কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরকে জঙ্গিদের সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) আখতারুজ্জামান। ফাইল ছবি

ছাত্র-পুত্র, ভূপতি স্যার এবং সেলুকাস

একটা ছেলের চোখ লাল দেখলে যে শিক্ষকের হৃদয় কেঁদে ওঠে, পড়াশোনায় একটু খারাপ করলে ছাত্রের চেয়ে নিজের ব্যর্থতাটাকে বড় করে দেখেন, কই সে বিদ্বান শিক্ষকেরা?

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৮, ২১:২১ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৬:০০


কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরকে জঙ্গিদের সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) আখতারুজ্জামান। ফাইল ছবি

এক.

শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায়, সাথে শিক্ষকও হওয়া যায়, কিন্তু বিদ্বান হওয়া যায় কি? আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন ভূপতি স্যার। পড়া না পারলে মারতেন, আমার ভাগ্যে অবশ্য মার জোটেনি, কিন্তু তিনি মারতেন। প্রথমে প্রচণ্ড শব্দে একটা বেতের বাড়ি দিতেন টেবিলে, তারপর হাত পাততে বলতেন। হাতে যে মার পড়তো, তাতে হাতের চেয়ে বেত কষ্ট পেত বেশি, হাসতে হাসতে ছাত্ররা ফিরে যেত বেঞ্চে। কোনো ছাত্রের চোখ লাল, অস্থির হয়ে যেতেন স্যার। থার্মোমিটার খুঁজে পেতে জ্বর মাপা শেষ। থার্মোমিটারের পারদ নব্বইয়ের উপরে উঠলে সোজা ক্লাস থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া। সন্ধ্যায় আবার নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসা। ব্যাকবেঞ্চারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ-খবর নেওয়া, এই ছিল সেই মহান শিক্ষকের কাজ।

আরেকজন ছিলেন, ছাত্রদের বোঝাতেন, না পারলে সেই ছাত্রের কপালে চক দিয়ে ক্রস আঁকতেন। এভাবে তিনবার ছাত্রের কপালে ক্রস আঁকার পর চতুর্থবার আঁকতেন নিজ কপালে। বলতেন তিনবারেও যখন বোঝাতে পারিনি, এ ব্যর্থতা আমার। নমস্য, বিদ্বান সেসব মানুষ। তাদের নামের পূর্বে কোনো ডক্টরেট বা অধ্যাপকের তকমা ছিল না, কিন্তু নিশ্চিত তারা শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়ে কথা হচ্ছে। তিনি তার ছাত্রদের কার্যক্রমের কোনো অংশকে জঙ্গিসম অভিধায় অভিসিক্ত করেছেন। এতে অধ্যাপক আলী রিয়াজ চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, ‘সুজন’ আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে, আরও অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন, ভর্ৎসনা করেছেন। এসব দেখতে বারবার আমার ভূপতি স্যারের চেহারা ভাসছিল। কী দায়িত্ববোধ, কী মমত্ব!

একটা ছেলের চোখ লাল দেখলে যে শিক্ষকের হৃদয় কেঁদে ওঠে, পড়াশোনায় একটু খারাপ করলে ছাত্রের চেয়ে নিজের ব্যর্থতাটাকে বড় করে দেখেন, কই সে বিদ্বান শিক্ষকেরা? এখনকার অনেক শিক্ষকই শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাদের কেউ কেউ বিদ্যা অর্জন করেননি। তাই তারা শিক্ষিত হয়েছেন, বিদ্বান হননি। শুধু শিক্ষা দিয়ে একজন মানুষ প্রকৃত শিক্ষক হতে পারেন না, তাকে বিদ্বান হতে হয়। শেখা নয়, অর্জিত বিদ্যা একজন মানুষকে মানবিক হতে শেখায়। শিক্ষকের মানবিক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সে অনুযায়ী ‘কাল’ তথা সময়ই বিচার করবে আলোচিত ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব কতটুকু মানবিক হতে পেরেছেন, পেরেছিলেন। ‘কাল’ শব্দের দুটি অর্থ, একটি তো সময়, অন্যটি ব্যবহৃত হয় ‘বিনাশ’ অর্থে। ‘কাল’ মানবিকতা ধরে রাখে, অমানবিকতাকে ‘বিনাশ’ তথা বিস্মৃত করে।

দুই.

শিক্ষকের কাছে ছাত্র আর পুত্রের কোনো তফাৎ নেই এবং করতেও নেই। একজন পিতা ও একজন শিক্ষকের পুত্র ও ছাত্রের কাছে হার হলো সবচেয়ে আনন্দের। এসব কথা এখন কেমন যেন অর্থহীন লাগে! একজন শিক্ষক যখন তার পুত্র ও কন্যাসম শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক কার্যক্রমকে বলেন জঙ্গিসম, তখন সকল অর্থই হীন হয়ে যায়। আরেকজন কিম্ভুত টাইপ পিতার কথা বলি। আমি সাধারণত কাউকে গালি দেই না এবং গালি-গালাজ জিনিসটাকে সভ্যতার খেলাপ মনে করি। কিন্তু মনে মনে প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল এই পিতাটিকে গালি দেওয়ার। কিন্তু রুচি আর অর্জিত বিদ্যার আপত্তিতে সম্ভব হলো না। সেই পিতাটি হলেন ‘আমজাদ হোসেন মোল্লা’, জার্মানির পাঁচ কিলোমিটার পতাকা বানিয়ে যিনি মাধ্যমের কল্যাণে খ্যাত। সেই গণমাধ্যমই জানিয়েছে সেই আমজাদ মোল্লার বয়ানে যে, তিনি তার তিনটি সন্তানের মৃত্যুতেও ততটুকু কষ্ট পাননি, যতটুকু পেয়েছেন জার্মানির পরাজয়ে। আহারে পিতা, এমন পিতায় পিতৃত্ব ‘ধরণীর দ্বিধা’ মাগে, গালিগুলো মাগে জিহ্বার অনুমতি।

ধৈর্যশক্তির পরীক্ষায় স্বীয় জিহ্বা অনুমতি না দিলেও ‘আমাদের সময় ডটকমে’ প্রকাশিত খবরটির কমেন্টের জায়গায় অনেকেই ধৈর্যের স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। কোন দেশে আছি আমরা? দেশপ্রেম তো ফুটবলের হুজুগে বাঁশে। পতাকা বিষয়ে হাইকোর্টের রুল জারি করতে হয়। পিতৃপ্রেম তো দেখালেনই আমজাদ মোল্লা। ছাত্রপ্রেমও দেখাতে বাদ রাখলেন না ভিসি মহোদয়। সেলুকাস’কে ডেকে আলেকজান্ডার বলেছিলেন, কী বিচিত্র এই দেশ। আমরা যাই কোথা, কাকে ডেকে বলি!

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট