ছবি সংগৃহীত

দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস: মলয় রায়চৌধুরী

তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। 'প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার' কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি ।

গোলাম রাব্বানী
ফিচার এডিটর
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০১৫, ১২:৫৩ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৮, ১৯:২০


ছবি সংগৃহীত

ছবি: সংগ্রহ

(প্রিয়.কম) মলয় রায়চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। হাংরি আন্দোলনের অন্যতম সদস্য তিনি। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি.দে মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন বিষয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের জন্য পিএচ.ডি. সন্মান দ্বারা ভূষিত হয়েছেন । ২০১৩ সালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক রিমা ভট্টাচার্য । ১৯৯৭ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক উদয়নারায়ণ বর্মা । আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে মলয় রায়চৌধুরী এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। 'প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার' কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। শয়তানের মুখ, জখম, ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস,নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র,কৌণপের লুচিমাংস অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি । কলকাতার এই কবি তার কবিতা, হাংরি আন্দোলন, বর্তমান ব্যস্ততা এবং দুই বাংলার সাহিত্য বিষয়ে কথা বলেছেন প্রিয়.কমের ফিচার সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে...

প্রিয় : কেমন আছেন ?
মলয় : শরীরের দিক থেকে বলতে গেলে বলব, ভালো নেই । দুবার হার্ট অ্যাটাক, তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি, একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি, তা সত্ত্বেও আবার হার্ট অ্যাটাক, হাঁপানি, আঙুলের আরথ্রাইটিস, আচমকা অজ্ঞান হবার রোগ সিনকোপি, প্রস্টেট, হার্নিয়া, ডান হাঁটুতে বাত, দুই পায়ে ভ্যারিকোজ ভেইনস ইত্যাদি । তবে মনের দিক থেকে খুবই ভালো আছি ; প্রচুর ভাবনা মগজে এসে জড়ো হয়, তরুণরা লেখা চান কিন্তু আঙুলের আথ্রাইটিসের কারণে এক আঙুলে কম্পিউটারে যতোটুকু পারি লিখি । চারটে কাব্যনাট্য আর পাঁচটা উপন্যাস তো এক আঙুলেই কম্পিউটারে লিখেছি । তবে প্রবন্ধ আর বিশেষ লিখতে পারি না , মানে ভালো লাগে না লিখতে, প্রকাশকও পাওয়া যায় না।
প্রিয় : এখন সময় কাটান কি করে ? লেখালিখিই তো করছেন নিয়মিত ?
মলয়: ঘুম থেকে উঠে গ্রিন-টি খেয়ে, সামনের চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে রকিং চেয়ারে বসে চিন্তা করতে ভালো লাগে আমার; পরে সেগুলো কবিতা বা উপন্যাসে চালান করি। ক্রেয়ন আর কালার পেনসিল কিনেছি, মাঝেমধ্যে যা ইচ্ছে হয় ডুডলিং করি, আরথ্রাইটিস সত্ত্বেও । ওটস খাবার পর দুপুর বেলায় দশটা থেকে একটা পর্যন্ত কম্পিউটারে লিখি, রিভাইজ করি । দুপুরে খেয়ে-দেয়ে ঘুমোই । সন্ধ্যায় ফেসবুকের  তরুণী পাঠিকা আর আঁকিয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করি, তাঁরাই, সৌভাগ্যবশত, সংখ্যায় বেশি। কোনো-কোনো দিন বিদেশে বসবাসকারী নাতনিদের সঙ্গে স্কাইপে গল্প করি । সাড়ে-আটটা নাগাদ আবার চেয়ারে ঠ্যাং তুলে দিয়ে খাওয়া এবং চিন্তা । মদ আর বিশেষ খাই না, কেননা আমি সিঙ্গল মল্ট ছাড়া খাই না, ছেলে বা মেয়ে বিদেশ থেকে আনলে খাই । দশটা বাজলে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় ; ঘুমের ট্যাবলেটে শৈশবের স্বপ্ন বেশি করে আসে। চাকর-চাকরানি রাখা আমার পছন্দ নয়, তাই আমি আর স্ত্রী ভাগাভাগি করে চালিয়ে দিচ্ছি।
প্রিয় : আপনি তো এখন দিল্লিতে থাকেন ?
মলয় : না, আমি ২০০৯ সাল থেকে মুম্বাইয়ের শহরতলি কানডিভালিতে গুজরাটি পাড়ায় একরুমের ফ্ল্যাটে স্ত্রীর সঙ্গে থাকি, প্রধানত চিকিৎসার সুবিধার জন্য। কোনো বাংলা সংবাদপত্র বা পত্রিকা পাওয়া যায় না এ-পাড়ায়। নাকতলার ফ্ল্যাট বিক্রির পর যতো বইপত্র কলকাতায় ছিল সব বিলি করে দিয়েছিলুম ; এখন আর বইপত্র সংগ্রহ করি না, পড়া হয়ে গেলে বিলিয়ে দিই, মানে আমার কোনো ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার নেই । তাই একরুমের ফ্ল্যাটে অসুবিধা হয় না । বইয়ের ধুলোর কারণে হাঁপানি বেড়ে যায় ।


প্রিয় : আপনাদের হাংরি আন্দোলনের যাঁরা এখনও জীবিত, তাঁদের সঙ্গে কি নিয়মিত যোগাযোগ হয় ?
মলয় : হ্যাঁ, কলকাতা নিবাসী সুবিমল বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, রবীন্দ্র গুহ, সুবো আচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ আছে । ত্রিপুরার রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফা, রত্নময় দে, অরূপ দত্তের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে । সকলেই তো প্রায় মারা গেছেন ; উৎপলকুমার বসুও এই সেদিন মারা গেলেন । হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সকলের গদ্যপদ্য নিয়ে একটা সংকলন বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি, কাউকে বাদ দেয়া হবে না । দেখি প্রকাশক পাওয়া যায় কিনা ; সমস্যা হল হাংরি আন্দোলন শুনলে চুনোপুঁটিরাও সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করে দ্যায় ।
প্রিয় : ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আপনি, এবং ৩৫ মাস ব্যাপী কোর্ট কেস চলে। কলকাতার নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণা হলেও ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে অভিযোগ মুক্ত হন । এত কিছু হয়ে গেল একটি কবিতার জন্য । আমি এই কবিতার জন্মকথা জানতে চাই । কখন, কীভাবে, মাথায় আসে আইডিয়াটা ?
মলয় : হ্যাঁ, এই কবিতাটির জন্য আমাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে সাতজন ডাকাত আর খুনির সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ কেবল অশ্লীলতার ( ধারা ২৯২ ) ছিল না, সাবভার্সানেরও ( ধারা ১২০বি ) ছিল । প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সেরকমটাই নির্দেশ ছিল আমাকে হিউমিলিয়েট করার । কবিতাটিতে আমার নিরীক্ষার আগ্রহে যে ব্যাপারগুলো এই পাঠকৃতি তৈরি করার সময়ে ছিল, তার মধ্যে প্রধান দুটি হল দীর্ঘ কবিতার কাঠামোয় স্পিড বা দ্রুতি আনা, এবং তাকে চিৎকার-নির্ভর করা । এই দুটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা কবিতায় তার আগে, বোধহয় পরেও, বিশেষ কাজ হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল পাঠবস্তুকে ইলেকট্রিফাইং করে তোলা, এবং পাঠককে দ্রুতির তুমূল বৈদ্যুতিক প্রবাহে আটক রাখা, যা থেকে সে ছাড়াবার চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না । ‘ছুতার’ দ্যোতকটি শিল্পবিরোধিতার জন্য ব্যবহৃত। কবিতাটিতে চিৎকারের খেলা বজায় রাখার জন্য অভিব্যক্তিকে শ্বাসপংক্তিতে সংকুচিত ও প্রসারিত করেছিলুম । শেষ তিনটি পংক্তিতে ধাতস্হ করেছি শ্বাসকে, আর স্তিমিত করেছি চিৎকারকে। অর্থাৎ অভিব্যক্তির বিনির্মাণ, কবিতায় বুর্জোয়া অহংবোধের সমাপ্তি, এবং লিখিত শব্দকে ছাপিয়ে যাবার প্রয়াস, হাংরি আন্দোলনের সময়ে যে নিরীক্ষাগুলো করতুম, তা এই কবিতায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলুম। তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত গড়ে-ওঠা পাতি-বুর্জোয়া চেতনার মডেলটি আমি বদলে ফেলতে চেয়েছিলুম আমূল । বাংলা কবিতাকে যে সেন্টিমেন্টাল নার্সিসিজম পেয়ে বসেছিল তখন, তাকে জলাঞ্জলি দিতে চেয়েছিলুম । কবিতার ঐতিহাসিকতাকে এভাবে বিপর্যস্ত করা মনে হয়েছিল শ্রেয় । প্রেম এই কবিতার স্ট্র্যাটেজি, কেন্দ্র নয়, বস্তুত কবিতাটির কোনো কেন্দ্র নেই । না আছে স্বীকৃত আঙ্গিক বা বিষয় বা থিম বা বক্তব্য বা ছন্দ বা প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক । মেইনস্ট্রিম বাংলা কবিতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এর প্রান্তিক অবস্হান নির্ধারিত করতে চেয়েছিলুম আমার শৈশবে পাওয়া ইমলিতলা পাড়ার মাগধি ও ভোজপুরি ইথসের সাহায্যে । তখনকার সাহিত্যিকরা এই অ-বাঙালি ইথসকে বরদাস্ত করতে পারেননি । তাঁরা তখন হয় ইউরোপ বা সোভিয়েত দেশের দাপটে পীড়িত ছিলেন । কবিতাটিতে এভাবে ঔপনিবেশিক ও উত্তরঔপনিবেশিক সংঘাতক্ষেত্রটিকে গড়তে চেয়েছিলুম --- মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির সংঘাত । প্রতিষ্ঠিত বাইনারি-বৈপরীত্যগুলোকে, ছয়ের দশকের পূর্বেকার বাংলা কবিতা যা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকত, অর্থাৎ ভালো/খারাপ, প্রেম/ঘৃণা, সু/কু, শ্লীল/অশ্লীল, পুরুষ/প্রকৃতি, মিতকথন/অতিকথন, শরীর/মন, শুরু/শেষ, আমি/তুমি, সুন্দর/কুৎসিত ইত্যাদি, সেই দেয়ালকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলুম । ভণ্ডুল করার জন্য প্রয়োগ করেছিলুম যৌনতা আর অন্তর্ভাবাত্মক স্বরধ্বনি । সেসময়ে কবিতায় এভাবে সঘোষ অব্যয় প্রয়োগ অকল্পনীয় ছিল, অস্বাভাবিক ছিল । কবিতাকে শাসন করার বিদ্যায়তনিক অনুশাসনকে ছত্রভঙ্গ করেছি প্রসৃত অব্যয় প্রয়োগে, এবং বিদ্যায়তনিক মানদণ্ডকে বেদখল করে দেবার চেষ্টা করেছি ঐক্য, রৈখিকতা, আদল, আদরা আর আনুমানিক মর্মার্থের মূল্যবোধসমূহের মসনদ থেকে । আবেগ যেহেতু একটি ট্র্যান্সগ্রেসিভ উপাদান, তাকে বারংবার, হাপরের মতন, ব্যবহার করেছিলুম লেখাটাতে । আমার কাছে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ছিল একটি অফুরন্ত আহ্লাদের বহুমাত্রিক প্রোজেক্ট । আর, আমার কবিতার কোনো কন্সটিটুয়েন্সি তখন আদপেই ছিল না । বাকধারা নিয়ে খেলবার অফুরন্ত এলাকা ছিল । খেলেওছি । তা টের পাওয়া যাবে রচনাটির নিজস্ব স্পিড বা দ্রুতি থেকে । কবির দ্রোহ নয়, কবিতার দ্রোহ ব্যক্ত করতে চেয়েছে পাঠবস্তুটি ।
‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এ “আমি” ব্যাপারটিকে অজস্র জিজ্ঞাসা দ্বারা বিগঠিত করতে চেয়েছিলুম । রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, তিন থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত কবিতায়, “আমি” ছিল স্বয়ংসিদ্ধ, সবজান্তা, প্রমাণিত সত্য । তাই “আমি” প্রতিপাদিত জ্ঞানকে মনে করা হতো অকাট্য । অথচ অকাট্য ও বিশুদ্ধ জ্ঞান বলে তো কিছুই নেই । আমি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার ডিসকোর্সকে একযোগে নান্দনিক সন্ত্রাস ও ভাষার সন্ত্রাস হিসেবে রূপায়িত করতে চেয়েছিলুম । কবিতাটিতে “আমি” প্রান্তিক ও সাবভারসিভ, এবং সেকারণে রাজনৈতিক । ১৯৬৩ সালে কবিতাটা লিখতে আমার তিন মাসের মতন লেগেছিল, প্রচুর রিভাইজ করেছিলুম । পাণ্ডুলিপি আর ফেরত পাওয়া যায়নি লালবাজার থেকে ।
প্রিয়: শিল্পে কোনটা শ্লীল মনে হয় আপনার কাছে আর কোনটাকে অশ্লীল বলবেন ?
মলয় : শ্লীল আর অশ্লীল এই যুগ্মবৈপরীত্য বা বাইনারি অপোজিটের মাপকাঠি এনেছিল ইভানজেলিস্ট খ্রিস্টানরা । তার আগে মাপকাঠি ছিল আমাদের রসশাস্ত্র ; তাতে কোথাও শ্লীল-অশ্লীলের বিভাজনের কথা নেই । বস্তুত আদিরসই তো যৌনতা, অথচ শ্রীরামপুরের পাদরিরা তাকে নাকচ করে দিয়ে জেমস লং আর ম্যাকলের মাধ্যমে ভিকটোরীয় মূল্যবোধ চাপিয়ে দিল । ইসলামি শাসকরাও এই বিভাজন চাপায়নি । যুগ্মবৈপরীত্যের মানদণ্ড থাকলে বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস, খাজুরাহো, কোণারক, পুরীর মন্দিরের কাজ, অজন্তা-ইলোরা, মীনাক্ষী মন্দির হতো না । মনসামঙ্গল, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বাৎসায়নের কামসূত্র লেখা হতো না ; এখানে বলে রাখি, কামসূত্রে বলা আছে স্বমেহন কী ভাবে করা উচিত। বর্তমান ভারতে টিকিয়াল আর দাড়িয়াল প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটিগুলো আবার নতুন করে ভিকটোরীয় মানদণ্ড চাপিয়ে দিচ্ছে ; এ থেকে বেরোনো কঠিন। সংস্কৃত সাহিত্যের বাহাত্তরটা অলঙ্কারগুলো ছিল পুরুষের অলঙ্কার ; কবিতাকে নারী বানিয়ে ফেলার পর সংস্কৃত অলঙ্কার সাহিত্য থেকে লোপাট হয়ে গেছে । মোগল সম্রাটরাও এদেশে এসে অলঙ্কার পরা আরম্ভ করেছিলেন। এখন সবই ইউরোপের দেয়া। শ্লীল/অশ্লীলের নির্ণায়ক এখন প্রতিষ্ঠানের টিকিয়াল আর দাড়িয়াল মৌলবাদীরা ।
প্রিয়: ঐ মামলায় আপনার পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিৎ দত্ত । আর বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । যারা আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁরা কি ঠিক ছিলেন ? তাঁদের মধ্যে আর পুলিশের মধ্যে তাহলে পার্থক্য কোথায় ? তাঁদের কি শিল্পী বলা যায় ?
মলয় : কি বলব বলো ? পবিত্র বল্লভকে আমি চিনতুমই না ; কুঁজো লোকটা ছিল পুলিশের ইনফরমার, কফিহাউস থেকে হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন লিফলেট পত্রপত্রিকা নিয়ে গিয়ে জমা দিত লালবাজারে । শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে বলা যায় পিঠে ছুরি মারা বিশ্বাসঘাতক । ওরা দুজনেও গ্রেপ্তার হয়েছিল ; মামলা থেকে রেহাই পাবার জন্য আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করার মুচলেকা লিখে দিলে, আমাকে যখন চার্জশিট দেয়া হল তখন ওদের ঘৃণ্য রূপ বেরিয়ে এলো । ওরা দুজনে  মিলে সারাজীবন আমার বিরুদ্ধে অবিরাম লিখে-লিখে নিজেদের গিল্টি-ফিলিং থেকে ছাড়া পাবার চেষ্টা করে গেছে । ওদের এই দুষ্কর্মে ইন্ধন যোগাতেন শঙ্খ ঘোষ, আমার বিরুদ্ধে যে বই শৈলেশ্বর-সুভাষরা কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকদের থেকে বের করেছে তাও শঙ্খ ঘোষের দৌলতে ; তাতে শঙ্খ ঘোষকেও হাংরি বলে চালানো হয়েছে । এই প্রকাশকরা আমার বই বের করতে চায় না, শঙ্খ ঘোষের দাপটের কারণে । শক্তি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন কেননা ওনার ধারণা ছিল আমি আর দাদা ষড়যন্ত্র করে দাদার শালি শীলার সঙ্গে ওনার বিয়েটা হতে দিইনি । সন্দীপন আর উৎপল কেন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়েছিলেন তা আজও জানতে পারিনি । উৎপল তো বাংলাদেশে গিয়ে খাতিরযত্ন পেতেন,  ওনার ডিগবাজি খাবার কারণ জিগ্যেস করতে পারতে ।


প্রিয় : আপনার কি মনে হয়েছে মামলাটি হওয়ার ফলে ভালোই হয়েছে ? কারণ এতে হাংরি আন্দোলন আলোচিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী ?
মলয় : ওই পঁয়ত্রিশ মাস, যখন মামলাটা চলেছিল, তখন কলকাতায় আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না । চাকরি থেকে সাসপেণ্ড হয়ে  টাকার টানাটানি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, কেসে প্রচুর টাকা দরকার হতো । অনেক সময়ে একবেলা খেয়ে কাটিয়ে দিতে হয়েছে । সুবিমল বসাকের এক স্যাকরা জ্যাঠামশায় ছিলেন, তাঁর দোকানে রাতে শুতুম আর গোসল করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূর পাল্লার ট্রেনে । দিনের পর দিন স্নান হতো না, জামাকাপড় পালটানো হতো না । একবার কমলকুমার মজুমদার কিছু টাকা দিয়েছিলেন, সেই টাকায় জামা-প্যান্ট কিনে পুরোনোগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিলুম । সৌভাগ্যবশত হাইকোর্টের জন্য করুণাশঙ্কর রায় নামে একজন সাহিত্যানুরাগী ব্যারিস্টার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখনকার নামজাদা ক্রিমিনাল  অ্যাডভোকেট মৃগেন সেনের সঙ্গে, যাঁর তখনকার ফিসই ছিল দিনে এক লক্ষ টাকা । তিনি বলেছিলেন, যা পারো দিও । কেস জিতে যাবার পরে চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে যে থোক টাকা পেয়েছিলুম তা ওনাকে দিই । এই স্মৃতির পৃষ্ঠপটে কি করেই বা বলি মামলাটা হয়ে ভালো হয়েছে ? তবে হ্যাঁ, রাজসাক্ষীরা আলোকিত হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার আর টাকাকড়ি পেয়েছে, মনের মতন প্রকাশক পেয়েছে হাংরি আন্দোলন সেসময়ে ততো আলোচিত হয়নি ; এখন বিবিসির সাংবাদিক, স্কটল্যাণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র, আমেরিকার গবেষক, ইতালির গবেষক এসে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, হাংরি আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পর । পিএই্চ ডি আর এম ফিল করছেন ছাত্র-ছাত্রীরা, তাও বছর দশেক হল । মামলার আগেই আমাদের লেখাপত্র ইউরোপ-আমেরিকার এবং ভারতের হিন্দি-উর্দু-মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল, তার কারণ হিন্দির ফণিশ্বরনাথ রেণু আর রামধারী সিং দিনকর আমায় আর দাদাকে শৈশব থেকে চিনতেন ।
প্রিয় : আপনি কি মনে করেন আপনাদের হাংরি আন্দোলন সফল হয়েছিল ? সফল না হলে এটাকে কনটিনিউ করেননি কেন আপনারা ?
মলয় : কনটিনিউ তো হয়েছে । পাকিস্তানি আমলে সংবাদ সেরকমভাবে হয়তো ওই পারে পৌঁছোয়নি ; এখন বাংলাদেশ হবার পর হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সংবাদ পৌঁছোচ্ছে । জীবিতকালে সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত ‘ক্ষুধার্ত খবর’ আর ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করেছে । অরুণেশ ঘোষ প্রকাশ করেছে ‘জিরাফ’ পত্রিকা । অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেছে ‘কনসেনট্রেশান ক্যাম্প’ । রসরাজ নাথ, সেলিম মুস্তফারা এখনও ‘অনার্য সাহিত্য’ প্রকাশ করে চলেছে । প্রদীপ চৌধুরী প্রকাশ করে চলেছে ‘ফুঃ’ এবং ‘স্বকাল’ পত্রিকা । রত্নময় দে প্রকাশ করে চলেছে  ফোল্ডার পত্রিকা । ওনাদের পারস্পরিক সংযোগের অভাবের জন্য তেমন প্রচার করতে পারছেন না বা পারেননি, যেমনটা আমি, সুবিমল বসাক আর দেবী রায় করেছিলুম। যেমনটা ত্রিদিব মিত্র আর আলো মিত্র বুলেটিন বিলি আর পোস্টার মারার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল নিজেদের কাঁধে । তুমি বোধহয় দ্যাখোনি যে ফেসবুকে একদল তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স বিশের কোঠায়,  নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী নামে একটা কমিউনিটি পেজ চালায় । আমি যে-কজনের নাম জানতে পেরেছি তাঁরা হলেন সায়নী সিংহরায়, রাজদীপ দত্ত, রিফাত খান অনীক, সায়ন ঘোষ, অয়ন ঘোষ, অর্ঘ্য দাশগুপ্ত, সুপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, সান্যাল কবীর সিদ্দিকি প্রমুখ । এঁদের কারোর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি এখনও । অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ দশক পরও কনটিনিউ করছে । সফলে যে হয়েছে তার প্রমাণ তো আমাদের পরে পত্রিকাগুলোর নামকরণ ; কেউই আর লিটল ম্যাগাজিনের লালটুশমার্কা নামকরণ করে না । দ্বিতীয়ত আমাদের লেখালিখির বৈশিষ্ট্য পরের প্রজন্মগুলো আত্মসাৎ করে নিতে পেরেছে, যেমন পংক্তির যুক্তিফাটল, যা দেবী রায়ের কবিতার প্রধান গুণ । যেমন রচনার মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-আঙ্গিক, মুক্ত-সমাপ্তি । যেমন অফুরন্ত অর্থময়তা, একক আমির অনুপস্হিতি, সংকরায়ণ, লিমিন্যালিটি, শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ, প্লুরালিজম, রাইজোম প্রয়োগ, বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতাকে সরিয়ে দেয়া, শব্দার্থের ঝুঁকি, ভঙ্গুরতাকে স্বীকৃতি, অনবিচ্ছিন্নতা অভিমুখী, কবিতায় ফ্লাক্স প্রয়োগ, বার্তা বর্জন, পংক্তির ইনটারলিংকিঙের পরিবর্তে ইনটারলকিং ইত্যাদি ।
প্রিয় : আপনারা ছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী । প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে কি ভাবে লেখক-কবি হওয়া সম্ভব ? এখনও অনেক তরুণ কবি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার পক্ষে ?
মলয় : বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বলতে কী বোঝায় জানি না । তবে আঁচ করতে পারি যে ব্লগার খুনের চাপাতিবাজরা প্রতিষ্ঠানের টাকায় চলে । ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায়, প্রতিষ্ঠান মানে নরখাদক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক-ধার্মিক-আর্থিক সিসটেমের নাগপাশ । আনন্দবাজার তো বাংলা সাহিত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভূতকিমাকার করে ফেলেছে । আমাদের পোঁদে তো প্রতিষ্ঠানই লেগেছিল, তারপর ওরা নকশাল খতম শুরু করে দিলে । সিপিএম মসনদে বসে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোপাট আরম্ভ করলে । এখন প্রতিষ্ঠান গেছে তৃণমূলের কব্জায়, তারা মসনদে বসতেই সিপিএমএর চামচাদের অ্যাকাডেমি আর সংস্কৃতির মাথা থেকে লাথিয়ে বের করে নিজেদের মালদের বসিয়ে দিলে । লুমপেনরা চিরকাল শাসকদের সঙ্গে থাকে ; সিপিএমএর লুপমেনরা এখন ভিড়ে গেছে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় । এই ক’দিন আগে বিফ খেয়েছে জিগির তুলে উত্তরপ্রদেশে একজনকে কোতল করা হল । ফিদা হুসেনকে দেশে ফিরতে দেয়া হল না । মহারাষ্ট্রে সনাতন ধর্ম নামে একটা সংস্হা তিনজন বুদ্ধিজীবীকে খুন করিয়ে দিলে । তামিলনাডুতে একজন লেখক বাধ্য হয়ে নিজের বই উইথড্র করে নিলে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরোধিতা লেখকরা না করলে কারা করবে ?


প্রিয় : কেউ-কেউ বলেন, হাংরি আন্দোলনের মূল আদর্শ থেকে আপনি সরে গিয়েছিলেন। একথা কতটা সত্য?
মলয় : কেউ-কেউ নয়, ওসব কথা প্রচার করেছে শৈলেশ্বর ঘোষ-সুভাষ ঘোষ আর তাদের চেলারা । নিজেরা তো মুচলেকা দিয়ে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংস্রব অস্বীকার করেছিল, ভয়ে “হাংরি” শব্দটাই ব্যবহার করতো না, তাই “ক্ষুধার্ত খবর” বা “ক্ষুধার্ত” নামে পত্রিকা বের করত, আর আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করত । আমি ১৯৯৪ সালে কলকাতা ফিরে যখন “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লিখলুম তখন ওদের টনক নড়ল, শঙ্খ ঘোষকে ধরে কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশক দিয়ে “হাংরি” নামে চেলাদের নিয়ে বই বের করল, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নাকচ করা । ওদের বেশির ভাগ চেলা তো ছিলই না হাংরি আন্দোলনে ; আমি তাদের বেশির ভাগকে চিনি না, দেখিনি কখনও । তারা নিজেরাই লিখেছে যে ষাটের দশকের হাংরি ম্যানিফেস্টো তারা পড়েনি। সব ম্যানিফেস্টো তো আমারই লেখা , আমি কেমন করেই বা মূল আদর্শ থেকে সরে যাব । ওরাই গিয়ে সিপিএমে ঢুকলো, মিছিলে ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়ালো, মোড়ের অবরোধে অংশ নিল । সিপিএম তখন ভয়ংকর প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়েছে, যাকে ইচ্ছে কেটে মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, ধর্ষণ করাচ্ছে, খেতের ফসল কাটিয়ে নিচ্ছে, রাস্তায় মানুষের ওপর পেটরল ঢেলে পোড়াচ্ছে । আমি এসবের বিরুদ্ধে প্রচুর লিখেছি, অথচ ওরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে স্পিকটি নট হয়ে বসেছিল । আমি তো অ্যাকাডেমির পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেছি ; সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ আর উৎপলকুমার বসুর মতন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে ল্যাজ নাড়াইনি ।
প্রিয় : আপনাদের আন্দোলনের বিনয় মজুমদার সম্পর্কে মূল্যায়ন শুনতে ইচ্ছে করছে ।
মলয় : আমি মনে করি জীবনানন্দের পর পশ্চিমবাংলায় যে দুজন জলবিভাজক কবি এসেছেন তাঁরা হলেন বিনয় মজুমদার ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় ।
প্রিয় : “আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই”, এটা আপনার কবিতার লাইন । নারী বিশ্বাসঘাতকতা করে, মানলাম । কিন্তু শিল্প কীভাবে বিশ্বাসঘাতক হয়, বিষয়টা যদি পরিষ্কার করেন ।
মলয় : কেন লিখেছিলুম, তা এখন আর মনে নেই । পাণ্ডুলিপি থাকলে আন্দাজ করতে পারতুম । তবে শিল্প ধারণাটায় আমি বিশ্বাস করি না ।
প্রিয় : লেখকের জন্য ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কিন্তু অনেকেরই নিজস্ব ভাষা নেই । নিজস্ব ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে কোন উপাদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন ?
মলয় : বাংলা গদ্য খুব বেশি দিনের নয়, ১৮০০ সনে মথি লিখিত সুসমাচারের আগে বাংলা গদ্য বলতে যা বোঝায় তা ছিল না । তাই ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা উচিত হবে না । ওদের তো ওল্ড টেস্টামেন্টের সময় থেকে, রোম সাম্রাজ্য আর গ্রিসের সময় থেকে গদ্য চলে আসছে । ‘ডন কিওটে’ লেখা হয়েছিল ১৬০৫ সালে, তার কতকাল পরে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড’ লেখা হল ভেবে দ্যাখো । বাংলা ভাষারও তেমন সময় দরকার ; আগামী প্রজন্মে ভাষা নিয়ে কাজ হবে নিশ্চয় । সন্দীপন, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, অজিত রায়, রবীন্দ্র গুহ, সুবিমল বসাক, কমল চক্রবর্তী, আজিজুল হক, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নিজেদের গদ্য তৈরি করেছেন । আমি নিজের গদ্য তৈরি করার দিকে খেয়াল দিইনি, কেননা প্রতিটি উপন্যাসের জন্য কাহিনি অনুযায়ী ভাষা বুনতে চেষ্টা করেছি । দুই বাংলায় ভাষা-নির্মাণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমার্শিয়াল উপন্যাস, মানে পাল্প ফিকশান।
প্রিয় : যদি দুই বাংলার বাংলা সাহিত্য নিয়ে মূল্যায়ন করতে বলা হয়, তাহলে আপনি কী বলবেন ?
মলয় : আমার পড়াশুনা অমন গভীর আর ব্যাপক নয় যে এই বিষয়ে বলার সাহস দেখাব । তবে কবিতায় যে ধরণের কাজ হচ্ছে তাকে আন্তর্জাতিক স্তরের বলতে আমার দ্বিধা নেই ।
প্রিয় : বাংলাদেশের লেখকদের কাদের লেখা আপনার ভালো লাগে ? তরুণদের লেখা পড়েন কি ?
মলয় : হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ আমার পছন্দ । শহীদ কাদরী আর হেলাল হাফিজের কবিতা আমার পছন্দ । তরুণদের লেখা নেটে যা পাই পড়ি । বই আর পত্রিকা তো বিশেষ পাই না ; দুই সরকার ষড়যন্ত্র করে ডাক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে আদানপ্রদান কঠিন হয় ।


প্রিয় : বাংলা সাহিত্য সত্যিকার অর্থে কোন দিকে যাচ্ছে ? আমরা কি উন্নতি করছি, নাকি অবনতির দিকে যাচ্ছি ?
মলয় : নিশ্চয়ই উন্নতি করছি ; কিন্তু তা কমার্শিয়াল লেখালিখির বাইরে, লিটল ম্যাগাজিনের জগতে ।
প্রিয় : আপনাকে ফেসবুকে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ অ্যাকটিভ দেখা যায় । কিন্তু আমি অনেক কবিকেই চিনি যারা ফেসবুক এবং নেট-সংস্কৃতিকে নাক ছিটকায় ! এ বিষয়ে আপনার মতামত কি ?
মলয় : আমি প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে চাই । অনেক কবি এখনও লম্বা দাড়ি, কাঁধে ঝোলা, খাদির পাঞ্জাবিতে পুকুর পাড়ে আটক । যাঁরা নাক ছিটকান তাঁরা সম্ভবত প্রযুক্তির উন্নতি, প্রভাব আর দ্রুতির সঙ্গে পরিচিত নন ; বিদেশে কবি-লেখকরা কী করছেন তার সঙ্গে পরিচিত নন । ফেসবুকে আছি বলেই আমার বই আর নেট-এর লেখালিখি এখন বাংলাদেশ আর পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পৌঁছোয়, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল । কলকাতার বাইরে এবং ঢাকায় আমার বই এখন বিক্রি হচ্ছে, ইনটারনেটের কারণে । প্রচার করার ধান্দা নিয়ে  আমি কোনো সম্বর্ধনা নিই না, কবিতা পাঠে যাই না, সাহিত্যসভায় সভাপতিত্ব করি না বা বক্তৃতা দিই না । পাঠকের কাজ আমাকে খুঁজে নেয়া । বিখ্যাত বিদেশি বই এখন পিডিএফ আকারে নেটে বিনে পয়সায় পড়তে পাওয়া যায় । বাংলা বই এবার কিণ্ডলেও পড়তে পাওয়া যাবে, ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার আর মেইনটেনেন্সের ঝক্কি-ঝামেলা পোয়াতে হবে না ।
প্রিয় : আপনার প্রেম, বিয়ে, সংসারের গল্প জানতে চাই ।
মলয় : পাটনার ইমলিতলা পাড়ায় থাকতে, প্রথম প্রেমে পড়ার আগেই আমার সঙ্গে পনেরো বছরের এক শিয়া মুসলমান তরুণীর যৌন সংসর্গ হয়েছিল, তখন আমার বয়স দশ বছর ; ওনাদের বাড়িতে হাঁসের ডিম কিনতে যেতুম, তরুণীটিকে কুলসুম আপা বলে ডাকতুম, ওনাদের বাড়ির মাংস রাঁধার  গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে প্রায়ই যেতুম । কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুখস্ত বলতে পারতেন । যৌনাঙ্গ ছড়ে যাবার পর যাওয়া বন্ধ করে দিই, তবে এখনও ওনার জন্য মন কেমন করে । পাটনায় ওনার খোঁজে কিছুকাল আগে গিয়েছিলুম, শুনলুম ওনাদের পরিবার বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন । এই ঘটনা আমি কেবল আমার ঠাকুমাকে বলেছিলুম ; উনি উপদেশ দিয়েছিলেন আমি যেন জীবনে কখনও এই ঘটনা বাড়ির কাউকে না বলি ।
স্কুলে ঢুকে ক্রাশ উঁচু ক্লাসের গালে-টোল ছিলেন নমিতা চক্রবর্তি, যাঁর প্রভাবে মার্কসবাদ ও বাংলা সাহিত্যে আকৃষ্ট হই । তারপর আমি তিনবার প্রেমে পড়েছি : স্কুলের সহপাঠিনী অঞ্জলি দাশ, যে আমার কবিতায় শুভা ; দ্বিতীয়বার স্নাতকস্তরের নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা, আর তৃতীয়বার হিপিনী ম্যাডেলিন করিয়েট, যে আমার ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । চতুর্থবার বিয়ে করেছি । আমার স্ত্রী সলিলা ছিলেন মধ্যপ্রদেশ হকি দলের ক্যাপটেন, যখন ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় । অনেক শিল্ড-মেডেল জিতেছে সেসময়ে । কাপ জিতলে তাতে ভরে ওরা রাম খেয়ে উৎসব করত । আলাপের কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের নাগপুরের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলুম । ১৯৬৮ সালে বিয়ে করি । দুজনেই চাকরি করেছি আর নাগপুর, পাটনা, লখনউ, মুম্বাই, কলকাতা শহরে কাজ করেছি ।
আমি প্রথমে ব্যাঙ্ক নোট পোড়াবার চাকরি করতুম, পচা ছাতাপড়া তেলচিটে নোটের বিশাল-বিশাল পাহাড় পোড়াতে হতো । তাতে শরীর খারাপ আরম্ভ হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ণের চাকরিতে যোগ দিয়ে সারা ভারত ঘুরেছি ; চাষি, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, শ্রমিকদের জীবন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে । আমার মেয়ে অনুশ্রী বড়ো, তার পাঁচ বছরের ছোটো ওর ভাই জীতেন্দ্র । দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সবই লিখেছি, পড়ে দেখতে পারো, যোগাড় করতে পারলে । আমি রাহু আর দাদা কেতু।
প্রিয় : যুগে-যুগে কবিতার ছন্দ নিয়ে দুই দল কবি আলাদা হয়ে ঝগড়া করতে থাকে । কিন্তু কেউ কি আজকাল নতুন ছন্দরীতি তৈরি করতে পেরেছে ?
মলয় : যুগে যুগে বলা উচিত হবে না । বাংলা কবিতা তো এই সেদিনকার, বিদেশিদের সঙ্গে এসেছে । তার আগে আমরা বাঁধা ছন্দে কাব্য লিখতুম । মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে বাংলা ছন্দ নানা আদল-আদরা পেয়েছে । ইউরোপের তুলনায় আমাদের কবিতা বেশ নবীন । নতুন ছন্দরীতি তৈরী হবে নিশ্চয়ই, তার জন্য ধৈর্য চাই । কলকাতায় ধীমান চক্রবর্তী, রাকা দাশগুপ্ত, শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী, মিতুল দত্ত, বারীন ঘোষাল, যশোধরা রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ছন্দে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন ।


প্রিয় : জীবন এখন দ্রুতি-আক্রান্ত । এই সময় কবিতার পাঠক তৈরি করা কি সম্ভব ?
মলয় : যারা কবিতা লিখছেন তাঁরাই তো পাঠক । কবি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই বাংলায় প্রায় ৫০০০ কবি আছেন, ওই বাংলাতেও হয়তো সেরকম সংখ্যকই হবেন । আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার তো হয়ইনি, তো পাঠক পাবে কোথ্থেকে । ইউরোপ-আমেরিকার মতন শিক্ষার প্রসার ঘটেনি এদেশে, লোকেরাও বেশ গরিব, বই কেনার মতন রেস্ত দূরের কথা, খাবার কেনার মতনই টাকাকড়ি জোটে না বেশির ভাগ পরিবারে । যতো দিন যাচ্ছে ভারতে গরিবের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । মধ্যবিত্তরা কবিতার বই কিনতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবাংলার যা আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ, তারা পশ্চিমবাংলা ছেড়ে প্রথম সুযোগেই পালাচ্ছে, তাদের পরের প্রজন্ম মুক্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি থেকে ।
প্রিয় : প্রকাশকরা প্রায় বলে থাকেন কবিতার পাঠক নেই । কবিতার জনপ্রিয়তা নেই । কবিতাকে জনপ্রিয় করলে কবিতার জাত চলে যাবে বলে আপনি মনে করেন কি ?
মলয় : কমার্শিয়াল উপন্যাস ছাড়া আর কিছুই বিকোয় না, প্রবন্ধের আর ছোটোগল্পের বইও বিকোয় না, তো কবিতার বই কোথ্থেকে বিকোবে ! গানের মাধ্যমে কবিতাকে কিছুটা জনপ্রিয় যে করার চেষ্টা হয়নি তা নয়, যেমন করেছেন কবীর সুমন । কিন্তু তারও তো ক্রেতা দরকার । ঘুরেফিরে সেই একই সমস্যায় এসে ঠেকি, অর্থাৎ সাধারণ বাঙালি পরিবারের হাতে তেমন টাকাকড়ি নেই যে কিনবে । প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়তো মোবাইল ফোনে কখনও কবিদের কন্ঠস্বর শোনার আগ্রহ হবে মধ্যবিত্ত শ্রোতার। কবিতা-পাঠ ও আবৃত্তির গ্রামোফোন রেকর্ডও প্রথম বের করেছিলেন ‘সাপ্তাহিক কবিতা’ লিটল ম্যাগাজিনের কবি শান্তি লাহিড়ি । ফেসবুকে এবার ভিডিও পোস্ট করা শুরু হয়েছে, কেউ-কেউ নিজের কবিতা পাঠ করছেন বা গান গেয়ে পোস্ট করছেন । ধৈর্য ধরতে হবে, তাড়াহুড়া করলে চলবে না ।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট