(প্রিয় টেক) কিছুদিন আগে ডিগোর একটি ফিচার বার ফোন নিয়ে লিখেছিলাম। যেহেতু বর্তমানে স্মার্টফোনের যুগ চলছে তাই আমার ধারণা ছিল প্রযুক্তি পাঠকদের কাছ থেকে বা মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে লেখাটিতে ততটা সারা পাবনা যেরকমটা স্মার্টফোন নিয়ে লিখলে পাওয়া যায়। তবে পাঠকরা বা ব্যবহারকারীরা আমার এই ভুল খুব সহ্যেই ভেঙ্গে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি এপর্যন্ত যতগুলো স্মার্টফোন রিভিউ করেছি সেগুলোর চাইতেও পাঠকের সারা পেয়েছিলাম সেই লেখাটিতে। স্মার্টফোনের যুগেও যে ব্যবহারকারীরা সেকেন্ডারি ফোন হিসেবে ফিচারফোনকে কতটা প্রাধান্য দিচ্ছেন তা আমার আপনাদের সারা থেকে বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি। আর তাই ডিগো এন২৪১ মোবাইলটির পর আজ রিভিউ করতে বসেছি প্রতিষ্ঠানটির সর্বাধিক বিক্রিত এবং চমৎকার একটি মোবাইল ফোন ডিগো  পি২৪১ মোবাইলটি নিয়ে। 

প্রথম দেখাতে একটি ছোট খাট ইটের টুকরোর মত মনে হলেও ডিভাইসটির এই ডিজাইনের পেছনের কারণ এবং উদ্দেশ্য জানার পর আশা করি আপনার আর এই ডিজাইনের উপর কোন আক্ষেপ থাকবে না। নেপালের সর্বশেষ শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপুল পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতির পরই মূলত চীন এই উদ্ভাবনী ফোনটি তৈরি করে। ডিভাইসটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন যে কোন পরিস্থিতিতেই এটি সর্বোচ্চ সেবা-দানে সক্ষম হয়। রেডক্রিসেন্ট এই ইমার্জেন্সি ফোনটির প্রায় ১ লাখ ইউনিট সহায়তার উদ্দেশ্যে সে সময় নেপাল পাঠিয়েছিল। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে ফোনটির ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাংলাদেশে সবার আগে এ ধরণের ইমার্জেন্সি ফোন বাজারে নিয়ে এসেছে ডিগো মোবাইল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এই ফোনটিকে পাওয়ার হাউজ মোবাইল নামেও ফিচার করছে! কেন এই ফোনকে ইমার্জেন্সি, এসওএস এবং পাওয়ার হাউজ মোবাইল বলা হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনি কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারবেন! চলুন, কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক আজকের রিভিউ! 

প্রথমেই আন-বক্সিং দিয়ে শুরু করা যাক আজকের রিভিউটি! 

(ডিগো পি২৪১, র‍্যাডিয়াম জ্যাকেট সহ) 

 

আন-বক্সিং 

মোবাইলটির বক্স খুললে আপনি যে সকল এক্সেসরিজ পাবেন সেগুলো হচ্ছে, 

  • একটি ডিগো পি২৪১ মোবাইল হ্যান্ডসেট 
  • একটি ৭,৫০০ মিলি অ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি 
  • ডাটা এবং থ্রি-ইন ওয়ান চার্জিং ক্যাবল  
  • একটি ট্র্যাভেল চার্জার 
  • মোবাইলের ব্যাক পার্ট খোলার জন্য একটি স্ক্রু ড্রাইভার
  • একটি র‍্যাডিয়াম জ্যাকেট 
  • একটি এলইডি ইউএসবি লাইট 
  • একটি এসওএস ম্যানুয়াল 
  • একটি ফোন ম্যানুয়াল এবং 
  • একটি ওয়ারেন্টি কার্ড 

(ফোনটির সাথে আসা এক্সেসরিজ) 

স্পেসিফিকেশন 

DiGo ব্র্যান্ডের P241মডেলের ফিচার ফোনটিতে রয়েছে একটি ২.৪ ইঞ্চি আকারের কিউভিজিএ ডিসপ্লে প্যানেল, একটি রিয়ার ভিজিএ ক্যামেরা, শক্তিশালী একটি টর্চ লাইট। এই ফোনটিতে আপনি প্রায় ১৬ গিগাবাইট পর্যন্ত মাইক্রো এসডি কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন। ২জি সাপোর্টেড এই ফোনটিতে ২টি রেগুলার সিম স্লট রয়েছে। এই ফিচার ফোনটিতে বক্স স্পিকার যুক্ত করা হয়েছে বলেই দাবী করে প্রতিষ্ঠানটি। P421 মডেলের এই ফোনটিতে রয়েছে একটি ৭,৫০০ মিলি অ্যাম্পিয়ারের একটি রিমুভাল ব্যাটারি ইউনিট। পাশাপাশি, ফোনটিতে আপনি জিপিএস, এসওএস, ব্লুটুথ, ওয়্যারলেস এফএম সুবিধাগুলোও উপভোগ করতে পারবেন। 

 

পারফর্মেন্স 

যেহেতু এটি একটি ফিচার ফোন তাই ডিসপ্লে কোয়ালিটি বা ডিজাইন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করাটা কিছুটা বোকামি হবে, তাই শুধুমাত্র এই ফোনটি যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে আমরা সেই দিকগুলো বিবেচনা করেই মোবাইলটির পারফর্মেন্স নির্ণয় করতে চেষ্টা করব। তবে আপনাকে এটুকু বলতে পারি যে এর ডিসপ্লে ইউনিটটি বেশ উজ্জ্বল এবং যথেষ্ট ডিসেন্ট আউটপুট দিতে সক্ষম। 

 

আগেই বলে রাখছি ডিভাইসটিতে একটি রিয়ার ক্যামেরা যোগ করা হলেও তাতে চমৎকার কোন আউটপুট পাবেন না আপনি। আর পরিষ্কার ভাষায় বললে একটি ইমার্জেন্সি ফোনে নিশ্চয়ই আপনি ক্যামেরা কোয়ালিটি নিয়েও ভাববেন না, তাই না? 

মোবাইল ফোনটির মূল পারফর্মেন্স হচ্ছে এতে যুক্ত থাকা শক্তিশালী ব্যাটারি ইউনিটটি। একটু কল্পনা করুন, একটি ফিচার ফোনে ৭,৫০০ মিলি অ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি যুক্ত করা হলে সেটা এক চার্জেই কতদিন ব্যাক-আপ দিতে সক্ষম হতে পারে? প্রতিষ্ঠানটির মতে এটি এক চার্জেই প্রায় ২৯ দিন টানা ব্যাক-আপ দিতে সক্ষম! অবাক হচ্ছেন? না, অবাক হওয়ারও তেমন কিছু নেই কেননা ফিচার ফোনগুলোতে না আছে কোন ব্যাটারি হাংরি অ্যাপলিকেশন আর না আছে কোন শক্তিশালী চিপ!  বরং, আপনি এই ডিভাইসটির ব্যাটারি ব্যাবহার করে একইসাথে ৩টি মোবাইল চার্জ করতে পারবেন! অর্থাৎ এই ইমার্জেন্সি ফোনটি ব্যবহার করলে আপনাকে আর বাড়তি কোন পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখতে হবেনা! এই ইমার্জেন্সি ফোনটিই আপনার প্রাইমারি ডিভাইসকে চমৎকার সাপোর্ট দিয়ে যাবে অনায়াসে। 

(সেটটি থেকে ব্যাটারি খুলেও আপনি শুধুমাত্র ব্যাটারিটিকে পাওয়ার ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।)

 

মোবাইলটিতে যুক্ত করা হয়েছে একটি শক্তিশালী টর্চ আলো, সাধারণত আপনারা যারা ৩ ব্যাটারির টর্চ আলাদা ব্যবহার করে থাকেন তারা এই ডিভাইসটি থেকে সেরকমই আলো পাবেন। চমৎকার বিষয় হচ্ছে, এই টর্চটির জন্য মোবাইলটির ডান দিকে একটি আলাদা ডেডিকেটেড ফিজিক্যাল স্লাইডার দেয়া হয়েছে। তাই অন্যান্য মোবাইলের মত কীবোর্ড চেপে বা মেন্যু থেকে খুঁজে বের করে টর্চ অপারেট করার ঝামেলা এই ডিভাইসটিতে নেই। 

 

আপনি যদি একজন সংগীত প্রেমী হয়ে থাকেন তবে এটি হতে পারে আপনার জন্য একটি আদর্শ ডিভাইস। মোবাইলটিতে বক্স স্পিকার ব্যবহার করা হয়েছে যার মাধ্যমে আপনি বেশ জোড়াল সাউন্ডে গান প্লে করতে পারবেন। এফএম রেডিও শুনতে যারা ভালোবাসেন তাদের জন্য এতে যুক্ত করা হয়েছে ওয়্যারলেস এফএম ফিচার যার মাধ্যমে কোন রকমের হেডফোনের সহায়তা ছাড়াই আপনি এফএম রেডিও উপভোগ করতে পারবেন। 

মোবাইলটির আরও একটি চমৎকার সংযোজন হচ্ছে এর এসওএস ফিচার! ইমার্জেন্সি মুহূর্তে ফোনটির এসওএস ফিচারের মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত পাঁচজন ব্যক্তির কাছে স্বয়ংক্রিয় ফোন ও এসএমএস চলে যাবে। বিপদে পড়লে তীব্র আওয়াজের প্যানিক অ্যালার্ম ব্যবহার করে সাহায্য নেওয়া যাবে। বয়স্করা এসব সেবা ব্যবহার করে সহায়তা নিতে পারবেন। 

আন-বক্সিংএর অংশটুকুতে বলেছিলাম একটি ইউএসবি এলইডি লাইটের কথা, মনে আছে? হ্যাঁ, ডিভাইসটির সাথে একটি ইউএসবি এলইডি লাইট যুক্ত করা হয়েছে যার আলো বেশ ভালো এবং আপনি জরুরী মুহূর্তে এটি ব্যবহার করে পড়ালেখার কাজও চালিয়ে নিতে পারবেন খুব সহজে। অন্যদিকে এটি একটি ইউএসবি এলইডি লাইট হবার কারণে মোবাইলটি ছাড়াও যে কোন ইউএসবি পোর্টে এটি যুক্ত করেও লাইটের সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। 

(এলইডি লাইটটি বেশ কাজের) 

এন্টারটেইনমেন্টের জন্য ফোনটিতে একটি পাজল গেম এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাও আছে। 

(একটি পাজল গেম) 

তাহলে দেখা যাচ্ছে, চমৎকার এই ফিচার ফোনটি যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে সেগুলোর পারফর্মেন্স বেশ ভালো! এককথায় ডিভাইসটিকে আপনি পাওয়ার হাউজ, এসওএস ডিভাইস বা ইমার্জেন্সি ফোন যে নামেই ডাকুন সেই নামকরণগুলো সার্থক হবে! 

 

ভালো এবং মন্দ দিক 

প্রতিটি ইলেক্ট্রনিকস ডিভাইসেরই ভালো এবং মন্দ দিক থাকে। যদিও, স্বল্প মূল্যের এই ফিচার ফোনটির ভালো এবং মন্দ দিক বিবেচনা করতে যাওয়া বোকামির মধ্যে পড়ে তবে যেহেতু রিভিউ করতে বসেছি তাই লিখেই দিচ্ছি। 

 

ভালো দিক সমূহ 

  • চমৎকার ব্যাটারি লাইফ - নিঃসন্দেহে এই ফোনটির ব্যাটারি লাইফ বেশ ভালো। প্রতিষ্ঠানটির কথামত এটি সত্যিই ২৯ দিন একটানা সাপোর্ট দিতে সক্ষম হবে কিনা তা পরীক্ষা করার সময় আমি পাইনি! তবে খাতা কলমের হিসেবে প্রায় ১ মাস না হলেও ২০ দিনের উপর অবশ্যই ব্যাক-আপ দিতে সক্ষম হবে ডিভাইসটি। আর যদি সত্যিই তাই হয় তবে সেটাও বা কম কী বলুন? 
  • পাওয়ার ব্যাংক - আগেই লিখেছি, ডিভাইসটির মাধ্যমে আপনি একই সাথে ৩টি ডিভাইস চার্জ দিতে সক্ষম হবেন। তাই লম্বা ভ্রমণের ক্ষেত্রেও এটি চমৎকার সাপোর্ট দিয়ে যাবে। 
  • শক্তিশালী টর্চ - ডেডিকেটেড বাটন সহ এতে যে শক্তিশালী টর্চ যুক্ত করা আছে তা একটি ডেডিকেটেড টর্চ ব্যবহারে ঝামেলা কমিয়ে দেবে। বিশ্বাস করুন, এরকম শক্তিশালী টর্চ আপনি পূর্বে কখনোই কোন মোবাইলে দেখেননি। 

(শক্তিশালী টর্চ, আছে ডেডিকেটেড স্লাইডার বাটন) 

  • রেডিয়াম জ্যাকেট - অন্ধকারে এই রেডিয়াম জ্যাকেট জ্বলে, ফলে এটি খুঁজে পেতেও আপনার সমস্যা হবেনা। 

(র‍্যাডিয়াম জ্যাকেট) 

  • ওয়্যারলেস এফএম - এফএম প্রেমীদের জন্য এটি একটি চমৎকার ফিচার। আপনি যখন খুশি, যেখানে খুশি ইচ্ছেমত কোন রকম হেডফোনের ঝামেলা ছাড়াই এফএম রেডিও উপভোগ করতে পারবেন। 

(ওয়্যারলেস রেডিও) 

বক্স স্পীকার - বক্স স্পীকার থাকার কারণে এটি বেশ জোড়াল শব্দ করে ফলে এফএম রেডিও এবং মিউজিক হ্যান্ডস ফ্রি শুনে আনন্দ পাবেন। 

এসওএস এবং প্যানিক অ্যালার্ট - নিরাপত্তায় বেশ কাজে আসার মত ফিচার দুটি সত্যিই বেশ চমৎকার! মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশীরভাগ স্মার্টফোনেও ডিফল্ট ফিচার হিসেবেও এগুলো থাকেনা। 

(এসওএস বাটন) 

এলইডি লাইট - এলইডি লাইটটি বেশ কাজের। 

সম্পূর্ণ বাংলা সাপোর্ট - ফোনটি সম্পূর্ণ বাংলা সাপোর্টেড একটি ডিভাইস। ফলে প্রবীণদের বা অল্প শিক্ষিত মানুষদের জন্যেও অপারেট করা বেশ সহজ হবে বলেই আমি আশা করছি। 

 

খারাপ দিক সমূহ 

ডিজাইন - এটি বেশ বড় আকারের একটি মোবাইল এবং হাতে ধরলে কিছুটা অদ্ভুত মনে হবে আপনার কাছে। তবে, এই বড় আকারের কারণ এর শক্তিশালী ব্যাটারি ইউনিটটি। শক্তিশালী ব্যাটারি এবং পাওয়ার ব্যাংক হিসেবে মোবাইলটিকে তৈরি করতে গিয়ে সম্ভবত কিছুটা বড় আকারের ডিজাইন করতে প্রতিষ্ঠানটি বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি এর বিল্ড কোয়ালিটিও বেশ চমৎকার, তাই সব মিলিয়ে এই খারাপ দিকটির দিকে আঙুল তোলাটাও কিছুটা বোকামি! 

(ব্যাটারির জন্যেই বেঢপ আকারে তৈরি করতে হয়েছে ডিভাইসটিকে!) 

 

সিদ্ধান্ত 

আপনার যদি সেকেন্ডারি ফোন হিসেবে একটি ফিচার ফোন দরকার হয় বা আপনি যদি সত্যিই একজন এডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ হয়ে থাকেন তবে নিঃসন্দেহে মাত্র ২৬৯০ টাকার এই ডিভাইসটি আপনার জন্য একটি আদর্শ ডিভাইস। ফোনটির গড়ন বাদ দিলে সত্যিই একটি ফিচার ফোনের 'চমৎকার ডিভাইস' হওয়ার জন্য যেসব যোগ্যতার দরকার হয় সেসব গুণই এর মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি এতে যে সকল ইমার্জেন্সি ফিচার যোগ করা হয়েছে সেগুলোও অভাবনীয়! এক কথায় ভেবে দেখলে ২৬৯০ টাকার এই ফোনটি কিনে একজন ব্যবহারকারীর কোন দিক দিয়েই ঠকা হবেনা। 

প্রাপ্তিস্থান 

ডিগো মোবাইলের এই মডেলটি কিনতে চাইলে আপনার জন্য সবচাইতে সহজ হবে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করা।