(বাম থেকে) মরোক্কোর মেধি বানটিয়ার, সেনেগালের এমবায়ে নিয়াং, পর্তুগালের রাফায়েল গুয়েরেইরো, সেনেগালের মুসা সো; সবার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে।

ফ্রান্স কীভাবে এত ‘বিশ্বকাপ ফুটবলার’ তৈরি করে?

এবারের বিশ্বকাপে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলা ৫০ জন ফুটবলারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে।

মিজানুর রহমান
সহ-সম্পাদক
১১ জুলাই ২০১৮, সময় - ১৫:৩২


(বাম থেকে) মরোক্কোর মেধি বানটিয়ার, সেনেগালের এমবায়ে নিয়াং, পর্তুগালের রাফায়েল গুয়েরেইরো, সেনেগালের মুসা সো; সবার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে।

(প্রিয়.কম) এই বিশ্বকাপে পর্তুগাল বনাম মরক্কো ম্যাচের দিকে নজর ফেরানো যাক। ম্যাচটি পর্তুগাল ১-০ গোলে জিতে নিয়েছিল। এ ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও খেলোয়াড়দের জন্মস্থানের তথ্য বেশি মজার। নিচের ছবিটি ওই ম্যাচের একটি মুহূর্তের। ৫ নম্বর জার্সি পরিহিত পর্তুগালের খেলোয়াড় রাফায়েল গুয়েরেইরোর জন্ম পর্তুগালে নয়, আবার মরক্কোর ৪ ও ৫ নম্বর জার্সি পরিহিত খেলোয়াড় যথাক্রমে ম্যানুয়েল ডা কস্তা ও মেধি বানাটিয়ার জন্মও মরক্কোতে নয়!

বিশ্বকাপে পর্তুগাল বনাম মরক্কো ম্যাচের একটি মুহূর্ত।

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিয়ম অনুসারে ফুটবলাররা তাদের রক্তের আত্নীয়, যেমন বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানির দেশের হয়ে ফুটবল খেলতে পারবেন। এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপে এমন ৮২ জন ফুটবলার আছেন, যারা তাদের জন্মভূমির পক্ষে না খেলে অন্য দেশের হয়ে খেলেছেন। কিন্ত এ ফুটবলাররা কোন দেশ থেকে আসছেন? কারা এত বেশি সংখ্যক বিশ্বকাপ ফুটবলার তৈরি করে?

বিশ্বকাপের সব ফুটবলারের জন্মভূমির তথ্য সংগ্রহ করলে একটা দেশের নামই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সেটি হচ্ছে ফ্রান্স। এবারের বিশ্বকাপে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলা ৫০ জন ফুটবলারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে। ভিনদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলার সরবরাহের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল। দেশটিতে জন্ম নেওয়া ২৮ জন ফুটবলার এবারের বিশ্বকাপে অন্য দলগুলোর হয়ে খেলেছেন। 

গত চারটি বিশ্বকাপের হিসেব ধরলেও দেখা যাবে, অন্য দেশগুলোতে ফুটবলার সরবরাহের দিক থেকে ফ্রান্সের ধারে কাছেও কেউ নেই। ফ্রান্স এখনো তাদের এ ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু দেশটি কীভাবে এত বিশাল সংখ্যক বিশ্বকাপ ফুটবলারের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠলো? উত্তর খুঁজতে হলে অনেক পেছনে যেতে হবে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের অধিকাংশ এলাকাই ধংসস্তুপে পরিণত হয়। যুদ্ধের পর থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ফ্রান্স সরকার দেশটি পুনর্গঠনে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউরোপ এবং ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ উত্তর আফ্রিকা থেকে শ্রমিক নিয়োগ শুরু করে। এ সময়ে ফ্রান্স ইউরোপের অন্য যেকোন দেশের চেয়ে বেশি অভিবাসী গ্রহণ করে। 

১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে ফ্রান্সের অর্থনীতির নাটকীয় উত্থান হয়। কিন্তু সেসময় আবারও শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় ফ্রান্স অভিবাসীদের জন্য আরও একদফা দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এবার অফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে আগের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যক অভিবাসী ঢোকে ফ্রান্সে। এসব শ্রমিক বড়বড় শহরের পাশে বিশাল বিশাল সব হাউজিং প্রজেক্টে কাজ করা শুরু করেন। 

একই সময়ে ফ্রান্স তাদের খেলাধুলার জগত, বিশেষ করে তাদের জাতীয় ফুটবল দলটি নিয়ে খুব খারাপ সময় পার করছিল। ১৯৬০-১৯৭৪ সালের মধ্যে ফ্রান্স তিনটি বিশ্বকাপ ও তিনটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশন হন্যে হয়ে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছিল। 

ফুটবলের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নেয় ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশন। প্রতিভাবান ফুটবলারদের বাছাই করার জন্য ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম প্রথম দেশ হিসেবে একটি ফুটবল একাডেমি চালু করে। ১৯৭২ সালে তারা জাতীয় ফুটবল ট্রেনিং সেন্টার চালু করে। চার বছর পরে এ ফেডারেশন ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় ফুটবল ক্লাবগুলোর সঙ্গে স্থানীয় তরুণদের কীভাবে অারও বেশি একাডেমিমুখী করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। 

১৯৮৮ সালে জাতীয় ফুটবল ট্রেনিং সেন্টারটি প্যারিসের দক্ষিণের বন এলাকা ক্লেয়ারফন্টেইনে স্থানান্তর করা হয়। এ ট্রেনিং সেন্টারটি ফ্রান্স ফুটবলে অপরিসীম অবদান রেখেছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেই ফ্রান্সের ফুটবল কাঠামো বিশ্বের অনত্যম সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পুরো ফ্রান্স থেকে প্রতিভাধর ফুটবলারদের এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। শেষে ফ্রান্স তাদের অসাধারণ ফুটবল অবকাঠামোর ফলাফলও পেলো। ১৯৯৮ সালে ফান্স বিশ্বকাপ জিতে নেয়। 

পুরো ফ্রান্সে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে। বিশ্বকাপ জয়ের ফলে ফ্রান্সে বহু জাতিস্বত্ত্বার উপস্থিতি আরও বেশি স্বীকৃতি পায়। কারণ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের বেশ কয়েকজন ফুটবলারই ছিলেন হয় অভিবাসী, না হয় কোনো অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এসব ফুটবলার ও তাদের পরিবার বিংশ শতকে অভিবাসী হয়ে ফ্রান্সে এসেছিলেন। ফ্রান্সের এ দলটিকে বলা হতো ‘কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ ও আরব’, দেশটির জাতীয় পতাকার তিনটি রংও এ তিনটি জাতিস্বত্ত্বাকে নির্দেশ করে। 

যদিও জাতীয়তাবাদি অনেক রাজনীতিক ফ্রান্স দলে অভিবাসী ফুটবলারদের উপস্থিতির কট্টর সমালোচনা শুরু করেন। কিন্তু সমালোচনা সত্বেও অভিবাসী পরিবারের ফুটবলাররা ফ্রান্স জাতীয় দলে দিন দিন আলো ছড়াচ্ছিল।

অভিবাসী ফুটবলারদের সঙ্গে প্যারিস শহরের নামটা যেন ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফ্রান্সে আসা ৩৮ শতাংশ অভিবাসীই প্যারিস বা এর আশেপাশে আশ্রয় নিয়েছিল। এদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই আশ্রয় নেয় ‘বেনলিউজ’ নামের একটি এলাকায়। এ এলাকাটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই অভিবাসী অধ্যুষিত। বছরের পর বছর ধরে এ এলাকাটি ফ্রান্সের ইতিহাসে সেরা সব ফুটবলারের জন্ম দিয়েছে। ফ্রান্সের ব্যতিক্রমী ও ফুটবলবান্ধব অভিবাসন নীতির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। ধীরে ধীরে প্রতিভাধর ফুটবলারদের দিক থেকে বিশ্বের সেরা শহরে পরিণত হয় প্যারিস। 

২০০২ সাল থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলে প্যারিসে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। এবারের বিশ্বাকপে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া যে ৫০ জন ফুটবলার বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন, তাদের ১৬ জনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্যারিসে। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স জাতীয় দলের ৮ সদস্যের জন্মই বেনলিউজে এবং তারা সবাই অভিবাসী পরিবারের সন্তান। কিলিয়ান এমবাপ্পে, বেঞ্জামিন মেন্ডি, এনগোলো কন্তে, পল পগবা, প্রেসনেল কিমপেম্বে, অালফোনসে অরিওলা, ব্লেইসি মাতুইদি, এনজনজি- এদের সবার পরিবারই অভিবাসী হিসেবে ফ্রান্সে এসেছিল এবং এদের সবার জন্মই হয়েছে অভিবাসীদের অাখড়া হিসেবে পরিচিত প্যারিসের পাশের এলাকা বেনলিউজে। 

রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলের ৮ জনই  অভিবাসী পরিবারের সন্তান

ফ্রান্সের ১৯ বছর বয়সী সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পের বাবা আলজেরিয়ার এবং মা ক্যামেরুনের। এমবাপ্পেও কিন্তু  ক্লেয়ারফন্টেইনে অবস্থিত জাতীয় ফুটবল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটেরই আবিস্কার। 

ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এবং এখানেই বেড়ে ওঠা সব ফুটবলারইফ্রান্সের হয়ে খেলেন না। ফিফার নিয়মের কারণে তারা আইভরি কোস্ট, মরক্কো, আলরেজিয়া, পর্তুগাল, সেনেগাল, ক্যামেরুন, টোগোর হয়ে খেলতে পারেন। এ বছরের বিশ্বকাপে সেনেগাল দলের চার সদস্য মুসা সো, এমবায়ে নিয়াং, আলফ্রেড এনডিয়াই এবং ইউসুফ সোবালি প্যারিসে জন্ম নিয়েছেন এবং প্যারিসেই ফুটবল শিখেছেন। তিউনিসিয়ার সাইফ এডউইন-কাউইর জন্মও প্যারিসে। 

পর্তুগালের রাফায়েল গুয়েরেইরো এবং মরক্কোর মেধি বেনাটিয়ার জন্ম, বেড়ে ওঠাও প্যারিসে। 

ফ্রান্সের কিংবদন্তী খেলোয়াড় জিনেদিন  জিদান, করিম বেনজেমা, প্যাট্রিক ভিয়েরা, সামির নাসরিরাও কিন্তু অভিবাসী পরিবারের সন্তান।  এটাই ফ্রান্স ফুটবলের অনন্য বৈশিষ্ট। অনন্য এক অভিবাসী নীতি এবং অসাধারণ ফুটবল একাডেমির কারণে দেশটি নিজেদের ছাড়াও সারা বিশ্বে ফুটবলার সরবরাহ করতে পারছে। 

প্রিয় সংবাদ/মিজান

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
‘নারীদের জন্য নিরাপদ নয় ভারত’
সৌরভ মাহমুদ ২১ জুলাই ২০১৮
‘রোনালদোর সিদ্ধান্তে আমি খুব খুশি’
প্রিয় ডেস্ক ২১ জুলাই ২০১৮