প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ফাইল ছবি

উত্তর রাখাইনে স্বাধীন মানবিক সংস্থার প্রবেশ এখনো রুদ্ধ: এমএসএফ

‘নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত ছাড়া পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের উপযোগী কি না তা বোঝারও বিন্দুমাত্র উপায় নেই।’

আবু আজাদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০১৮, ২২:৫৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪৮


প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ফাইল ছবি

(ইউএনবি) আন্তর্জাতিক মানবিক চিকিৎসা সংস্থা মেডিসিন্স সায়েন্স ফ্রন্টিয়ার্স বা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর মতে, স্বাধীন মানবিক সংস্থাগুলো উত্তর রাখাইনের অরক্ষিত ও ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় মানবিক ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের অনুপযুক্ত পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০১৭ সালের ১১ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) আক্রমণ ও পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে, মিয়ানমার সরকার এমএসএফ-এর উত্তর রাখাইনের মেডিকেল কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এখনো এমএসএফ সেখানে কাজ করতে পারছে না।

সংস্থাটির মিয়ানমারের অপারেশন ম্যানেজার বেনোয়া দ্য গ্রিজ বলেন, ‘উত্তর রাখাইনে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পরিস্থিতির যাচাই ও মূল্যায়নের অভাবের কারণে এখন পর্যন্ত কেউই পুরোপুরি জানতে পারছে না সেখানকার মানবিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা আসলে কতটুকু।

মিয়ানমার সরকারের কাছে এমএসএফ স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যাতায়াত ও মেডিকেল কার্যক্রমের অনুমতি চেয়ে বারবার আবেদন করেছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি এখনো অসম্ভব।

এমএসএফ আবারও মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করছে উত্তর রাখাইনে সব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মানবিক সংস্থার অবিলম্বে পূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য। যেন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য চাহিদা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়।’

বেনোয়া দ্য গ্রিজ জানান, এমএসএফ উত্তর রাখাইনের সব জনগোষ্ঠীকে ১৯৯৪ সাল থেকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। গত বছরের ১১ আগস্ট যখন এমএসএফের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হয়, তখন উত্তর রাখাইনে সংস্থাটির চারটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক ছিল। এর মধ্যে তিনটি পরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই চারটি ক্লিনিকে প্রতি মাসে ১১ হাজারের বেশি রোগীকে প্রাথমিক ও প্রসূতিসেবা দেওয়া হতো। পাশাপাশি ছিল জরুরি অবস্থার রোগীদের যাতায়াত ও হাসপাতালে ভর্তি।

২৫ আগস্ট-পরবর্তী উদ্দেশ্যমূলক সহিংসতা থেকে বাঁচতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। উত্তর রাখাইনের অনেক স্থানকে জনশূন্য করা হয়েছে। তবে এখনো রাখাইন প্রদেশজুড়ে পাঁচ লাখ  ৫০ হাজার থেকে ছয় লাখ রোহিঙ্গা আছে।

দ্য গ্রিজ বলেন, ‘উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গাদের এবং স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য চাহিদা স্বাধীন ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে।

চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো সম্ভব না হলেও মংডুতে এমএসএফের কর্মীরা এখনো আছে। সেখানকার রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আমরা সবসময়ই শুনি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য তাদেরকে কী রকম সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মুসলমান রোগীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় বাধা আছে এখনো। আরো আছে অতিরিক্ত মেডিকেল ফি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে।’

দ্য গ্রিজ  জানান, এমএসএফের মিয়ানমার টিম একজনের সঙ্গে কথা বলেছিল, যিনি কয়েক মাস আগে তার মায়ের চিকিৎসার জন্য উত্তর রাখাইন থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার মা পরে বাংলাদেশেই মারা যান।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা সিত্তওয়ে বা ইয়াঙ্গুনে যেতে পারি না, তাই আমাদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র রাস্তা থাকে সীমানা পার হয়ে বাংলাদেশে আসা। এই রুট অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

আমার খুব ইচ্ছা ছিল আমার মাকে আমাদের গ্রামে নিয়ে আমার বাবার পাশে কবর দেওয়ার। কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে সেটা এখন আর সম্ভব না। আমরা যদি এখানে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে পারতাম, তাহলে তো আমরা আর বাংলাদেশে যেতামই না।’

মিয়ানমার সরকার দাবি করে যে সব স্বাস্থ্য চাহিদা পূর্ণ করা হচ্ছে। কিন্তু উত্তর রাখাইনে মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশে তীব্র প্রতিবন্ধকতার কারণে বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যায় না।

দ্য গ্রিজ বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়ার জন্য মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত ছাড়া পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের উপযোগী কি না তা বোঝারও বিন্দুমাত্র উপায় নেই।’

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট