের কাহিনি। চিত্রশিল্পীদের এই দুঃসময়ে ঘটনার মধ্যে হাজির হয় বইয়ের অন্যতম চরিত্র ব্ল্যাক- যে কিনা ওস্তাদ এফেন্দীর ভাগ্নে হয়। নিজে কিছুদিন শিক্ষানবিশ শিল্পীর কাজ করলেও প্রেম ব্যর্থ হয়ে পারস্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বারো বছর পর যখন ফিরে আসে- জমে উঠে ব্ল্যাক ও শেকুরের প্রেমকাহিনি। কাহিনীর সময়কালটি রাজনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাতে খেলাফতের একটি ক্রান্তিকালও বলা যায়। এই সাম্রাজ্য ইউরোপের অংশ হওয়ায় ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ অনেকদিনের। তাদের কুটনৈতিক বোঝাপড়ার সাথে আছে শিল্প-সংস্কৃতির দ্বন্ধ, আছে সভ্যতার গরিমা। ফলে রাজনৈতিক দ্বন্ধের সাথে যুক্ত পারষ্পরিক শিল্পকলার দ্বন্ধ। যেখানে প্রতিদ্বন্ধী গোষ্ঠীগুলো একে অপরকে প্রভাবিত করতে চায়। এটা ইসলামী বয়ান আশ্রিত শিল্পরীতির ক্ষয়ের কালও বটে। এই দ্বন্ধের মাঝে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ইসলামী ধর্মতত্ত্বে শিল্পকলার চর্চা। প্রচলিতভাবে আমরা জানি, ইসলাম শিল্পকলা চর্চার ক্ষেত্রে ততটা উদার নয়। কিন্ত ততদিন ইসলামী সাম্রাজ্যের কেন্দ্রগুলোতে শিল্পকলার নিজস্ব একটা ধরণ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের শিল্পকলায় থাকে একটি মূল চরিত্র, যাকে কেন্দ্র করে চিত্রটি আঁকা হয়- তার সাথে ইস্তাম্বুলে চর্চিত শিল্পকলার ফারাক রয়েছে। কারণ ধর্মতাত্ত্বিকভাবে কাউকে চিত্রের কেন্দ্রে করলে তার পূজিত হবার একটা সম্ভাবনা থাকে। সৃষ্টি কখনো চিত্রের কেন্দ্রে থাকতে পারে না। বরং, আল্লাহ কিভাবে জগতকে দেখে সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবত: বইটি ইউরোপীয় রীতিতে আঁকা হচ্ছে- এই সংবাদে শিল্পীদের সাথে সাথে ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। দেখা যাক যারা আঁকছেন তাদের মধ্যেও বিরোধ তৈরি হয়। যার ফলশ্রুতিতে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আবার এই হত্যাকারী নিজেও একজন শিল্পী। কিন্তু একটি হত্যাতেই হত্যাকারী স্থির নন, তিনি হত্যা করেন শেকুরের বাবা ওস্তাদ এফেন্দীকে। আক্রান্ত হয় অন্যরা। সুলতান হত্যা রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব দেন প্রধান চিত্রশিল্পী ওস্তাদ ওসমান ও ব্ল্যাককে। এই উপলক্ষ্যে উপন্যাসের চরিত্রগুলো ঘুরে বেড়ায় শিল্পকলার ইতিহাস ও তত্ত্বের অলিগলিতে। এই এক রোমাঞ্চকর ভ্রমন- বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-ঘৃণার জটিলতায় আর্বতিত।
হত্যা রহস্যের সাথে রয়ে গেছে আরেকটি রহস্য। আসলে বইয়ে আঁকা ছবিগুলো কেমন ছিল? কেননা, চিত্রশিল্পীরা পাতার নির্দিষ্ট অংশ এঁকে দিয়েছেন কিন্তু কেউ জানে না আসলে বইয়ের পাতাগুলো কেমন। ফলে একটি উপন্যাসের অনেক ধরণের চরিত্র দাঁড়ায়- ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও থ্রিলার। ওরহান পামুক তার বর্ণনায় অনেকগুলো ধ্রপদী ও আধুনিক রীতি ব্যবহার করেছেন। তাই বইটি সুখপাঠ্য হয়। টানটান উত্তেজনার সাথে এক ধরণের দার্শনিকতার উপকরণ পাওয়া যাবে। ইসলামের চিত্রকলার ইতিহাসকে শুধুমাত্র উপন্যাসের কাহিনির প্রেক্ষাপট আকারে নয়, বরং এটা খুবই চমৎপ্রদ যে, সিরিয়াস আলোচনাকে তিনি উপন্যাসের কথকদের গল্পের ভেতর অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। যা উত্তর আধুনিক বিভিন্ন ফর্মকে একসুত্রে গেঁথেছে। আছে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণা যেমন- চিত্রকলায় ঐতিহ্য শৈলী, সময়ের ধারণা। এগুলো খাঁটি তাত্ত্বিক আলোচনা মনে হতে পারে কিন্তু উপন্যাসে চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে জীবন্ত বাহাস হিসেবে উঠে এসেছে। বর্ণনার এই ধারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনাকারী উপস্থিতিকে সহজ করে দেয়। যেমন আছে শৈল্পিক সারল্যতা, তেমনি আছে মনোদৈহিক জটিলতার গুরুভার। ওস্তাদ ওসমান অন্ধ হতে চান, যেমন করে অতীতের মহান শিল্পীরা হয়েছিলেন ।এটাই যেন জীবনের পরম প্রাপ্তি। এরমধ্যে আছে শিল্পী হৃদয়ের জটিল দিকটি। বোঝা যায় শিল্পী জীবনের মহত্তম অনুভবগুলো কি কি অথবা নারীদের পোশাক পরতে পছন্দ করা গল্প কথক। মানুষের হৃদয়ের জটিল লেনাদেনা নিয়ে সংশয়ের ধুম্রজাল তৈয়ার করেছেন লেখক। যার ভেতরই ঘটে ইতিহাসের বাঁক-বদল। সম্প্রতি বইটি বাংলায় অনুদিত হয়েছে। অমর মুদির সাবলীল অনুবাদটি এইবারের বইমেলায় প্রকাশ করেছে সন্দেশ। আশা করি বইটি পাঠকদের কাছে ভালো লাগবে।