ছবি সংগৃহীত

আমি ১৩ বছর কষ্ট করেছি : ওম

এক বছর, দু’বছর নয়-টানা ১৩ বছর কষ্ট করে ওম পেয়েছেন সাফল্যের দেখা। সে কষ্টের গল্প, প্রাপ্তির সে আনন্দের কথা প্রিয়.কমকে জানালেন ওম। শুনলেন সুদীপ্ত সাইদ খান।ছবি তুলেছেন লয়েড তুহিন হালদার।

Sudipto
লেখক
প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১২:৪৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৯:৩২
প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১২:৪৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৯:৩২


ছবি সংগৃহীত
এক বছর, দু’বছর নয়-টানা ১৩ বছর কষ্ট করে ওম পেয়েছেন সাফল্যের দেখা। সে কষ্টের গল্প, প্রাপ্তির সে আনন্দের কথা প্রিয়.কমকে জানালেন ওম। শুনলেন সুদীপ্ত সাইদ খান।ছবি তুলেছেন লয়েড তুহিন হালদার। (প্রিয়.কম) সেদিন বিকেল ছিলো।বিএফডিসিতে ছিলো সাংবাদিকদের ভিড়।সবার উৎসুক চোখ খুঁজছিলো অচেনা এক মানুষকে।নবজাতক শিশুকে দেখার জন্য মানুষ যেমন উৎসুক হয়ে পড়ে তেমনি ব্যাকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো ওপার বাংলার নবাগত এক নায়কের জন্য।তিনি বিএফডিসিতে আসবেন, অংশ নিবেন তার নতুন ছবির প্রচারণায়। সবার অপেক্ষার পালা শেষ করে একসময় দলবল সমেত সেই নায়ক এসে হাজির হলেন বিএফডিসির ডিজিটাল কমপ্লেক্সের মিলনায়তনে।এই নায়কের নাম ওম।ওম প্রকাশ সাহানি।কলকাতার অর্জুন,অ্যাকশন ছবির নায়ক।বাংলাদেশে নতুন।মাহির বিপরীতে ‘অগ্নি-২’ ছবিতে অভিনয় করেছেন।এই ছবির প্রচারণাতেই সেদিন অংশ নিয়েছিলেন ওম।স্বভাবসুলভ হাসি আর অমায়িক আচরণে মুগ্ধ করেছিলেন সবাইকে।তারপর ঢাকার নানা চ্যানেল আর পত্রিকার অফিসে হাজির হয়ে দর্শকদের আহ্বান জানালেন নিজের অভিনীত ছবিটি দেখার জন্য।
দর্শক তাকে নিরাশ করেনি। ঈদুল ফিতরে বেশ ভালোই ব্যবসা করে জাজ মাল্টিমিডিয়ার ‘অগ্নি-২’।এরপর মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে ওম আবার এলেন বিএফডিসিতে।এবার ছবির মহরতে।ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত ‘অঙ্গার’ ছবির নায়িকা আরেক নবাগত মুখ ফাল্গুনি রহমান জলি।এ ছবিটিও জাজের।২ তারিখ থেকে তিনি বিএফডিসিতেই শুটিং করছেন।
এবার চলুন মুখোমুখি হওয়া যাক নায়ক ওমের। শোনা যাক তার গল্প- ‘এদেশে পা দিয়েই আমি এতটা রেসপন্স পাবো তা কখনো ভাবিনি।এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো।কখনোই ভাবিনি এতো ফ্যান পাবো। আমি এটা পেয়ে খুব খুশি। আমি চাইযে, আমার বাকি জীবনটা এভাবেই কেটে যাক।’ কথাগুলো বলার সময় ওমের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠছিলো আনন্দে।সামান্য অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এত আনন্দ এর আগে আর কোনো তারকার চোখেমুখে দেখিনি আমি। তাই প্রশ্ন করে বসি এত আনন্দ! সামান্যতেই এত আনন্দ মানুষ পায় কখন? ওমের সাফ জবাব, ‘আগে শুনেছি যারা কষ্ট করে তারা তার ফল পায়, আমি এখন সেটা পাচ্ছি। এত বছর কষ্ট করার পর আজ আমি যখন এসব পাচ্ছি তখন আনন্দটা একটু বেশিই।এই আনন্দটা আমার কাছে অনেক অনেক বেশি।’
ওমের এই জবাব শুনে মাপা গেল তার আনন্দের তলার কষ্টটাও।কারণ ১৩ বছর কষ্টের পর এমন একটা ব্রেক পেয়েছেন ওম।সে কষ্টের গল্প শোনার আগে আমরা জেনে নিতে পারি ব্যক্তি ওমকে।তার মিডিয়ায় আসার গল্প- ওমের জন্ম বিহারে।বাবার চাকরী সূত্রে কলকাতায় বড় হওয়া। গৃহিনী মায়ের আদর আর বাঙালি আতিথেয়তায় বেড়ে ওঠা ওম ছোটবেলায় ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। দুষ্টুমী তো দূরের কথা খেলাধুলাতেও মন ছিলো না তার। তবে টিভির সামনে বসে থাকতেন সারাক্ষণ।আর টিভি দেখতে দেখতেই ভাবতেন একদিন তিনি নায়ক হবেন।নিজের অজান্তেই রক্তের সঙ্গে কখনযে অভিনয় স্পৃহাটা মিশে গেছে তা টেরও পাননি এই নায়ক।
বাঙালি পরিবেশে বেড়ে ওঠায় বাংলাটাও বেশ ভালোই রপ্ত করেন ওম।টানাটানির সংসার।তাই মাঝখানে টাকা পয়সার অভাবের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হয় তাকে। বিরতি শেষে ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স মাস্টার্স করেছেন তিনি। ওমের বয়স যখন ১৭ তখনই একটা টেলিভিশন অডিশনে অংশ নেন তিনি। ইটিভি মেগাস্টার শো’য়ে চান্সও হয় তার।এভাবেই বেশকিছু শো’তে অংশ নেন তিনি।আর এগুলোর মাধ্যমেই তার সখ্যতা গড়ে ওঠে ডান্সারদের সঙ্গে।এবার নাচের দিকে মনোযোগ দেন ওম।এই ডান্সারদের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে পদার্পন ঘটে তার। সে গল্প শোনা যাক ওমের মুখেই- ‘আমি প্রথম কাজ শুরু করি ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সার হিসেবে। এরপর ছবিতে জুনিয়র আর্টিস্ট, সিরিয়ালের জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবেও কাজ করি।’
‘বনি আই লাভ ইউ’ জিৎ-এর ‘প্রিয়তমা’,সহ বেশ কিছু ছবিতে ব্যাক গ্রাউন্ড ডান্সার হিসেবে দেখা গেছে ওমকে।এসব করতে করতেই টি সরকার প্রোডাকশনের একটা সিরিয়ালের কাজ পেয়ে যান তিনি।সে কাজটাতে ভাল করার পরই তার ডাক পড়ে ডিটেকটিভ টাইপের ‘অর্জুন’ ছবিতে।এরও পেছনে আছে এক করুণ গল্প। কী সে গল্প?, ‘সেসময়ে আমার কাছে তেমন টাকা পয়সা থাকতো না।টালিগঞ্জ থেকে ট্রেনে করে বাড়ি ফিরতাম।একদিন সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরছিলাম।নানা কারণে মনটা খারাপ ছিলো।একটু অন্যমনস্কও।খুব ভিড় ছিলো সেদিন ট্রেনে।হঠাৎ করে বাঁ হাতে পোস্টের বাড়ি লাগে। সে দাগ এখনো আছে।(দাগটাও দেখিয়ে দিলেন তিনি।) সেসময় টি সরকারের বাপ্পা দা আমাকে খুব সহায়তা করেন। তিনিই আমাকে একটা সিরিয়ালে নেন।আর বলেন সিরিয়ালে ভাল করলে তোমাকে আমরা ছবিতে নেবো।এরপরেই অর্জুনে কাজ করার সুযোগ দেন তিনি।’
অর্জুনে কাজ করার সুযোগ পেলেও এত এত গুনী অভিনেতা ছিলেন যে ওম তার কাজ দেখানোর তেমন সুযোগই পান নি।তাকে স্ট্রাগল করতে হয় আরও অনেক, এবার সেই স্ট্রাগলের গল্পটাও শুনতে চাইলাম, বললেন, ‘আমার স্ট্রাগলের গল্প বলতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে। তবুও দুয়েকটি বলি’ বলেই শুরু করলেন তার কষ্টের গল্প, ‘আমি ১৩ বছর কষ্ট করেছি এই জায়গা পর্যন্ত আসতে। সেসময় পয়সা থাকতো না পকেটে।আমার বাড়ি দূরে থাকায় একদিন শুটিংস্পটে ঠিক মতো পৌঁছুতে পারি নি।সেদিন আমাকে আর নেওয়া হয় নি। আমি ভেবেছিলাম টিফিনটা হয় তো পাবো।কিন্তু সেদিন সেটাও পাইনি। সারাদিন না খেয়ে থেকেছি। এমনটা হয়েছে বহুবার। সেসময়েই একদিন জিৎ-দার ‘প্রিয়তমা’ ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সার হিসেবে কাজ করছিলাম।আমার অবস্থান ছিলো দুই সারি পেছনে।হঠাৎ করে ভুলে গানে লিপ দিয়ে ফেলেছিলাম । তখন মাস্টারজি এসে আমাকে চড় মেরে বলেছিলেন, তুই গানে লিপ দিচ্ছিস কেন? তুই কি নায়ক! এমনো হয়েছে অনেক আশা করে অডিশনে গিয়েছি। কষ্ট করে নিজের অভিনয় দেখিয়েছি কিন্তু ওদের পরিচিত একজন এলে আমাকে আর নেওয়া হলো না।পরে নেওয়া হলো সাইড ক্যারেক্টারের আর্টিস্ট হিসেবে। সেদিন সারাদিন কাজ করে ৫০ টাকা পেয়েছিলাম। সে টাকা নিয়েই আনন্দে বাড়ি ফিরেছি।’ এমনি ছিলো ওমের কষ্টকর জীবন।তবে ভাগ্যদেবী দীর্ঘ ১৩ বছর পর তার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন ঠিকই। অর্জুনের পর পেয়েছেন ‘অ্যাকশন’ ছবি।এখানেও ওমের কাজ করার মতো জায়গা খুব একটা ছিলো না।আর তারপর পেলেন জাজের ‘অগ্নি-২’।দুই বাংলার দুই বড় প্রযোজনা সংস্থার ছবি হলে কী হবে এটাও নারী প্রধান ছবি।ধৈর্য হারান নি ওম। দেড় মাসের মাথাতেই এবার পেলেন ‘অঙ্গার’।
অঙ্গার নিয়ে বেশ আশাবাদী তিনি।তার অনুভূতিটাও তাই উষ্ণ- ওম বলেন, ‘এ অনুভূতি আমি আসলে বলে বোঝাতে পারবো না। সব নায়কের স্বপ্ন থাকে যে বড়স্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। জাজ আর এসকে মুভিজের কাছে যা পেয়েছি সেটার আনন্দ ধারণ করার মতো ক্ষমতা যে আমার থাকবে না সেটা ভাবিনি।’ ছবি: ওম, একটি ধর্মীয় শব্দ।ওমেই শুরু ওমেই শেষ।আর মেডিটেশনে ওম মানে প্রশান্তি, আত্মার শান্তি। আর নায়ক ওমের শান্তি কীসে? ‘আমি আমার কাজে প্রশান্তি পাই।নিজের কাজটাকে খুব পছন্দ করি। ছোটবেলা থেকেই আমি চেষ্টা করেছি হিরো হবো।আজ ১৩ বছর পর এত বড় একটা ব্রেক পেলাম। আমার স্ট্রাগল সফল হচ্ছে। আমি মুভি করবো। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবো। আর এভাবেই খুঁজে নিবো নিজের প্রশান্তি।’ ওম প্রতিষ্ঠা পাক, প্রশান্তি আসুক জীবনে, জয়তু ওম…