ছবি সংগৃহীত

একনজরে নামাজে কিরাত-সুরা পাঠের বিধি-বিধান

ইমাম হলে ফজরে এবং মাগরিবে ও ঈশার প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চৈস্বরে কিরাত পড়বে এবং শেষ দুই রাকাআতে অনুচ্চৈস্বরে পড়বে। এটাই পরস্পরায় চলে এসেছে। আর যদি মু্নফারিদ হয় তা হলে সে ইচ্ছাধীন। চাইলে সে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে এবং নিজকে শোনাবে। কেননা নিজের ব্যাপারে সে নিজের ইমাম। আর চাইলে চুপে চুপে পাঠ করবে।

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০১৫, ০২:৩৭ আপডেট: ১৭ মে ২০১৮, ১৬:২৩


ছবি সংগৃহীত
ইমাম হলে ফজরে এবং মাগরিবে ও ঈশার প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চৈস্বরে কিরাত পড়বে এবং শেষ দুই রাকাআতে অনুচ্চৈস্বরে পড়বে। এটাই পরস্পরায় চলে এসেছে। আর যদি মু্নফারিদ হয় তা হলে সে ইচ্ছাধীন। চাইলে সে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে এবং নিজকে শোনাবে। কেননা নিজের ব্যাপারে সে নিজের ইমাম। আর চাইলে চুপে চুপে পাঠ করবে। কেননা, তার পিছনে এমন কেউ নেই, যাকে সে শোনাবে। তবে উচ্চৈস্বরে পাঠ করাই উত্তম। যাতে জামা’আতের অনুরূপ আদায় হয়। যুহর ও আসরে ইমাম কিরাত চুপে চুপে পড়বে। এমন কি আরাফাতে হলেও। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- দিবসের সালাত নির্বাক। অর্থাত্ তাতে শ্রুত কিরাত নেই। আরাফা সম্পর্কে ইমাম মালিক (র.) এর ভিন্নমত রয়েছে। আর আমাদের বর্ণিত হাদীছটি তার বিপক্ষে দলীল। আর জুমুআ ও দই ঈদে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে। কেননা উচ্চৈস্বরে পাঠের বর্ণনা মশহূর ভাবে চলে এসেছে। দিবসে নফল সালাত চুপে চুপে পাঠ করবে। আর ফরজ সালাতের উপর কিয়াস করে রাত্রের সালাতে মুনাফারিদের ইখতিয়ার রয়েছে। কেননা, নফল সালাত হলো ফরযের সম্পূরক। সুতরাং (কিরাআতের বেলায়) নফল ফরযের অনুরূপ হবে। যে ব্যক্তির ঈশার সালাত ফউত হয়ে যায় এবং সূর্যোদয়ের পর তা পড়ে, সে যদি উক্ত সালাতে ইমামতি করে তাহলে উচ্চস্বরে কিরাত পড়বে। এর সকালে জামা’আতের সাথে ফজরের সালাত কাযা করার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যেমন করেছিলেন। আর যদি সে একা সালাত পড়ে, তাহলে অবশ্যই নীরবে কিরাত পড়বে। (উভয় রকম পড়ার) ইখতিয়ার থাকবে না। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা উচ্চৈস্বরে কিরাত সম্পৃক্ত রয়েছে জামা’আতের সাথে অবশ্যম্ভাবীরূপে, কিংবা সময়ের সাথে স্বেচ্ছামূলকভাবে মুনাফারিদের ক্ষেত্রে। অথচ এখানে দু’টোর কোনটাই পাওয়া যায় নি। যে ব্যক্তি ঈশার প্রথম দুই রাকা’আতে সূরা পাঠ করল কিন্তু সূরাতুল ফাতিহা পাঠ করেনি, সে শেষ দুই রাকাআতে তা দোহরাবে না। পক্ষান্তরে যদি সূরাতুল ফাতিহা পড়ে থাকে কিন্তু তার সাথে অন্য সূরা যোগ না করে থাকে, তাহলে শেষ দুই রাকাআতে ফাতিহা ও সূরা দুটোই পড়বে এবং উচ্চৈস্বরে পড়বে। এটা ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মদ (র.)এর মত। তবে ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) বলেন, দুটোর মধ্যে কোনটাই কাযা করবে না। কেননা ওয়াজিব যখন নিজ সময় থেকে ফউত হয়ে যায়, তখন পরবর্তীতে বিনা দলীলে সেটাকে কাযা করা যায় না। উল্লেখিত ইমামদ্বয়ের পক্ষে দলীল – যা উভয় অবস্থার পার্থক্যের সাথে সম্পৃক্ত যে, সূরাতুল ফাতিহাকে শরীআতে এমন অবস্থায় নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, তার পরে সূরা সংযুক্ত হবে। সুতরাং যদি ফাতিহাকে শেষ দুই রাকাআতে কাযা করা হয় তাহলে তরতীবের দিক থেকে সূরার পর সূরাতুল ফাতিহা এসে যাবে। অর্থাত্ এটা নির্ধারিত অবস্থানের বিপরীত। আর (প্রথম দুই রাকাআতে) সূরা ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা তা শরীআত নির্ধারিতরূপে কাযা করা সম্ভব। উল্লেখ্য যে, এখানকার পাঠে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে (কাযা করা) ওয়াজিব হওয়া বুঝায়। আর মূল গ্রন্থের উল্লেখিত শব্দে মুস্তাহাব হওয়া বুঝায়। কেননা সূরার কাযা যদিও ফাতিহার পরে হচ্ছে তবু এ সূরা নিজ ফাতিহার সাথে সংযুক্ত হচ্ছে না। সুতরাং নির্ধারিত অবস্থান সর্বাংশে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আর উভয়টিতে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা একই রাকাআতে সরব ও নীরব পাঠ একত্র করা মানায় না। আর নফল তথা ফাতিহার মধ্যে পরিবর্তন আনা উত্তম। অনুচ্চৈস্বরে পাঠ হল যেন নিজে শোনতে পায়। আর উচ্চৈস্বরের পাঠ হল অপরে শোনতে পায়। এ হল ফকীহ্ আবূ জা’ফর হিন্দওয়ানীর মত। কেননা, আওয়াজ ব্যতীত শুধু জিহবা সণ্চালনকে কিরাত বলা হয় না। ইমাম কারখী (র.) এর মতে উচ্চৈস্বরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো নিজেকে শোনানো আর অনুচ্চৈস্বরের পরিমাণ হলো হরফের বিশুদ্ধ উচ্চারণ। কেননা, কিরাত বা পাঠ মুখের কাজ, কানের কাজ নয়। কুদূরী গ্রন্থের শব্দে এর প্রতি ইংগিত রয়েছে। তালাক প্রদান, আযাদ করা, ব্যতিক্রম যোগ করা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণমূলক যাবতীয় মাসআলার মধ্যে মতপার্থক্যের ভিত্তি হল উক্ত নীতির পার্থক্যের উপর। সালাতে যে পরিমাণ কিরাত যথেষ্ট হয়, তার সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর মতে এক আয়াত আর ইমাম আবূ ইউসূফ ও মুহাম্মদ (র.) এর মতে ছোট তিন আয়াত অথবা দীর্ঘ এক আয়াত। কেননা, এর চেয়ে কম পরিমাণ হলে তাকে কারী বলা হয় না। সুতরাং তা এক আয়াতের কম পাঠ করার সমতূল্য। ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর দলীল হলো, আল্লাহ তা’আলার বাণী- কুরআনের যতটুকু পরিমাণ সহজ হয়, তা তোমরা পড়ো। এখানে (এক আয়াতে বা তার অধিকের মাঝে) কোন পার্থক্য করা হয়নি। তবে এক আয়াতের কম পরিমাণ (সর্বসম্মতিক্রমেই কুরআন গণ্য হওয়ার হুকুমের) বহির্ভূত। আর পূর্ণ আয়াত আয়াতের অংশবিশেষের সমার্থক নয়। আর সফরের সূরা ফাতিহার সাথে অন্য যে কোন সূরা ইচ্ছা হয় পড়বে। কেননা বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) তার সফরে ফজরের সালাতে ফালাক ও নাস সূরাদ্বয় পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া সালাতের অর্ধেক রহিত করার ক্ষেত্রে সফরের প্রভাব রয়েছে। সুতরাং কিরাত হ্রাস করণের ব্যাপারে তার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক।এ হুকুম তখন, যখন সফরে তাড়াহুড়া থাকে। পক্ষান্তরে যদি (মুসাফির) স্থিতি ও শান্তির পরিবেশ থাকে, তাহলে ফজরের সালাতে সূরা বুরূজ ও ইনশাক্কা পরিমাণ সূরা পাঠ করবে। কেননা, এভাবে তাখফীক সহকারে সুন্নাতের উপরও আমল সম্ভব হয়ে যাবে। মুকীম অবস্থায় ফজরের উভয় রাকাআতে সূরাতূল ফাতিহা ছাড়া চল্লিশ বা পণ্চাশ আয়াত পড়বে। চল্লিশ থেকে ষাট এবং ষাট থেকে একশ’ আয়াত পাঠ করার কথাও বর্ণিত রয়েছে। আর এ সব সংখ্যার সমর্থনে হাদীছ এসেছে। বর্ণনাগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য বিধান এভাবে হতে পারে যে, (কিরাত শ্রবণে) আগ্রহীদের ক্ষেত্র্রে একশ’ আয়াত এবং অলসদের ক্ষেত্রে চল্লিশ আয়াত এবং মধ্যমদের ক্ষেত্রে পণ্চাশ থেকে ষাট আয়াত পাঠ করবে। কারো কারো মতে রাত্র ছোট বড় হওয়া এবং কর্মব্যস্ততা কম-বেশী হওয়ার অবস্থা বিবেচনা করা হবে। ইমাম কুদূরী বলেন, যুহরের নামাযেও অনুরূপ পরিমাণ পাঠ করবে। কেননা সময়ের প্রশস্ততার দিক দিয়ে উভয় সালাত সমান। মবসূত গ্রন্থে বলা হয়েছে- ‘কিংবা তার চেয়ে কম’। কেননা তা কর্মব্যস্ততার সময়। সুতরাং অনীহা এড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ফজর থেকে কমানো হবে। আসর ও ‘ঈশা একই রকম। দু’টোতেই আওসাতে মুফাসসাল পাঠ করবে। আর মাগরিবে তার চেয়ে কম অর্থাত্ তাতে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পাঠ করবে। এ বিষয়ে মূল দলীল হলো আবূ মূসা আশ’আরী (রা.) এর নামে প্রেরিত উমর ইবন খাত্তাব (রা.) এর এই মর্মে লিখিত পত্র যে, ফজরে ও যুহরে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়ো। তাছাড়া মাগরিবের ভিত্তিই হলো দ্রুততার উপর। সুতরাং হালকা কিরাতই তার জন্য অধিকতর উপযোগী। আর আসর ও ‘ঈশায় মুস্তাহাব হলো বিলম্বে পড়া। আর কিরাত দীর্ঘ করলে সালাত দু’টি মুস্তাহাব ওয়াক্ত অতিক্রম করার আশংকা রয়েছে। সুতরাং এ দুই সালাতে আওসাতে মুফাসসাল নির্ধারণ করা হয়। ফজরে প্রথম রাকাআতকে দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় দীর্ঘ করবে, যাতে লোকদের জামা’আত ধরার ব্যাপারে সহায়ক হয়। ইমাম কুদূরী বলেন, যুহরের উভয় রাকাআত সমান। তা ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসূফ (র.) এর মত। আর ইমাম মুহাম্মদ (র.) বলেন, সব সালাতেই প্রথম রাকাআতকে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ করা আমার কাছে পসন্দনীয়। কেননা, বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) সব সালাতেই প্রথম রাকাআতকে অন্য রাকাআতের তুলনায় দীর্ঘ করতেন। প্রথমোক্ত ইমামদ্বয়ের দলীল এই যে, উভয় রাকাআতই কিরাতের সমান হকদার। সুতরাং পরিমাণের ক্ষেত্রেও উভয় রাকাআত সমান হতে হবে। তবে ফজরের সালাত এর বিপরীত। কেননা, তা ঘুম ও গাফলাতের সময়। আর উদ্ধৃত হাদীছটি সানা, আউযুবিল্লাহ্ ও বিসমিল্লাহ্ পড়ার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। আর কম, বেশীর ক্ষেত্রে তিন আয়াতের কম ধর্তব্য নয়। কেননা অনায়াসে এতটুকু কম-বেশী থেকে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। আর কোন সালাতের সহিত এমন কোন সূরা নির্দিষ্ট নেই যে, এটি ছাড়া সালাত জাইয হবে না। কেননা, আমরা পূর্বে যে আয়াত পেশ করেছি, তা নিঃশর্ত। বরং কোন সালাতের জন্য কুরআনের কোন অংশকে নির্ধারণ করে নেওয়া মাকরূহ। কেননা, তাতে অবশিষ্ট কুরআনকে বর্জন করা হয় এবং বিশেষ সূরার ফযীলতের ধারণা জন্মে। মুক্তাদী ইমামের পিছনে কিরাত পাঠ করবে না। সূরাতুল ফাতিহার ব্যাপারে ইমাম শাফিই (র.) এর ভিন্নমত রয়েছে। তার দলীল এই যে, কিরাত হলো সালাতের অন্যন্য রুকনের মত একটি রুকন। সুতরাং তা পালনে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ে শরীক থাকবেন। আমাদের দলীল হলো রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর বাণী- যে ব্যক্তির ইমাম রয়েছে, সেক্ষেত্রে ইমামের কিরাত তার কিরাত রূপে গণ্য। এবং এর উপরই সাহাবীদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর কিরাত হলো উভয়ের মাঝে শরীকানামূলক রুকন। তবে মুক্তাদীর অংশ হলো নীরব থাকা ও মনোযোগসহ শ্রবণ। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- (ইমাম) যখন কুরআন পাঠ করেন তখন তোমরা খামুশ থাকো। তবে ইমাম মুহাম্মদ (র.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সতর্কতা অবলম্বন হিসাবে পাঠ করাই উত্তম। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসূফ (র.) এর মতে তা মাকরূহ। কেননা এ সম্পর্কে হুশিয়ারি রয়েছে। আর মনোযোগ সহকারে শুনবে এবং নীরবে থাকবে। যদিও ইমাম আশা ও ভয়ের আয়াত পাঠ করেন। কেননা, নীরবে শ্রবণ ও নীরবতা আয়াত দ্বারা ফরজ সাব্যস্ত হয়েছে। আর নিজে পাঠ করা, কিংবা জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া এ সকল এতে বাধা সৃষ্টি করে। খুতবার হুকুমও অনুরূপ। তেমনি হুকুম নবী (সা.) এর উপর দুরূদ পাঠ করার সময়ও। কেননা, মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করা ফরজ। তবে যদি খতীব এ আয়াত পড়েন- তখন শ্রোতা মনে মনে দুরূদ পড়বে। অবশ্য মিম্বর থেকে দূরের লোকদের সম্পর্কে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে নীরব থাকার মধ্যে ইহতিয়াত রয়েছে, যাতে (কমপক্ষে) খামুশ থাকার ফরজ পালিত হয়। সঠিক বিষয় আল্লাহই উত্তম জানেন। মূল- শায়খুল ইসলাম বুরহান উদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবন আবূ বকর আল-ফারগানী [রহ.] অনুবাদ- মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ গ্রন্থনা ও সম্পাদনা- মাওলানা মিরাজ রহমান

পাঠকের মন্তব্য(১)

মন্তব্য করতে করুন


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

আওসাতে মুফাসসাল এ কোন কোন সূরা অর্থাৎ কোন সূরা থেকে কোন সূরা পর্যন্ত কিসারে মুফাসসাল এ কোন কোন সূরা অর্থাৎ কোন সূরা থেকে কোন সূরা পর্যন্ত তিওয়ালে মুফাসসাল এ কোন কোন সূরা অর্থাৎ কোন সূরা থেকে কোন সূরা পর্যন্ত

আরো পড়ুন
আজ পবিত্র আশুরা
হাসান আদিল ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট