ছবি সংগৃহীত

বদ্ধ কুয়ার বাঁধটা কেটে দেয়ার জন্য তো তরুণদের উদ্ধত হতেই হবে : স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান। সমকালীন বাংলা ভাষার তরুণ ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। পাঠ এবং লেখালেখিতেই মগ্ন হয়ে থাকেন। গত ২৯ মার্চ তার কর্মস্থান সাপ্তাহিক ‘এই সময়’ কার্যালয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। কথা বলেছেন নিজের লেখালেখিসহ সাহিত্যের নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।

Sudipto
লেখক
প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০১৬, ১৫:৩৬ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০৩:৪০


ছবি সংগৃহীত

গ্রাফিক্স : আকরাম হোসেন। ছবি : শামছুল হক রিপন।

(প্রিয়.কম) স্বকৃত নোমান। সমকালীন বাংলা ভাষার তরুণ ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। পাঠ এবং লেখালেখিতেই মগ্ন হয়ে থাকেন। গত ২৯ মার্চ তার কর্মস্থান সাপ্তাহিক ‘এই সময়’ কার্যালয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। কথা বলেছেন নিজের লেখালেখিসহ সাহিত্যের নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।


প্রিয়.কম : প্রশ্নটি একটু ভিন্নভাবে করি। গল্প উপন্যাস কেন লেখেন? খ্যাতির জন্য, নাকি জনপ্রিয় লেখক হয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য? নাকি অন্যকোনো কারণ আছে?

স্বকৃত নোমান : উত্তরটা আমি একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। ছোটবেলায় শুনেছি শবে বরাতের রাতে মানুষ আল্লার কাছে যা চায় আল্লা তাই দেন। ছোটবেলা, স্বাভাবিকভাবেই আমি কিছুটা ধর্মানুরাগী ছিলাম। আমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। এক শবে বরাতের রাতে আমি মসজিদে নামাজ পড়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করেছিলাম, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে কিচ্ছু চাই না, শুধু আমি লেখক হতে চাই, তুমি আমাকে লেখক বানিয়ে দাও।’ আমি তখনো লিটারেচার বলতে যা বোঝায় তা পড়তে শুরু করি নি। বাবার কাছে শেখ সাদি, হাফিজ, খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমি প্রমুখ কবির লেখাজোখা পড়েছি। তখন কেন আমার মধ্যে লেখক হওয়ার স্বপ্নটি জেগেছিল? লেখক হওয়ার জন্য কেন আমি তখন অদৃশ্য সত্তার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম? জানি না। এখনো, ছত্রিশ বছর বয়সে এসে, আমি প্রশ্নটির উত্তর পাই নি।

আমি নিয়তিতে বিশ্বাসী নই। যদি হতাম, তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলতাম, লেখক হওয়া আমার নিয়তিতে ছিল। যেহেতু নিয়তিতে বিশ্বাসী নই সেহেতু আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলতে হচ্ছে, খ্যাতিটাকে আমি খুব একটা দরকারি জিনিস মনে করি না। বিশ-ত্রিশ বছর পরে তো মরেই যাব, খ্যাতি দিয়ে আমি করবটা কী? আমি অর্থেরও কাঙ্গাল নই। খুব সাদামাটা জীবন যাপন করি। ছোট্ট সংসার। চাওয়া-পাওয়া খুব বেশি নেই। সুতরাং এ দুটি কারণে যে আমি লিখি না―এই ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।
তাহলে কেন লিখি? আমি আসলে কিছু বলতে চাই। অনেক অনেক কথা বলতে চাই। কিভাবে বলা যায় কথাগুলো? তারুণ্যে আমি আমার কথাগুলো ব্যক্ত করার জন্য অনেক উপায় খুঁজেছি। আমার বাবা আমাকে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে নিয়ে যেতেন। অনেক ওয়াজ মাহফিলে আমি ওয়াজও করেছি। মানে ধর্মীয় বক্তৃতা দিয়েছি। আমার গ্রামেও আমি বহুদিন ওয়াজ করেছি। কিন্তু আমার ভেতরে বিপুল অতৃপ্তি কাজ করেছে। আমি যেসব কথা বলতে চাই তা ধর্মীয় মাহফিলে বলা সম্ভব নয়। কথাগুলো মাহফিলের উপযুক্ত নয়। তাহলে কিভাবে ব্যক্ত করব কথাগুলো? আমি কবিতা লিখতে শুরু করলাম। একটা সময়ে এসে খেয়াল করলাম কবিতার মাধ্যমেও সম্ভব হচ্ছে না। আমার অনেক কথা। তাই আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করলাম। লিখতে লিখতে আমি আপ্লুত হয়ে পড়ি। এই জন্য যে, আমার মনে হলো, যেসব কথা বলার জন্য আমি মাধ্যম খুঁজছিলাম এত এত বছর ধরে সেই মাধ্যমটা আমি পেয়ে গেছি।
অথবা এইভাবেও বলা যায়, অনেকে তো অনেক কিছু করে। যেমন কেউ জাল মেরে মাছ ধরে, কেউ হাল চাষ করে, কেউ শুটকি বা ভেজিটেবলের ব্যবসা করে, কেউ ড্রাইভ করে, কেউ এরোপ্লেন চালায়, কেউ ড্রইং করে, কেউ গান করে, কেউ খেলে বা খেলা দেখে। আমি এসবের কিছু পারি না। পারি শুধু একটাই জিনিস―লেখালেখি, আর তা গল্প-উপন্যাস। এ কারণেই আমি গল্প-উপন্যাস লিখি।


প্রিয়.কম : যারাই গল্প উপন্যাস বা কবিতা লেখেন, তারাই বলেন দেশ ও জাতির কল্যাণেই তাদের এই পথে আসা। একটি কবিতা, একটি গল্প বা একটি উপন্যাস জাতির কল্যাণে আদৌ কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

স্বকৃত নোমান : গল্প উপন্যাস বা কবিতা জাতির কল্যাণে ভূমিকা না রাখলে তো সাহিত্যচর্চার ব্যাপারটাই বন্ধ হয়ে যেত। আমার কথাই ধরুন। আমিও তো জাতির একটা অংশ, তাই না? কৈশোরে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘লালসালু’ উপন্যাসটি পড়ে পারিবারিকভাবে প্রাপ্ত ধর্মবিশ্বাসের প্রতি আমার এক ধরনের বিতৃষ্ণা চলে আসে। উপন্যাসটি আমাকে এই তথ্য দিয়েছে যে, এই পথ তোমার নয়, তোমার পথ অন্য। তার মানে উপন্যাসটি আমাকে প্রভাবিত করেছে, আমার জীবনটাকে বদলে দিয়েছে। কিংবা ধরুন চণ্ডীদাসের সেই উক্তি―‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’―এটা তো একটা কবিতা। এই কবিতা কি আমাদের ক��্যাণ করছে না? নিশ্চয়ই করছে। আমরা যখনই মানবতাবিরোধী কোনো কাজ করতে যাই তখনই চণ্ডীদাস আমাদের কানে কানে এই কবিতা বলে যান। কবিতা বা গল্প উপন্যাস হচ্ছে জ্ঞানের নির্যাস। এখানে মানবীয় গুণাবলীর উৎকর্ষের সূত্র থাকে। এসব পড়ে মানুষের বোধ ঋদ্ধ হয়, মানুষ প্রজ্ঞার একটা উচ্চতায় পৌঁছে। আপনি একটা জরিপ করতে পারেন পাঠকদের ওপর। যারা নিয়মিত বই পড়ে, দেখবেন, তাদের মধ্যে অপরাধীর সংখ্যা কম। থাকলেও হাতেগোনা। সাহিত্য পাঠ তাদের মননকে এমন একটা উচ্চতায় নিয়ে যায়, যার কারণে তারা অপরাধ করতে পারে না। সভ্যতার বিকাশে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন লেখকরা। মানুষ তার কল্যাণের জন্য যত কিছু আবিস্কার করেছে, বই তার মধ্যে প্রধান। লেখকগণ এই কারণে নমস্য। 

প্রিয়.কম: এ সময়ে লিখিত বেশিরভাগ গল্প-কবিতা উপন্যাসেই তো বিনোদনের খোরাক ছাড়া খুব বেশি কিছু পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে দেশ বা সমাজের সেবা হবেই বা কী করে?

স্বকৃত নোমান : এই সময়ে বাংলাদেশে কী লেখা হচ্ছে তার খুব বেশি খোঁজ যে আমি রাখতে পারি তা নয়। পাঠক হিসেবে আমি এখনো বিশ শতকের। গত শতকে বিশ্বব্যাপী যেসব মহৎ সাহিত্যকর্ম হয়েছে আমি এখনো সেগুলো পড়ে শেষ করতে পারিনি। এটা আমার দুর্বলতার দিক। কারণ আমাকে অন্য একটা লাইন থেকে শিফট করে এই লাইনে আসতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই আমাকে ইসলামের ইতিহাস আর ইসলামি সাহিত্য পড়তে হয়েছে। এর বাইরেও সাহিত্যের যে বিপুল ভাণ্ডার, তার খোঁজ পেয়েছি কিছুটা দেরিতে, আঠার-উনিশ বছর বয়সে। সুতরাং আমাকে পড়তে হচ্ছে প্রচুর। পড়াটা আমি পেছন থেকে শুরু করছি আরকি। ম্যাক্সিম গোর্কি একটা কথা বলেছেন, লেখকের নিজ সাধ্যমতো সব কিছু যত বেশি সম্ভব জানা তার কর্তব্য এবং যত ভালো করে গভীরভাবে সে অতীতকে জানবে ও উপলব্ধি করবে তত ভালোভাবেই সে বর্তমানকে বুঝতে পারবে। আমিও অতীতটাকে গভীরভাবে জানার ও উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। সে কারণে বর্তমানটা আমার কাছে এখনো উন্মোচিত নয়।

তবে একেবারেই যে পড়ি না তা নয়, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লেখা পড়া হয়ে যায়। কখনো বাধ্য হয়ে, কখনো অনুরোধ রাখতে গিয়ে, কখনোবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। সেক্ষেত্রে আমার পক্ষে বলা প্রায় অসম্ভব এই সময়ে লিখিত সাহিত্য স্রেফ বিনোদনের খোরাক কি না। আর বিনোদনের খোরাক হলেও অসুবিধা কোথায়? পাঠক বিনোদিত তো হচ্ছে অন্তত। মানুষকে বিনোদিত করাটাও তো এক ধরনের সেবা। দেখছেন না, বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো কী পরিমাণ ভাঁড়ামি প্রচার করে দর্শকদের বিনোদিত করবার জন্য। বিনোদন দেওয়াও এক ধরনের সেবা বৈকি!

প্রিয়.কম: এবারের ‘প্রিয়.কম’-এর বিবেচনায় বইমেলায় প্রকাশিত বইগুলো থেকে আপনার বই ‘বালিহাঁসের ডাক’ সেরা দশ গল্পগ্রন্থের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সেরা তালিকায় নিজের বই স্থান পাওয়ার বিষয়টি কিভাবে দেখেন। অনুভূতি জানতে চাই।

স্বকৃত নোমান : অবাক হওয়ার মতো অনুভূতি হয়েছে।

প্রিয়.কম : অবাক? অবাক হলেন কেন?

স্বকৃত নোমান : দেশের জনপ্রিয় একটি অনলাইন নিউজপোর্টাল আমার গল্পের বইকে সেরা বলছে, এটা আমার জন্য অবাক হওয়ার মতো ঘটনাই বটে। কারণ আমার গল্পের প্রতি আমার আস্থা এখনো তৈরি হয় নি। মানে আমি যে ধরনের গল্প লিখতে চাই তা ‘বালিহাঁসের ডাকে’ ঠিক পেরেছি বলে এখনো মনে হচ্ছে না। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে সচেতন। লেখক হিসেবে আমি কতটা পারদর্শী এবং কতটা অপদার্থ তা খুব ভাল করেই জানি। আপনাদের সেই নিউজটা দেখে আমি ফেসবুকে শেয়ার নিয়েছিলাম। স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, ‘একটি ছাড়া বাকিগুলো ভালো বই’। কমেন্টস করে এমনকি ইনবক্সে অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘ভাই, খারাপ বই কোনটা?’ আমি বলেছি, ‘কেন, বালিহাঁসের ডাক।’ বললেন, ‘ভাই, ইয়ার্কি করছেন?’ আমি বলি, ‘আশ্চর্য, এখানে ইয়ার্কির কী দেখলেন? আমার যা মনে হয়েছে আমি তাই তো লিখেছি। আমি আমারটা সম্পর্কে জানি যে এটাকে ভালো বলা যায় না। বাকিগুলো সম্পর্কে জানি না, তাই সেগুলো ভালো। যা সম্পর্কে জানি না তাকে খারাপ বলবে কিভাবে?’
যাই হোক, আপনাদের দৃষ্টিতে যদি ‘বালিহাঁসের ডাক’ সেরা দশ গল্পগ্রন্থের একটি হয় সেটা একান্তই আপনাদের বিবেচনা, আমার নয়। আপনাদের বিবেচনাকে আমি সম্মান করি। আপনাদের পরিশ্রমের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। এ জন্য প্রিয়.কমকে ধন্যবাদ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমাকে আরো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।

প্রিয়.কম : ‘বালিহাঁসের ডাক’ গল্পগ্রন্থটির নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই। মানে গল্পগ্রন্থটির গল্পগুলো লেখার পেছনের গল্পটা জানতে চাই।

স্বকৃত নোমান : ‘বালিহাঁসের ডাক’ আমার দ্বিতীয় গল্পের বই। গত দুই বছরে লেখা মোট ১৪টি গল্প এতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। এ বছর বই করার কোনো পরিকল্পনাই আমার ছিল না। কেননা গত বছর আমি লিখতে থাকা (শেষ জাহাজের আদমেরা) উপন্যাসটা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। আমি সাধারণত গল্পের চেয়ে উপন্যাসের দিকেই বেশি কনসেনটেশন দেই। কিন্তু উপন্যাস তো আর একটানা লেখা যায় না। অন্তত আমি পারি না। একটা এপিসোড লিখে আমাকে বেশ কিছুদিন বিরতি নিতে হয়। দ্বিতীয় এপিসোডটা কিভাবে শুরু করব তা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। কখনো একটা প্যারা লিখে সপ্তাহ-দশদিন বিরতি নিই। ভাবি। উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে আমার গতি অত্যন্ত শ্লথ। এই বিরতির ফাঁকে আমি গল্প লিখি। গত বছরের ডিসেম্বরে এসে খেয়াল করি বিরতির ফাঁকে আমি দশটি গল্প লিখে ফেলেছি! এটি আমার জন্য ছিল বিস্ময়কর। এসব গল্প লেখার কোনো পরিকল্পনাই আমার ছিল না। আইডিয়াটা মাথায় এলো, অমনি লিখতে শুরু করলাম। কোনো গল্পই লিখে শেষ করতে দু-দিনের বেশি লাগে নি। এই দশটি গল্প এবং ২০১৪ সালে লেখা চারটি গল্পসহ মোট চৌদ্দটি গল্প নিয়ে ‘বালিহাঁসের ডাক’ প্রকাশিত হলো অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে। ‘বালিহাঁসের ডাক’ গল্পগুচ্ছে আমি আসলে মানবজীবনের বহুমাত্রিক বোধের দিকে আলো ফেলতে চেয়েছি। পেরেছি কিনা সেটা পাঠক ভালো বলতে পারবেন।

প্রিয়.কম : আদম পাচার নিয়ে একটি উপন্যাস লিখছেন। একটি ওয়েবম্যাগাজিনে তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিতও হচ্ছে। খুব ভাল একটি বিষয় সিলেক্ট করেছেন। এই উপন্যাস লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা বা উপন্যাসটি রচনা করতে প্ররোচনা কোথা থেকে পেয়েছেন?

স্বকৃত নোমান : আপনি জানেন যে, গত বছর মালয়েশিয়া মানবপাচারে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচিত একটি ঘটনা। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে বিভিন্ন নৌযানে পনের থেকে কুড়ি হাজার ভাসমান মানুষের সীমাহীন দুর্দশা, খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি, মারামারি, হতাহত এবং থাইল্যান্ডের পেদাং বেসার জঙ্গলে আবিস্কৃত অসংখ্য গণকবর আমাকে ভয়ঙ্করভাবে বিচলিত করে তুলেছিল। এই কারণে এবং অন্য আরো একটি বিশেষ কারণে, বঙ্গ-ভারতের সাংস্কৃতিক ক্লেশ নিয়ে যে উপন্যাসটি লিখব বলে দুই বছর ধরে নোট নিচ্ছিলাম, নোট নিতে নিতে ‘বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামের সন্ধানে’ নামে ১২ হাজার শব্দের একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলাম, সেই উপন্যাসটির পরিকল্পনা বাতিল করে আমি ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’ লিখতে শুরু করি।
উপন্যাসটির কিছু অংশ নাঈমুল ইসলাম খান সম্পাদিত ‘নতুনধারা’য়, আর কিছু অংশ কবি সোহেল হাসান গালিব সম্পাদিত ‘পরস্পরে’ প্রকাশিত হয়। আসলে মানুষের কল্পনা বাস্তবতাকে কতটা ছুঁতে পারে, উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে এই চেষ্টাটা ছিল আমার। মানবতার চূড়ান্ত পতন, একই সঙ্গে তুঙ্গ উত্থান এবং অনিবার্য মৃত্যু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের মানসিক কী প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়―এসব কিছুকে আমি শব্দে আঁকতে চেয়েছি উপন্যাসটিতে। চার শ বছর আগে মগ-ফিরিঙ্গিদের মানবপাচার এবং চার শ বছর পরের মানবপাচারকে একটা সুতোয় গাঁথতে চেয়েছি। কদিন আগে এটি লেখা শেষ হয়েছে।

প্রিয়.কম : কতদিন লাগল এটি লিখতে?
স্বকৃত নোমান : প্রায় ৬৪ হাজার শব্দের কঙ্কালটা দাঁড় করাতেই লেগে গেল ১২ মাস। মানে গোটা এক বছর।
 
প্রিয়.কম : এটা কি আরো সম্পাদনা করবেন? নাকি একেবারেই ফাইনাল করে ফেলেছেন?
স্বকৃত নোমান : সম্পাদনা করব তো বটেই। লেখা শেষ হলো, এবার উপন্যাসটির কথা আমি ভুলে যাব। ভুলে থাকব টানা ৮ মাস। ডিসেম্বরে আবার প্রিন্ট নিয়ে সম্পাদনা শুরু করব। টানা এক মাস সম্পাদনা চলবে। সংযোজন-বিয়োজন। এই শব্দটা বাদ দিয়ে ওই শব্দটা বসানো, এই বাক্যটা একটু ঘুরিয়ে ওই বাক্যটা একটু সোজা করে দেওয়া এসব। তারপর কঙ্কালে অস্থি-মজ্জা ও আত্মার সংযোজন। কিংবা বিয়োজন। সর্বাঙ্গে তুলির আঁচড় দেব।

প্রিয়.কম : ভুলে যাওয়ার কথা বললেন। ভুলে যাবেন কেন?
স্বকৃত নোমান : ভুলে থাকার সুবিধা হচ্ছে এই―আট মাস পর সম্পাদনা করতে বসলে ফাঁকগুলো ভুলগুলো দুর্বলতাগুলো ধরা পড়বে। উপন্যাস লেখার চেয়ে সম্পাদনাতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে আমার কাছে। উপন্যাস মূলত লেখা হয় সম্পাদনার সময়টাতেই, আমার মনে হয়।

প্রিয়.কম: আপনি একটা উপন্যাস কতবার সম্পাদনা করেন?
স্বকৃত নোমান : প্রায় বারো থেকে পনের বার। সম্পাদনা করতে করতে যখন বিরক্ত হয়ে যাই তখন প্রকাশকের হাতে তুলে দেই।

প্রিয়.কম : উপন্যাসটি লেখার সময়ের কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?

স্বকৃত নোমান : একেকবার মনে তো, না, উপন্যাসটি লিখে শেষ করা আমাকে দিয়ে হবে না। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত কীবোর্ড সামনে নিয়ে বসে থেকেছি, অথচ একটা শব্দও লিখে উঠতে পারি নি। নিদারুণ এক বিপন্নতা আমাকে আঁকড়ে ধরত তখন। মনে হতো, হায়, আমি বুঝি লিখতে ভুলে গেছি! উপন্যাস লেখা বুঝি আর আমাকে দিয়ে হবে না! বেঁচে থাকাটা তখন নিরর্থক মনে হতো। নিজেকে তখন জগতের সবচেয়ে অপদার্থ মানুষ বলে মনে হতো। কিন্তু আবার যখন লেখা শুরু হতো, টানা চলতে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কী বোর্ডে শুধু ঠকঠক শব্দ উঠত অবিরাম। লিখে আবার সম্পাদনা। শব্দ ধরে ধরে সম্পাদনা।

প্রিয়.কম : লিখে শেষ করার পর কেমন অনুভূতি হচ্ছে?
স্বকৃত নোমান : খুব আনন্দ লাগছে। নিজেকে মুক্ত মুক্ত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে আমার আপাতত কোনো কাজ নেই। আমি একটা মুক্ত পাখি, যার কোনো কাজ নেই, দায়-দায়িত্ব বলতে কিছু নেই। এই দায়িত্বহীনতাটা কয়েকদিন থাকবে। তারপর আবার শুরু করব নতুন কিছু, নতুন উদ্যমে।

প্রিয়.কম : প্রত্যেক লেখকেরই লেখার একটা নিজস্ব প্রক্রিয়া থাকে। আপনার প্রক্রিয়াটা কি জানতে পারি?
স্বকৃত নোমান : ধরুন উপন্যাস লেখার জন্য আমি কোনো একটা প্লট পেলাম, পাওয়া মাত্র সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু লেখা শুরু করি না। এটা নিয়ে কয়েক মাস ভাবি। ভাবনাটাকে মজতে দেই, পরিপক্ক হতে দেই। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা শুরু করি। কোন আঙ্গিকে লিখব তা খুঁজি। প্রথম লাইনটা কী হবে তা নিয়ে প্রচুর ভাবি। ভাষাটাকে লাইনে আনার জন্য ক্ল্যাসিক উপন্যাসগুলো পড়তে শুরু করি। তারপর ধীরে ধীরে নোট নেই। আখ্যানের বিন্যাস করি। মানে পর্ব বিভাজন করি; যদিও শেষ পর্যন্ত ওই বিভাজন আর থাকে না। তারপর একদিন লিখতে শুরু করি। আমি আগে হাতে লিখতাম, এখন লিখি সরাসরি কম্পিউটারে। অনেক সময় আবার দেখা যায় ঘুমাবো বলে কম্পিউটারটা বন্ধ করলাম, অমনি জোয়ারের মতো লেখা মাথায় হানা দিতে লাগল। আমি তখন ডায়েরিতে লিখতে শুরু করি। আমার টেবিলে দু-তিনটা ডায়েরি সবসময় থাকে। থাকতে হয়। কারণ আমাকে প্রচুর নোট নিতে হয়। 

প্রিয়.কম : লেখকরা দুটি ভাগে বিভক্ত। একভাগ মনে করেন তারা শুধু আনন্দ দানের জন্য লিখবেন আরেকভাগ মনে করেন তারা সমাজের জন্য লিখবেন? আপনি কোন দলের? কেন?
স্বকৃত নোমান : আমি কোনো দলেরই নই। আমি কাউকে আনন্দ দেয়ার জন্যও লিখি না, আবার সমাজের প্রতি কোনোরূপ দায়বদ্ধতা থেকেও লিখি না। তবে আপনার প্রশ্নের দুটো পয়েন্ট নিয়ে আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। লেখালেখি একটা দালিলিক ব্যাপার, ঠাট্টা-তামাশা নয়। এটা কালের মুকুর। কালের সাক্ষী হয়ে থাকে। আপনি একটা বই লিখলেন, সেটা এক শ বছর পরও থেকে যেতে পারে। পাঠককে নিছক আনন্দ দেয়ার জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত বইগুলো লেখা হয় নি। আনন্দের জন্য পৃথিবীতে আরো অনেক কিছু আছে। আনন্দের জন্য আপনি টিভি দেখতে পারেন, ক্রিকট খেলতে পারেন, ফুটবল খেলতে পারেন বা খেলা দেখতে পারেন, সিনেমা দেখতে পারেন, গান শুনতে পারেন, ইউটিউবে ঢুকে পর্নোগ্রাফিও দেখতে পারেন। এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আনন্দের জন্য কষ্ট করে বই পড়তে হবে কেন? সুতরাং যারা পাঠককে আনন্দদানের জন্য লেখেন তাদের এখনো বুদ্ধির মুক্তি ঘটে নি। বুদ্ধির মুক্তি না-ঘটা লেখক পৃথিবীতে অনেক আছে। আমাদের দেশেও আছে।

প্রিয়.কম : কয়েকজনের নাম কি বলা যাবে?
স্বকৃত নোমান : কে চায় হাতে ধরে মার খেতে? আমি গোবেচারা লেখক মানুষ। বেঁচে থাকার জন্য ছোট একটা চাকরি করি। মার খেলে কয়েকদিন নার্ভাস থাকব, তাতে আমার লেখার ক্ষতি হবে। বেশি মার খেলে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে। তাতে আমার চাকরিটা চলে যেতে পারে। যেহেতু তাদের বুদ্ধির মুক্তি ঘটে নাই সেহেতু তারা আমাকে মেরেও বসতে পারে। অথবা দেখা গেল একটা মানহানির মামলা করে দিল। সুতরাং থাক। চেপে যাওয়াই ভালো।

প্রিয়.কম : সমাজের জন্য যারা লেখেন...
স্বকৃত নোমান : শিল্পী আসলে তার শিল্পের কাছেই দায়বদ্ধ, সমাজের কাছে নয়; যদিও মার্কসীয় সাহিত্বতত্ত্ব আমার এই বক্তব্যকে স্বীকার করে না। মার্কসীয় সাহিত্বতত্ত্ব কলাকৈবল্যবাদকে স্বীকার করে না। আমার কথা হচ্ছে, শিল্পী তার শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে সমাজের মঙ্গল এমনিতেই আসবে। শিল্পীকে বলে বেড়াতে হবে না, এই শিল্পকর্মটি সমাজের মঙ্গলের জন্য, সমাজের ভালোর জন্য। আপনারা এটি পড়ুন এবং দলে দলে অশেষ মঙ্গল হাসিল করুন।

প্রিয়.কম : একবিংশ শতাব্দীর গল্প-উপন্যাস বা কবিতা কেমন হওয়া উচিৎ?
স্বকৃত নোমান : সেটা আমি বলে দেয়ার কে? প্রত্যেক লেখকই স্বয়ম্ভু। প্রত্যেকেই তার নিজের মতো করে লেখেন। দেবেশ রায়ের লেখা একরকম, আবার হাসান আজিজুল হকের লেখা একরকম। সন্দ্বীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখার সঙ্গে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখার মিল কোথায়? কিংবা ধরুন মারিয়ো ভার্গাস ইয়োসার গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে কি নাগিব মাহফুজ বা মিলান কুন্ডেরার গল্প-উপন্যাসের মিল আছে? একুশ শতকে যারা লিখছেন তারাই ঠিক করে নিচ্ছেন তাদের লেখাটি কেমন হওয়া উচিত। আমি যেমন আমার লেখাটির ধরন ঠিক করে নিই। আমি মনে করি, আমার উপন্যাসের ফিলসফি থাকবে, মানবজীবনের বহুমাত্রিকতা থাকবে, গভীরতর উপলব্ধি থাকবে। আমি জীবনকে চারদিক থেকে দেখাতে চাই আমার গল্প-উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। সেই দেখানোটা কখনো সরল, কখনো জটিল।

প্রিয়.কম : আপনি নিজেই যখন পাঠক তখন সামসময়িক অন্য লেখকদের লেখাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
স্বকৃত নোমান : ঐ যে বললাম আমি আমার সামসময়িকদের লেখা খুবই কম পড়ি। এটা আমার সীমাবদ্ধতা। মূল্যায়নের জন্য তো বেশি বেশি পড়তে হয়। আমি মূল্যায়ন করব কিভাবে? তা ছাড়া সামসময়িক বলতে আসলে কারা? আমার সময়ে তো সৈয়দ শামসুল হক লিখছেন, হাসান আজিজুল হকও লিখছেন। ওপারে দেবেশ রায়, অমর মিত্র, রবিশঙ্কর বল, আবুল বাশারসহ আরো অনেকেই লিখছেন। অসংখ্য। এদের কথা বলব?

প্রিয়.কম : না, এরা তো আপনার সিনিয়র। এদের পরবর্তী জেনারেশনের কথা বলছি। মানে আপনার সমবয়সী বা আপনার চেয়ে একটু সিনিয়রদের কথা...।
স্বকৃত নোমান : উত্তরটা আগেই দেয়া হয়ে গেছে। তবে ঐ উত্তরে একটা কথা ছিল বিচ্ছিন্নভাবে সমকালীন লেখকদের কিছু লেখা পড়েছি বা পড়ি। বিচ্ছিন্নভাবে পড়া অনেক গল্পকার-ঔপন্যাসিক আছেন বাংলাদেশে। যেমন ধরুন শাহাদুজ্জামানের কিছু গল্প ভালো লেগেছে আমার। তার ক্রাচের কর্নেল উপন্যাসটা পড়েছি। ব্যর্থ উপন্যাস। এ ছাড়া আছেন কাজল শাহনেওয়াজ। তার একটি গল্প আমি পড়েছি। সিরিয়াস লেখক। শাহনাজ মুন্নী গল্পে প্রতিশ্রুতিশীল। আহমাদ মোস্তফা কামালের বেশ কিছু গল্প ও প্রবন্ধ পড়েছি। রায়হান রাইন, শাহীন আখতার, জাকির তালুকদার, প্রশান্ত মৃধা, পারভেজ হোসেন, অদিতি ফাল্গুনি, উম্মে মুসলিমা, পাপড়ি রহমান, চঞ্চল আশরাফ, হামিম কামরুল হক―এঁদের কিছু কিছু লেখা পড়েছি। ভালো লেগেছে। এই তালিকায় আরো অনেকে আছেন, যাঁদের কিছু কিছু লেখা আমি পড়েছি। শুনেছি মাসউদুল হক ভালো লিখছেন। তার ‘পূর্বপুরুষেরা’ উপন্যাসটি পড়ার ইচ্ছে আছে। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামি কয়েক বছর পর আমি আমার সমকালীনদের লেখাগুলো পড়া শুরু করব। ২০১৮ সাল নাগাদ। একেবারে ধরে ধরে পড়ব। নিজের সীমাবদ্ধতা কাটাব পড়ে। ততদিন পর্যন্ত আমার সমকালীন লেখকরা নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন।

প্রিয়.কম : সাহিত্যের প্রতিটি বই-ই ব্যবসা করার জন্যই বাজারে আনা হয়। দোকানের সেল্ফে রাখা হয়। তারপরও অনেকে এক শ্রেণীর লেখকদের লেখাকে কেন বাজারি সাহিত্যের তকমা দিয়ে সেগুলো দূরে সরিয়ে রাখেন?
স্বকৃত নোমান : বাজারি তো সব কিছুই। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা মারিও ভার্গাস ইয়োসা বা তলস্তয় বা দস্তয়ভস্কি কিংবা ধরুন দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা হাসান আজিজুল হক―সবার বই-ই তো বাজারি, তাই না? বাজারে না এলে পাঠক কিনবে কোথা থেকে? প্রকাশকরাও দু-পয়সা রোজগারের জন্যই বইটি বাজারজাত করেন। কিন্তু এখানে ‘বাজারি সাহিত্য’বলতে যা বোঝানো হয় সেগুলো আসলে অসাহিত্য। বাজে বই। সেগুলো মেলার মাঠের মুড়ি-মুড়কির মতো হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হয়। স্বল্পপ্রজ্ঞার পাঠকরা সেগুলো পড়ে। যেমন ধরুন প্রণব ভট্ট নামের একজন লেখক ছিলেন। তার বই খুব চলত। কিন্তু সাহিত্য বলতে যা, তার লেখা তার ধারেকাছেও ছিল না। কিংবা ধরুন কাশেম বিন আবু বকর ও আবদুস সালাম মিতুলের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। তাদের বইও খুব চলে। স্বল্পপ্রজ্ঞার পাঠকরা তাদের বই পড়ে। প্রণব ভট্ট, বকর বা মিতুল টাইপের অনেক লেখক এখনো আছেন। তাদের নাম বলতে চাই না। লিখুক না। ধানের মধ্যে তো ভুষি থাকবেই। সব যদি ধান হয় তাহলে তো গরু-ছাগলের খাবারের জন্য কিছু আর থাকবে না।

প্রিয়.কম : এই সময়ে এসে কবি লেখকদের জীবন যাপন কেমন হওয়া উচিৎ?
স্বকৃত নোমান : আমি যেহেতু কথাসাহিত্যকর্মী, তাই কথাসাহিত্যিকদের জীবনের কথাই বলি। কথাসাহিত্যিকের জীবন হবে একেবারেই রুটিনমাফিক। তিনি রুটিন করে জীবন যাপন করবেন। লম্বা ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে, লম্বা চুল, দাড়ি আর লম্বা নখ রেখে, লম্বা আলখাল্লা পরে লেখক সাজার যুগ এখন নেই। শেষ হয়ে গেছে গত শতকে। আর লেখক হতে হলেই যে সাকুরা বা পিকক বা গোল্ডেন ড্রাগনে গিয়ে প্রতিদিন মদ খেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কথাসাহিত্যিক তো মাসে একদিনের বেশি মদ খেতেই পারবেন না। কারণ মদ কনসেন্ট্রেশন নষ্ট করে। কখনো কখনো শরীর দুর্বল করে দেয়। কথাসাহিত্যিক শরীরের দিকে নজর দেবেন, নাকি তার কথাসাহিত্যের দিকে নজর দেবেন? তাছাড়া উপন্যাস লেখার সময় সব চরিত্রগুলো মাথায় রাখতে হয়। মদ খেলে সব চরিত্র মাথায় থাকে না, একটা দু-টা থাকে। তাই মদ যত কম খাওয়া যায় ততই মঙ্গল। আর এখন কর্পোরেট যুগ। কথাসাহিত্যিককেও এই যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লিখতে হবে। তিনি কর্পোরেট লাইফ লীড করবেন, কিন্তু নিজের ভেতরে এমন একটা জগত তেরি করে নেবেন, যে জগত একান্তই তার। এই জগতে প্রবেশের অধিকার কারো নেই।

প্রিয়.কম : পৃথিবী থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। গল্প-কবিতাও কি একদিন হারিয়ে যাবে? হঠাৎ যদি গল্প-কবিতা-উপন্যাসও হারিয়ে যায় বা এগুলোর উপর যদি নিষেধাজ্ঞা জারি হয় সেক্ষেত্রে লেখক-কবিদের অনুভূতি প্রকাশের বিকল্প মাধ্যম কি হতে পারে?
স্বকৃত নোমান : গল্প-কবিতা যদি হারিয়ে যায় তাহলে তো আর সভ্যতাই থাকবে না। লেখালেখিই সভ্যতাকে এতদূর এনেছে এবং টিকিয়ে রাখছে। গল্প-কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করছে। ভাব প্রকাশের মধ্য দিয়েই কিন্তু সভ্যতা বিকশিত হচ্ছে। ভাব বা অনুভূতি প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে মানুষ তো আবার নেংটো হয়ে বনে জঙ্গলে ফিরে যাবে। আমি মনে করি না পৃথিবী থেকে গল্প-কবিতা হারিয়ে যাবে। গল্প-কবিতার বিকল্প শুধুই নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধতা মানে সৃষ্টির আদিতে ফিরে যাওয়া। সেটা হওয়ার নয়। কেননা মানুষ ক্রমশই সম্মুখবর্তী। মানুষ পেছনে ফেরে না। বরফ যুগ এলে সেটা আলাদা কথা।

প্রিয়.কম : ‘তরুণরা উদ্ধত’―যুগ যুগ ধরে এই বাক্য উচ্চারিত হয়ে আসছে। নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই টার্মটাকে কিভাবে দেখেন?
স্বকৃত নোমান : তরুণরা উদ্ধত না হলে তো প্রচলিত ব্যবস্থাকে ভাঙতে পারবে না। ‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখী ঝড়’―নতুনরা কালবৈশাখী ঝড়ের মতোই উদ্ধত হবেন। তবে সেই ঔদ্ধত্য মার্জিত, শৈল্পিক, সৃজনশীল হওয়া চাই। ঔদ্ধত্য মানে তো আমার একজন সিনিয়ররের কলার ধরে মেরে বসা নয়, তাকে অপমান-অপদস্ত করা নয়। বদ্ধ কুয়ার বাঁধটা কেটে দেয়ার জন্য তো তরুণদের উদ্ধত হতেই হবে। তারা উদ্ধত না হলে নতুন সৃষ্টিও তো হবে না। তরুণদের ঔদ্ধ্যত্বকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট
ইবিতে কোটার ভর্তি সাক্ষাৎকার শনিবার
ইবিতে কোটার ভর্তি সাক্ষাৎকার শনিবার
জাগো নিউজ ২৪ - ৩ দিন, ১ ঘণ্টা আগে
সম্পদ বেড়েছে আফছারুল ও নোমানের
সম্পদ বেড়েছে আফছারুল ও নোমানের
মানবজমিন - ৩ দিন, ১৭ ঘণ্টা আগে
নোমানের কাছে হারলেন খসরু
নোমানের কাছে হারলেন খসরু
সমকাল - ১ week, ৩ দিন আগে
এ কেমন সাক্ষাৎকার ম্যারাডোনার!
এ কেমন সাক্ষাৎকার ম্যারাডোনার!
https://www.prothomalo.com/ - ১ week, ৫ দিন আগে
জামাল খাশোগির গোপন সাক্ষাৎকার
জামাল খাশোগির গোপন সাক্ষাৎকার
নয়া দিগন্ত - ২ সপ্তাহ, ১ দিন আগে
পুলিৎজার বিজয়ী অ্যাডাম জনসনের সাক্ষাৎকার
পুলিৎজার বিজয়ী অ্যাডাম জনসনের সাক্ষাৎকার
বাংলা ট্রিবিউন - ২ সপ্তাহ, ১ দিন আগে