ছবি সংগৃহীত

স্বল্প বাজেটের সিনেমা ‘সাইরাত’কে নিয়ে ভারতে কেন এত হৈচৈ?

বিভিন্ন গোত্র ও বর্ণে বিভক্ত ভারতে যেখানে একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে প্রচলিত, ধনীদের অারো ধনী হওয়ার লোভ, নিন্মবর্ণের কারো সাথে প্রেমের সম্পর্ক কিংবা বিয়ে যেখানে অনেকটাই সামাজিক রীতিবিরুদ্ধ, সেখানে ঠিক উল্টো কাহিনীনির্ভর একটি আঞ্চলিক সিনেমা তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।

মিজানুর রহমান
লেখক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০১৬, ১০:০৪
আপডেট: ২৪ মার্চ ২০১৮, ১৭:০৫


ছবি সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বিভিন্ন গোত্র ও বর্ণে বিভক্ত ভারতে যেখানে একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে প্রচলিত, ধনীদের অারো ধনী হওয়ার লোভ, নিন্মবর্ণের কারো সাথে প্রেমের সম্পর্ক কিংবা বিয়ে যেখানে অনেকটাই সামাজিক রীতিবিরুদ্ধ, সেখানে ঠিক উল্টো কাহিনীনির্ভর একটি আঞ্চলিক সিনেমা তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। নূন্যতম বাজেটের (মাত্র চার লাখ রুপি) মারাঠি ভাষার এ সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন নিন্মবর্ণের হিন্দু হিসেবে বিবেচিত দলিত চলচ্চিত্র পরিচালক নাগরাজ মাঞ্জুলে। সিনেমাটির নাম সাইরাত। 

সাইরাতের নায়িকা চরিত্র আর্চণা মহারাষ্ট্রের কলেজপড়ুয়া এক অল্পবয়সী তরুণী আর নায়ক হচ্ছে তার কলেজের বন্ধু ও গ্রামের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক প্রসন্ন। অর্চণা গ্রামের উঁচুবর্ণের প্রভাবশালী ও ধনী রাজনীতিবিদের বখে যাওয়া মেয়ে আর প্রসন্ন একই গ্রামের নিন্মবর্ণের একজন জেলের ছেলে। সমাজ ও পরিবারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রসন্নের প্রেমে পড়ে যায় অর্চণা। গ্রামের মানুষ তাদের প্রেম মেনে নেয়নি। তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং এক পর্যায়ে ভালোভাবে বাঁচতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় এ যুগল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এ নিষ্পাপ প্রেম করুণ পরিণতি বরণ করতে বাধ্য হয়। এটিই হচ্ছে এ সিনেমার গল্প।

গতানুগতিক বলিউডি ধাঁচের প্রেমের গল্পকেও এক বড় ধাক্কা দিয়েছে সাইরাতের গল্প। ইতিমধ্যেই মুক্তির একমাসের মাথায়  সিনেমাটি মারাঠি ভাষার সবচেয়ে ব্যাবসা সফল ছবির তকমা পেয়ে গেছে। সিনেমাটির আয় ১২ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সিনেমার মূলচরিত্রে যে দু’জন অভিনয় করেছেন তারাও একেবারে আনকোরা।

পরিচালক নাগরাজ মাঞ্জলে (৩৮)

মহারাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪৫০টি সিনেমা হলে মুক্তির পর থেকে অনবরতভাবে হলভর্তি দর্শক সিনেমাটি উপভোগ করছেন। অতিরিক্ত দর্শকের ঢল সামাল দিতে এ হলগুলোতে রাতে ও সকালে একটি করে শো বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া গ্রামে গ্রামে একক পর্দার যে সিনেমাহলগুলো আছে, সেখানেও আছে দর্শকদের উপচে পড়া ভীড়।  এছাড়া সিনেমাটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও অভূতপূর্ব সম্মান পেয়েছে। সাইরাতকে ঘিরে এসব ঘটনাকে সমালোচকরা ‘সাইরাত ফেনোমেনা’ বলছেন।

নিজের পরিচালিত একটি সিনেমাকে ঘিরে মানুষের এত আগ্রহ ও আলোচনা যে দারুণ উপভোগ করছেন তা বিবিসির কাছে খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করেছেন পরিচালক নাগরাজ মাঞ্জুলে। কি কারণে সিনেমাটি ঘিরে মানুষের এত আগ্রহ তারও ব্যাখ্যা করেছেন পরিচালক। 

সিনেমাটির জন্য কোনো নিয়মিত অভিনেতাকে চাননি পরিচালক। বরং তিনি চেয়েছিলেন এমন কেউ তার সিনেমাটি করুক যাদের অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা নেই এবং বাস্তব জীবনেও তারা ছাত্র-ছাত্রী। 

নায়ক আকাশ থোসার (২০)

নায়িকা রিঙ্কু রাজগুরু (১৪)

সিনেমার মূল চরিত্রে নেওয়া হলো মাত্র ১৪ বছর বয়সী রিঙ্কু রাজগুরুকে যে মেডিসিনে পড়ার বিষয়ে মনস্থির করছিল আর নায়ক হিসেবে নেওয়া হলো ২০ বছর বয়সী আকাশ থোসারকে যে সদ্য গ্র্যাজুয়েট, অসম্ভব ক্রিকেট পাগল একটা ছেলে এবং পুলিশে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে। 

পরিচালকের শ্যুটিং স্পটেই কাজ করত রিঙ্কুর মা, সেখানেই রিঙ্কুর সাথে পরিচালকের পরিচয়। রিঙ্কুকে দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই পরিচালক তাকে তার সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বাছাই করেন। 

আর থোসারকে পরিচালক পেয়েছেন তার এক ভাইয়ের মাধ্যমে। তাদের সাথে কয়েকমাস থেকে পরিচালক তাদের চরিত্রগুলো তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

একেবারে গ্রাম থেকে উঠে আসা অখ্যাত দুটি তরুণ তরুনী এখন অতিরিক্ত মানুষের ভীড় এড়াতে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকছেন। সিনেমাটি কতটা সফল এবং এর প্রভাব কতটা তা সিনেমাটির নায়ক নায়িকাদের লুকিয়ে থাকা থেকেই বোঝা যায় বলে মনে করেন পরিচালক।

সিনেমার নায়িকা তো আফসোস করেই বললেন সিনেমা মুক্তির পর রাস্তায় হাঁটতে পারছেন না কিংবা তার পছন্দের রাস্তার পাশের খাবার পর্যন্ত খেতে পারছেন না।

সিনেমাপাগল ভারতবাসী সারাবছরই বলিউডে বুঁদ হয়ে থাকে। বলিউডি প্রেম, সেখানকার সিনেমায় দেখানো রীতিনীতি, বংশমর্যাদার প্রভাব তাদের জীবনে অনেকাংশেই আছে। অথচ এমন একটা প্রেক্ষাপটে বলিউডি গল্পের থেকে ভিন্নধর্মী একটা গল্প নিয়ে অত্যন্ত স্বল্পবাজেটে তৈরী অখ্যাত মারাঠি ভাষার একটা সিনেমা পুরো দেশে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। এটিকে বলিউডের প্রতিও একটা ধাক্কা হিসেবে মানছেন চলচ্চিত্র সমালোচকেরা। পরিচালকতো কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে দিলেন, ‘সাইরাত হচ্ছে বলিউডের প্রতি আমার প্রতিবাদ’।

বলিউডি সিনেমার সমালোচনা করে মাঞ্জুলে বলেন, এগুলো হচ্ছে এমন ধরনের সিনেমা যেখানে সুন্দরী সুন্দরী নায়িকারা তাদের নায়কের জন্য অপেক্ষা করে, প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য নায়কের উপর নির্ভর করেন। মাঞ্জুলে বলেছেন, তিনি এমন সিনেমা বানাতে চান যেগুলো বলিউডের রীতি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। 

বলিউডি সিনেমায় পুরুষের একাধিপত্ব ও নায়িকাদের শুধু গ্ল্যামার বাড়ানো উপস্থিতি দেখতে দেখতে ক্লান্ত মাঞ্জুলে বলেন, গ্রামের একটি সহজ সরল মেয়েও যে সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করতে পারে, সে অনুপ্রেরণা থেকেই আমি রিঙ্কুকে বাছাই করেছিলাম। 

আর তার এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ভারতীয় সমাজ ও বলিউডের ভুল ধারণাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার জন্য সর্বমহলে প্রসংশিত হচ্ছেন তিনি। 

প্রায় দুই বছর ধরে এ সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করেছেন মাঞ্জুলে এবং ২০১৪ সালে এসে তিনি এটি চূড়ান্ত করেন এবং এ বছরের এপ্রিলে এসে সিনেমাটি মুক্তি দেন। একটি চলচ্চিত্র সমাজে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা সিনেমাটি মুক্তির পর থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। 

সাইরাতের ট্রেইলার

[video:https://www.youtube.com/watch?v=wMrMKnoYWwA]

বিবিসি অবলম্বনে
 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
ভালো মানুষ হয়ে, ভালো নির্মাতা হতে চাই : ইউসুফ
তাশফিন ত্রপা ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
‘এবাদত’-এর পর ‘এখন বলা যায়’
নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
১৪ ডিসেম্বর ‘জন্মভূমি’
তাশফিন ত্রপা ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
‘ফাটল ধরেছে’ নেহা- হিমাংশুর প্রেমে
তাশফিন ত্রপা ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট