সীমান্তে বিএসএফ সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

যে কারণে কমছে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা

‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার কারণে আমাদের জওয়ানদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চোরাকারবারিরা জানে যে বিএসএফের সৈন্যরা গুলি করবে না, তাই তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করছে।’

জানিবুল হক হিরা
সহ-সম্পাদক
১১ জুলাই ২০১৮, সময় - ১৮:৩৯


সীমান্তে বিএসএফ সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গত ছয় মাসে সীমান্তে বিএসএফের হাতে শারীরিক নির্যাতনে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং গুলিতে কেউ নিহত হননি।

কিন্তু ২০১৭ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছিলেন ২৫ জন। তাদের মধ্যে ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বিএসএফের জওয়ানদের গুলিতে। ২০১৬ সালে নিহত হয়েছেন ৩০ জন এবং ২০১৫ সালে ৪৬ জন। অবশ্য এ বছর যে তিনজন নিহত হয়েছেন, তারা ঠিক কী ধরনের নির্যাতনে মারা গেছে, সেসব কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারও বলছে, এ বছর সীমান্তে বিএসএফের হাতে তিনজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কিন্তু গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৯২। ২০১৬ সালে ৮৭ এবং ২০১৫ সালে নিহত হয়েছিল ১৩২ জন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সীমান্ত-হত্যা বন্ধের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত দুটো দেশের ইতিবাচক অবস্থানের কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য রকমের উন্নতি ঘটেছে।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজার বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানায়, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের মনোভাবেরও বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে।

বিষয়টি নিয়ে একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে শীপা হাফিজা বলেন, মাস দুয়েক আগে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িতে ২০ বছরের এক তরুণ বিএসএফের ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছিলেন। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আইন ও শালিস কেন্দ্র বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তখন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন থেকে তাদেরকে বলা হয়েছে যে, ভারত সরকার ওই তরুণের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।

শীপা হাফিজা বলেন, ‘আহত যুবককে ভারতে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজেদের খরচে চিকিৎসা দিতে রাজি হয়েছে ভারত সরকার। এখন তার পাসপোর্ট তৈরির কাজ চলছে।’

সীমান্তে পরিস্থিতির উন্নতির কারণ

সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে কারণ সম্পর্কে শীপা হাফিজা বলেন, বিএসএফের সৈন্যদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো খুবই সোচ্চার। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার এসব সংগঠনের কথায় কান দিয়ে বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

‘তবে এই বিষয়টি যাতে শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটার প্রতিফলন ঘটতে হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিমালাতেও। তা না হলে ভারত কিংবা বাংলাদেশ- যে কোনো দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আবারও আগের পর্যায়ে চলে যেতে পারে,’ বলেন শীপা হাফিজা।

সরকারও বলছে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর গুলিতে এখন আর কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে জানান, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কমিয়ে আনা হয়েছে।

এইচ টি ইমাম বলেন, ‘বিএনপির আমলে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। কিন্তু এর পরে আমাদের সরকারের আমলে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দু'দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছি।’

ভারত সরকারও বলছে যে, তাদের বাহিনীর সৈন্যদের হাতে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে না।

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফের মহাপরিচালক কে. কে. শর্মা কয়েক মাস আগে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সক্ষাৎকারে বলেন, ভারতীয় সৈন্যরা এখন আর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না।

বিএসএফের মহাপরিচালক বলেন, ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার কারণে আমাদের জওয়ানদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চোরাকারবারিরা জানে যে- বিএসএফের সৈন্যরা গুলি করবে না, তাই তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করছে। কিন্তু তারপরেও বিএসএফ তাদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে না। কারণ এই অস্ত্র আর ব্যবহার করা হবে না, এটা আমাদের সরকারের সিদ্ধান্ত।’

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত প্রায় ২৫০০ মাইল লম্বা। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম আর ভারতের অংশে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্যমতে, ভারত সরকার সীমান্তে ২০০০ মাইলেরও বেশি লম্বা কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করেছে। এই বেড়ার উচ্চতা প্রায় তিন মিটারের মতো।

অধিকার বলছে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বহুদিনের। তার মধ্যে রয়েছে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা, নির্যাতন এবং অপহরণ। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক চুক্তিরও লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের রক্তাক্ত সীমান্তগুলোর একটি উল্লেখ করে অধিকারের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শুধু তাই নয়, বিএসএফের জওয়ানরা অনেক সময় অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকেও বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা চালায় ও তাদেরকে অপহরণ করে থাকে।

অধিকারের হিসেবে অনুসারে, ২০০০ সালের পর থেকে গত ১৮ বছরে বিএসএফ সৈন্যদের হাতে এক হাজার ১৩৬ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন ২০০৬ সালে ১৫৫ জন।

অধিকার বলছে, বিএসএফের হাতে গত ১৮ বছরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩৬০ আর সবচেয়ে বেশি অপহরণ হয়েছে ওই একই বছরে (২০০৬) ১৬০টি। তারপরে ২০১৩ সালে ১২৭টি।

প্রিয় সংবাদ/হিরা/শান্ত 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
কুমিল্লায় বাস উল্টে ২ যাত্রী নিহত
আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন ২১ জুলাই ২০১৮
রাজধানীতে প্রতি মাসে বেড়েছে ১৫০০ ব্যক্তিগত গাড়ি
আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন ২১ জুলাই ২০১৮
‘নারীদের জন্য নিরাপদ নয় ভারত’
সৌরভ মাহমুদ ২১ জুলাই ২০১৮
নারায়ণগঞ্জে দুই নৈশ প্রহরীকে হত্যা করে ডাকাতি
ইমামুল হাসান স্বপন ২১ জুলাই ২০১৮