ছবি সংগৃহীত

হজের দোয়াসমূহ- ০১

একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হচ্ছে হজ্জে গেলে অনেক "দুআ" জানা লাগে। এই "দুআ" মুখস্ত করার ভয় অনেক এর জন্যেই নিরুৎসাহ প্রদান করে থাকে। কিন্তু আসলে এই ধারণাটি একেবারেই অবান্তর। একজন হজ প্রত্যাশীর অবশ্য কর্তব্য হবে হজের আমলগুলোর মাঝে কোনটি ফরয, কোনটি সুন্নত, কোনটি ওয়াজিব ও কোনটি নফল তা সঠিক ভাবে জেনে নেয়া।

saleh1403
লেখক
প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০১৪, ০৪:৪৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:৩২
প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০১৪, ০৪:৪৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:৩২


ছবি সংগৃহীত
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ'র নামে শুরু করছি। আসসালামু আলাইকুম। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ফরযের অন্যতম হলো আল্লাহ'র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য হজ্জ পালন করা। গুরত্বপূর্ণ এই ফরয যথাযথভাবে আদায়ের লক্ষ্যে প্রত্যেক হজ্জ প্রত্যাশীরই হজ্জের নিয়মাবলী ও মাসায়িল সঠিক ভাবে জেনে নেয়া অবশ্য কর্তব্য হজ্জের সফর নিয়ে মানুষের মাঝে অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। কিছু কিছু ধারণার কারণে হজ্জের সফর মানুষের কাছে একটি কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জিং কাজ হয়ে দাঁড়ায়। একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হচ্ছে হজ্জে গেলে অনেক "দুআ" জানা লাগে। এই "দুআ" মুখস্ত করার ভয় অনেকের জন্যেই নিরুৎসাহ প্রদান করে থাকে। কিন্তু আসলে এই ধারণাটি একেবারেই অবান্তর। একজন হজ্জ প্রত্যাশীর অবশ্য কর্তব্য হবে হজ্জের আমলগুলোর মাঝে কোনটি ফরয, কোনটি সুন্নত, কোনটি ওয়াজিব ও কোনটি নফল তা সঠিক ভাবে জেনে নেয়া। বাংলাদেশে অনেক বইতেই দেখা যায় তাওয়াফ (নিয়ম অনুসারে কাবা ঘর প্রদক্ষিণ করা) ও সায়ী (নিয়ম অনুসারে সাফা-মারওয়া পাহাড় যাওয়া আসা) এর "প্রতি চক্করের জন্য" দীর্ঘ দুআ বর্ণনা করা। এই দুআ দেখে অনেককেই ঘাবড়ে যেতে দেখা যায়। দ্বীনের যে কোন ক্ষেত্রেই আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম কে অনুসরণ করবো। তাওয়াফ ও সায়ীর সময়ে প্রতি চক্করে আলাদাভাবে যেই দীর্ঘ দুআ গুলো বিভিন্ন হজ্জ গাইডে উল্লেখ করা আছে, সহীহ হাদীসে সেগুলোর বর্ণনা পাওয়া যায়না। সম্পূর্ণ হজ্জের সফরে একটি দুআ ব্যাতীত আর কোন দোয়া নেই যা আপনাকে অবশ্যই পড়তে হবে। তবে হ্যা, সুন্নাহ অনুসারে আপনি অন্যান্য দোয়া করতে পারেন, সেক্ষেত্রে যিনি সুন্নাত পালন করছেন, তিনি সুন্নতের সওয়াব পাবেন, ইনশাল্লাহ। আর সুন্নত পালনের মর্তবা অনেক উপরে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'লা ইরশাদ করেছেনঃ
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে প্রকৃতভাবে আল্লাহর-ই আনুগত্য করে (সূরা নিসাঃ৮০)
হজ্জের সফরে প্রতিটি কাজে আমরা চেষ্টা করবো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম কে অনুসরণ করার। যেমন তাওয়াফ এর সময় রুকনে ইয়ামীনী কর্ণার থেকে হাজরে আসওয়াদ এ যাওয়ার সময় রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম থেকে নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ার বর্ণনা রয়েছেঃ (আবু দাঊদ, ১:২৬০/ বাইহাকী, ৫:১৩৭)
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ [البقرة :201]
নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম) যে সকল দোয়া পড়তেন তা পরবর্তী পর্বগুলোতে আসবে, ইনশাল্লাহ। এবার জেনে নেয়া যাক সেই দুআ সম্পর্কে যেটা হজ্জের সফরে অবশ্য পাঠ্য। এই দুআটি অনেকেই ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে মুখস্তও করে ফেলেন! দুআটিকে বলা হয় "তালবিয়া"। বুখারী (১:১১০), মুসলিম (১:৩৭৫), তিরমিযী (১:১৬৯) ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে বর্ণীত তালবিয়ার শব্দগুলো নিম্নরূপঃ
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَشَرِيْكَ لَكَ
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাই্কা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়া'মাতা লাকাওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক। অর্থঃ আমি উপস্থিত আয় আল্লাহ! আমি উপস্থিত, আমি উপস্থিত, আপনার কোন শরীক নাই, আমি উপস্থিত; নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নিয়ামত আপনারই, আর রাজত্বও আপনার; আপনার কোন শরীক নাই। (এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলা হরফে তালবিয়ার উচ্চারণ লিখলে অর্থ ও উচ্চারণ বিকৃত হয়ে যায়, এ জন্যে বাংলায় উচ্চারণ পড়ার চেয়ে আরবী থেকে সরাসরি পড়ে নেয়া উচিত। কেউ আরবী পড়তে না পারলে বিশুদ্ধরূপে পাঠকারী থেকে শুনে শুনে তালবিয়া শিখে নিতে সচেষ্ট হবেন। ) তালবিয়া পড়ার ফযীলতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখনই কোনো মুসলিম (হজ্জ বা উমরাহ'র জন্য) তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ডান ও বাম দিকে পৃথিবী শেষ সীমা পযর্ন্ত যত পাথর, বৃক্ষ ও মাটির চাকা রয়েছে, সব কিছুই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করে। (তিরমিযী, ১:১৭০/ইবনু মাজাহ, পৃঃ ২০৯) এই দুআটি'র অর্থের দিকে যদি খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন এই দোয়ার মাধ্যমে আপনি আল্লাহ'র কাছে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে সমর্পণ করছেন। বান্দা এই দোয়ার মাধ্যমে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন পরম করুণাময়ের কাছে। এই দোয়ার মাধ্যমে আপনি সেই স্বত্তার কাছে নিজেকে উপস্থিত করছেন, এই বিশ্ব-চরাচরের সমগ্র রাজত্ব যার অধীনে। সেই স্বত্তার কাছে আপনি উপস্থিতি জানাচ্ছেন যার জন্যেই সকল প্রশংসা এবং সকল নিয়ামত যার কাছ থেকেই আমরা পেয়ে থাকি। দোয়াটি পাঠ করার সময় শুধু গড়গড় করে উচ্চারণ না করে, "নিজেকে আল্লাহ তা'লার কাছে বিনীত ভাবে সমর্পণ করছি এবং তার অপার মহিমা ঘোষণা করছি" এই উপলদ্ধি ধারণ করা জরুরী। তালবিয়া পড়ার বিস্তারিত মাসায়িল আরেকটি লেখায় প্রকাশ করা হবে। তালবিয়া ব্যাতীত হজ্জের কার্যাবলীর মাঝে এমন কোনো দুআ নেই, যা না পড়লে হজ্জ হবেই না। কাজেই আরবী দুআ পড়তে না পারলে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, নিরুৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে দোয়া করতেন আমরাও সেভাবে দোয়া করার চেষ্টা করবো। এবং আল্লাহ তা'লা অবশ্যই আপনার জন্যে তা সহজ করে দিবেন। দুআ শিখে নিতে কেউ কেউ দেখা যায় তাওয়াফ ও সায়ীর সময় বই নিয়ে যান এবং বিভিন্ন বইয়ে বর্ণীত তাওয়াফ ও সায়ীর "প্রতি চক্করের" জন্যে "ভিন্ন ভিন্ন" দুআ বই দেখে পড়তে থাকেন। কেউ কেউ না বুঝে অতি কষ্টে এই দোয়া পড়তে গিয়ে অযথাই সমস্যার সম্মুখীন হন । বই দেখে বা অন্যের মুখে উচ্চারণ শুনে অশুদ্ধ উচ্চারণে দুআ পড়ে, তার চেয়ে নিজ ভাষায় দু'আ করাই উত্তম। নিশ্চয়ই আল্লাহ পৃথিবীর সকল ভাষায়ই বোঝেন। অবশ্য কারো যদি আরবী কোন দুআ মুখস্ত থাকে এবং বিশুদ্ধভাবে তা পড়তেও পারে, তবে "অর্থের" প্রতি লক্ষ্য রেখে তা পড়াই ভাল। (আহকামে হজ, পৃঃ৫০-৫১) দু'আ'র সময় করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আরেকটি লেখায় লিখবো, ইনশাল্লাহ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, সহীহ ভাবে তাকে স্মরণ করার এবং তার প্রণীত নিয়মাবলী মেনে চলার তৌফিক দান করুন।