(প্রিয়.কম) চাকরির সুবাদে ঢাকায় ইট-কাঠের দেয়ালে বন্দি জীবন। শুক্র ও শনিবার ছাড়া ছুটি নেই। জীবনের একঘেয়েমি তাড়াতে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। সময়ও কম, মাত্র দুই দিন। এক বন্ধু বলল বিছনাকান্দির দৃশ্য নাকি বর্ষাকালে খুবই সুন্দর থাকে। পরিকল্পনা হলো বিছনাকান্দিতেই যাব। তবে সেখানে গিয়ে এমন সুন্দর, মনোরম ও নৈস্বর্গিক দৃশ্য উপভোগ করবো তা আমাদের কারও কল্পনাতেই ছিল না।

ঘন নীল আকাশ। সামনে সারি সারি পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের কুন্ডলী। নৈকট্যে গেলে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। মেঘের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্ণা। নিচে নেমে জল ও পাথরের সম্পর্কে শাঁ শাঁ শব্দ। সেই জলই আবার মিশে যাচ্ছে পিয়াইনের সাথে। ভরা পিয়াইনের বুকে চলতে চলতে এর দুই পাশের দৃশ্য দেখে বিমোহিত হবেন যে কেউ। পিয়াইনের পরে আকাশে হেলানো উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারির পায়ের কাছেই পাথর বিছানো বিছনাকান্দি। এখানে এসে এমন নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখতে পাবো তা ভাবিনি।

ছবি ও ইউটিউব থেকে বিছনাকান্দির যে সব দৃশ্যগুলো দেখেছি তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি অপরূপ একটি জায়গা। পাথরে ও নদীতে মিতালি। পাথরে মানুষে জীবনযাপনের যুদ্ধ। চারিদিকে বিস্তৃত সবুজ। পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজের জলকেলি। একের পর এক সৌন্দর্য ছাড়িয়ে যেতে থাকে আর এক সৌন্দর্যকে। অভিভূত হওয়া, বিস্ময়, কৌতূহল নিয়ে যে দিকেই তাকাবেন দেখবেন নৈস্বর্গিক অনেক দৃশ্য।1502349172 afcb421dbc913afffed2

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে ট্রেনে যাতায়াত করলে সবচেয়ে ভাল হয়। আপনি কমলাপুর থেকে উপবন এক্সপ্রেস-এ রাতে রওয়ানা দিলে সকালে গিয়ে সিলেট রেলস্টেশনে পৌঁছবেন। তারপর রেল স্টেশন থেকে একটি সিএনজি ভাড়া নিন হাদারপার বাজার পর্যন্ত। বিছনাকান্দি যাওয়ার রাস্তার অবস্থা চরম রকমের বাজে থাকার কারণে সিএনজি বাধারঘাট বাজার রোড হয়ে প্রায় ১০ কিমি ঘুরে যেতে হয়, এই কারণে ভাড়া এখন লোকাল জনপ্রতি ১৫০ টাকা। রিজার্ভ করেও নিতে পারেন, আসা-যাওয়া ১২০০-১৫০০ নিতে পারে। হাদারপার বাজারে সিএনজি থামলেই দেখতে পাবেন নৌকা ঘাট। সেখান থেকে নৌকা রিজার্ভ নিয়ে যেতে হবে।নৌকার ভাড়া আসা যাওয়া ১৫০০ টাকা নিবে। নৌকাই উঠলেই আপনি আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে থাকবেন বিছনাকান্দির অপরূপ সৌন্দর্যে।

কখন যাবেন: সব সময়ই যাওয়া যায় তবে বর্ষায় না গেলে সেখানের আসল সৌন্দর্য আপনি উপভোগ করতে পারবেন না। তাছাড়া বর্ষাকালে বিছনাকান্দি পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। আর বর্ষায় যদি বৃষ্টি থাকে আমার বিশ্বাস আপনি ওখান থেকে খুব তাড়াতাড়ি আসতে চাইবেন না। বর্ষাকাল গেলে নৌকায় যাতায়াত করা যায়, শুকনা মৌসুমে এক থেকে দেড় ঘন্টার মত হাটতে হয় । সত্যিকার অর্থে ছবির থেকে সুন্দর একটি যায়গা।

1502349172 22e92a23f72c5ee42cde

বিছনাকান্দির আশে-পাশের দর্শনীয় স্থান: একটু সময় নিয়ে গেলে বিছনাকান্দির কাছাকাছি আরো কয়েকটি মনোমুগ্ধকর যায়গা ঘুরে আসতে পারেন। বিছনাকান্দির খুব কাছেই পানতুমাই। আরও আছে জলাভূমি রাতারগুল ও পাথরের ঝর্ণা লক্ষণছড়া।

পানতুমাই: ভারতের মেঘালয়ের বুক চিরে অশান্ত জলের বয়ে চলা শিতল কোমল জল এসে শান্ত হয়ে মিশে গেছে বাংলাদেশের মাটিতে। ভরা বর্ষায় এই পানতুমাই এর চেয়ে ভয়াবহ সুন্দর আর কোনো ঝর্ণা হয় কিনা জানা নাই। দুই পাহাড়ের যোগাযোগ রক্ষার্থে ঝর্ণার উপর রয়েছে একটি কালভার্ট যার দৃষ্টিনন্দন লুক ঝর্ণার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়ে বহুগুণে। বিছনাকান্দি ঘুরতে গেলে সাথে করে ঘুরে আসতে পারেন পানতুমাই ঝর্ণা। যেতে হয় নৌকা রিজার্ভ করে। বিছনাকান্দি, লক্ষণছড়া ও পানতুমাই এক সাথে ঘুরে আসার জন্য নৌকা ভাড়া নিবে ১৩০০-১৫০০ টাকা। হাদারপার ঘাট থেকে নৌকায় পানতুমাই যেতে সময় লাগবে ১ ঘন্টার মত। বর্ষায় গেলে পুরো পথ নৌকায় যাওয়া যায়। আর বর্ষা ছাড়া গেলে নৌকা থেকে মাঝে মাঝে নেমে হাঁটতে হবে এবং নৌকা ঠেলতে হবে।

লক্ষণছড়া: পানতুমাই থেকে খুবই কাছে। যেতে আগে লক্ষনছড়ার ঘাট এবং ফিরতে পথে লক্ষণছড়ার ঘাট পড়বে। পানতুমাই ঘুরে ফেরার পথে নেমে যান লক্ষনছড়া দেখতে। ঘাটে নেমে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটতে হবে পাথুরে পথের লুকায়িত এই সৌন্দর্য দেখতে। এর মুল আকর্ষণ ও ভারতীয় সীমানায় পড়েছে। ছড়ার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাতায়াতের জন্য রয়েছে এখানে দারুন কারুকার্যে বানানো একটি ব্রিজ। পাহাড়ি ঢলে নেমে আসে ঝর্ণার পানি সাথে ছোট বড় বহু পাথর। পানি আর পাথর দুই এ লিমে এক অদ্ভুত সুন্দর রুপ দিয়েছে প্রকৃতি এই লক্ষণ ছড়াকে।

রাতারগুল: বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন হিসেবে বিখ্যাত সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেষ্ট। বনের বেশিরভাগ জুড়েই সাপের আবাস বেশি, জোক,বিচ্ছুতেও ভরপুর এই বন। সাদাবক,ময়না,টিয়া,বুলবুলি,কাকাতুয়া, মাছরাঙ্গা সহ বহু পাখির দেখা যায়, শীতকালে বালিহাসের আগমনও হয়। এছাড়াও আছে বহু প্রজাতির গাছ গাছালি।বেত,হিজল, কদম, মুর্তাসহ রয়েছে জলসহিষ্ণু বহু গাছ। ঘুরে দেখার জন্য নৌকা ভাড়া করতে হয়। পাখির চোখে পুরো রাতারগুল দেখার জন্য রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। বর্ষাকাল ছাড়া রাতারগুলের আসল সৌন্দর্য দেখা যায় না। তাই রাতারগুল ঘুরতে চাইলে অবশ্যই বর্ষায় আসতে হবে। বছরের মে-আগষ্ট মাস উপযুক্ত সময় রাতারগুল ভ্রমণের।

বিছনাকান্দি ভ্রমণের কিছু টিপস: ১. একা না গিয়ে গ্রুপ করে যাবেন। তাহলে খরচ অনেক কম পড়বে। ২. বর্ষায় গেলে রেইনকোট অথবা ছাতা নিয়ে যেতে পারেন। ৩. খাবারের দোকান থেকে কোন কিছু কেনার আগে দাম জিজ্ঞাসা করুন। ৪. ভারতীয় সীমানা যেহেতু খুবই কাছে, তাই বর্ডার ক্রসের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

 

ভ্রমণ নিয়ে আপনার যেকোনো অভিজ্ঞতা, টিপস কিংবা লেখা পোস্ট করুন আমাদের সাইটে আর জিতে নিন একজন সঙ্গী নিয়ে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা বিমান টিকেটসহ দুই রাত, তিন দিন অভিজাত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা।
আপনাদের মতামত জানাতে ই-মেইল করতে পারেন [email protected] এই ঠিকানায়।