ছবি সংগৃহীত

ছবির পেছনের ছবি!

সংবাদে বলা হয়েছিলো- তীব্র সমালোচনার মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে শ্যুটিং করা হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারির সংবাদ এটি। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইফুল হক অমি। <strong><em>প্রিয়.কম</em></strong>-এর সাথে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, শিল্পি কখনো এতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে না। <strong>প্রিয়</strong> পাঠকদের জন্য সে সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হল।

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০৭:০৫ আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১৬
প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০৭:০৫ আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১৬


ছবি সংগৃহীত
(প্রিয়.কম) সংবাদের মূল বক্তব্য ছিলো, বার্ন ইউনিটে শ্যুটিং! দেশের জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত প্রায় সবগুলো গণমাধ্যমের খবর হয়েছিলো ঘটনাটি। সংবাদে বলা হয়েছিলো- তীব্র সমালোচনার মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে শ্যুটিং করা হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারির সংবাদ এটি। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় -
গত ৭ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল আগুনে দগ্ধ যন্ত্রনা কাতর একজন রোগীকে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলেন। তাদের কারও হাতে ছিল ক্যামেরা, কারও হাতে লাইট, কালোবোর্ড, স্ক্রিপ্ট। দুপুরে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে শুটিং করার পর রোগীর স্বজনদের তোপের মুখে তারা বার্ন ইউনিট ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সংবাদে জানানো হয়, ‘কাউন্টার ফটো’ নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সাইফুল হক অমি ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল নিয়ে হৈচৈ করে এইচডিইউ-এ ঢুকে পড়েন। প্রথমে তাদের সবাই ফটোসাংবাদিক বলেই মনে করছিলেন। কিন্তু পুরো শ্যুটিং ইউনিটকে দেখে রোগীদের স্বজনরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে বিষয়টি ফাঁস হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো নীচের ছবিটি বেশ বড় করেই ছাপে। এবং সামাজিক গনমাধ্যমে (বিশেষ করে ফেসবুকে) এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী হয়। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন অসংখ্য ফটো/ভিডিও-জার্নালিস্ট ছবি তুলে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন প্রচার করলেও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার সাইফুল হক অমির ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে বিশাল এক ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অমিকে নিয়ে রিপোর্ট করার সময়, কেউ একটি বারের জন্যেও তার মতামত নেয়নি, এবং তাকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়া হয়নি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিতর্কিত সেই ছবি: বার্ন ইউনিটে ছবি তুলছেন সাইফুল হক অমি
সাইফুল হক অমি ফটোজার্নালিস্ট নন। তবে তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার। তার ছবি ছাপা হয়েছে নিউজ উইক, ফটো ফাইল (যুক্তরাস্ট্র), নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইন্টারন্যাশনালিস্ট, টাইম ম্যাগাজিন, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইকোনমিস্ট, ডে-জ জাপান, আরব নিউজ এবং বিবিসি সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। মাত্র ২০০৫ সালে ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই লেকচার-সহ তার কাজ দেখিয়েছেন এমআইটি, স্টানফোর্ড, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ২৩ টি দেশে কাজ করেছেন। তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়েছেন যা বাংলাদেশের অনেক ফটোগ্রাফারের স্বপ্নের স্থান। তার ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়েছে আল জাজিরা, বিবিসি, চ্যানেল ফোর-সহ অন্যান্য টিভি মাধ্যমে। উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্ক টাইমস সারা পৃথিবীর আলোকচিত্রীদের কাছ থেকে ছবি চেয়েছেন, ছবি রিভিউ করে দেওয়ার জন্য। এ জন্য পুরো পৃথিবীর ৭০ জন বিখ্যাত আলোকচিত্রীকে এই জুরিস্ট প্যানেলে রেখেছেন। সাইফুল হক অমি তাদের একজন। তিনি বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদেরকে ফটোগ্রাফি শেখানোর জন্য "কাউন্টার ফটো" নামক প্রতিষ্ঠানের "ফটোগ্রাফি বিভাগ"-টি প্রতিষ্ঠা করেন। সাইফুল হকের মতো ফটোগ্রাফার বাংলাদেশে হাতে গোনা আরও কয়েকজন পাওয়া যাবে। এখন সঙ্গত কারনেই প্রশ্ন এসেছে, তাহলে এই মাপের একজন মানুষকে নিয়ে হঠাৎ করেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম এতো সোচ্চার হয়ে উঠলো কেন? প্রিয়.কম যেহেতু সংবাদ এগ্রিগ্রেট করে থাকে, তাই প্রচলিত নিয়মে প্রিয়.কমেও এই ছবিটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু সাইফুল হক অমির সাথে কথা বলার পর মনে হয়েছে, বিষয়টি মোটেও এতো সরল নয়। এখানে ভাববার মতো বিষয় রয়েছে। তাই আমরা সাইফুল হক অমির একটি সাক্ষাৎকার গ্রহন করি (১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। এবং পাঠকদের জন্য তা এখানে প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রিয়.কম সম্পাদক জাকারিয়া স্বপন এবং অনুলিখন করেছেন রাজিউল হাসান

প্রিয়.কম: আসলে সেদিন কী ঘটেছিলো?

সাইফুল হক অমি: প্রথমেই একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে ঘটনাটা আমি কিভাবে দেখছি, সেটা বলি। পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স নিয়ে আমি দীর্ঘদিন কাজ করছি। আসলে বর্তমানে দেশে যা ঘটছে, তা কোনোমতেই মনে নেওয়ার মতো না। আমি মোটেও কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে যেতে চাই না। কিন্তু শেষ প্রশ্নটা হচ্ছে- মানুষ মারা যাচ্ছে। এবং সেই মানুষ কারা? বাংলাদেশের সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে নিপীড়িত হতভাগ্য জনগণ। আর আক্রমণের শিকার কে হচ্ছে? শিল্পী হিসাবে যদি বলি, ওই মানুষের শরীর। আর যে মানুষগুলো হতাহত হচ্ছে, তাদের প্রধান সম্বলই হচ্ছে তাদের শরীর। আর এই মানুষগুলো আক্রান্ত হওয়া মানে শুধু তারা আক্রান্ত হওয়া নয়, তাদের পরিবারও আক্রান্ত হওয়া। আপনারা টিভি-পত্রিকা দেখে থাকলে জানেন, বহু মানুষ কাঁদছে আর বলছে, যে মানুষটা আহত বা নিহত হচ্ছে, সে-ই ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস। তার মানে আক্রমণটা যেমন মানুষের ওপর হচ্ছে, তা তার শরীরের ওপর হচ্ছে, পরিবারের ওপর হচ্ছে। তাই এই বিষয়টা নিয়ে যদি কাজ করতে হয়, তাহলে আপনাকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। একটা হচ্ছে, আপনি সাংবাদিক হিসাবে বয়ান তৈরি করবেন, মানুষের কাছে সত্যটা পৌঁছে দেবেন এবং সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদের ওপর শতভাগ সম্মান রেখে বলছি, নিউজের একটা বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, আপনি চাইলেও দু’দিন আগের ঘটনা পরেরদিন বলতে পারবেন না। প্রতিদিনকার ঘটনাই আপনাকে বয়ান করতে হবে। এবং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যা ইতিহাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারন করে দেয়। এবং একজন শিল্পী হিসেবে, ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার হিসেবে সেটা আমি বুঝতে পারি। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, আজকে যা ঘটছে, তা শুধু দুর্ঘটনা বা সন্ত্রাস নয়। এর উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বহু কিছু ঠিক হবে। রাজনীতির মোড় ঘোরার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমার মনে হয়, আমরা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তের সামনে আছি। এবং একটা মর্মান্তিক, প্রায় গণহত্যার মতো একটা পরিস্থিতির মাঝে আছি। এবং সেটাকে ডকুমেন্ট করতে গেলে, অনেক কিছু ভাবতে হয়। এবং ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে, শুধুমাত্র যা ঘটেছে, তা উপস্থাপন করলেই হয় না। যেমন করে আমি আপনি কথা বলছি, সেটা বললে কবিতা হবে না; কবিতাটি কবিতার ভাষায় হতে হবে, একইভাবে শিল্পকে শিল্পের মতোই হতে হবে। তার মানে, আপনার ছবি সকলের ছবির মাঝে হারিয়ে যেতে পারে না। আপনার গান, আপনার কবিতা, আপনার উপন্যাস আপনার মতোই হবে। যদি তা উন্নত মানের হয়, তাহলে তা টিকে থাকবে; নাহলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। কিন্তু শিল্পী হিসেবে আপনি চেষ্টা করবেন, যাতে মানুষ এই ঘটনাগুলো ভুলে না যায়। আমরা ছবি তুলি, ডকুমেন্টারি করি, যাতে আর কোনোদিন এই ঘটনাগুলো না ঘটে। আমি রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে আড়াই বছর কাজ করেছি। ব্যক্তিগত জীবনে বহুধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি। অনেক মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছি। এবং এটা আমার জন্য নতুন কিছু নয়। আমার কাজ নিয়ে আমি বই করেছি। সেই বই বিএনপি সরকার ব্যান করেছে। মুজাহিদ সাহেব নিজ দায়িত্বে তা ব্যান করেছেন। আর ব্যান করার প্রক্রিয়া ছিলো এমন যে, ব্যান করার কথা বললেও আমাদের বিপদ হবে। আমরা যে এনজিও’র জন্য বইটি করছিলাম, তাদের বলা হয়েছে- তোমাদের সমস্ত ফান্ডিং বন্ধ করে দেব। এই প্রজেক্টের অধীনে ছিলো একটা আন্তর্জাতিক সেমিনার, তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশের বাইরে থেকে ক্যামেরাম্যান এনে আমি ফিল্ম বানানো শুরু করি, সেই ফিল্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং বাংলাদেশের সমস্ত গ্যালারিকে চিঠি দিয়ে বলা হয়, আমার কোনো ছবি প্রদর্শন করা যাবে না। বাংলাদেশের বাইরে ছবি পাঠানো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। এবং আপনি এমন একজন ফটোগ্রাফারের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, যিনি আজ আটবছর পর এই বিষয়ে কথা বলছে। ঘটনার ১৫দিন আগে বার্ন ইউনিটে আমি গিয়েছি একজন শিল্পি হিসেবে। আমি সেখানে দেখেছি, কী হচ্ছে। আর সকলের মতো আমি ছবি তুলি নাই। এই ছবি না তোলা যদি অপরাধ হয়, তাহলে আমি করজোরে ক্ষমা চাইছি। আমি প্রতিদিন শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি না ক্যামেরা নিয়ে। আমি পনেরদিন ভেবেছি শুধু, কী করলে এই ঘটনার কথা মানুষের মনে থাকবে। পনের দিন ভেবে আমি বের করলাম, কালো পর্দা ব্যবহার করবো। কালো হচ্ছে শোকের প্রতীক। এই প্রতীকটার কথা আমি নির্বাচন করেছিলাম মানুষকে ভাবাতে। আর আরেকটা কথা হলো, ফটোগ্রাফিতে ভিজ্যুয়াল ডিস্ট্রাকশন বলে একটা টার্ম আছে। আমি যদি এখন আপনার রঙিন ছবি তুলি, তাহলে খুবই সমস্যা হবে। কারণ আপনার পেছনে অনেক ধরণের রঙ আছে। আপনি হারিয়ে যাবেন এই রঙের মাঝে। আপনাকে তো আমি স্টুডিওতে নিয়ে যেতে পারবো না। তাহলে আমাকে কাজটা করতে হবে একটা নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে। আবার আমি যাদেরকে নিয়ে কাজ করছি, তাদেরকে এক মিলিমিটারও সরানোর উপায় নেই। এবং তা কোনোভাবেই করা যাবে না। কারণ করলে তার চেয়ে অমানবিক কিছু আর হয় না। পনের দিন ধরে চিন্তা ভাবনা করে আমি একটা কালো কাপড় নিয়ে গেলাম সেখানে, যা আসলে ছিলো আমার অফিসের একটি পর্দা। আমি খুব প্রাচীন ধরণের একটা ক্যামেরায় শ্যুট করতে চেয়েছিলাম, যাকে বলে হ্যাসেলব্লাড (Hasselblad)। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি এই ক্যামেরা ব্যবহার করতে যে ট্রাইপড লাগে, তা ব্যবহার করার পরিস্থিতি নাই। দ্বিতীয়বার আরেকটু চিন্তা করে সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরায় শ্যুট করার সিদ্ধান্ত নিই। ওই ওয়ার্ডে যখন আমি ঢুকি, সেখানে ২০ জন বা তার বেশি ফটোগ্রাফার ছিলেন। সেখানে ঢুকে দেখি, সব মিলে ১৫-২০টা বেড আছে এবং প্রত্যেকটাতেই রোগী আছে। এবং প্রত্যেকের অবস্থাই মর্মান্তিক। তাদের মাঝে মাত্র যে তিন-চারজন লোক বসার ভঙ্গিমায় আছেন, শুধু তাদেরই ছবি তোলা সম্ভব। বাকিদের উঠে বসতে হবে, তাকাতে হবে- যা করানো সত্যিকার অর্থেই অমানবিক। এবং আমি তা কখনোই করবো না। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে আমি ছবি তোলা শুরু করি। যাদের ছবি তোলা হয়েছে, তাদের পেছনে কালো কাপড়টা ধরে ছবিগুলো তুলি আমি। একটি মানুষকে, (দিস ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট), এক সেন্টিমিটার, এক মিলিমিটার আমি সরতে বলিনি। একটা মানুষকে এক মুহূর্তের জন্য আমি পোজ দিতে বলিনি। যেটা সংবাদে বার বার করে এসেছে আমাকে প্রচণ্ড অপদস্থ করে যে, আমি মানুষগুলোকে দাঁড় করিয়েছি, বসিয়েছি, এগুলো মোটেই সত্যি নয়।

প্রিয়.কম: দাঁড় করানোর ছবিটা গণমাধ্যমে এসেছে।

সাইফুল ইসলাম অমি: এটার ব্যাখ্যা আমি আপনাকে দিচ্ছি একটু পর। এরপর আমি এই বসে থাকা মানুষগুলোর ছবি তুললাম। এবার যে ছবিটা নিয়ে বিতর্ক, তার ব্যাখ্যায় আসি। এই ভদ্রলোক আমার সামনে বসেছিলেন। এবং তার পেছনেই একটা বেড আছে। একারণে আমি কালো পর্দাটা ধরতে পারবো না এবং তার ছবি আমি নিতে পারবো না। তার ছবি তোলার জন্য তাকে আমার সরতে বলতে হবে। এবং আমার জন্য বিষয়টা এমন না যে, তারই ছবি আমাকে তুলতে হবে। বার্ন পেশেন্ট প্রচুর আছে এবং ১০-১২টা শট নিয়েই আমার গল্পটা আমি বলতে পারতাম। আমার সংখ্যাতত্ত্বের রাজনীতিতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। আমার একটি ছবিই হাজার ছবির গল্প বলতে পারবে। যাই হোক, আমার সামনে (আমি দাঁড়ানো অবস্থায়) ওই মানুষটি হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান। আমার ধারণা, তার শারীরিক অসুবিধা বা কিছু একটা হচ্ছিলো। পরবর্তীতে বিষয়টা নিয়ে আমি বার্ন ভিক্টিমদের সাথে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেন, তাদের সাথে কথা বলি। তারা আমাকে নিশ্চিত করেন, এটা রেগুলার ঘটনা। শারীরিক কষ্টের জন্য মানুষ নানাভাবে মুভ করে। ওই লোকটি দাঁড়ানোর পরও আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি দাঁড়িয়ে খাটের নীচ থেকে একটা সেণ্ডেল খুঁজতে যান। মানবিকতার কারণেই আমি তাকে সাহায্য করতে যাই। এতে তিনি লজ্জা পেয়ে যান। আমাদের মাঝে এখনো এই বিষয়টা কাজ করে। কেউ একজন সেণ্ডেল টেনে দিচ্ছে, তা লজ্জাষ্কর আমাদের কাছে। যাই হোক, এসময় খুব সম্ভবত তার মুখে থুথু জমে। উনি পা দিয়ে বেডের নিচ থেকে একটা পাত্র টেনে তাতে থুথু ফেলেন। থুথু ফেলার পর আমি দেখছিলাম, তিনি বসে পড়েন কি না। বসে পড়লে আমি আর ছবি তুলবো না। তারপরও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এবং হাত তুলে আছেন। উনি বসে থাকা অবস্থায়ও ওই হাত তোলা অবস্থায় ছিলেন। আপনি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন এবং একজন বিখ্যাত সাংবাদিকও আমাকে বলেছেন, তিনিও ওই হাত তোলা অবস্থায়ই ওই লোকের ছবি তুলেছেন। যাই হোক, লোকটা যখন দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমি কিছুক্ষণ পর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? মনে রাখতে হবে, তিনি আমাকে দেখেছেন, আমি ছবি তুলছি অন্যদের এবং অন্য ফটোসংবাদিকদেরও তিনি ছবি তুলতে দেখেছেন। তিনি অনুমতি দিলে আমি আমার সাথের লোককে দেখিয়ে বললাম, উনি কি একটু পেছনে দাঁড়াতে পারবেন আপনার? তিনি সম্মতি জানালে আমার লোক কালো পর্দাটা নিয়ে দাঁড়ায় তার পেছনে এবং আমি ছবিটা তুলি। এবং আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, সবমিলিয়ে দেড় থেকে দুই মিনিটের মাঝেই আমি শ্যুট করি। ছবিটা তোলামাত্র আমার লোক বেরিয়ে আসে। আমি যখন চলে আসি, তখনও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। হয়তো এর পর তিনি বিশ সেকেন্ড, ত্রিশ সেকেন্ড বা পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর এই ছবি তোলার সময় কেউ একজন আমারসহ তার ছবিটা তোলে, যা জঘণ্য মিস লিডিং। জঘণ্য উদ্দেশ্যে এবং সম্পূর্ণ নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তা প্রকাশ করা হয়েছে। এবং এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রিয়.কম: আপনাকে নিয়ে এই ছবিটা তুলেছে কে?

সাইফুল ইসলাম অমি: আমি জানি না কে তুলেছে। কারা আমার ছবি তুলছে, আমি এক সেকেন্ডের জন্যও জানতাম না। কারণ ওখানে বহু মানুষ কাজ করছে এবং এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে, আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি। আপনাকে আমি একটা উল্টো প্রশ্ন করি। ধরেন, আপনি এমন একটা ভয়াবহ জায়গায় গিয়েছেন, যেটা একটা বার্ন ইউনিট। সারা বাংলাদেশের মানুষ যা নিয়ে ভাবছে। সেখানে একজন আলোকচিত্রী, যে কি না এই বিষয়ে তার ছাত্রদের পড়ায়ও, সে কি এতোটা নির্বোধ হতে পারে যে, যে জায়গায় এতো মানুষ, যার ওপর সারা দেশের দৃষ্টি, সেখানে সে উন্মাদ হলেও কি বলবে, এই একটু সরো তো, আমি একটা ছবি তুলি? সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পশু হলেও তা বলবে না। এটা যে করবে, তা করার পর মার খাবে- এবং এটাই সত্য। আমি যখন কাজ শেষ করেছি, তখন সাংবাদিকরা আসলেন, এসে আমার সাথে তর্ক জুড়ে দিলেন। এই প্রসঙ্গে আমি বেশিদূর যেতে চাই না। তারা আমার সাথে খুবই দুর্ব্যবহার করেছেন। আমি তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করি - দেখেন, আমি তো নিউজ ফটোগ্রাফার না। আমি তাদের ছবি তুলেছি তাদের অনুমতি নিয়েই এবং তারা যে যেভাবে আছেন, আমি সেই অবস্থাতেই ছবি তুলেছি। কাউকে এক চুল নড়তে বলিনি। আপনাদের সাথে আমার শুধু তফাৎ, আমি ছবি তোলা মানুষটার পেছনে একটা কালো পর্দা জুড়েছি। এছাড়া আর কোনো তফাৎ নেই। বরং আপনার সাথে এই তফাৎ থাকতে পারে, আমি সবার অনুমতি নিয়েছি। আমি কয়েকটা পোর্ট্রেট করে ভাই চলে যাবো। তারপর সাংবাদিকরা আমার সাথে উত্তেজিত হয়ে উঠেন। সেই উত্তেজনা দেখানোর সময় আমার মনে হয়েছে, রোগীদের শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে এবং আমি এখানে উত্তেজনা দেখাতে আসিনি। আর তাছাড়া এই ছবি তোলা আমার ব্যবসা না। এখানে আমার কোনো লেনাদেনা নেই। আমি বিবেকের তাড়নায় গিয়েছিলাম। আমি যেহেতু সারাজীবন পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স শ্যুট করেছি, বাংলাদেশের এই নির্মম পরিস্থিতিতে এটা শ্যুট করা আমার দায়। সেই দায়ের থেকে এসেছি এবং এখানে ঝগড়া করার কিছু নেই। তারপর আমি বেরিয়ে চলে আসি। এবং তারপর থেকে মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। আপনারা জানেন, বাংলাদেশের মিডিয়ায় নানারকম ভাগ-বাটোয়ারা, দলাবাজি, নোংরামি বহু কিছু আছে। আমি কখনোই এর পার্ট ছিলাম না। এবারের ঘটনা শুধুই আমি এবং আমার বন্ধুরা যে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল পরিচালনা করি, সেই স্কুলকে রুখে দিতেই এই ধরণের কার্যকলাপ করা হয়েছে। আপনি জানেন, গত দু’বছরে আমরা ছয়শ’র ওপরে ছাত্র পড়িয়েছি। আমাদের ছাত্ররা তেইশটির ওপর আন্তর্জাতিক পুরষ্কার জিতেছে। সারা পৃথিবী আমাদের কাজকে স্বাগত জানাচ্ছে। সমস্ত বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের চুক্তিস্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে পড়াই। আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার মাঝে আছি। এই প্রতিষ্ঠানটাকে শেষ করে দিতেই, আমাকে রুখে দিতেই এমন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে যারা করেছেন, সাংবাদিকরা, আমি খুবই শ্রদ্ধাভরে বলছি, তারা খুবই আবেগ তাড়িত হয়েই কাজটা করেছেন বলে আমার ধারণা। তাদের সকলেরই আবেগ বুঝতে হবে। যেমন রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করি আমি পাঁচ বছর ধরে। কোনো একটা মানুষকে আমি যখন রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে খারাপ প্রতিবেদন করতে দেখি, আমি খুবই ক্ষেপে যাই। আমার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই প্রতিবেদন যারা দেখেছে, তারা সবাই ভেবেছে- আমি খুবই অসভ্য। এই ছবিটা যারা দেখেছে, তারাও বিশ্বাস করেছে- আমি এতোদিন ধরে এইসবই করে বেড়িয়েছি। তাদের আবেগকে আমি শ্রদ্ধা করি। তবে আমি মনে করি, সাংবাদিক হিসেবে তাদের অনেক দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিলো। আরো ইনভেস্টিগেট করা উচিত ছিলো। সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হল- ক্রস চেক করা। আপনি যা শুনেছেন, তা অপরপক্ষ থেকেও ক্রস ম্যাচ করে নেওয়া। সত্য যাচাইয়ের বাইরে সাংবাদিকতার কোনো মূল্য নাই। তাহলে সেটা হবে প্রোপাগান্ডা। সেটা হবে নোংরামি। এই কাজ পলিটিক্যাল পার্টি করতে পারে, এটা সাংবাদিকরা পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আপনি জানেন, ফেসবুক এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে গণজাগরণ মঞ্চ এবং তৎপরবর্তী সময়ে মানুষের নৈতিক চরিত্র নিয়ে টানাটানি এবং তার চৌদ্দ পুরুষ নিয়ে যা খুশি তা বলার প্রচলন চলছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অসীম ক্ষমতা এবং শক্তির পাশাপাশি খারাপ দিকও আছে একটা। যেদেশে চাঁদে মানুষ দেখা যায়, সেই দেশে সতর্ক না হয়ে কোনো উপায় নেই। সোশ��যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এখানে দায়বদ্ধতা নাই। ফেসবুকের চাপ এখন যেকোনো টেলিভিশন বা পত্রিকার চেয়েও বেশি। আপনি দেখবেন, বড় ধরণের রাজনীতকরা এখানে বিবৃতি দেন এবং তা পরদিন পত্রিকার লিডনিউজও হয়। কারণ ফেসবুক এখন জনগণের নার্ভ-সেন্টারে পরিণত হয়েছে। এই ফেসবুক দিয়েই প্রথমে আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়, তারপর একটা বিশেষ পত্রিকা আমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করে। এবং এরপর ওই পত্রিকার চাপে পড়ে অন্যরাও প্রতিবেদন ছাপে। এই হচ্ছে মূল ঘটনা।

প্রিয়.কম: ওই জায়গাটায় আরো অনেক সাংবাদিক ছিলেন। তারাও ছবি তুলেছেন। সেই ছবির সাথে আপনার ছবি তারা কেন আলাদা করতে চাইছে?

সাইফুল ইসলাম অমি: এই বিষয়টা নিয়ে তাদের কিন্তু প্রচণ্ড রকম আবেগ আছে। তারা প্রতিদিনই সেখানে যাচ্ছেন, প্রতিদিনেই দেখছেন পরিস্থিতি, তাদের আবেগ থাকাটাই স্বাভাবিক। এখানে বহু মানুষ আছেন, যারা জীবন দিয়ে কাজ করছেন। তবে ফটোগ্রাফি যে হাজার ভাবে হতে পারে, হাজার রকম ভাবে যে কাজ করা যায় এই সেক্টরে, তার জন্য সঠিক শিক্ষা দরকার। মৌলিক যে প্রশ্ন, এই কাজ করতে গিয়ে আমি কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘণ করেছি কি না? তা কিন্তু আমি করিনি। তারা যে মনে করলেন, একটা কালো পর্দা নিয়ে যাওয়া অন্যায় হয়েছে, সেটা আসলেই খুব দুঃখজনক। কারণ তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের কাজের সাথে আমার কাজের নূন্যতম কোনো দূরত্ব নেই। ব্যক্তি ভিন্নতার কারণেই তাদের সাথে আমার কাজের ভিন্নতা। এছাড়া আর কিছু নয়। তারা বিষয়টা বুঝতে পারলে হয়তো এমনটা আর করতেন না। কিন্তু একজন বিশেষ মানুষ ধরেই নিলেন এবং আমাকে আক্রমণ করে বললেন, এটা নিউজ ফটোগ্রাফি না। তার মাথায় আসলে আসেইনি, নিউজ ফটোগ্রাফির বাইরেও একটা বিশাল পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবী সম্পর্কে তিনি কোনো খবরই জানেন না। সারা পৃথিবীতে কত ধরণের আলোকচিত্রি আছেন, কত রকমভাবে তারা কাজ করেন, তার খবর তিনি জানেনই না।

প্রিয়.কম: ওখানে উপস্থিত ফটোগ্রাফাররাও তো ছবি নিয়েছে। এখন…

সাইফুল ইসলাম অমি: বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি নিয়ে বড় রকমের একটা তর্ক আছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ডের সময় পরিষ্কারভাবে অভিযোগ এসেছে, তারা তাকে দেখিয়ে দিয়েছে। আজ প্রকাশিত সত্য, বাস পোড়ানোর আগে, ককটেল ফাটার আগে ফটোসাংবাদিকদের কাছে ফোন আসে। তারা ফোন পেয়ে সেখোনে চুটে যায় এবং তারপর কাজগুলো করে। তাদেরকে আপনি যখনই জিজ্ঞেস করবেন, আপনি ফোন পেয়ে কেন পুলিশকে বলেননি। তিনি উত্তর করবেন, আমি আমার সোর্স ডিসক্লোজ করবো না। তার মানে মানুষের হত্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আপনার ছবি? আজ আমাকে অমানবিক বলা হচ্ছে, অথচ যে পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিক, কর্মীরা চলমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে সামান্য একটা কালো কাপড় নিয়ে শ্যুট করার জন্য আমাকে অমানবিক বলছে, তাদের মানসিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ।
বায়ে: কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাইফুল হকের তোলা ছবি। ডানে: যেভাবে তিনি ওই ছবিটি তুলছিলেন।
বায়ে: একটি মর্মান্তিক ছবি। ডানে: ছবিটি আসলে যেভাবে তোলা হয়েছিল।

প্রিয়.কম: প্রতিদিনই তো এধরণের ছবি ছাপা হচ্ছে। তাহলে আপনার ছবি নিয়ে বিতর্ক কেন?

সাইফুল ইসলাম অমি: আমার মনে হয়, ফেসবুক যেমন আমাদের বিচরণের জায়গা, সেই ফেসবুকই সবার দুঃখ-হতাশা প্রকাশের জায়গা। আজ বাংলাদেশের মানুষ দোযখের আগুনে পুড়ছে। বার্ন ইউনিট হয়ে গেছে মানুষের আত্মার জায়গা। তাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতি আমি সম্মান জানাই। তবে তারা শালীন ভাষা ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু যতো নোংরা ভাষায় বলা যায়, ফেসবুকে তারা মন্তব্য করেছে। কিন্তু একটা সংবাদপত্রের কি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত না? সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় অবস্থান হতে পারে, যাচাই করে নেওয়া। কিন্তু কোনো যাচাই না করেই আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হচ্ছে। দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য একজনকে এভাবে অপদস্থ করা ঠিক না। একজন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, একজন নোবেলজয়ী সম্পর্কে যথপোযুক্ত সম্মান দিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্ত তা আমাদের দেশে নেই। সেই তূলনায় আমি তো তাদের পায়ের ধুলোও নই। তাহলে আপনি কীভাবে প্রত্যাশা করেন, এই মানুষগুলো এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে না? আপনি দেখবেন, পৃথিবীর যেসব দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, সেখানেই মানুষের মনে কীভাবে গণতন্ত্রিকতা ধাক্কা খেয়েছে! আমরা যেহেতু দলাদলির মধ্যে থাকতে থাকতে সাদা আর কালোর বাইরে কিছু দেখি না। দুঃখজনকভাবে আমাদের ফটোগ্রাফাররাও এর ভিক্টিম হয়ে গেছে। আর তাদের মনের এই অচলাবস্থা ভাঙ্গার একটাই রাস্তা। ফটোগ্রাফি সম্পর্কে আরো পড়ালেখা করে আরো জানার চেষ্টা করা। তাদের মূল ক্ষোভের জায়গাই হচ্ছে এক টুকরো কালো কাপড়। আর এটাই যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে আমি ক্ষমা চাইতে রাজি আছি। তবে গত ৪০-৪২ বছরে তারা যতো হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার জন্যও ক্ষমা চাইতে হবে। আমরা অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারবো, পুলিশকে তারা বলেছেন, আরেকটু মারেন ছবিটা নেই; সন্ত্রাসীকে বলেছেন, ককটেল আরো দুইটা মারেন, ছবি নেই; তোবা গার্মেন্টে ঢুকে তারা বলেছেন, একটু পিটিয়ে দেন, কতক্ষণ আর থাকবো, ছবি তুলে বাড়ি যাই- এমন শত শত উদাহরণ আছে। এই উদাহরণ টানলে তারাই ছোট হবেন, কারণ আমি নিউজ ফটোগ্রাফার নই। আমি বলছি, এই পরিস্থিতিতে পরস্পরকে দোষারোপ না করে কনফেস করা উচিত। তাদের উচিত ছিলো, অভিযুক্তের কাছ থেকে একটিবার অন্তত তার বয়ান শোনা। বাংলাদেশের একটি পত্রিকাও প্রথম যেদিন প্রতিবেদন ছেপেছে, তার আগে আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। শুধুমাত্র পরের দিন যখন ফলোআপ নিউজ এসেছে, তখন কথা বলেছে। প্রথম আলো থেকে কেউ কথা বলেনি, যদিও তারা রিপোর্ট করেছেন; বিবিসি’র থেকেই শুধুমাত্র আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন কিংবা প্রিয় বা অন্যান্যরা যা ছাপিয়েছে, এর থেকে মিথ্যাচার আর কিছু কি হতে পারে? বলা হয়েছে, আমি ১০-১২ জনের দল নিয়ে নাটকের শ্যুটিং করার মতো করে শ্যুট করতে গেছি। আপনি আমাকে বলেন, কোন বিবেচনায় এগল্প ফাঁদা হতে পারে? এমন পত্রিকার কাছে এই দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিশু পর্যন্ত কাকে নিরাপদ বলবো আমি? এরা যেকোনো মানুষকে যেকোনো মুহূর্তে বিতর্কিত করে দিতে পারে। শুধুমাত্র তাদের খায়েশ এবং এডিটরিয়াল পলিসির কারণে এসব তারা করে। এর থেকে জঘণ্য আর কি হতে পারে? আজকে যদি সংবাদপত্র না থাকতো, গণতন্ত্র যতোটুকু আছে, ততটুকুও থাকতো না। তাহলে কি তাদের বোঝা উচিত না, তাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত? মানুষের শেষ ভরসার স্থল গণমাধ্যম, যা থাকলে আজ বাংলাদেশ কোথায় চলে যেতো কেউ বলতে পারে না। তারা যে অন্যায় আমার সাথে করেছেন, তা মোটেই ঠিক নয়। যে ছবি ছাপানো হয়েছে, তা একশ’বার ছাপাতে পারেন কিন্তু তার আগে আমার বক্তব্য নেওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তা তারা করেননি। ঢাকা ট্রিবিউন দাবি করেছে, আমার সাথে কথা বলেছে। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছি, তাদের কারোর সাথেই পরের দিন সাড়ে এগারোটার আগ পর্যন্ত আমার একটা কথাও হয়নি। আমি তাদের কারোর সঙ্গেই কথা বলিনি। এটা কোন মানের সাংবাদিকতা?

প্রিয়.কম: বড় পত্রিকাগুলো কে কি করেছে?

সাইফুল ইসলামি অমি: ডেইলি স্টার তো ছাপানোর পরও যোগাযোগ করেনি। ঘটনা ৮ তারিখের। আজ ১০ তারিখ। তিনদিনের মাথায় এসে তারা আজকে বিকেল বেলা ফোন করেছে। প্রথম আলোরও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। ঢাকা ট্রিবিউন তো জিজ্ঞেস করেইনি, বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং প্রিয়.কমও করেনি। বাংলাদেশ প্রতিদিনে পরদিন যখন প্রতিবাদ পাঠিয়েছি, তারা সম্পাদকীয়তে একই কথা জুড়ে দিয়েছে।

প্রিয়.কম: পাঠকদের জন্য আপনার কোনো মেসেজ আছে কি না?

সাইফুল ইসলাম অমি: পাঠকের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, যেকোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আমি অসুবিধাজনক বলে মনে করি। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘণ বলে মনে করি। আমার এই ছবি তোলার জন্য যদি জীবন দিতে হয়, আমি তবু তুলবো। আমি এক মুহূর্তের জন্য কোনো অন্যায় করিনি। সেখানে আমি রোগীদের চিকিৎসায় যেমন ব্যঘাত ঘটাইনি, একইভাবে তাদের কাউকে নড়ে চড়েও বসতে বলিনি ছবি তোলার স্বার্থে। তারা যে যেভাবে ছিলেন, আমি সেভাবেই শ্যুট করেছি। ফোটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো- এটি দিয়ে দেখে বুঝে নিতে হয়। পড়ার কিছু থাকে না। এটি যেমন সত্য বলে, তেমনই মিথ্যা বলে। তারই একটা ক্লাসিক উদাহরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। আমি জানি, আরো বহু বছর বহু জায়গায় আমার এই বিষয়টা সমালোচিত হবে। ফটোগ্রাফির যে এথিক্যাল কোয়েশ্চেন নিয়ে গত একশ’ দেড়শ’ বছর আলোচিত হচ্ছে, যা আমি নিজে পড়াই, তারই একটা উদাহরণে পরিণত হয়েছি আজ। পাঠকের কাছে আমার মেসেজ হচ্ছে- এই ঘটনায় আমার একশ’ ভাগ শততা থাকা সত্ত্বেও আপনি কষ্ট পেয়ে থাকতে পারেন। আমি সে কষ্ট দিতে চাইনি। সেই সাথে বলতে চাই, যারা এই অপপ্রচারের সাথে যুক্ত, তাদের ব্যাপারে পাঠককে সতর্ক হতে হবে। এবং আরো বলতে চাই, আপনারা যেন দ্বিতীয়বার ভাবেন। আপনারা যেন এমন কারোর কথা বিশ্বাস না করেন, যিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা বলেন। আমি প্রত্যাশা করবো, মানুষ যেন নিজের বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে চিন্তা করে সিদ্ধান্তে আসেন। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি লেকচার দিতে গিয়েছিলাম। আমাদের সামনে দুই-আড়াইশ’ ছাত্র বসে। তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তোমাদের মাঝে বিবিসি-সিএনএনকে কয়জন বিশ্বাস করো। মাত্র দু’জন হাত তুলেছিলো। এটাই কিন্তু শিক্ষার মান। আমি বিবিসি-সিএনএসকে অসম্মান করছি না। কিন্তু উন্নত দেশের মানুষগুলো ক্রস চেক করে। সিএনএন একটা কথা বললে, বিবিসি সেই বিষয়ে কি বলেছে, তা তারা জানতে চায়। আমাদের পাঠকদেরও এই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আমাদের চাঁদে মানুষ দেখা বন্ধ করতে হবে। চাঁদে মানুষ দেখা বন্ধ করতে না পারলে আমাদের সামনে বাড়ার কোনো পথ নাই। সামনে বাড়তে হলে আমাদের শিক্ষিত হয়ে ওঠা ছাড়া, বিবেকবান হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নাই। সর্বশেষে বলছি, আমাদের নৈতিক চরিত্র নিয়ে টানাহেঁচড়া করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রিয়.কম: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য সাইফুল ইসলাম অমি, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার সাথে যোগাযোগ না করে ওই ছবিটি প্রকাশ করায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। এবং আমরা বিশ্বাস করি, আপনার অবস্থান পরিষ্কার করার অধিকার আপনার রয়েছে। সাইফুল ইসলাম অমি: আমাকেও আমার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ।

সম্পাদকীয় নোট:

আমরা পৃথিবীতে যতো ভালো ছবি দেখি, তার পেছনের গল্পগুলো সবসময় ততটা ভালো নাও হতে পারে। রানা প্লাজার ছবি তুলে আমাদের যে চিত্রশিল্পী পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছেন, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি - তিনিই ভালো জানেন সেই দিনের ছবি তুলতে গিয়ে তাকে কতটা মানসিক কষ্টে পড়তে হয়েছিল। যুদ্ধের ছবি তুলতে গেলে, সেই ফটোগ্রাফার জীবনে ঝুকি নিয়ে যখন আহত মানুষের ছবি তুলছেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো ক্যামেরা ফেলে যুদ্ধাহত মানুষের মুখে পানি তুলে দেন। সেই ছবি আমরা দেখি না। আমরা দেখি, তাদের কষ্টে তোলা ঝকমকে সুন্দর ছবি, মৃতপ্রায় মানুষের ছবি, মৃত মানুষের ছবি, আগুনে ঝলসে যাওয়া শরিরের ছবি - বিভৎস ছবি। একজন চিত্রশিল্পীকে হয়তো প্রতিনিয়ত এই ব্যালেন্সটুকু করেই কাজটি করতে হয়, যা আমাদের অন্য প্রফেশনের মানুষকে করতে হয় না। তাই আমরা হয়তো একেক জন একেকভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করি। এবং মানুষ আরেকজন মানুষের কষ্টে ব্যথিত হবে, আবেগে আন্দোলিত হবে - এটাই স্বাভাবিক। আমাদের আবেদন শুধু এটুকুই - কাউকে যেন ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করা না হয়, কারো চরিত্রহননের চেস্টা যেন না হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে এমনিতেই কাজ করার ক্ষেত্র খুব সীমিত। আমরা সবাই মিলে যদি চরিত্রহননের কাজে নেমে পড়ি, তাহলে আমরা আর দাড়াবো কোথায়?

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...