ছবি সংগৃহীত

পরিবেশ-জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়ন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব

শেখ নোমান পারভেজ: রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাংলাদেশ সংবিধান এর দ্বিতীয় ভাগে ১৮ক অনুচ্ছেদে বলা আছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন”। সেখানে নির্বাহী বিভাগ কখনই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

Noman Parvez
লেখক
প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০১৬, ১৪:০৯ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৪:৫০


ছবি সংগৃহীত

 

কিছুদিন আগে সোশ্যাল সাইটগুলোতে একটি ছবি আমাকে খুব বিচলিত করে। ছবির পটভূমিটা হলো একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার একটি গাছ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমন অসহায় ব্যক্তি আঁকড়ে ধরে থাকে একমাত্র আশ্রয়স্থল।

পৃথিবীর সব থেকে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা কিনা জীববৈচিত্র্যের এক গুরত্বপূর্ণ সম্ভারই নয় সাথে সাথে পরিবেশের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। কেননা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচানোসহ একটি দেশে যতটুকু বনায়ন থাকা জরুরি তার অনেক চাহিদা মেটায় সুন্দরবন। সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে ওঠে আসে যে, ইউনেস্কো দ্বারা হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই সুন্দরবন নানান প্রজাতির গাছ এবং হুমকির সম্মুখে থাকা প্রাণীগুলোর জন্য একই সাথে অভয়ারণ্য এবং আবাসস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়। তাছাড়া গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পানি নিষ্কাশনের অববাহিকায় এবং অন্যান্য নদী ও জলপথ একটি সুন্দর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে এই সুন্দরবন। কিন্তু পরিবেশ রক্ষাকারী বন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন হতে চলেছে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং তার সাথে সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। তথ্যসূত্র থেকে দেখা যায় যে, ২০৩০ নাগাদ দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে অনেক। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তার নিজস্ব প্রতিবেদনে বলেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৬% মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভুক্ত এবং ভবিষ্যতে এর যোগান বৃদ্ধি সরকারের একটি অন্যতম কাজ। যার ফলে আমাদের সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি, নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর ওপর। উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, এই বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অনেক সময় পরিবেশবান্ধব হয়, আবার কোনটি অনেক ব্যায়বহুল এবং পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পরিবেশ বান্ধব হবে না বলে আশঙ্কা করা যায়। সেই প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে, পরিবেশগত বিপদসীমায় প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে, আমাদের জনপদের জন্য গুরত্বপূর্ণ বনভূমি সুন্দরবনকে কিছুতেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া যায় না। আরও সুদৃঢ় করে বলতে গেলে, সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন হলে জন্য কড়া মাশুল আমাদেরই তথা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

সমস্যার জায়গাগুলোও খুবই স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের ইআইএ যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেই অনুসারে রামপাল প্রকল্পের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ এলাকায় রয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষি জমি এবং ম্যানগ্রোভ বনের সাথে সংযুক্ত এই এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এখানে মৎস্য সম্পদ উৎপন্ন হয় প্রচুর। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে এই এলাকার কৃষি এবং মৎস্য সম্পদ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হবে প্রচুর। কেননা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি হবে অন্য দেশ থেকে ফলে কয়লা বহনে ছোট ছোট নৌকা বা স্টিমার কিংবা পরিবহনে যা-ই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা থেকে নিঃসৃত হবে তেল, বজ্য পদার্থ এবং কয়লা পানি, যার ফলে দূষিত হবে পানি। সাথে সাথে নদী দিয়ে চলমান যান্ত্রিক জলযান সৃষ্টি করবে পরিবেশ এবং শব্দ দূষণ। পরিবেশ আইন কিংবা সরকারি নিয়ন্ত্রণের ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না। কেননা সরকারি নিয়ন্ত্রণ কিংবা আইন দিয়ে বাঁচানো যায়নি বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা কিংবা তিস্তার মতো নদী। এর সাথে যুক্ত হবে নৌ চলাচলে সৃষ্ট ঢেউ, যা নদীর তীরবর্তী মাটি ক্ষয় করে, সুন্দরবনের গাছগাছালির জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির ওপর একটি প্রভাব ফেলবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, সুন্দরবনের যে বাস্তুব্যবস্থা তার ওপর একটি বিরাট প্রভাব ফেলবে এই অতিরিক্ত নৌ চলাচল। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দরকার পড়বে পশুর নদী ড্রেজিং, জেটি এবং নদীতীর সংরক্ষণের জন্য দরকারি অবকাঠামো। এবং সেই অবকাঠামো প্রস্তুতকরণে গরান বনভূমির অনেক গাছ এবং বড় বড় অনেক ঝোঁপঝাড় যা পাখিদের বসতি হিসেবে বিবেচিত, সেগুলো কেটে ফেলতে হবে। ফলে বিভিন্ন জাতের পাখি যেমন বক, সারস ইত্যাদি পাখি হারাবে তাদের বসতি। হয়তো বা কালক্ষণে পাখিগুলোও বিলীন হয়ে যাবে।

এর সাথে সাথে যুক্ত হবে প্রতিদিনের কয়লা পোড়ার হিসাব। পাওয়ার প্লান্টটিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার টন কয়লার দরকার পড়বে এবং একই সাথে প্রতিবছর আনুমানিক ৭৯ লাখ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হবে। এখন যত উঁচু চিমনিই ব্যবহার করা হোক না কেন বাতাসের চেয়ে ভারী এই গ্যাস তো এই দেশেই ফিরে আসবে, ফিরে আসবে সুন্দরবনের বুকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে সুন্দরবন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব থেকে বিপদজনক বিষয় হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পোড়া ছাই, যা ক্ষতিকর বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত। পাওয়ারপ্লান্টে প্রতিবছর ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর ফলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশের বর্জ্য তৈরি হবে। ধরেই নেওয়া হয়, ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি বিপজ্জনক মাত্রায় পরিবেশদূষণ করে, কারণ এতে আর্সেনিক, পারদ, সিসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়ামের মতো বিভিন্ন ক্ষতিকর ও তেজস্ক্রিয় ভারী ধাতু থাকে। ইআইএ প্রতিবেদনে উৎপাদিত ছাই চিমনি দিয়ে নির্গত হওয়ার ধরে রাখার কথা বললেও স্বীকার করা হয়েছে, কিছু উড়ন্ত ছাই বাতাসে মিশবে। এতে করে এসিড বৃষ্টিকে কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। ফলশ্রুতিতে ওই এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি সংকটের একটি তীব্রতর সম্ভাবনা আছে। সর্বোপরি যেকোনোভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের জন্য ঝুঁকিমূলক।

তাছাড়া এই প্রকল্পে বাংলাদেশ যে লাভবান হবে তা নয়। ভারতীয় এনটিপিসি ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগের মূল্যেই। এবং আমাদের জনপদে, আমাদের পরিবেশ নষ্ট করে আমাদের অন্যের কাছে থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিদ্যুতের দাম হবে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন। তাছাড়া বিনিয়োগের হিসাবে দেখা যায়, এই প্রকল্পের ১৫ শতাংশ অর্থ জোগান দেবে পিডিবি, ১৫ শতাংশ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি এবং বাকি ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নেওয়া হবে। গৃহীত ঋণ ও এর সুদের হার তখন একটি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। যার ফলে পিডিবিকে লোকসানের ভর্তুকি গুনতে হবে প্রতি বছর। এই এনটিপিসি ভারতের মধ্যপ্রদেশে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন পায়নি। কারণ সেখানে তাজমহলের সৌন্দর্যহানি এবং পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা ছিল। আর আমরা মরিয়া হয়ে উঠেছি সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থাপনের জন্য।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাংলাদেশ সংবিধান এর দ্বিতীয় ভাগে ১৮ক অনুচ্ছেদে বলা আছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন”। সেখানে নির্বাহী বিভাগ কখনই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। যা শুধু পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের উন্নয়ন এবং এর সংরক্ষণ কে ব্যাহত করে না সাথে সাথে এই সুন্দরবরনকে ঘিরে বেঁচে কর্মনির্ভর মানুষের মৌলিক অধিকারের জায়গাগুলোকে যা সংবিধানের তৃতীয় ভাগে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলো ব্যাহত করে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যান্য ধরনের যেকোনোও ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়ে পরিবেশে। এছাড়া রয়েছে বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, ক্যাডমিয়াম, লেড, ছাই ইত্যাদি গ্যাস ও ভারী ধাতুর পরিবেশে নির্গমন তো রয়েছেই। ফলে এসিড-বৃষ্টি অবধারিত, এতে অনায়সে ধসে পড়বে সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছগাছালি ও প্রাণীদের জীবনচক্র, যেহেতু তাদের খাদ্য ও বায়ু বিষাক্ত হয়ে পড়বে। মানুষের জন্যও এই প্রভাব প্রযোজ্য।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকারক নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক এবং ভৌগলিকভাবে বেমানান। এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এবং সেই সম্পদের অধিকারী হিসেবে এই ক্ষতির প্রধান ভুক্তভোগী হব আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরা।

সরকারের স্বাক্ষরিত চুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে, কেননা জনমত চুক্তির শুধু দ্বিমতই পোষণ করেননি, পিটিশন দিয়েছেন, রোড মার্চ করেছেন এবং এই চুক্তি বাতিলে আন্দোলন চলছেও। প্রতিবাদের পথ সহজ না হলেও সমষ্টিগত স্বার্থের জন্য প্রতিবাদ চালু রাখতে হবে, যেন চুক্তি বাতিল হয়। কেননা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশ, বিশেষ করে সুন্দরবন ও সংলগ্ন মানুষ, ওই জনপদ ও বনাঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর এবং ভৌগলিকভাবে বেমানান ও অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক।

শেখ নোমান পারভেজ: শিক্ষার্থী, স্কুল অব ল’, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
ফেরত আসা শ্রমিকদের দায় নিচ্ছে না দুই এজেন্সি
মোস্তফা ইমরুল কায়েস ১৬ অক্টোবর ২০১৮
যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন মাহবুব তালুদার
প্রদীপ দাস ১৫ অক্টোবর ২০১৮
ফোন করলেই চা হাজির
আবু আজাদ ১৫ অক্টোবর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
যমুনার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে ধস
যমুনার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে ধস
সমকাল - ১ দিন, ৩ ঘণ্টা আগে
ধুনটে যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধে ধস
ধুনটে যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধে ধস
বণিক বার্তা - ১ দিন, ৮ ঘণ্টা আগে
নোনা ইলিশ যেভাবে তৈরি ও সংরক্ষণ করবেন
নোনা ইলিশ যেভাবে তৈরি ও সংরক্ষণ করবেন
বাংলা ট্রিবিউন - ১ দিন, ১৫ ঘণ্টা আগে
সংকটে সুন্দরবনের জেলেরা
সংকটে সুন্দরবনের জেলেরা
মানবজমিন - ৩ দিন, ৩ ঘণ্টা আগে