ছবি সংগৃহীত

উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমরা বন্ধ্যাকাল অতিক্রম করছি: স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান। ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয় বৈচিত্র্যের করণে অগ্রসর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রিয়.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তার লেখালেখিসহ নানা বিষয়ে।

তানজিল রিমন
সহকারী বার্তা সম্পাদক
প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১০:৫১
আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:০৪


ছবি সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) স্বকৃত নোমান। গতানুগতিকতার জোয়ারে গা না ভাসানো প্রতিশ্রুতিশীল কথাসাহিত্যিক। লেখালেখি তার সাধনার জায়গা। মূলত তিনি ঔপন্যাসিক। তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে― রাজনটী, বেগানা, হীরকডানা, কালকেউটের সুখ। গল্পও লিখছেন। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে― নিশিরঙ্গিনী, বালিহাঁসের ডাক। ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয় বৈচিত্র্যের করণে অগ্রসর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রিয়.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তার লেখালেখিসহ নানা বিষয়ে।

প্রিয়.কম:এ বছর আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। নাম ও প্রকাশনা সংস্থার নাম যদি বলতেন।

স্বকৃত নোমান: মূলত আমার বই বেরিয়েছে একটি, গল্পগ্রন্থ ‘বালিহাঁসের ডাক’। এটি আমার মৌলিক সৃষ্টিকর্ম। গল্পের বই হিসেবে দ্বিতীয়। এটি বের করেছে অনিন্দ্য প্রকাশ। বইমেলার দ্বিতীয় দিনই এসেছে। এর আগে ২০১৪ সালে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নিশিরঙ্গিনী’ বেরিয়েছিল জাগৃতি প্রকাশনী থেকে।

এছাড়া এবারের বইমেলা উপলক্ষ্যে আরও দুটি বই বেরিয়েছে, অনুপ্রাণন প্রকাশনী থেকে ‘কথাসাহিত্যের অলিগলি’ নামে মুক্তগদ্যের একটি বই। গত দু’বছর কথাসাহিত্য বিষয়ে ফেসবুকে ও পত্রপত্রিকায় যেসব গদ্য লিখেছি সেগুলোর সংকলন। আর উৎস প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে কিংবদন্তী রাজনীতিক তাজউদ্দীন আহমদের জীবনী। উৎসের প্রকাশক জনাব মোস্তফা সেলিম বলেছিলেন সর্বসাধরণের বোধগম্য করে তাজউদ্দীন আহমদের জীবনীটি লিখে দিতে। মেলার শুরুতেই এটি বেরিয়েছে। তার মানে এ বছর বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে তিনটি। তবে আমার মৌলিক বই কিন্তু একটাই― ‘বালিহাঁসের ডাক’। এটিকে ঠেকা দেয়ার জন্য বাকি দুটি লিখেছি এমনটা বলা যায়।

প্রিয়.কম:সাহিত্যের তো অনেক শাখা। আপনি কেন কথাসাহিত্য বেছে নিয়েছেন?

স্বকৃত নোমান: লেখালেখির প্রথম দিকে আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। সব বাঙালি লেখকই তাই করেন। কিন্তু সেগুলো ঠিক কবিতা হয়ে উঠেনি, যদিও আমি নিজেকে তখন বড় কবি ভাবতাম। প্রয়াত নাট্যকার আচার্য সেলিম আল দীনের সান্নিধ্যে আসার পর তিনিই অনুপ্রাণিত করলেন কথাসাহিত্য চর্চায়। তা ছাড়া আমি যা লিখতে চাচ্ছিলাম, আমার লেখার বিষয় এত বিপুল যে, কবিতার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। আমার মনে হয়েছে কথাসাহিত্যই আমার প্রকৃত জায়গা। তাই শিল্পসাধনার মাধ্যম হিসেবে কথাসাহিত্যকেই বেছে নিয়েছি।

প্রিয়.কম:লিখতে গিয়ে কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

স্বকৃত নোমান: স্মরণীয় ঘটনা তো বিস্তর। লিখতে গেলে মোটামুটি একটা বই হয়ে যাবে। আমি দুটি স্মরণীয় ঘটনার কথা সংক্ষেপে বলি। প্রথমটি ‘বেগানা’ লেখার আগের ঘটনা। একদিন নাফ নদী তীরবর্তী টেকনাফের নয়াপাড়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী-শিবির পরিদর্শনে গেলে মোচুনি পাহাড়সারি থেকে নামার সময় বয়োজ্যেষ্ঠ এক রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তার ছেলে পাহাড়ে গেছে লাকড়ি কাটতে, আর তিনি পাদদেশে বসে ছেলের ফেরার প্রতীক্ষা করছেন। উচ্চ পাহাড় পরিভ্রমণ-হেতু আমরা, আমি ও কবি শাহান সাহাবুদ্দিন কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম। বিশ্রামের জন্য ওই নারীর পাশে বসি আমরা। পরিচয়ের একপর্যায়ে তিনি তার জীবনযন্ত্রণার নানা কথা আমার কাছে বর্ণনা করছিলেন। ফেরার সময় করুণাবশত আমি তার হাতে বিশ টাকার একটি নোট দেই। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন, বিগলিত অশ্রুর বানে ভাসিয়ে দিলেন দুই চোয়াল। জানতে চাইলাম, ‘কাঁদছেন কেন?’ বললেন, ‘ছ’ মাসের মধ্যে আমি একসঙ্গে বিশ টাকা দেখিনি’। ঘটনাটা আমাকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিল, তুমুল ঝড় তুলল সংবেদনশীল মনে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতা বিষয়ে নতুন করে আমার ভেতর নানা জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হলো। পৃথিবীব্যাপী আজ সভ্যতার জয়ধ্বনি। শোনা যায়, জাতি-ধর্ম-বর্ণের প্রভেদ লুপ্ত হয়েছে। তাহলে বিবর্ণ মলিন বোরখায় ঢাকা রোগে-শোকে জর্জরিত এই নারী কে? যে কিনা মাত্র বিশটি টাকা প্রাপ্তির আনন্দের ভার বহন করতে না পেরে কেঁদে উঠল! বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলায় আমি দুলতে থাকি। নিজের ভেতরে গভীর এক ঘোরের সৃষ্টি হলো। শুরু হলো নিরন্তর অনুসন্ধান, গবেষণা, পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও পরিভ্রমণ। অতঃপর সেই ঘোরের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বেগানা। 

আরেকটা মজার ঘটনা বলি। বছর দুয়েক আগে আমি একবার ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। বিশ-একুশ বছরের এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি আপ্লুত হয়ে বললেন, ‘আমি আপনার রাজনটী পড়েছি’। এ কথা বলেই তিন আমার পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য ঝুঁকে পড়লেন। লজ্জায় আমি পিছু হটতে গিয়ে আমার এক পা পড়ে গেল একটা কর্দমাক্ত নালায়। সে কি বিব্রতকর অবস্থা! দুজনই লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। বেচারার অনুতাপের আর শেষ রইল না। পরে আমিই কষ্ট পেয়েছি এই ভেবে যে, একজন পাঠক তার ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে চাইছে আমাকে কদমবুচি করার মধ্য দিয়ে, আমি বাধা দিতে গিয়ে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হলো। আমি তাকে বিব্রত করেছি। এটা আমার ঠিক হয়নি।

আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা হলো রাজনটী উপন্যাসটি লেখার আগে আমি চোরাইপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরায় চলে গিয়েছিলাম। অল্পের জন্য বিএসএফ-এর হাতে ধরা খাইনি। তখন অনেক সাহস ছিল আমার। সেই সাহসে এখন ভাটা পড়ে গেছে খানিকটা। এখন আর চোরাইপথে যাওয়ার সাহস হয় না।

প্রিয়.কম:অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকাশনা সংস্থা থেকে ভুল বানান, বাক্যগঠন ঠিক নেই -এমন বই প্রকাশ হয়। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? এসব কেন হয়?

স্বকৃত নোমান: প্রতি বছর বইমেলায় তো তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বই বের হয়। আমার মনে হয় না নির্ভুল বই একশ’র বেশি বের হয়। মুদ্রণ ব্যবস্থার উৎকর্ষের ফলে এখন যে কেউ চাইলেই বই প্রকাশ করতে পারে। প্রকাশক হতে হলেও এখন বিশেষ কোনো যোগ্যতার দরকার হয় না। কিছু টাকা বিনিয়োগ করলেই প্রকাশক হওয়া যায়। বইমেলায় যত বই প্রকাশিত হয় তার বেশিরভাগই লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রকাশ করেন প্রকাশকরা। কেউ নগদ টাকা দেন, কেউবা দুই থেকে তিন শ’ কপি বই কিনে নেন। সেক্ষেত্রে বানান, বাক্যগঠন ঠিক আছে কিনা―এসব কিছু দেখার খুব একটা প্রয়োজনবোধ করেন না প্রকাশকরা। এক্ষেত্রে তারা পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দেন না। টাকাটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি বেশ কজন প্রকাশককে চিনি, যারা নির্ভুল বই বের করার চেষ্টায় থাকেন সবসময়। 

আসলে আমাদের প্রকাশনা শিল্প এখনও প্রস্তুতিকালের মধ্যেই আছে। মানে শৈশব অতিক্রম করছে। সবে হাঁটার চেষ্টা করছে। একটা মানুষ শৈশবকালে যখন হাঁটার চেষ্টা করে তখন বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে। আবার উঠে। আবার হাঁটার চেষ্টা করে। এই করতে করতে একটা সময় ঠিকমতো হাঁটতে শেখে। শৈশব-কৈশোরে অনেক ভুলত্রুটি হয়। পরবর্তীকালে সেসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ পরবর্তী জীবন অতিবাহিত করে। আমার প্রকাশনা জগতও ভুলত্রুটি করতে করতে একটা সময় ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। এই ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

প্রিয়.কম: বানান ভুল, বাক্যগঠন ছাড়া বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বইয়ের মান কেমন?

স্বকৃত নোমান: মানের ব্যাপারটা আসলে আপেক্ষিক। আমার কাছে যে বইটি মানসম্পন্ন, আপনার কাছে তা মানহীন হতে পারে। অনেক লেখক আছেন যাদের বই আমাকে ফ্রি দেওয়া হলেও আমি পড়ব না। কিন্তু আরেকজন টাকা দিয়ে সেটি কিনে পড়ছেন। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিমত বলি। আমি আসলে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বই খুব একটা পড়ি না। পড়ার মতো যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগই আগে পড়ে ফেলেছি। যেগুলো এখনও পড়ার বাকি সেগুলোও বিশ শতকে লেখা। একুশ শতকে লেখা বাংলাদেশের কোনো লেখকের লেখা আমি খুব একটা পড়ি না। পড়লেও খুব কম। একুশ শতকের যেসব লেখকদের লেখা পড়ি তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। সুতরাং আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে মানসম্পন্ন কোনো বই বেরুচ্ছে না। কিন্তু একজন তরুণ পাঠককে যদি এই প্রশ্নটি করেন, তিনি বলবেন, প্রচুর মানসম্পন্ন বই বেরুচ্ছে। তার অভিমতকে আপনি কিন্তু উড়িয়ে দিতে পারবেন না। সুতরাং মানের ব্যাপারটা আপেক্ষিক। 

প্রিয়.কম: উপরের দুটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির কোনো ভূমিকা থাকা উচিত কি-না? বাংলা একাডেমির কাজ কী শুধু মেলার আয়োজন করা আর কিছু গবেষণা করা বা বই প্রকাশ করা?

স্বকৃত নোমান: ভূমিকা তো অবশ্যই থাকা উচিত। এই সময়ে যারা ভালো গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা প্রবন্ধ লিখছেন―বাংলা একাডেমির উচিত তাদের বইগুলো প্রকাশ করা এবং যারা লেখালেখিতে আসছেন তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যদিও আমি মনে করি না, প্রশিক্ষণ দিয়ে লেখক তৈরি করা সম্ভব। তবু লেখালেখির জগতটাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য একাডেমি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেই পারে। সৃজনশীল লেখক তৈরিতে একাডেমির অনেক কিছু করার আছে। কিন্তু আমি বললে কি একাডেমি কর্তৃপক্ষ তা করবে? করবে না। যাদের বলার দরকার তারা তো বলছেন না। আর বইমেলাটা আসলে একাডেমির কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। মেলার আয়োজন করবে প্রকাশকরা। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও মেলার আয়োজন করতে পারে। বইমেলার সঙ্গে একাডেমির সম্পর্কটা আমি ঠিক খুঁজে পাই না। সম্পর্ক রাখারও দরকার মনে করি না। একাডেমি তার কাজ করুক। কত কাজই তো করার আছে। বইমেলা নিয়ে একাডেমি ব্যস্ত থাকার কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না।

প্রিয়.কম: দেশে নতুন লেখক তৈরি হচ্ছে কি-না? হলে তারা কেমন লিখছে? না হলে কেন হচ্ছে না? এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের দায় আছে কি-না?

স্বকৃত নোমান: অনেক নতুন লেখক তৈরি হচ্ছে। তারা কেমন লিখছেন সেই ব্যাপারে আমাকে মোটামুটি অজ্ঞ বলতে পারেন। আগেই বলেছি, সমকালীনদের লেখা আমি খুব একটা পড়ি না। পড়ার মতো সময় পাই না। কারণ বিশ শতকে লেখা বিশ্বসাহিত্যের প্রচুর বই আমার টেবিলে পড়ে আছে। সিলেবাসটা দীর্ঘ। এখনও অনেক বই পড়ার বাকি। আমি এখনও সেগুলো শেষ করতে পারিনি। তবু মাঝেমধ্যে পড়ি না যে তা নয়। পড়ি। পড়ে দারুণ হতাশ হই। আবার কখনও কখনও আশার আলোও দেখতে পাই। আমি কথাসাহিত্যের কর্মী। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ এবং শওকত আলীর ‘নাঢ়াই’ বা ‘মাদারডাঙার কথা’ কিংবা হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’র পর বাংলাদেশের কোনো উপন্যাস আমাকে ঠিক পাঠতৃপ্তি দিতে পারেনি। তার মানে ভালো উপন্যাস লেখা হচ্ছে না। না হওয়ার কারণ আমি ঠিক খুঁজে পাই না। উপন্যাসের ক্ষেত্রে আসলে আমরা একটা বন্ধ্যাকাল অতিক্রম করছি। মানে ভালো উপন্যাস লেখা হচ্ছে না। তবে কিছু ভালো গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে দেখতে পাই। এটি আশার আলো।

আর লেখক তৈরি হওয়া-না-হওয়া নিয়ে বাংলা একাডেমির কেন, কোনো প্রতিষ্ঠানেরই দায় নেই। দায় আছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের। সেই প্রতিষ্ঠানটির নাম রাষ্ট্র। আমাদের রাষ্ট্র এখনো স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি। লেখালেখির উৎকর্ষের জন্য রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা খুব জরুরি। আমরা একটি প্রদোষকাল অতিক্রম করছি। প্রদোষে থাকে শুধু বিষণ্নতা আর বিপন্নতা। এই প্রদোষকাল না কাটলে প্রকৃত লেখক আসবে বলে মনে হয় না। তবু কে জানে, এর মধ্য দিয়েই হয়ত বেরিয়ে আসতে পারে এমন এক লেখক, যিনি হবেন মহীরুহ, যার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। আমরা সেই লেখকের প্রতীক্ষা করছি।

প্রিয়.কম:লেখক হিসেবে পাঠকের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

স্বকৃত নোমান: প্রত্যাশা একটাই―পাঠক আমার বই পড়বেন। এই প্রত্যাশা কেবল আমার একার নয়, সম্ভবত প্রত্যেক লেখকেরই এমন প্রত্যাশা।

প্রিয়.কম: বাংলা সাহিত্যকে দেশের বাইরে ছড়িয়ে দিতে কী করা প্রয়োজন?

স্বকৃত নোমান: এগিয়ে আসতে হবে সাহিত্যপ্রেমী অনুবাদকদের; যারা বাংলা ভাষায় লেখা বইগুলোকে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবেন। আর দরকার ইউপিএল-এর মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এরকম অন্তত আরো এক ডজন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দরকার আমাদের। আর দরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। আমাদের লেখা বই দেশের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রাষ্ট্রের তো কোনো পৃষ্ঠপোষকতাই নেই। প্রয়োজনও মনে করে না।

প্রিয়.কম: মুক্তমনা লেখকদের উপর বিভিন্ন সময় হামলা হচ্ছে। এখন প্রকাশকদের উপরও হচ্ছে। এ নিয়ে যদি কিছু বলতেন...

স্বকৃত নোমান: মুক্তমতের চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যারা এই হামলা করছে তারা নিশ্চিতভাবেই পরাজিত হবে। আমি নিশ্চিত। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। মুক্তচিন্তা আদিকাল থেকেই ছিল। মানুষ তো বনে-জঙ্গলে ন্যাংটো বসবাস করত একসময়। মুক্তচিন্তা ছিল বলেই মানুষ আজকের এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। মুক্তচিন্তার উপর আঘাত অতীতেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে সারা পৃথিবীজুড়ে। মুক্তচিন্তা কখনও মুক্ত হয় না। মুক্তচিন্তার পদে পদে বিপদ থাকে। এই বিপদকে মোকাবিলা করেই মুক্তচিন্তকরা এগিয়ে যান, সমাজকে এগিয়ে নেন। তাদের উপর মৃত্যু খড়গ নেমে এলেও তারা হাসিমুখে বরণ করে নেন। পশ্চাৎপদরা যতই চেষ্টা করুক মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করতে, কোনো লাভ হবে না। পারবে না তারা। হত্যা করে মুক্তচিন্তা বন্ধ করা যাবে না। অতীতে যায়নি, ইতিহাস বলছে।

প্রিয়.কম: যারা হামলা করছে তারা কোনো ধারণা বা ভ্রান্ত ধারণা থেকে করছে। কিংবা জেনেশুনেই করছে। কিন্তু এ থেকে মুক্তির কোনো উপায় আছে কী?

স্বকৃত নোমান: হামলা যে তারা ভ্রান্ত ধারণা থেকে করছে তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যাই হোক, লেখালেখির জন্য কারো উপর হামলা হবে এটা কিছুতেই মানা যায় না। পৃথিবীর সব ধর্ম, সব দর্শন, সব তত্ত্ব মানুষের জন্যই তৈরি। ধর্মের জন্য, দর্শনের জন্য, তত্ত্বের জন্য মানুষ হত্যা চলতে পারে না। মানুষ না থাকলে ধর্ম, দর্শন আর তত্ত্ব দিয়ে কী হবে? মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাস যেমন বলেছেন, ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’। লালন বলেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’। ইসলাম ধর্মমতে, আল্লাহ মানুষকে তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। খেয়াল করুন, মানুষ কিন্তু আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহর প্রতিনিধিকে অসম্মান করা মানে প্রকারান্তরে আল্লাহকেই অসম্মান করা। যারা আল্লাহর নামে মানুষ হত্যা করছে তারা বিভ্রান্ত। ইসলাম ধর্মমতে আল্লাহ রাহমানুর রাহিম। অর্থাৎ তিনি পরম ক্ষমাশীল। তার বান্দাহদের মধ্যে কাকে তিনি স্বর্গীয় সুখ দেবেন আর কাকে নারকীয় দুঃখ দেবেন―এটা একান্তই তার ব্যাপার। একজন অবিশ্বাসীকেও তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন। কেননা তিনি রাহমানুর রাহীম। 

সুতরাং ‘পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল’ আল্লাহর নামে যারা এসব সন্ত্রাসবাদ চলাচ্ছে তারা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। এই বিভ্রান্তির পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সংস্কৃতির জাগরণের মধ্য দিয়েই এই বিভ্রান্তরা সমূলে উচ্ছেদ হয়ে যাবে। সংস্কৃতির জাগরণ ছাড়া মুক্তির কোনো উপায় আমি আপাতত দেখছি না। আমরা বাঙালি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছি না বলে ধর্মের নামে এসব সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। 

প্রিয়.কম: এবারের বইমেলা সম্পর্কে কিছু বলুন।

স্বকৃত নোমান: বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবারের বইমেলার আয়োজন অনেক ভালো। পরিসর বাড়ানো হয়েছে। তবে একটা সমস্যা রয়েই গেছে। লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলো এখনও একাডেমি চত্বরেই রেখে দেওয়া হয়েছে। লিটলম্যাগ চত্বর লেখকদের প্রাণকেন্দ্র। সবাই ওখানে আড্ডা জমায়। এটা কি উদ্যানে আনা যেত না? তার মানে মেলা দুই ভাগে রয়েই গেল। একাডেমি কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে আশা করি দুই ভাগে রাখবে না। এবারের মেলায় আগের চেয়ে আরো বেশি প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে আমার কাছে। ভালোভাবে শেষ হোক মেলা, শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটুক, এই কামনা।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
ভালো মানুষ হয়ে, ভালো নির্মাতা হতে চাই : ইউসুফ
তাশফিন ত্রপা ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
‘নেতৃত্বের গুণে অমর আনিসুল হক’
‘নেতৃত্বের গুণে অমর আনিসুল হক’
জাগো নিউজ ২৪ - ২ সপ্তাহ আগে
কলকাতা বইমেলা শুরু ৩০ জানুয়ারি
কলকাতা বইমেলা শুরু ৩০ জানুয়ারি
সময় টিভি - ২ সপ্তাহ আগে
একুশে টেলিভিশন ভবনে একদিনে ২ বার অগ্নিকাণ্ড
একুশে টেলিভিশন ভবনে একদিনে ২ বার অগ্নিকাণ্ড
বণিক বার্তা - ২ সপ্তাহ, ৩ দিন আগে
একুশে টেলিভিশন ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে
একুশে টেলিভিশন ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে
সময় টিভি - ২ সপ্তাহ, ৩ দিন আগে
একুশে টেলিভিশন কার্যালয়ের নিচতলায় অগ্নিকাণ্ড
একুশে টেলিভিশন কার্যালয়ের নিচতলায় অগ্নিকাণ্ড
বিডি নিউজ ২৪ - ২ সপ্তাহ, ৩ দিন আগে
একুশে টেলিভিশন ভবনে অগ্নিকাণ্ড
একুশে টেলিভিশন ভবনে অগ্নিকাণ্ড
বণিক বার্তা - ২ সপ্তাহ, ৩ দিন আগে
একুশে টেলিভিশন ভবনে আগুন
একুশে টেলিভিশন ভবনে আগুন
যুগান্তর - ২ সপ্তাহ, ৩ দিন আগে