‘মানবিকতার পরীক্ষায় বিশ্ব কি উত্তীর্ণ হতে পারবে?’

জীবন বাজি রেখে ছোট ছোট নৌকায় করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ গমনকারী হাজার হাজার অভিবাসীরা পুরো বিশ্বকে এক মানবিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে’ বলেছেন ইন্টারন্যা্শনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান এলহাজ অ্যাস সাই। ‘শুধুমাত্র আমাদের মানবতার পরীক্ষা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি উত্তীর্ণ হতে পারবো?’বিশ্বনেতাদের কাছেই হয়তো প্রশ্ন রাখেন তিনি।

আরিফ আরমান বাদল
সহ-সম্পাদক, বিজনেস এন্ড টেক
প্রকাশিত: ২১ মে ২০১৫, ১৭:৫৭ আপডেট: ১৪ জুন ২০১৮, ০০:২৭
প্রকাশিত: ২১ মে ২০১৫, ১৭:৫৭ আপডেট: ১৪ জুন ২০১৮, ০০:২৭

(প্রিয়.কম) ‘জীবন বাজি রেখে ছোট ছোট নৌকায় করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ গমনকারী হাজার হাজার অভিবাসীরা পুরো বিশ্বকে এক মানবিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে’ বলেছেন ইন্টারন্যা্শনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান এলহাজ অ্যাস সাই। ‘শুধুমাত্র আমাদের মানবতার পরীক্ষা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি উত্তীর্ণ হতে পারবো?’ সম্প্রতি এশিয়াতে অভিবাসন বিষয়ক এক সম্মেলন শেষে জেনেভায় এসে এ.এফ.পিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাতকারে বিশ্বনেতাদের কাছেই হয়তো প্রশ্ন রাখেন তিনি। জীবনের স্রোতে কফিনে ভেসে যাওয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অভিবাসী জীবনের ভয়াবহ জীবন বাস্তবতা উঠে আসে ওই একান্ত সাক্ষাৎকারে। ‘সমগ্র বিশ্বে বিরাজিত সহিষ্ণুতা, উদারতা, অকপটতা এবং সংহতির এক বড় পরীক্ষা হবে এবার।’ বলেন তিনি। থাইল্যান্ডের মানব পাচার সিন্ডিকেটের শিকার প্রায় ৩ হাজার অভিবাসী বিগত ১০ দিন ধরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের উপকূলে নৌকাতে ভাসমান অবস্থায় জীবন কাটায়। নৌকায় থাকা এসব ভাসমান অধিবাসীদের উদ্ধারের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়া সরকার এক অভিযান নামানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সরকার এক বিবৃতিতে বলে, মায়ানমারের রোহিঙ্গা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দেওয়া ভুখা ও আশ্রয়হীন বাংলাদেশী অভিবাসীদের ব্যাপারে বিরাজিত নিন্দা-নীতিকে অচিরেই তারা শেষ করবেন। ‘এতগুলো মায়ানমার এবং বাংলাদেশের নাগরিককে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে জেনে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খোঁজার পরিবর্তে এ সিদ্ধান্তটি নেওয়াটা আসলেই অনেক গূরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা আশা করি সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হতে বেশি সময় লাগবে না।’ প্রতিক্রিয়া জানান সাই। জাতিসংঘের সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী ২০১৪ সাল থেকেই ৮৮ হাজারের বেশি মানুষ অভিবাসনের আশায় আন্দামান এবং বঙ্গোপসাগর দিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্র যাত্রা করে। আর এই বছরই ২৫ হাজারের বেশি মানুষ অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্র যাত্রার সময় শুধুমাত্র নিরাপত্তাহীনতার কারণেই প্রায় ১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। তাছাড়া অসাধু মানব পাচারকারীদের হাতে পড়ে মারা গেছে প্রায় ১ হাজারের মত লোক। সাই বলেন, ‘নৌকাগুলোর ভিতরে স্বাস্থ্যকর অবস্থা ভয়ঙ্কর। নারীরা নির্যাতিত হয়। আর শিশুরা জীবনে যা দেখেনি সে সব ভয়ঙ্কর জিনিসের স্বাক্ষী হয়। আপনি জানেন, পুরুষদের সবকিছুই লুন্ঠন করা হয় আর তারা তাদের পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারে না।” তার দাবি, রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দিয়ে তাদের সাহায্য করেছিল। তাদেরকে খাদ্য, পানি এবং আশ্রয়ও দেওয়া হয়েছিল। মানবতা ও মর্যাদা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করার জন্য তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়েছিলো। “পরিস্থিতিই তাদেরকে অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করে। যেমনঃ মায়নমারের রোহিঙ্গা নাগরিকেরা তাদের সরকার কর্তৃক নিগৃহীত হয়।’ স্পষ্ট ভাষায় বলেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই অভিবাসী সমস্যা ইউরোপেও প্রভাব ফেলেছে। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে অভিবাসীদের ঢল ইউরোপীয় দেশগুলোর পাড়ে আসায় ভীতিতে আছেন ইউরোপের দেশগুলো। বিগত ১৮ মাসে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে দেশ পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছে প্রায় ৫ হাজারের বেশি লোক। লিবিয়া থেকে অভিবাসীর এই মহাপ্লাবনের পিছনে থাকা মানব পাচারকারীদের সমুদ্র পথে রুখতে নৌ বাহিনী পাঠানোর জন্য সম্মত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও স্বীকার করা হচ্ছে অভিবাসী মানুষকে ঘিরে গৃহীত সকল অপরাধমূলক কার্যক্রম তাদের জীবনকে ঝুঁকি ও অসহায়ত্বের মধ্যে ফেলে দেবে। কিন্তু সেসব ঝুঁকি মাথায় রেখেই কাজ করতে হবে। সাই জোর দিয়ে বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপে অভিযানের ক্ষেত্রে মানুষের জীবন বাঁচানোই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।” তিনি বলেন, “নৌকা ধ্বংস করা নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। আমাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো কিভাবে আমরা ঐসব অভিবাসীদের পাশে দাঁড়াবো।” অভিবাসী প্রবেশের পরিচিত সমুদ্র পথগুলোতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকর্মী দিয়ে সুরক্ষিত রাখার আহবান জানান তিনি। তাছাড়া অভিবাসী পৌছানোর পর কাঙ্খিত দেশগুলোতে তাদের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা হলো তারা যেন এসব অভিবাসীদের প্রতি মানবিক ও সহানুভূতিশীল হয়।” ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া এসব উদ্বাস্তুদের প্রতি ইউরোপের এই বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাই বলেন, “যারা একটু শান্তি, একটু ভালো থাকবে বলে জীবন বিপন্ন করে সাগর পাড়ি দেয় সেসব মানুষকে সহায়তা করাটা মানবিকভাবে বাধ্যতামূলক। আর এটুকুই ইউরোপের কাছে প্রত্যাশা।” দীর্ঘমেয়াদী ভাবে প্রত্যেক দেশেরই অভিবাসী বিষয়ে আইনগত নিরাপদ উপায় সংযোজন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার আশাবাদ, এতে মানব পাচারকারীর সংখ্যা অচিরেই হ্রাস পাবে।