ছবি সংগৃহীত

ইদ্রাকপুর জলদুর্গ

আনুমানিক ১৬৬০ সালের দিকে বাংলার সুবাদার মীর জুমলা নির্মিত ইদ্রাকপুর দুর্গটি ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ইছামতী নদীর পূর্ব তীরে মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরে অবস্থিত। এছাড়া এখানে আরো দেখতে পাবেন বাবা আদম শহীদ মসজিদ,শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর এর বাস্তুভিটা,রাধা-কৃষ্ণের মন্দির,গজারি স্তম্ভ,খানবাড়ী,বল্লাল বাড়ী,গুহপাড়া,বুলু শেখের বাড়ী,বজ্রযোগিনী সোমপাড়া মোমেন খানের জমি মঠবাড়ী সোমপাড়া, রামপাল দিঘির মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আপনিও চাইলে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যেতে পারেন বাংলার ইতিহাসের গৌরবোজ্জল স্মৃতির পাতায়।

মো. আদনান আরিফ সালিম
লেখক
প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ১৭:৩৪ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৩:৩২


ছবি সংগৃহীত
আনুমানিক ১৬৬০ সালের দিকে বাংলার সুবাদার মীর জুমলা নির্মিত ইদ্রাকপুর দুর্গটি ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ইছামতী নদীর পূর্ব তীরে মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরে অবস্থিত। বর্তমানে নদী দুর্গ এলাকা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠেছে। নদীপথ শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে নির্মিত ইদ্রাকপুর জলদুর্গটি পূর্ব ও পশ্চিমে দু’ভাগে বিভক্ত। পূর্ব অংশ আয়তাকার এবং পশ্চিমের অসম আকৃতির দুটি অংশ মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ দুর্গটি নির্মিত হয়েছে। দুর্গের পূর্ব অংশটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এবং এ অংশের দৈর্ঘ্য ৭৭ মিটার এবং প্রস্থ ৪৪ মিটার। আয়তাকার অংশের চারকোণে চারটি গোলাকৃতির পর্যবেক্ষণ বুরুজ রয়েছে। বুরুজগুলির ব্যাস ৫.৫০ মিটার এবং ৪.৬০ মিটার। দুর্গের একমাত্র প্রবেশ তোরণটি উত্তর দুর্গ প্রাচীরের মাঝখানে অবস্থিত। প্রবেশ তোরণের খিলানপথটি আয়তাকার বর্ধিত নির্মাণ কাঠামোর মধ্যে সংস্থাপিত। প্রবেশপথটি ২.১০ মিটার প্রশস্ত এবং দু’পাশে প্যানেল নক্শায় সুশোভিত। প্রবেশ তোরণের উপরে মার্লন বা শরছিদ্রের নকশা করে সুশোভিত করা হয়েছে। দুর্গ প্রাচীরের এ অংশের পুরুত্ব ০.৮৮ মিটার। দুর্গের বেষ্টনী প্রাচীর ১.২২ মিটার উঁচু।
উন্মুক্ত নদীপথের দিকে দৃষ্টি দিতে দুর্গের পর্যবেক্ষণ বুরুজটি এ অংশে অবস্থিত। পশ্চিম অংশটি আয়তনে পূর্বের অংশের চেয়ে বড় এবং এ অংশের দৈর্ঘ্য ৯৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫১.৮০ মিটার। এ অংশটিও প্রাচীর বেষ্টিত এবং এর উত্তর-পশ্চিম কোনে একটি পর্যবেক্ষণ বুরুজ বিদ্যমান। এ বুরুজটি গোলাকৃতির এবং ৬.১০ মিটার প্রশস্ত। ভূমি-নকশা অনুযায়ী ধারণা করা যেতে পারে এ প্রান্তের মতই দক্ষিণ-পশ্চিম কোণেও একটি বুরুজ ছিল। যার চিহ্ন বর্তমানে অনুপস্থিত। ইদ্রাকপুর দুর্গের প্রান্তভাগের মোট পাঁচটি বুরুজ দূর থেকে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করার জন্য পর্যবেক্ষণ চৌকি হিসাবে নির্মিত হয়েছিল। সাধারণত বর্ষাকালে বহিরাক্রমণ প্রতিহত করতে হতো এবং সে সময়ে এসব বুরুজের ফাঁকা অভ্যন্তরভাগ সৈন্যদের আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহৃত হতো বলে ধরে নেয়া হয়। এ দুর্গের পশ্চিম অংশেই রয়েছে দুর্গের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য উচুঁ বৃত্তাকার বুরুজ। বুরুজটি নীচ থেকে উপর পর্যন্ত উচ্চতায় ২৪ মিটার এবং ব্যাস ৩২.৯১ মিটার। এ দুর্গে কেন্দ্রীয় বৃত্তাকৃতির বৃহৎ বুরুজের উপর থেকে ভূ গর্ভস্থ কুঠুরী পর্যন্ত একটি গুপ্ত সিঁড়ি পথের অস্তিত্ব রয়েছে। এ গুপ্ত কুঠরীতে যুদ্ধের জন্য জরুরী হাতিয়ার ও অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখা হতো। উচুঁ বুরুজের ড্রামটি ৩ টি পর্যায়ক্রমিক স্তরে বিভক্ত এবং ড্রামের সর্বত্র জুড়ে রয়েছে ১ মিঃ বিস্তৃত প্রদক্ষিণ পথ ও বড় আকারের মার্লন। ইদ্রাকপুর দুর্গের সমগ্র বেষ্টনী প্রাচীর, কোণের বুরুজ সমূহ এবং পর্যবেক্ষণ বুরু“জের উপরের অংশ নানা প্রকার ছোট বড় ছিদ্রসহ মার্লন বা শরছিদ্রের অলংকরণ সংবলিত। এই সব মার্লন বা শরছিদ্রগুলো কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ, বন্দুক স্থাপন অথবা তীর নিক্ষেপের কাজে ব্যবহৃত হতো যা দুর্গটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের ধারণ দিচ্ছে । বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় এ দুর্গের পর্যবেক্ষণ বুরুজের মার্লনে সৃষ্ট ফোকরগুলি উপর থেকে কামান ও গোলা নিক্ষেপের জন্য অনেকটাই ঢালু করে নির্মিত। ফলে শত্রু খুব কাছে চলে আসলে উপর থেকে সহজেই শত্রুর উদ্দেশ্যে কামান বা গোলা নিক্ষেপ করা যাবে। কিন্তু শত্রু ঐ পথে আক্রমণ করতে পারবে না। এটিও এ দুর্গের প্রতিরক্ষার আরেকটি প্রমাণ। কামানের জন্য সৃষ্ট ফোকরগুলি আকারে বড় এবং গোলা নিক্ষেপের ফোকরগুলি আকারে ছোট। বৃত্তাকার উচুঁ বুরু“জটি যে বড় আকারের কামান স্থাপনের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। পশ্চিম অংশের দক্ষিণের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতা ৩.৪০ মিটার এবং পুরুত্ব ৮৫ সেঃ মিঃ। পর্যবেক্ষণ বুরুজের দুটি স্তরে বিভক্ত সিড়িপথটি খিলানসমৃদ্ধ। ১ম স্তরে ১৩ টি ধাপ যুক্ত সিঁড়ি এবং পরের স্তরে ১২ টি ধাপ যুক্ত সিঁড়ি রয়েছে। এ দুর্গের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বুরুজের সিঁড়িপথ সংলগ্ন উত্তর-পূর্বকোণের সুড়ঙ্গটি। বর্তমানে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখটি বন্ধ রয়েছে। ইদ্রাকপুর দুর্গের আয়তাকার অংশের মূল স্থাপনা ছাড়াও এখানে একসময় পর্যবেক্ষণ বুরুজের উপর জেলা প্রশাসকের বাংলো ছিল। তবে পরবর্তীসময়ে জেলা প্রশাসনের বাংলো সরিয়ে অন্যত্র নেয়া হলেও নতুন করে জেলখানা, জেলারের অফিস ও বাসভবন, কয়েদিদের খাদ্য-গুদাম এবং জের গার্ডদের বাসভবন নির্মাণ করা হয়। পর্যবেক্ষণ বুরুজটিও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ থেকে রক্ষা পায়নি। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সব্জি বাগানসহ জেলা প্রশাসনের অফিসের পিয়নের বাসভবন ও বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গার্ডের বাসভবন। তবে এ অংশে উল্লেখ করার মত রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটি আয়তাকার অংশের মাঝখানে এবং প্রবেশতোরণ বরাবর অবস্থিত। ধারণা করা হয় যে, কার্যকালীন সময়ে এ পুকুর থেকেই দুর্গভ্যন্তরের পানির সংস্থান হতো। কৌশলগত উপযোগিতা বিবেচনা করে বলতে পারি যে, এ দুর্গটি থেকে শত্রুর যেমন মোকাবেলা করা যেত তেমনি আবার আত্মরক্ষার জন্য সুড়ঙ্গ পথও তৈরি করা হয়েছিল যা এ দুর্গের নির্মাণ কৌশলগত উপযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য । সে সঙ্গে দুর্গের নির্মাণ কৌশল, বিভিন্ন অঙ্গের বিন্যাস, মার্লন ও প্যানেল অলংকরণ মোগল আমলে বাংলায় নির্মিত স্থাপত্যের চিহ্ন হিসেবে কালের স্বাক্ষী হয়ে টিকে আছে। ছুটির দিনগুলোতে অনন্যসুন্দর এই স্থাপনাটির পাশাপাশি আরো অনেক নিদর্শন আছে যেগুলো দেখার জন্য আপনিও আসতে পারেন সপরিবারে। বিশেষ করে প্রত্নতাত্ত্বিক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল বিক্রমপুরে খনন করে বিহার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। ভাগ্যক্রমে চতুর্থ পর্বের মাঠকর্মের সময় ঐখানে আমি নিজেও খনন কাজে অংশ নিয়েছিলাম। এবং সদ্য আবিষ্কৃত বিহারটি হয়তো এই অঞ্চলের বাংলার ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে। এছাড়া এখানে আরো দেখতে পাবেন বাবা আদম শহীদ মসজিদ, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর এর বাস্তুভিটা, রাধা-কৃষ্ণের মন্দির, গজারি স্তম্ভ, খানবাড়ী, বল্লাল বাড়ী, গুহপাড়া, বুলু শেখের বাড়ী, বজ্রযোগিনী সোমপাড়া মোমেন খানের জমি, মঠবাড়ী সোমপাড়া, রামপাল দিঘির মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আপনিও চাইলে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যেতে পারেন বাংলার ইতিহাসের গৌরবোজ্জল স্মৃতির পাতায়। কোথায় থাকবেন- কিভাবে যাবেন ঢাকার বাইরে কিন্তু খুব একটা দুরে না হওয়ায় এখানে বেড়াতে গেলে যেমন মিলবে নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ তেমনি পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটবে দেশের গৌরবময় ঐতিহ্যের সাথে। ঢাকা থেকে যারা এখানে বেড়াতে যাবেন তাদের পক্ষে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব। কিন্তু কেউ থাকতে চাইলে থাকতেও পারেন। এখানকার জেলা শহরে কিছু সাধারণ মানের হোটেল আছে। এর মধ্যে হোটেল থ্রি-স্টার ও হোটেল কমফোর্ট এর কথা বলা যায়। তবে এখান থেকে বেড়িয়ে পদ্মা রিসোর্টের নিরিবিলি পরিবেশে রাত কাটালে সবারই ভালো লাগার কথা। যাদের পার্সনাল গাড়ি আছে তাদের জন্য কিছু বলার নেই। তবে আপনি চাইলে বাসে করেও খুব সহজেই যেতে পারেন। ঢাকার গুলিস্তান থেকে এখানে যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া ছোট ছোট কিছু লঞ্চে করে নৌপথেও এখানে যাওয়া যায়। এখন সবকিছুর পাশাপাশি বাস ভাড়া অনেক বাড়লেও খুব সম্ভবত ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ ভাড়া ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়নি।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট