অনুস্বরের সাইকেল

বাসায় আফসার সাহেবের ছোট্ট মেয়ে অনুস্বর মায়ের বানানো কেক সামনে নিয়ে বসে আছে অধীর অপেক্ষায়। আজ তার জন্মদিন! তার মন খারাপ, তার জন্মদিনের জন্যে ফুলানো প্রতিটা বেলুনই চুপসে গেছে।

জাহিদ রাজ রনি
Editor-in-Chief at Banglar Amra
১৬ মে ২০১৮, সময় - ২২:৩৮

প্রতীকী ছবি।

(প্রিয়.কম) শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসেও আফসার সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শার্টের কোনা দিয়ে চশমার কাঁচ পরিষ্কার করে হাত কচলাতে কচলাতে আফসার সাহেব কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন, ‘স্যার আমাকে একটা বাচ্চাদের সাইকেল দেয়া যায় আমাকে? হলুদ রঙের, চার চাকা ওয়ালা...’

গ্রুপ অব কোম্পানির পরিচালত শওকত ওসমান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। গত বছরই তিনি তার প্রতিষ্ঠানে এ রকম একটা নিয়ম চালু করেছেন যে, বছর শেষে সার্বিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের সৎ এবং নিয়মিত একজন মানুষকে তিনি পুরস্কৃত করবেন। সেই পুরস্কারের জন্যে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সবচাইতে সৎ মানুষটা পুরস্কার হিসেবে চাচ্ছেন বাচ্চাদের চার চাকার সাইকেল! তার আবার বিশেষত্ব হলো হলুদ রঙ! ৪৭ বছর বয়সি একজন মানুষের মুখে এমন অদ্ভুত পুরস্কারের দাবি শুনে অবাক হলেও শওকত ওসমান বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনি যা চান তাই দেয়া হবে।’

দুদিন পরই অফিসের ঠিকানায় সাইকেল চলে আসে। আজকাল অনলাইনে কেনাকাটার উপায় থাকার ফলে, কত জঞ্জাল মানুষের মাথা থেকে নেমে গেছে। বিকেলে ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শওকত ওসমান সাইকেল তুলে দেন আফসার সাহেবের হাতে। সাইকেল দেখে খুশিই হন আফসার সাহেব। হলুদ রঙ, চার চাকা সবই ঠিক আছে।

প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং কর্মকর্তারা এই চুপচাপ মানুষটাকে কখনো কারও সঙ্গে গভীর আলাপ করতে দেখেনি। তার অধস্তন অনেক কর্মর্তাই তাকে চিনেই না, কারণ এই সহজ মানুষটি কখনো প্রতিষ্ঠানে কোন ব্যাপারেই উচ্চবাক্য করেনি। আফসার সাহেবের সাইকেল নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীরা আড়ালে আফসার সাহেবকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাও করেন। অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, পরেরদিন থেকে হয়তোবা আফসার সাহেবকে বাচ্চাদের ছোট্ট হলুদ রঙের সাইকেলটি চালিয়ে তারা অফিসে আসতে দেখবেন। বাস্তবিক অর্থে দেখা গেল- দিন শেষে আফসার সাহেব তার সাইকেলটি বাসায় নিয়েই যায়নি। অফিসের গ্যারেজের এক কোনাতে পুরনো কাপড় দিয়ে ডেকে যত্নে রেখে দিয়েছেন।

তিনদিন এভাবেই থাকার পর এক সন্ধ্যায় যখন আফসার সাহেব রিকশায় সাইকেল তুলে অফিস থেকে বাসায় রওনা করলেন, বলাবহুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু অতি উৎসাহী কর্মচারী আগামীকাল আফসার সাহেবের সাইকেল চালিয়ে আসা দেখবে বলে, যথা সময়ের পূর্বেই অফিসে আসবে বলেও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে!

সন্ধ্যায় আফসার সাহেব যখন তার গোপীবাগের বাসার সামনে পৌঁছালেন, ফিনফিনে বৃষ্টি হচ্ছে তখন। বাসায় আফসার সাহেবের ছোট্ট মেয়ে অনুস্বর মায়ের বানানো কেক সামনে নিয়ে বসে আছে অধীর অপেক্ষায়। আজ তার জন্মদিন! তার মন খারাপ, তার জন্মদিনের জন্যে ফুলানো প্রতিটা বেলুনই চুপসে গেছে। তা ছাড়া সে সংশয়ে আছে, তার বাবা তার জন্যে সাইকেল কিনে আনবেন কি-না! অনেকদিন আগে, এ রকমই এক সন্ধ্যায় বাবার বুকে শুয়ে অনুস্বর তার এই ষষ্ঠ জন্মদিনে একটা হলুদ সাইকেল চেয়েছিল বাবার কাছে। শুনে মা বলেছেন, বাবার কাছে সাইকেল কেনার মতো টাকা নেই। তাও অনুস্বরের মন বলছে আজ তার বাবা একটা সাইকেল নিয়েই ফিরবেন। হলুদ রঙের, চার চাকার সাইকেল!

 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট