ছবি সংগৃহীত

আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা ২০১২

<strong>(প্রিয় টেক)</strong> প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার আয়োজন করেছিল দুই দিন ব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বসেছিল এই আসর।

techadmin
লেখক
প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০১২, ১৭:৫২
আপডেট: ১৯ মার্চ ২০১৮, ১৪:১৫


ছবি সংগৃহীত
(প্রিয় টেক) প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার আয়োজন করেছিল দুই দিন ব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বসেছিল এই আসর। ১৯৫৫ সালে স্থাপিত এই স্কুলে এর আগে কখনোই এই রকম কোন মেলার আয়োজন হয়নি। তাই আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার আয়োজিত প্রথম এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার প্রতি শিক্ষার্থীদের ছিল ভিন্ন মাত্রার এক আকর্ষণ। দুই তরুণ বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও প্রযুক্তিবিদ সামি ও নাহিদকে কাছ থেকে দেখার, তাদের তৈরি প্রকল্প প্রদর্শন করার এবং প্রশিক্ষণ নেবার জন্য স্কুলের প্রায় ১১০০ শিক্ষার্থী অপেক্ষায় ছিল মাস দেড়েক আগ থেকেই। ১৪ জুন। সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত সব শাখায় বিশেষ প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মোট ৬০ জনকে নির্বাচন করা হয়। যারা পরেরদিন প্রকল্প প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ হিসেবে প্রশিক্ষণ কার্ড পায়। তবে তাদের নাম ঘোষণা করা হয় বেলা তিনটার পর। এর আগে সাড়ে ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সামি ও নাহিদের প্রকল্প প্রদর্শনীতে রাখা হয়।
স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থীই দলে দলে সারিবদ্ধ হয়ে মোট ছয়টি প্রকল্প ঘুরে ঘুরে দেখে। কৌতূহলী শিক্ষার্থীরা প্রকল্পগুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষক সামি ও নাহিদকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করে। বেলা তিনটায় প্রশিক্ষণ কার্ড ঘোষণার সময় নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রশিক্ষণ কার্ড পায়নি বলে কেঁদে ফেলে অনেকেই। মনে হয়েছিল এ যেন গান-সংস্কৃতির কোনো অনুষ্ঠান। ইয়েস কার্ড না পাওয়ায় তাদের চোখে জল! অনেকেই আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের বিজ্ঞান কর্মীদের কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসে অনুরোধ করে, ‘আমার খুব ইচ্ছা। আমি পারব। আমাকে সুযোগ দিন।’ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনুরোধে প্রশিক্ষণ কার্ড প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৯০!
প্রদর্শনীর ছয় প্রকল্প ১৪ জুন মোট ছয়টি প্রকল্প প্রদর্শনীতে রাখা হয়। তিনটি সামির। তিনটি নাহিদের। সামির প্রকল্পগুলো হচ্ছে থার্মোফ্লাস্ক তৈরি, সাইকেল থেকে বিদ্যুৎ তৈরি এবং পেরিস্কোপ তৈরি। আর নাহিদেও তিনটি প্রকল্প হচ্ছে : জলের অপচয়রোধী ট্যাপ, প্রাযুক্তিক পাহারাদার এবং মিসকল দিয়ে দূরের কোনো যন্ত্রকে অন-অফ করা। প্রশিক্ষণ কর্মশালা ১৫ জুন সকাল নয়টা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কার্ড পাওয়া ৯০ শিক্ষার্থী পাঁচটি প্রকল্প হাতে নাতে বানাতে শিখে। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষক সামির কাছ থেকে সহজে ও কম মূল্যে থার্মোফ্লাস্ক তৈরি করার কারিগরি জ্ঞান লাভ করে। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলছিলেন, ‘মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকায় একটি থার্মোফ্লাস্ক বানানো যায় সেটা শিখতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এতে করে আমরা কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা গরম পানি গরম কিংবা ঠাণ্ডা পানি ঠাণ্ডাই রাখতে পারব।’ সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সামির কাছে সাইকেল থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কৌশল শেখে। বিনোদপুরের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী সাইকেলে চড়ে স্কুলে যাতায়াত করে। সামি তাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়ার সময়ে সাইকেলের গতিশক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আন্না বলেন, ‘ভাইয়া এত সহজে শেখালেন! প্রকল্পটা দারুণ। এতে করে আমরা প্রতিদিন কমপক্ষে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বেশি পড়বার সুযোগ পাব। কারণ, সাইকেলের চাকা থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে তাতে রাতে বিদ্যুৎ না থাকলেও লেড বাতি জ্বালানো সম্ভব হবে।’ নাহিদ ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন জলের অপচয়রোধী ট্যাপ বানানোর কৌশল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় অনেকেই বেখেয়ালে বেসিনের ট্যাপ খুলে রাখেন। কিংবা ট্যাপ খুলে মুখ ধোয়ার ক্ষেত্রে যে জল কাজে লাগে তার থেকে বেশি জল অপচয় হয়। জাদুর ট্যাপ বানাতে শিখেছেন ৮ম শ্রেণীর এমন এক শিক্ষার্থী আল মোবাশশিরা বলেন, ‘ম্যাজিক বলে যাকে আরকি! ট্যাপের নিচে হাত দিলে পানি পড়ে। আর হাত যেই সরিয়ে নিলাম অমনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল পানি পড়া!’ ৯ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ পেয়েছে প্রাযুক্তিক পাহারাদার। ব্যাখ্যা করছিলেন ৯ম শ্রেণীর বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ‘দেখুন ক্লাসে রোল কলের পরপরই অনেক বন্ধুই পেছন দরজা দিয়ে চুপিসারে পালিয়ে যায়। নাহিদ ভাইয়ার এই প্রকল্প সেটা থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত রাখবে। কারণ, যখনই কেউ পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবে, তখনই একটা অ্যালার্ম বেজে উঠবে ক্লাস টিচারের টেবিলে! তাই ধরা পড়ার ভয়ে অন্তত কেউ ক্লাস ফাঁকি দেবে না।’
দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ নিয়েছে নাহিদে কাছ থেকে। মোবাইল ফোনে মিস কলের মাধ্যমে কী করে দূরের কোনো যন্ত্রকে অন বা অফ করা যায় তাই শিখেছে তারা। এ বিষয়ে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হাসিনা খাতুন জানালেন, ‘রহস্যময় মিস কল। ধরুন, মাঠে জল দেয়ার মোটর আছে। কিন্তু আপনি বিশেষ কারণে মাঠে যেতে পারবেন না। তাই বলে কি কৃষকের ক্ষেত জলের অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে? মোটেও না। আমরা শিখেছি এমন এক মিস কল দিতে যা এরকম মোটরকে অনেক দূর থেকেই চালু এবং প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে পারে।’ প্রশিক্ষণ কর্মশালার পাশাপাশি বিজ্ঞান আড্ডাও বসিয়েছিল আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার। এতে বিজ্ঞানের সঙ্গে জীবনের নানান সম্পর্ককে তুলে ধরে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি এই আড্ডায় ‘সমাজে বিজ্ঞানের ভূমিকা’ শীর্ষক এক রচনা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। বিকেল সাড়ে চারটায় বসে সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে উপস্থিত ছিলেন বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য সহকারী শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা, মনাকষা হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, মনাকষা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের দুই শিক্ষক এবং এলাকার মান্য গণ্য আরও অনেক বিদ্বান ব্যক্তি। পুরো দুই দিনের এই বিজ্ঞান আয়োজনে খুঁজে বের করা হয় সবচেয়ে কৌতূহলী ও বিজ্ঞানে আগ্রহী এক শিক্ষার্থীকে। সেরা অনুসন্ধিৎসু এই শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছেন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ক শাখার (রোল ১১) শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান। তাকে ওয়ালটনের সৌজন্যে একটি সনি ডিজিটাল ক্যামেরা উপহার দেওয়া হয়। উপহার নেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বিস্ময় বালক মাহফুজ, ‘এটা আমার কোনো দুখের কান্না না। আমি ভাবতে পারিনি যে আমার স্বপ্নেও আমি এই ক্যামেরাটা পাব। তাই আমি খুবই খুশি। আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারকে অনেক ধন্যবাদ এরকম আয়োজন করবার জন্য।’ রচনা প্রতিযোগিতায় কম্পাস উপহার পেয়েছেন অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারহানা তাসনীম। আর বিজ্ঞানে কার কেমন আগ্রহ এই ভিত্তিতে সেরা ছয়ে নাম লিখিয়েছেন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর সাবরুনা, ৭ম শ্রেণীর আন্না, ৮ম শ্রেণীর রাসেল, ৯ম শ্রেণীর শাকিলা, ১০ম শ্রেণীর রেহান ও সুইট। এই ছয়জন জাহাঙ্গীর সুরের লেখা ‘নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের শৈশবগাথা’ নয়তো শর্মিলা সিনড্রেলার লেখা ‘বিজ্ঞানীদের প্রেম’ বই উপহার হিসেবে পেয়েছেন। স্কুলের স্কাউট টিমকে সামির তৈরি একটি পেরিস্কোপ উপহার দেয় আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার। ওয়ালটনের সৌজন্যে প্রশিক্ষক সামি ও নাহিদকে ওয়ালটন মোবাইল ফোন উপহার দেওয়া হয়। এছাড়া বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে সম্মানসূচক ক্রেস্ট উপহার দেয়। আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের পক্ষে বিজ্ঞানকর্মী শর্মিলা সিনড্রেলা দুই প্রশিক্ষকের হাতে তুলে দেন বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্মানী। আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের এই আয়োজন সম্পর্কে এবং নিজের এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন শাহাবুদ্দীন সামি, ‘আমি এক কথায় আত্ত্বহারা। আমাদেরকে এমন একটি স্কুলে এত এত শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুই দিন কাজ করার সুযোগ দিয়েছে আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমি সবচেয়ে বেশি খুশি শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে। যা শেখাতে চেয়েছি তাই পেরেছি।’ আরেক প্রশিক্ষক নাহিদুজ্জামান নাহিদ বললেন, ‘এখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী। মনে হয়েছে, ওদেরকে সুযোগ দিলে ওরা বাংলাদেশ এমনকি বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার মতো সৃজনীশক্তি ওদের রয়েছে।’ আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের এই বিজ্ঞান আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস, সাহিত্যের কাগজ ডাকটিকিট এবং এসিআইয়ের কর্মকর্তা ফারুক। অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে প্রধান শিক্ষক সাবিরুদ্দিন বলেন, ‘এমন আয়োজন করতে পেরে আমরা খুব খুশি। বিজ্ঞানের আলোই পারে সমাজকে আলোকিত করতে। আকুমদ্দিন গ্রন্থাগারের সঙ্গে আমার আগামীতেও এরকম বিজ্ঞানের আয়োজন করব। পুরো এই আয়োজন সম্পর্কে আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের বিজ্ঞানকর্মী জাহাঙ্গীর আলম সুর বলেন, ‘বিজ্ঞানমনস্ক এক সমাজের লক্ষ্যেই আমাদের এই প্রয়াস। বিজ্ঞান ছাড়া দেশ বদলের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু একবারেই তো আর পুরো দেশ বদলানো যায় না। তাই নিজেদের এলাকা দিয়েই শুরু করলাম। আশা করি, আগামীতে আমরা সব এলাকায় বিজ্ঞানের আলোকবাতি পৌঁছে দেব।’

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট