ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের লোকনৃত্য

মিশরীয় দেয়ালচিত্রে ও ভারতীয় গুহাচিতে নৃত্যকলার বিভিন্ন ভঙ্গী দেখতে পাওয়া যায়। নৃত্যকলার ব্যবহার যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে নাচের এই ব্যবহার ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ভারতীয় সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত। লোকসংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়া এই নৃত্যকলাই হচ্ছে লোকনৃত্য। বাংলাদেশের লোকনৃত্য বা পল্লীনৃত্যের কোনো কোনোটিতে প্রাচীন সংস্কার, কোনোটিতে ধর্মের প্রভাব এবং কোনো কোনটিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পাওয়া যায়।

nusrat jahan champ
লেখক
প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ০৫:৪৩ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৯:৪৮


ছবি সংগৃহীত
নৃত্য বা নৃত্যকলার ইংরেজি প্রতিশব্দ Dance এসেছে প্রাচীন ফ্রেঞ্চ শব্দ Dancier থেকে, যা মূলত শারীরিক নড়াচড়ার প্রকাশভঙ্গীকে বোঝায়। নাচ বা নৃত্য হলো দৈহিক প্রতিভঙ্গিমা, তবে তা প্রতিদিনের ব্যবহার জীবনের প্রতিভঙ্গিমা নয়। এ প্রকাশভঙ্গী সামাজিক, ধর্মীয় বা মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এতে আছে গতি, মুদ্রা, সংযম ও ছন্দ। নৃত্যকলা শিল্পের এমন একটি শাখা, যা খুব সম্ভবত প্রাচীনতম। প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন হিসেবে নানা বস্তু পাওয়া গেলেও নৃত্যের তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন জনপদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে নাচ প্রচলিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মিশরীয় দেয়ালচিত্রে ও ভারতীয় গুহাচিতে নৃত্যকলার বিভিন্ন ভঙ্গী দেখতে পাওয়া যায়। নৃত্যকলার ব্যবহার যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে নাচের এই ব্যবহার ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ভারতীয় সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত। লোকসংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়া এই নৃত্যকলাই হচ্ছে লোকনৃত্য। লোকনৃত্য নৃত্যকলার অন্তর্ভুক্ত হলেও কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে তা শাস্ত্রীয় বা ক্লাসিক নৃত্য থেকে কিছুটা আলাদা। লোকনৃত্য ছন্দের কঠোর নীতি খুব একটা অনুসরণ করে না। ক্লাসিক নৃত্যের তুলনায় লোকনৃত্যে সংযম ও ছন্দের অভাব রয়েছে, কারণ এতে মুদ্রার ব্যবহার খুব একটা নেই। লোকনৃত্যের গতি, ছন্দ, অঙ্গকৌশল অনেকটা বাস্তব জীবনের কাছাকাছি। শাস্ত্রীয় নৃত্যের ক্ষেত্রে পোশাক ও সাজসজ্জা একটি অপরিহার্য বিষয়। কিন্তু লোকনৃত্যের ক্ষেত্রে পোশাক তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। লোকনৃত্য সাধারণত দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়। কারণ জীবনচক্রের গতিময় দলবদ্ধ আচরণই লোকনৃত্য বা পল্লীনৃত্যের অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের লোকনৃত্য বা পল্লীনৃত্যের কোনো কোনোটিতে প্রাচীন সংস্কার, কোনোটিতে ধর্মের প্রভাব এবং কোনো কোনটিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বেশ কয়েক ধরনের লোকনৃত্য প্রচলিত রয়েছে। যেমন - জারি নাচ : বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে এই নাচ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। মহররম উপলক্ষে জারি নাচ অনুষ্ঠিত হয়। জারি গানের সাথেই জারি নাচ হয়। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকরা তাজিয়া মিছিলে জারি নাচ নেচে থাকে। বাউল নাচ : বাংলার পল্লীর পথে-ঘাটে বাউল গান ও বাউল নাচ দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয়তা অর্জন করে আসছে। বাউল নাচের কোনো মৌলিক উপলক্ষ নেই। বাউল গান ও নাচের মূল প্রেরণা হচ্ছে ধর্মসাধনা। বিশেষ করে গান বাউলদের সাধনারই অঙ্গ। বাউল নাচ বাউল গানের অনুষঙ্গ, তবে অপরিহার্য নয়। ফকির নাচ : বাংলেদেশের প্রায় সব জায়গাতেই এক ধরনের লোক দেখতে পাওয়া যায়, যারা ঢিলেঢালা পোশাক পরে এবং লম্বা বাবরি চুল রাখে। এরা সাধারণভাবে মাদারের ফকির নামে পরিচিত। ফকিররা মূলত মুসলমান। নৈমিত্তিক জিকিরের পাশাপাশি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নাচ-গানও করে থাকে। চৈত্র সংক্রান্তিতে মাইজভাণ্ডারের উত্‍সব উপলক্ষে ফকির নাচ অনুষ্ঠিত হয়। ঘেটু নাচ : বিল-হাওরে ভরা ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্ব এবং শ্রীহট্টের পশ্চিম অঞ্চলে ঘেটু গানের সাথে ঘেটু নাচের আসর বসে। এ নাচের কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উপলক্ষ নেই, মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যেই এর আয়োজন হয়। লোকনৃত্যের মধ্যে একমাত্র ঘেটুনাচেই গানের ভাবার্থ ধরে নাচের ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা হয়। সারি নাচ : নৌকাবাইচের সময় সারি গানের সাথে সারি নাচ হয়। দু একজন নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে, ঘুরে ঘুরে গান গায় এবং নাচে। গানের তালে তালে বৈঠা চালানো হয়। গানের সাথে নাচের তেমন সম্পর্ক থাকে না। ছোকরা নাচ : ঘেটু নাচের মতো এ নাচেরও কোন ধর্মীয় বা সামাজিক উপলক্ষ নেই। মাঠে-ঘাটে, ক্ষেত-খামারে সারাদিন কাজের পর ছোকরা নাচের আসরে কৃষক-মজুররা ভিড় জমায়। ছোকরা নাচ বছরের যেকোনো সময় অনুষ্ঠিত হতে পারে। খেমটা নাচ : খেমটা নাচ হচ্ছে বাইজি নাচের গ্রামীণ সংস্করণ। গ্রামের অবস্থাপন্ন গেরস্থরা যেকোনো সামাজিক ও লোকিক আনন্দ-অনুষ্ঠানে খেমটা নাচ-গানের আয়োজন করে থাকে। লাঠি নাচ : লাঠি নাচ সারা দেশব্যাপী প্রচলিত। লাঠি নাচে দৈহিক বল ক্ষিপ্রতার প্রয়োজন হয় বলে এতে অভিজ্ঞরাই অংশগ্রহণ করে। লাঠি নাচে লাঠিই একমাত্র উপকরণ নয়। তলোয়ার, ছোরা, থালা ইত্যাদি নিয়েও নাচ দেখানো হয়। লাঠি নাচে কোনো গান হয় না। ঢাক নাচ : ঢাকার মানিকগঞ্জ অঞ্চলে ���াক নাচের প্রচলন বেশি দেখা যায়। এটা পুরুষদের যুদ্ধ নৃত্য। এ নাচের মধ্য দিয়ে সঙ্গীকে যুদ্ধে আহবান করা হয়। ঢাক নাচ পুরোপুরি সামাজিক। এতে লাঠি খেলার মতো লাঠি নিয়ে যুদ্ধের নানা দৈহিক কলাকৌশল দেখানো হয়। ঢালি নাচ : ঢাল নিয়ে নাচা হয় বলে এ নাচের নাম ঢালি নাচ। এটিও পুরুষের যুদ্ধ নৃত্য। ঢাল এবং লাঠি এ নাচের প্রধান উপকরণ। ঢালি নাচে কোনো গান নেই, তবে বাদ্য আছে। ঢোল এবং কাঁসির তালে তালে নাচা হয়। রায়বেঁশে নাচ : রায়বেঁশে নাচ লাঠি নাচের মতোই যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ নাচ। 'রায়বাঁশ' নামক এক ধরনের শক্ত বাঁশের তৈরি লাঠি নিয়ে এ নাচ নাচা হয় বলে এ নাচের এমন নাম। বাংলাদেশের সীমান্তের এলাকাগুলোতে এ নাচের প্রচলন বেশি।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
শীতে দ্রুত বুড়িয়ে যায় ত্বক, কিন্তু কেন?
কে এন দেয়া ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮
শীতকালে দই খাওয়া কী খারাপ?
কে এন দেয়া ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮
কাশতে কাশতে বের হয়ে এলো ‘ফুসফুস’!
কে এন দেয়া ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮
শীতের সকালে খুব সহজে গরম গরম নাস্তা
রুমানা বৈশাখী ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট