খাগড়াছড়িতে শিশু কৃত্তিকা ত্রিপুরার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে ১০ আগস্ট খাগড়াছড়িতে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রদীপ প্রজ্বালন করে দুটি সংগঠন। ছবি: প্রিয়.কম

পাহাড়ে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদে যৌন সহিংসতা একটি ‘হাতিয়ার’

পার্বত্য পাহাড়ি এলাকায় কাজ করে এমন কয়েকটি সংগঠনের বরাত দিয়ে যৌন নির্যাতনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা ইউএনবি।

আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৪২ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৪৮
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৪২ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৪৮


খাগড়াছড়িতে শিশু কৃত্তিকা ত্রিপুরার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে ১০ আগস্ট খাগড়াছড়িতে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রদীপ প্রজ্বালন করে দুটি সংগঠন। ছবি: প্রিয়.কম

(ইউএনবি) পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ পাহাড়িদের সংগঠনগুলোর। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে পূর্বপুরুষের বসতভিটা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের জন্য নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনকে একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন (কেএফ)। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কাপেং ফাউন্ডেশনের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গত সাত মাসে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মোট ৩২ জন নারী ও মেয়ে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনকে ধর্ষণ, চারজনকে ধর্ষণের পর হত্যা, দুজনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, নয়জনকে ধর্ষণ চেষ্টা এবং ছয়জনকে যৌন হয়রানি করা হয়।

২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত কাপেং ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক (বিআইডব্লিউএন) ও আদিবাসীবিষয়ক আন্তর্জাতিক ওয়ার্ক গ্রুপের (আইডব্লিউজিআইএ) আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে ‘বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও মেয়েদের অবস্থা: এক নজরে সমস্যা ও উদ্বেগের বিষয়’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৪৬৬ জন ‘আদিবাসী’ নারী ও মেয়েদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১৫টি মামলার মধ্যে একটিতেও কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।

কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা জানান, অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের পূর্বপুরুষদের জমি থেকে উচ্ছেদ করছে, যা তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে।

পল্লব চাকমা বলেন, ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ক্রমাগত হুমকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়াচ্ছে।’

কল্পনা চাকমা অপহরণের ২২ বছরে তার সন্ধান চেয়ে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে ১১ জুন শাহবাগে মশাল মিছিল করা হয়।

ধর্ষণকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের বাস্তুচ্যুতের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে পল্লব চাকমা বলেন, ‘যখন হুমকি-ধমকিতে কাজ হয় না, তখন তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে ভয় তৈরি করার জন্য ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির আশ্রয় নেয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস মনে করেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর এ ধরনের সহিংসতা তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে অন্যত্র স্থানান্তর করতে বাধ্য করার একটি হাতিয়ার।

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা চারটি উপায়ে তৈরি হয়, তাদের বাড়িঘর আক্রমণ, তাদের আয় উৎসে আক্রমণ, তাদের উপাসনা স্থানে আক্রমণ এবং নারীদেরকে যৌন হয়রানি করা। যৌন সহিংসতা ও হয়রানি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে তারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার রক্ষার জন্য অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।’

চাকমা রানি ও চাকমা সার্কেলের উপদেষ্টা ইয়ান ইয়ান বলেন, ‘আদিবাসী নারীরা এখন নিজ দেশে অনিরাপদ।’

ইয়ান দাবি করেন, ন্যায়বিচারের অভাব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের ওপর যৌন সহিংসতাকে বৈধতা দেয়। যখন ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায়বিচার পায় না, তখন যৌন হয়রানি একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি সমাজের একটি নিয়ম হয়ে ওঠে।

৯ আগস্ট পালিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে’ অভিবাসনের মূল কারণ, আন্তঃসীমান্ত চলাচল ও স্থানচ্যুতির ওপর ভিত্তি করে জাতিসংঘের এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আদিবাসীদের অভিবাসন ও আন্দোলন।’

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রায় বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের নারীরা।

২০১৭ সালে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর কাপেং ফাউন্ডেশনের মানবাধিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার ঘটনায় মোট ৪৮টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২০টি সমভূমি ভূমি থেকে ২৮টি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন থেকে করা হয়েছে।

এসব মামলায় ৭৫ জন আসামির মধ্যে ৬৫ জন বাঙালি সম্প্রদায়ের এবং চারজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্তদের বয়স ৩ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের আরেক প্রতিবেদন দাবি করছে, প্রভাবশালীদের চাপ, নিরাপত্তার অভাব, সম্ভাব্য সেবা বঞ্চিত, আবাদী জমি সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে গত ৪-৫ বছরে বান্দরবানের আলীকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলার দুর্গম এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবার মিয়ানমারের আরাকানে (রাখাইন রাজ্য) চলে গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাহাড়ে সংকট সমাধান করার লক্ষ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরের ২০ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এর মূল বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, মানবাধিকার কর্মীরা বিশ্বাস করে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ দেশ গড়তে হবে যেখানে শ্রেণি, জাতি, ভাষা, সামাজিক অবস্থা ও ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...