প্রতীকী ছবি

কাঠি দিয়ে লাঠি ভাঙবে নির্বাচন কমিশন!

স্মার্ট কার্ড তৈরিতে ১০টি মেশিন রয়েছে, যা প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা চললেও ৯ কোটি কার্ড তৈরিতে সময় লাগবে এক বছরেরও বেশি।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০১৮, ২১:৫৯ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৯:৪৮
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০১৮, ২১:৫৯ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৯:৪৮


প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) আগামী তিন মাসের মধ্যে ৯ কোটি জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড ভোটারদের হাতে তুলে দেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু বাস্তবে তা আদৌ সম্ভব নয়। তিন মাস তো দূর, আগামী এক বছরেও তা সম্ভব না। স্মার্ট কার্ড তৈরিতে মোট যে ১০টি মেশিন রয়েছে, তা প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা চললেও ৯ কোটি কার্ড তৈরিতে সময় লাগবে এক বছরেরও বেশি।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ৯ কোটি স্মার্ট কার্ড বাস্তবায়নের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর এ পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এসব স্মার্ট কার্ড ভোটারদের হাতে তুলে দেওয়াও হচ্ছে। বাকি পাঁচ কোটি স্মার্ট কার্ড তিন মাসে তৈরির কথা বলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন অনু বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, স্মার্ট কার্ড তৈরির জন্য মোট ১০টি মেশিন রয়েছে। এসব মেশিন দিয়ে এক দিনে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট কার্ড তৈরি করা যায়। অর্থাৎ এক দিনে একটি মেশিন দিয়ে ১৫ হাজার স্মার্ট কার্ড তৈরি করা যায়।

বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ হিসাবে ৩০ দিনে (১ মাস) ৪৫ লাখ স্মার্ট কার্ড তৈরি করতে পারে ১০টি মেশিন। পাঁচ কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরি করতে হলে ১০টি মেশিনকে টানা ৩৩৩ দিন অর্থাৎ ১১ মাসেরও কিছু বেশি সময় কাজ করতে হবে (আক্ষরিক অর্থে ৩৩৩ দিন ১০টি মেশিন কাজ করলে চার কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট কার্ড উৎপাদন করা সম্ভব)।

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন অনু বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) অব. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের মতে, সপ্তাহে সাত দিন এবং দিনে ২৪ ঘণ্টাই মেশিনগুলোকে স্মার্ট কার্ড তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।’

বিভিন্ন সময় মেশিনগুলো টানা ব্যবহারের ফলে নানা ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তখন এসব মেরামত না করা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়নি। খুব কম সময়ই সব মেশিন একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।

এদিক বিবেচনায় নিলে ১০টি মেশিনের মধ্যে যদি প্রতিদিন গড়ে একটি মেশিন ব্যবহার করা সম্ভব না হয়, তাহলে ৩৩৩ দিনে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার স্মার্ট কার্ড উৎপাদন সম্ভব হবে না। এই পরিমাণ কার্ড তৈরিতে অবশিষ্ট ৯টি মেশিনের অতিরিক্ত সময় লাগবে ৩৭ দিন। ১১ মাসের সঙ্গে আরও ৩৭ দিন যোগ করলে এক বছরেরও বেশি সময় দাঁড়ায়। এ ছাড়াও লোকবল সংকট, যন্ত্রপাতি নষ্ট বা মেরামত, ছুটি কিংবা অন্য কোনো কারণ যুক্ত হলে লাগবে আরও অতিরিক্ত সময়।

অবশ্য ২ আগস্ট অব. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম প্রিয়.কমকে জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ৯ কোটি ভোটারের হাতে স্মার্ট কার্ড তুলে দিতে ফ্রান্সের কোম্পানি ওবার্থু’র টেকনোলজিসের সঙ্গে চুক্তি করে কমিশন। ৮১৬ কোটি টাকা মূল্যের চুক্তি অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালের অক্টোবরে। কিন্তু নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিবন্ধিত এক কোটি ১৮ লাখের বেশি নতুন ভোটারকে আপৎকালীন লেমিনেটেড এনআইডি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইসি।

সম্প্রতি ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নতুন করে এই নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে না। তবে কেউ স্বেচ্ছায় কমিশনের কাছে এলে ভোটার হতে পারবেন।

এনআইডি নিবন্ধন অনু বিভাগের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের মধ্যে সব ভোটারকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। অর্থাৎ এই এক কোটি ১৮ লাখের সঙ্গে আরও যারা ভোটার যোগ হবেন, তাদের জন্যও স্মার্ট কার্ড তৈরির চাপ থাকবে এনআইডি উইংয়ের ওপর।

এ রকম বাস্তবতার মধ্যে বর্তমানে স্মার্ট কার্ড উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আগামী ৮ আগস্ট ৯৭টি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড প্রদান করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর আগে ৭ আগস্ট থেকে ১০টি মেশিনই চালু হবে বলে জানিয়েছেন এনআইডি নিবন্ধন অনু বিভাগের মহাপরিচালক।

উৎপাদন বন্ধ থাকা সম্পর্কে মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘উৎপাদন হচ্ছে না, তা নয়। ২৪ ঘণ্টা আমরা মেশিনগুলোতে কাজ করছি। সে জন্য মেশিনগুলোতে চাপ বেশি পড়ে গেছে। যার জন্য আমরা ইন্টেরিম টাইম (কিছু সময়) নিলাম, যাতে করে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, সমস্ত কিছু মেইনটেন্যান্স করতে পারি। সে জন্য মেশিনগুলো একটু বন্ধ রেখে, মেইনটেন্যান্স করাচ্ছি।’

স্মার্ট কার্ড তৈরির মেশিনের মধ্যে চারটি নষ্ট–এমন খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘তা তো না। মেশিনে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দেয়। হয়তো একটা মেশিন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, আরেকটা ঠিক হচ্ছে। এভাবে ১০টা মেশিনই চলছে। ১০টির মধ্যে এখন সাতটা মেশিনই চালু আছে।’

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের জুলাইয়ে ৯ কোটি স্মার্ট কার্ড দেওয়ার চুক্তি হয় বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্স একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায়। প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (৮১৬ কোটি টাকা) ফ্রান্সের ওবার্থু’র টেকনোলজিসের (ওটি) সঙ্গে চুক্তি করে ইসি। কিন্তু এই প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে ব্যর্থ হয় এই দুই কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয় প্রকল্পের। এর মধ্যেও কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে কমিশনের পক্ষ থেকে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হলে বিশ্বব্যাংক না জানিয়ে দেয়। এরপর ইসি সিদ্ধান্ত নেয়, সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) কাছ থেকে স্মার্ট কার্ড তৈরি করা হবে। এখানেই ১০টি মেশিনে স্মার্ট কার্ড তৈরির কাজ চলছে। ফাঁকা কার্ডের ভেতরে ভোটারের তথ্য ভরে (পারসোনালাইজেশন) স্মার্ট কার্ড তৈরি করা হয়। 

প্রিয় সংবাদ/রিমন/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...