ছবি সংগৃহীত

পুনরায় ‘বাঘ ও সুন্দরবন’ প্রসঙ্গ

‘সুন্দরবন ধ্বংস করে বাঘ বাঁচানো যাবে কি?’ শিরোনামে এই ইত্তেফাকেই এর আগে একবার বেশ কিছু কথা লিখেছিলাম। সেই একই বিষয়ে প্রায় একই কথাগুলো লেখাটা আবার প্রয়োজন বলে অনুভব করায় আজ লিখতে বসেছি। একই বিষয়ে লেখার এই তাগিদের কারণ হলো, এ বিষয়টি নিয়ে সপ্তাহ দু’য়েক আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বেশ জোরালো কণ্ঠে কিছু কথা বলেছেন। লিখেছেন <strong>মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম</strong>

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
লেখক
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ০৯:৩২ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:১৮
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ০৯:৩২ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:১৮


ছবি সংগৃহীত
‘সুন্দরবন ধ্বংস করে বাঘ বাঁচানো যাবে কি?’ শিরোনামে এই ইত্তেফাকেই এর আগে একবার বেশ কিছু কথা লিখেছিলাম। সেই একই বিষয়ে প্রায় একই কথাগুলো লেখাটা আবার প্রয়োজন বলে অনুভব করায় আজ লিখতে বসেছি। একই বিষয়ে লেখার এই তাগিদের কারণ হলো, এ বিষয়টি নিয়ে সপ্তাহ দু’য়েক আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বেশ জোরালো কণ্ঠে কিছু কথা বলেছেন। তার সেসব কথা যথার্থ ও সমর্থনযোগ্য। তবে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অর্ধেক কথা বলেছেন, অর্ধেক কথা বলেননি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব বাঘ পর্যালোচনা (স্টকটেইকিং) সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সুন্দরবনকে রক্ষা করে বাঘ। আর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে সুন্দরবন। তাই বাঘ রক্ষার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সরকার। শুধু বাঘ রক্ষাই নয়, প্রাণি বৈচিত্র্যের বিপুল আধার হিসেবে সুন্দরবনকে রক্ষা করা জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীব-পরিবেশের এক অনন্য নিদর্শন এই সুন্দরবন। এই বনভূমির উপর প্রায় ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইক্লোন, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ইত্যাদি বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।’ (ইত্তেফাক, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪) অতীব সত্য ও খুবই সুন্দর এ কথাগুলো বলার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ! কিন্তু বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, বাগেরহাটের রামপালে ১৮০ একর ধানি জমিতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের ফলে সুন্দরবন, বাঘ ও জীব বৈচিত্র্যের যে সর্বনাশ ঘটবে—সেই আসন্ন বিপদের কথা তিনি একেবারেই উচ্চারণ করেননি। সেটি তার না করারই কথা। কারণ, তিনিই হচ্ছেন সুন্দরবনকে ধ্বংস করতে উদ্যত এই পরিকল্পনার একজন উত্সাহী আয়োজক। এমতাবস্থায়, রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাচালিত বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপিত হলে যে বিপদ নেমে আসতে যাচ্ছে তা থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করার ক্ষমতা ‘বাঘেরও’ নেই বলেই মনে হচ্ছে। ছোট বেলা থেকেই একথা সকলের জানা যে, যেসব কারণে বিশ্ব দরবারে আমাদের দেশের খ্যাতি, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ও সুন্দরবন। ডোরা কাটা বিশাল আকৃতির এই বাঘ যেমন হিংস্র ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির, তেমনি সৌন্দর্যে তা অনিন্দ্য। এদেশের নামে বাঘ। সেই বাঘই বিশ্ব দরবারে এদেশের নামকে ছড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে, সুন্দরবন হলো প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ‘ম্যানগ্রোভ’ বনাঞ্চল এটি। সুন্দরবনের অভাবনীয় সৌন্দর্য ও অভিনবত্বের বিবরণ তুলে ধরে আমরা সারা বিশ্বে প্রচার চালিয়েছি। বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য প্রাকৃতিক স্থানের মাঝে সু্ন্দরবন মাত্র অল্প কিছু ভোটের জন্য এবার স্থান করে নিতে পারেনি। কয়লা চালিত তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করে সেই সুন্দরবনের গায়ে আঁচড় লাগানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সুন্দরবন সম্পর্কে মুখে এ ধরনের সুন্দর সুন্দর কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের গায়ে আঁচড় লাগার বিপদ বন্ধ না করে বরঞ্চ সে বিপদকে আরো ত্বরান্বিত করছেন। প্রশ্ন হলো, সুন্দরবনে আঁচড় লাগলে প্রধানমন্ত্রী বাঘ বাঁচাবেন কিভাবে? অথচ তিনি বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলছেন। স্পষ্টতই এটি একটি গুরুতর স্ববিরোধীতা। সুন্দরবন ঘেঁষে কয়লাচালিত তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের গায়ে কোনো আঁচড় লাগবে কিনা এবং লাগলে তা কতটা বিপদজনক হবে—সেটিই গুরুতররূপে বিবেচনার বিষয়। তাই এখন দেখা যাক যে, রামপালে কয়লাচালিত তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে সে কারণে সুন্দরবনের ওপর কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের হিসেব মতে, পরিকল্পিত রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের মতো একটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ বায়ুদূষণকারী উপাদান আশেপাশে ছড়িয়ে পড়বে। এক বছরে এসব দূষণ পদার্থের ধরন ও পরিমাণ হবে নিম্নরূপ: (১) ৮৪.৫ লক্ষ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই পরিমাণ ৪২ কোটি গাছ কেটে ফেলার কারণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোধন বন্ধ হওয়ার পরিমাণের সমান। (২) ৯৭.৫ হাজার টন সালফার-ডাই-অক্সাইড। এটি এসিড-রেইনের ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এছাড়াও সালফার-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তুলবে, যা ফুসফুস ও হূদপিণ্ডের সমূহ ক্ষতি সাধন করবে। (৩) প্রায় ২৭ হাজার টন নাইট্রোজেন-অক্সাইড। এই গ্যাস ফুসফুসের টিস্যুর ক্ষতি করে থাকে, যার ফলে শ্বাসতন্ত্র নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়বে। (৪) ১,৩২২ টন ক্ষুদ্র কণিকা। এগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ফলে ব্রংকাইটিস এবং ফুসফুসের অন্যান্য রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে। (৫) ১,৯০০ টন বিষাক্ত কার্বন-মনো-অক্সাইড গ্যাস। বাতাসে এই গ্যাসের পরিমাণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। (৬) প্রায় ৪৫০ পাউন্ড পারদ। ২৫ একর আয়তনের একটি পুকুরে এক চা-চামচের ৭০ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ পারদের মিশ্রণ ঘটলে সেই পুকুরের মাছ বিষাক্ত হয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। পারদ ব্রেন ড্যামেজ ও স্নায়ুতন্ত্রের নানান রোগের জন্ম দিয়ে থাকে। (৭) ৫৯৪ পাউন্ড বিষাক্ত আর্সেনিক। আর্সেনিক একটি মারাত্মক বিষ। এর অতি সামান্য পরিমাণের ফলে আর্সেনিকোসিস ও ক্যান্সার রোগের বিস্তার ঘটবে। (৮) ৩০১ পাউন্ড সীসা, ১০.৫ পাউন্ড ক্যাডমিয়াম ও বিভিন্ন পরিমাণের অন্যান্য ভারি ধাতু। এসবই পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতক্ষণ বায়ুমণ্ডলের দূষণের হিসেব তুলে ধরা হলো। এ ছাড়াও কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ কঠিন ও তরল বর্জ্য সৃষ্টি হবে। এসবের মধ্যে প্রধান হলো (ক) কয়লা ধোঁয়ার পর পানির সাথে মিশে তৈরি হওয়া তরল কয়লা বর্জ্য (খ) কয়লা পোড়ার ফলে তৈরি হওয়া ছাই, যাকে ‘ফ্লাই অ্যাশ’ বলা হয়ে থাকে। এসব তরল ও কঠিন বর্জ্য খুবই বিষাক্ত। কারণ এসবের মধ্যে আর্সেনিক, পারদ, ক্রোমিয়াম এবং এমনকি তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম ইত্যাদি ঘণীভূত পরিমাণে উপস্থিত থাকে। ছাই বা ফ্লাই অ্যাশকে ‘অ্যাশ পন্ড’-য়ে বা ছাইয়ের পুকুরে গাদা করে রাখতে হয়। রামপালের প্ল্যান্টের মতো ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কারখানায় বছরে ৩ লক্ষ টনের বেশি ছাই তৈরি হবে। সতর্কতা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ ছাইয়ের অনেকটাই বাতাসে উড়ে গিয়ে বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিবে এবং ছাই ধোঁয়া বৃষ্টির পানি চুইয়ে মাটিতে ও নদীতে মিশে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে উঠবে। এরূপ আয়তনের একটি কারখানা থেকে বছরে ৫ লক্ষ টনের বেশি ‘স্লারি’ বলে পরিচিত তরল বর্জ্য তৈরি হবে। এই তরল বর্জ্যকে উপযুক্ত ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করা সম্ভব হলেও তা বেশ দুরূহ কাজ। তাই, তরল বর্জ্য বা স্লারি থেকেও দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রে জন্ম নেয়া দূষণের উপাদানগুলো ভূ-পৃষ্ঠের পানি (সারফেস ওয়াটার) ও ভূমধ্যের পানি (গ্রাউন্ড ওয়াটার)-এর সাথে মিশে বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মাছ, জলজ প্রাণি, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি হুমকির মুখে পড়বে। আশেপাশের নদ-নদী, খাল-বিল ছাড়াও এমনকি পুকুর, কুয়া, টিউবওয়েলের পানিও দূষণে আক্রান্ত হওয়ার বিপদ সৃষ্টি হবে। মানুষ ও সব ধরনের জীব-জন্তু, যারা এই পানির ওপর নির্ভরশীল, তারা সবাই বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে। এসব রাসায়নিক ও জৈবিক দূষণ উপাদানের সাথে সাথে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের টারবাইন, কমপ্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, পরিবহনের যানবাহন, কনস্ট্রাকশন যন্ত্রপাতি ইত্যাদির কারণে আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক শব্দ দূষণেরও সৃষ্টি হবে। রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু রাখতে প্রচুর পানির সরবরাহ প্রয়োজন। নদীর মিঠা পানি পাম্প করে কারখানায় নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে এই নদীর পানি প্রবাহ যেটুকু কমে যাবে, তা সমুদ্রের নোনা পানি এসে পূরণ করবে। ফলে, পশুর নদীর পানিতে লবণাক্ততা বাড়বে। এই পানি ট্রিটমেন্ট করে পরিশুদ্ধ করা হলেও তা দিয়ে পরিষ্কার পানির সবটুকু চাহিদা সামাল দেয়া যাবে না। বিদ্যুত্ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠাণ্ডা করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ ঠাণ্ডা পানি দরকার, সেজন্য গভীর নলকূপের সাহায্যে লবণাক্ততা মুক্ত বিশুদ্ধ পানি উত্তোলন করতে হবে। যন্ত্রপাতি শীতলায়তনের কাজে ব্যবহূত হওয়ায় এই পানি অনবরত গরম হতে থাকবে এবং বাষ্পায়িত হয়ে ও অন্যভাবে তার পরিমাণ কমতে থাকবে। এই কমে যাওয়া পানি পূরণ করার জন্য অনবরত make up water-এর প্রয়োজন হবে। এ কারণে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন অব্যাহতই রাখতে হবে। যে পরিমাণ নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করতে হবে তাতে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ভূ-পৃষ্ঠের উপরের স্তরে পানিশূন্যতা দেখা দিবে। রামপালে পরিকল্পিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রটি চালু হলে সেখানে প্রতিদিন ১৩ হাজার টন কয়লা পোড়াতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের জমজ প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত আছে। সেই দ্বিতীয়টিও চালু হলে দুটি কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন মোট ২৬ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন হবে। বড় বড় জাহাজে করে এই কয়লা আনতে হবে। নাব্যতার কারণে কয়লা বহনকারী বড় জাহাজকে দক্ষিণের হিরণ পয়েন্ট হয়ে সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আকরাম পয়েন্টে মাল খালাস করতে হবে। বছরে ৫৯ দিন বড় জাহাজকে কয়লা পরিবহন করতে হবে। আকরাম পয়েন্টের পরে বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে না। তাই বড় জাহাজ থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজযোগে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে ৬৭ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সেই বিপুল পরিমাণ কয়লাকে মংলা বন্দরে আনতে হবে। বছরে ২৩৬ দিন এসব লাইটারেজ জাহাজকে কয়লা পরিবহন করতে হবে। সুন্দরবনের নিস্তব্ধ পরিবেশ আলোড়িত হবে। বনের পশু-পাখি হতচকিত হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লার গুঁড়া, টুকরো কয়লা, তেল, জাহাজের দূষিত পানি সুন্দরবনের দূষণ ঘটাবে। এসবের ফলে চিরপরিচিত সুন্দরবন আর আগের সুন্দরবন থাকবে না। বিশ্বের ১৬০টি দেশের ১ হাজার ৯৭০টি প্রাকৃতিক জলাভূমি ‘রামসার এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত। তার মধ্যে সুন্দরবন এবং টাঙ্গুয়ার হাওর অন্তর্ভুক্ত আছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ ‘রামসার এলাকা’ সমূহের প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইরানের রামসার শহরে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কারণে এটিকে ‘রামসার চুক্তি’ বলা হয়। রামসার কনভেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সুন্দরবন এলাকায় কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন হলে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণসহ অনুসন্ধান ও গবেষণা করে বলেছেন যে, রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে (১) সুন্দরবনের স্বাভাবিক চরিত্র বিনষ্ট হবে, তৈরি হবে অসংখ্য কয়লা ডিপো, শুরু হবে গাছ কাটা, আগুন লাগিয়ে বন পরিষ্কার করা, বাঘ-হরিণ-কুমির ইত্যাদি ধরা ও হত্যা করা। (২) কয়লা পোড়া গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণিকার কারণে সুন্দরবনের জৈবিক পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, (৩) বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের কারণে ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টি ঘটিয়ে বনাঞ্চলের সমূহ ক্ষতি সাধন করবে। পৃথিবীর কোনো দেশে আবাসিক এলাকা, কৃষি এলাকা, বনাঞ্চলের কাছাকাছি (১৫/২০ কিলোমিটারে��� মধ্যে) কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ উত্পাদন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয় না। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম করার চেষ্টা হচ্ছে কার স্বার্থ রক্ষার জন্য? মানব বসতির ক্ষেত্রে যদি এই নীতি প্রযোজ্য হয় তাহলে বাঘসহ অন্য বন্য প্রাণী বাঁচাতে তাদের বসতির ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হবে না কেন? রয়েল বেঙ্গল টাইগার ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হওয়ার বিপদের মুখে। আর সরকার কিনা সেই টাইগারের নিবাস, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন ধ্বংস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছে। তাই, সেই একই সরকার যখন একই নিঃশ্বাসে ‘বাঘ বাঁচাও-সুন্দরবন বাঁচাও’—বলে শ্লোগান দেয়া হয় তখন তাকে প্রতারণামূলক তামাশা বলে না ভেবে পারা যায় না। তবে এটিকে তামাশা বলে হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সুন্দরবন ও তার বাঘকে বাঁচাতে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করতেই হবে। ‘বিশ্ব বাঘ পর্যালোচনা সম্মেলনে’ প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার মর্যাদা রক্ষার জন্যই এটি প্রয়োজন। (এই পোষ্টটি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে) (এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে )