বাংলা বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ফাইল ছবি

যাদের জন্য এলো নববর্ষ, তাদের খবর রাখে কে

আমরা কেউই তাদের কথা ভাবি না, ভাবি না সেই সব মানুষদের কথা- যাদের জন্য আমরা আজ বর্ষবরণ করতে পারছি।

রিফাত কান্তি সেন
সাংবাদিক/কলামিষ্ট
১৫ এপ্রিল ২০১৮, সময় - ১৯:৫৯


বাংলা বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ফাইল ছবি

বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নিদর্শন পহেলা বৈশাখ। নানা রঙে, নানা ঢঙে সেজে আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ছেন শহরকেন্দ্রিক লোকেরা। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান তো মোটেই দেখা যায় না। তবে যে মাটির মানুষগুলোর জন্য এ দিনপঞ্জি সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেছিলেন, সে মানুষগুলোর খবর কি কেউ রাখে?

কর্পোরেট দুনিয়ায় আজ আমরা বন্দী। নামিদামি পোশাক আর চাকচিক্যময় জীবন অতিবাহিত করতেই আমাদের যত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ। নববর্ষে সেলফি আর দামি পোশাক যেখানে মূখ্য বিষয়, সেখানে কৃষকের খবর নেওয়ার সময় কোথায়? কিন্তু যাদের জন্য আমরা আজ এ বর্ষবরণে মেতে উঠতে পেরেছি, সেই কৃষকের কথা কয়জনের মনে পড়ে?

ইতিহাস বলে ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকানুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। ফলে কৃষকরা বিপাকে পড়ে যেতেন। কৃষকদের এ কষ্ট লাঘব করার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশে তৎকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন।

এখন কথা হলো, যাদের জন্য এ বাংলা সনের প্রবর্তন, তাদের খবর কজনে নিয়েছেন? সারা দেশ যখন বর্ষবরণের আনন্দ-উল্লাসে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় কৃষকের ঘরে হয়তো আনন্দের লেশটুকুও নেই। 

এখনো অনেক কৃষক তার ন্যায্য দাবি আদায়ে ব্যর্থ। রাত-দিন পরিশ্রম করে ফসল ফলান মাঠে। সে ফসল বিক্রিতেই চলে তার কষ্টের সংসার। বর্ষবরণে যখন আপনারা লাখ টাকা খরচ করছেন, ঠিক সে সময় হয়তো কোনো কৃষক ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। আমরা কেউই তাদের কথা ভাবি না, ভাবি না সেই সব মানুষদের কথা- যাদের জন্য আমরা আজ বর্ষবরণ করতে পারছি।

বাঙালি জাতি বহু ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই খাঁটিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা বর্ষবরণ করি। আনন্দ-উল্লাস যতই করি না কেন, আমাদের অস্তিত্ব মিশে আছে মা-মাটির সাথে। সে মা-মাটির টান কিন্তু কৃষাণীর ঘরে দেখা মেলে। আজও গ্রাম বাংলায় বর্ষবরণ হয়। তবে সেটা আগের সেই প্রকৃত কৃষাণীর মুখের হাসির মতন নয়! এখন গালে আলপনা মেখে সেলফি তোলার ধুম পড়ে। আর তৎকালে বর্ষবরণ ছিল কৃষকের ঘরে নতুন ফসল আসার উৎসব। চিরায়ত গলাইয়া বাজার, পুতুল নাচ, ঘোড় দৌড়সহ গ্রাম-বাংলার মানুষের মিলনমেলা।

এখন এর উল্টো, বর্ষবরণ বা নববর্ষ পালন করা হয় আধুনিকতার মারপ্যাঁচে। বাহারি রঙের শাড়ি আর ছবি তোলার উৎসবে যেন পুরনো বাংলার যে সংস্কৃতি ছিল, তা প্রায় হারাতে বসেছে। কৃষাণীর মিষ্টি হাসি, নববর্ষের পায়েস- সবই যেন এখন বিলুপ্তির পথে। দিন যত যাচ্ছে, ততই আমরা যান্ত্রিকতায় হারাতে বসেছি আমাদের ঐতিহ্যকে, ভুলতে বসেছি আমাদের সংস্কৃতির সত্যিকারের ধারকদের। যাদের জন্য এ নববর্ষ তাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

নববর্ষে স্মরণ করি খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মুজুরদের। 

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
ক্রিকেটে প্রণয় সমাচার
গাজী মো. রাসেল ১৫ জুলাই ২০১৮
নারী মাত্রই আবেদনময়ী, তাই কী?
জীবেন রায় ১৪ জুলাই ২০১৮
‘আমি নোমান থাকি ওমান’
রাফিউজ্জামান রাফি ১৩ জুলাই ২০১৮
ট্র্যাজেডিতে সহযোগিতা
জীবেন রায় ১১ জুলাই ২০১৮
কূট ও কৌটিল্যনীতি—ইট’স এ গেইম
কাকন রেজা ০৯ জুলাই ২০১৮
ট্রেন্ডিং