ছবি সংগৃহীত

‘স্বাধীনতা সংগ্রাম' ভাস্কর্য : বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের ধারক

ভাস্কর্য এক ধরনের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিল্পকলাবিশেষ। বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের তাগিদে বা নিতান্তই সখ্যতাবশত এই ধরনের বহু ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো মূলত একটি দেশের ইতিহাসকে বহন করে থাকে।

farzana rinky
লেখক
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০১৪, ১০:৪০
আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ২০:৫২


ছবি সংগৃহীত
(প্রিয়.কম) : ভাস্কর্য এক ধরনের ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিল্পকলাবিশেষ। বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের তাগিদে বা নিতান্তই সখ্যতাবশত এই ধরনের বহু ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো মূলত একটি দেশের ইতিহাসকে বহন করে থাকে। প্রাচীনকালে মিশরে, গ্রীসে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ভাস্কর্যের ন্যায় বাংলাদেশেও বিগত কয়েক যুগ ধরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্কাল্পচার যেগুলোর বেশিরভাগই বহন করে চলেছে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এমনই একটি ভাস্কর্য হল স্বাধীনতা সংগ্রাম যেটি বাংলাদেশে গড়ে ওঠা সমস্ত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়।

যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছে :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন সড়ক দ্বীপে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারক স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যটি স্থাপিত। ভাস্কর শামীম শিকদার ১৯৮৮ সালে ফুলার রোডে অবস্থিত সেকেলে বাংলো স্টাইলের বাড়ির (বর্তমানে প্রোভিসির ভবন) সামনে পরিত্যক্ত জায়গায় ‘অমর একুশে’ নামে একটি বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ঘরোয়া পরিবেশে প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ শরীফ এটি উদ্বোধন করেন। ১৯৯৮ সালে ওই স্থানে উদয়ন স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ শুরু হলে ভাস্কর্যটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়। ভাস্কর্যটি সড়কদ্বীপে এনে রাখা হয়। পরে ভাস্কর শামীম শিকদার ওই ভাস্কর্যটির অবয়ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আলোকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। একইসঙ্গে সড়ক দ্বীপটিকেও তিনি নিজের মনের মতো গড়ে তোলেন। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন।

যেজন্য গুরুত্বপূর্ণ :

"স্বাধীনতা সংগ্রাম" ভাস্কর্যটি বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করে নির্মিত। এ ভাস্কর্যটি মহান ভাষা অন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬-র স্বাধিকার আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান, ২৫শে মার্চের কালরাত্রি, ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি আন্দোলনে নিহত হয়েছেন এমন ১৮ জন শহীদের মুখাবয়ব দিয়ে পুরো ভাস্কর্য নির্মিত। সবার নীচে ভাষা শহীদের ভাস্কর্য এবং সবার উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্যে আরো তুলে ধরা হয়েছে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীক আমাদের লাল সবুজের পতাকা।

ভাস্কর্যটির বিশেষত্ব :

মূল ভাস্কর্য স্বাধীনতা সংগ্রামকে ঘিরে অরো অনেক ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে এ সড়কদ্বীপে। এখানে মোট ১১৬টি ভাস্কর্য রয়েছে এবং এর সবগুলোই শামীম সিকদারের গড়া। সবগুলো ভাস্কর্যের রং শ্বেত শুভ্র। শ্বেতবর্ণের এ ভাস্কর্যের উচ্চতা ৬০ ফুট। পরিসীমা ৮৫.৭৫ ফুট। একটি গোলাকার ফোয়ারার মাঝখানে এটি উপস্থাপিত। মূল ভাস্কর্য ছাড়া অন্য ভাস্কর্যগুলোর গড় উচ্চতা ৩-৪ ফুট।

যাদের মুখাবয়ব রয়েছে :

মূল ভাস্কর্য স্বাধীনতা সংগ্রামকে ঘিরে রয়েছে দেশ-বিদেশের শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানীর আবক্ষ ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যের কোনোটি একক, কোনোটি যুক্ত। কারো কারো ভাস্কর্য অপূর্ব ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত। এখানে রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জগদীশ চন্দ্র বসু, মাইকেল মধুসুদন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত, ড. মোঃ শহীদুল্লাহ, শিল্পী সুলতান, জিসি দেব, সুভাস বোস, কামাল আতাতুর্ক, মহাত্মা গান্ধী, রাজা রামমোহন রায়, মাও সে তুং, ইয়াসির আরাফাত, কর্ণেল ওসমানী, তাজউদ্দিন আহমেদ, সিরাজ সিকদার প্রমুখের প্রতিকৃতি রয়েছে। ভাস্কর শামীম সিকদারেরও দুটি প্রতিকৃতি রয়েছে। আরও রয়েছে একটি হাতির চিত্তাকর্ষক ভাস্কর্য। আসুন এই ভাস্কর্যের কিছু ছবি দিয়ে চিনে নেই কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে।
উপরের ছবিটি আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের যিনি নিজের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতিকে স্বাধীন দেশে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন।
আহমদ ছফা। একজন বাংলাদেশী লেখক, কবি এবং সমাজবিজ্ঞানী। যিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশী জাতিসত্ত্বার পরিচয় নির্ধারণ করেছেন।
রাউফুন বসুনিয়া, জাতীয় ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক। যিনি ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৎকালিন সরকারের পেটুয়া বাহিনী মিছিলে গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন ।
মহাত্মা গান্ধী, পুরো নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার লড়াইয়ের অধিনায়ক।
ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রেখেছেন অসামান্য অবদান।
হুমায়ুন আহমেদ, বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্প-কবিতা লেখার জন্য বিখ্যাত।
রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। সর্বক্ষেত্রে রয়েছে তাঁর অবদান।
জর্জ হেরিসন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানও অপরিসীম।
সুকান্ত ভট্টাচার্য, তরুণ সাহিত্যিক।
এস.এম.সুলতান বা শেখ মোহম্মদ সুলতান। একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু চিত্র তিনি এঁকেছেন।
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বিংশশতকী ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক, যিনি জীবদ্দশায় ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের মানুষের কাছে 'মজলুম জননেতা' হিসাবে সমধিক পরিচিত
শামীম সিকদার, স্বাধীনতা সংগ্রাম নামের এই ভাস্কর্যটির মহান কারিগর, ভাস্কর। তিনি নিজেই নিজের এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন। ছবি : তানভীর আশিক

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
জিহ্বায় ইস্ট ইনফেকশন হলে কী করবেন?
কে এন দেয়া ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
ভিনদেশি খাবার ‘নাসি গরেং’
রুমানা বৈশাখী ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট