ছবি সংগৃহীত

দেড় কিলোমিটার হেঁটে টিভিতে মেয়েদের খেলা দেখেন আনুচিং-আনাইয়ের বাবা মা

খাগড়াছড়ি শহর থেকে দুই কিলোমিটার রাস্তা। তারপর সাতভাইয়া পাড়া। এই পাড়াতে বেড়ে উঠেছে এএফসি অনুর্ধ্ব ১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশীপে চার ম্যাচে ৫ গোল করা আনুচিং মগিনী।

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০৫:৩৭ আপডেট: ১৪ মে ২০১৮, ১১:৫৭


ছবি সংগৃহীত

রিপ্রু মগ আর আপ্রুমা মগিনী, অনুচিংদের গর্বিত বাবা-মা, ছবি: প্রিয়.কম

খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে
মংক্যথোয়াই মারমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

(প্রিয়.কম) খাগড়াছড়ি শহর থেকে দুই কিলোমিটার রাস্তা। তারপর সাতভাইয়া পাড়া। এই পাড়াতে বেড়ে উঠেছে এএফসি অনুর্ধ্ব ১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে চার ম্যাচে পাঁচ গোল করা আনুচিং মগিনী। আনুচিং মগিনী আর আনাই মগিনী জমজ হয়ে জন্ম নিয়েছে। এখন তাদের বয়স তের। এই ১৩ বছরে এ জমজসহ কৃষ্ণা, মার্জিয়ারা ইতোমধ্যে রীতিমত ফুটবলের পায়ের জাদুতে রীতিমত বিশ্বজয় করে ফেলেছেন।

গেল মঙ্গলবার আনুচিং আর আনাই এর বাবা মার সাথে কথা হলো প্রিয়.কম-এর। নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয় তাদের বাড়ি। সাতভাইয়া পাড়া খাগড়াছড়ি সদরে পড়লেও বেশ দুর্গম এলাকা। বাড়িগুলো বেশির ভাগ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি। আনুচিংদের বাড়ির উঠোনে লাগানো আছে এক জোড়া নারিকেল গাছে। সেই নারিকেল গাছ দুটোও আনুচিংদের মতোই জমজ। যেন জমজে জমজে প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় মেলবন্ধন হচ্ছে। বিশেষ করে আনুচিং জমজের সাথে।

আনুচিংদের বাড়িতে জমজ নারকেল গাছ। ছবি: প্রিয়.কম

এবার গল্প শুরু করলেন আনুচিং এর বাবা রিপ্রু মগ। তিনি বললেন, ‘আনুচিং আর আনাই জমজ আমাদের কনিষ্ঠ সন্তান। ওরাসহ আমার চার ছেলে চার মেয়ে আছে। কিন্তু আমার ছেলেরা ওদের মতো আমাকে এত সম্মান এনে দিতে পারেনি’।

কথার প্রসঙ্গে কী করেন এমন প্রশ্ন করতেই মুখটা একটু গম্ভীর হলো, ‘দুই তিন বছর হলো বনজ ঔষুধ বিক্রি করে কোনো রকম সংসার চালাচ্ছি।  আমাদের জমিজমা যা আছে সেটি এ একটি বাড়ি। বনজ ঔষুধ বিক্রি করার আগে দিনমজুরি করে সংসার চালাতাম। ’

গল্পের ফাঁকে উপস্থিত হলেন আনুচিং এর মা আপ্রুমা মগিনী। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনাদের বাসায় টিভি আছে? উত্তরে বললেন, নেই।

তবে কীভাবে মেয়েদের খেলা দেখেন এমন প্রশ্ন করলে দুজনে বলে উঠলেন, ‘এখান থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তায় হেঁটে মধুপুর বাজারে গিয়ে টিভি দেখি। নিজের বাসায় এখনও বিদ্যুতের মিটার বক্স স্থাপন করতে পারিনি’।

এই সাঁকো পার হয়ে মেয়েদের খেলা দেখতে যান রিপ্রু মগ। ছবি: প্রিয়.কম

মেয়েদের ফুটবলার হবার পেছনের গল্প শুনতে চাইলে হাসিমুখে দুজনে বলতে লাগলেন, ‘ওরা পাঁচ, ছয় বছর থেকে বাড়ির উঠোনে মামাত ভাই চাইহ্লা মগের সাথে ফুটবল খেলত। এছাড়াও পাড়ায় ছেলেদের সাথে মিলেমিশেও ফুটবল, ক্রিকেট সব খেলাই খেলত। আমরা কখনও এ কাজে বাধা দেইনি। সবসময় উৎসাহ দিয়েছি। আমরা দুজনেই নিরক্ষর হলেও ওরা যেন আমাদের মতো না হয় সেজন্য ওদেরকে সব কাজে স্বাধীনতা দিয়েছি। ওরা যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছিল তখন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে। রাঙামাটি মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিয়ে সেবারের প্রথম রানার্সআপ হয়েছিল। এর আগে ওরা সাতভাইয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছিল’।

মেয়েদের লেখাপড়ার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আপ্রুমা মগ বলেন, ‘হাইস্কুলের জীবন এপিবিএন উচ্চ বিদ্যালয়ে হলেও সেখানে পড়াশুনা চালাতে ব্যয় বেশি হওয়ায় ঘাগড়া বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। ওরা মানবিক শাখা নিয়ে সেখানে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ওদের জেএসসি রেজাল্ট ও ভালো। দুজনে জিপিএ চার এর উপরে পেয়েছে’।

কখনও স্টেডিয়ামে গিয়ে মেয়েদের খেলা দেখেছন কিনা জানতে চাইলে রিপ্রু মগ বলেন, ‘একবার বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টের সময় গিয়েছি ট্রেনে করে। এরপর আর যেতে পারেনি। কারণ ঢাকায় গিয়ে ওদের খেলা দেখার মতো সামর্থ্য নেই। তারপর ওদের খেলা যখন শুরু হয় তখন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ওরা যেন ভালো খেলে জিততে পারে।’ এসময় রিপ্রু মগের চোখ ছলছল করছিল।

আনাইদের মা আপ্রুমা নিজের মেয়েদের সাফল্যের স্মারক দেখাতে লাগলেন। খেলার মধ্যে তাদের সাফল্য বেশ ঈর্ষণীয়। কারণ এই ১৩ বছরের মধ্যে ওদের সাফল্যের পালকে জুটেছে ১২ জোড়া সার্টিফিকেট! এছাড়াও গেল মে মাসে কাজাকিস্তানে গিয়ে জিতে আসা মেয়েদের সেই বিজয়ের পেপার কাটিং ছবিটিও দেখালেন।

মা-বাবার সংগ্রহে সন্তানের কৃতিত্বের স্মারক। ছবি: প্রিয়.কম

আনুচিং আনাইয়ের বাবা একটু আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে আনসার ব্যাটেলিয়ন থেকে মাসে ৬৫০০ টাকা করে বৃত্তি পেত। এখন আনাই এ বৃত্তি পেলেও আনুচিং এর টা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে। এর কারণটাও এখনও অজানা। ও যদি এ বৃত্তি পেত তাহলে ওর পড়ালেখার খরচটা নিজেই চালাতে পারত’।

আনুচিং এর সাথে ফোনে কথা হলে এ অদম্য বলেন বলেন, ‘আমি আমার পার্ফরম্যান্স নিয়ে খুব খুশি। বড় হলে দেশের হয়ে নারী বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে চাই’।

আনুচিং এর মামাত ভাই থোয়াই অং মগ বলেন, ‘আনুচিং আর আনাই দেশের সম্পদ। ওরা ওদের খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে সকলেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। না হলে ওরাও একসময় ঝরে পড়ে যাবে। দেশটা হারাবে অমূল্য মুক্তা।’ 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
তারেক কি আপিল করতে পারবেন
আমিনুল ইসলাম মল্লিক ২০ অক্টোবর ২০১৮
ফাদার রিগনের লাশ আসছে বাংলাদেশে
শেখ নোমান ২০ অক্টোবর ২০১৮
ডা. জাফরুল্লাহর শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন
আবদুল কাইয়ুম ২০ অক্টোবর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
ওয়েব থেকে
পাসপোর্ট করতে গিয়ে রোহিঙ্গা নারী আটক
পাসপোর্ট করতে গিয়ে রোহিঙ্গা নারী আটক
নয়া দিগন্ত - ৫ দিন, ১৮ ঘণ্টা আগে
ভিজিডি সুবিধা পান না ভূমিহীন ৯৩% নারী
ভিজিডি সুবিধা পান না ভূমিহীন ৯৩% নারী
বণিক বার্তা - ৬ দিন, ১ ঘণ্টা আগে