মুলা। ফাইল ছবি

মুলা নাকি জাতে উঠেছে!

স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই, স্বপ্ন দেখতে নেই মানা। মুলা জাতে উঠতে পারলে আমরা কেন পারব না।

রুবু মুন্নাফ
কর্মকর্তা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০১৮, ১৭:১৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪৮


মুলা। ফাইল ছবি

আগে বাজারে গেলে মুলা কেমন এতিমের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত কিন্তু দুঃখের বিষয় তার পানে খুব কম লোকজনই তাকাত। দুএকজন যারা নেড়েচেড়ে দেখত তাতেই নিজেকে ধন্য মনে করত মুলা জাতি। বলছিলাম শীতকালীন সবজি মুলার কথা।

ছোটবেলায় আমরা একজন আরেকজনকে টিপ্পনী কাটতাম এই বলে ‘ওর দাম মুলার মতো’। প্রথম প্রথম এর মর্মার্থ না বুঝেই বলতাম। পরে যখন নিজে বাজার করতে যেতাম তখন মুলার মতো দামের অর্থ উদ্ধার করতে সমর্থ হই। শীতের শুরুতে মুলা বেশ ভালো দামে বিক্রি হতো। চীনা মুলা, বোম্বাই মুলা, দেশি মুলা, নানান হাবিজাবি টাইপের মুলা বাজারে পাওয়া যেত। আমরা স্কুলপড়ুয়া, যারা বাজার করতাম তাদের আর্কষণ ছিল বোম্বাই মুলার দিকে। তরকারি হিসেবে না; মুলার সাইজের জন্য। চারটা নিলে মোটামুটি সংগ্রাম করতে হত বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য। তরকারি হিসেবে খেতে আমাদের ভালোই অনীহা ছিল সেটা যত না স্বাদের জন্য ততটাই তার বিপরীত কারণে। এমনিতে খেতে খারাপ না, তবে বায়ুদূষণ জনিত সমস্যা ছিল প্রকট। কলার মোছার সঙ্গে মুলা ভালো রকম পিষে আমসত্ত্ব মিশিয়ে সাথে মরিচ দিয়ে বাগানে চুপিচুপি কিশোরের দল খেতে বসতাম। এক মুলার কারণে কত বিড়াল আর কুকুরের ঘাড়ে যে কত দোষ চাপানো হতো তা ভাবলে আজও হাসি পায়।

বায়ুদূষণ করে মুরুব্বিরা যখন দেখত সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে তখন অবলা কুকুর কিংবা বিড়াল যে সামনে পড়ত তার ঘাড়েই দোষ চাপত। দূর, দূর, দূর হ কুত্তার বাচ্চা। তো যা বলছিলাম, মুলার প্রথম দিকের বাজার দর তেতে থাকতো পরে হত কি মুলা আর কেউ নিতে চাইত না। কেজি নিলে আট আনা আনা কিংবা এক টাকা দর হতো। তখন অবশ্য মনুষ্য খাদ্য না গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। আর কৃষক হাফ ছেড়ে বাঁচত তার ক্ষেত খালি হতো বলে। আশা করি মুলার মতো দামের মর্মার্থ অনুধাবন করতে অসুবিধা হয়নি।

গত কয়েকদিন অফিসের কাজের চাপের কারণে বাজার আর করা হয়ে উঠে না। আর বুয়া যথারীতি ডিম বাঙালির তকমা গায়ে এঁটে দিয়েছে। বাল্যবন্ধু সোহাগ এসে ডিম বাঙালির তকমা ছেঁটে দেবার উদ্যোগ নিল। তার সৌজন্যে রাত সাড়ে ৮টায় বাজারে গেলাম। মাছ কাটাকুটি করায়ে চিন্তা করলাম কী তরকারি নেয়া যায় আগামী দিনের জন্য। যেহেতু রান্নাটা নিজেই করতে হবে তাই শুধু মাছ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঁচা বাজারে যেতেই হল। কাঁচা মরিচ ১০০, পেঁয়াজ ৮০, লাউ শাঁকের আটি ৬০, ঢেঁড়শ ৬০, মোদ্দাকথা ৬০ টাকার নিচে কোন তরকারি নেই। মুলার দিকে তাচ্ছিল্য সহকারে তাকালাম। নাহ্ এইডা নিমু না, এইডা তো এমনি পাওয়া যায় টাইপ ভাব। তারপর ও করুণা করে দাম জিজ্ঞেস করলাম। মুলার গায়েও আগুন লাগছে। মুলাও নাকি ৬০ টাকা। হায়! হায়! মুলা নাকি জাতে উঠছে। যেইটা ৬০ বলতেছে, দেশি চিকন মুলা সেটা তো আমরা কিনার জন্য গোনায় ধরতাম না। তার আজ রাজ কপাল। তার দিন ফিরেছে, সে জাতে উঠেছে!

মুলার ঠিক বিপরীতে আমরা, মুলার দাম হুহু করে বাড়তেছে আর আমাদের দাম কমতেছে। আরও বেশি করে কমতেছে আমাদের মূল্যবোধ। আমরা সামান্য ব্যাপারে অন্যকে খুন পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করি না। পায়ু পথে বাতাস দিয়ে কাউকে মেরে ফেলা আজকাল ডালভাত খাওয়ার মতো। খুঁটির সাথে বেঁধে কাউকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা আমরা রীতিমত শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমরা মুভির অনুুকরণে কাউকে খুন করে দিব্যি ঠান্ডা মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। চলন্ত গাড়ি আজকাল নারীর জন্য আতঙ্কের আরেক নাম। আমরা বৃদ্ধ বাপ-মাকে রাস্তায় ফেলি আসি আমাদের বোঝা কমানোর জন্য। এসব খারাপের মাঝেও আমরা স্বপ্ন দেখি। সব তো আর গোল্লায় যায়নি। আমরাও একদিন জাতে উঠব। গোরা কালার সাথে টক্কর দিয়ে আমরা বাদামীরাও সমান তালে এগিয়ে যাব।

স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই, স্বপ্ন দেখতে নেই মানা। মুলা জাতে উঠতে পারলে আমরা কেন পারব না।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট