চলচ্চিত্রকার নার্গিস অবইয়ার। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম

‘বাংলাদেশ হচ্ছে একজন নির্মাতার জন্য ফিল্ম নির্মাণের উর্বর ভূমি’

ইরানের নির্মাতা নার্গিস অবইয়ার তার ‘শাবি কে মহ কমেল শোদ’ ছবির শুটিংয়ের জন্য বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বেছে নিয়েছেন।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০১৮, ১৫:১৯
আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৭:১৬


চলচ্চিত্রকার নার্গিস অবইয়ার। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) সড়কবাতিগুলোর আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছিল। কিছুটা সময় পর শহরের সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে গেল। জীবন বদলের নেশায় বুদ থাকা মানুষগুলোর কর্মচাঞ্চল্যতাও ধীরে ধীরে স্থবির হতে লাগল। বিচিত্র রংয়ের মানুষের জীবনের নানান রূপের রংয়ের ভেলাও পাল তুলে চলল। এমন জীবনচিত্রের আনাগোনা রাজধানীর গ্রীন রোডের মধ্যবর্তী এক জায়গায় দাঁড়িয়েই আবিষ্কার করা হল। সেখানে যার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে এসব দৃশ্য চোখে পড়ল তিনি ইরানের নারী চলচ্চিত্রকার নার্গিস অবইয়ার

তার নতুন ছবি ‘শাবি কে মহ কমেল শোদ’ (যে রাতে চাঁদ পূর্ণতা পেয়েছিল)-এর শুটিংয়ের জন্য বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বেছে নিয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে শুটিং। এখনো চলছে। এরপর তার সঙ্গে যখন আলাপ শুরু হল তখন ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে। প্রায় এক ঘণ্টার আলাপে নার্গিস তার নতুন ছবি, বাংলাদেশসহ বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরেন।

নার্গিস অবইয়ার বেশ কয়েকবার ভারতে এসেছেন। তবে এবারই প্রথম বাংলাদেশে এসেছেন। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, যে কয়েকদিন শুটিং করেছেন তার অভিজ্ঞতা কেমন? মানে বলতে চাইছি-ওয়েদার, পাবলিক হেল্প, প্রশাসনের সহযোগিতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা আপনারা যেমনটা দৃশ্যের ধারণ করতে চেয়েছিলেন ঠিক তেমনটাই করতে পেরেছেন কি না?

জবাবে প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি যে দৃশ্যগুলো ধারণ করতে চেয়েছিলাম, তার সবই আমি পেয়েছি। এখনো কাজ চলছে। এ ছাড়া কাজ করতে গিয়ে আর তেমন কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি। আমরা জানি শহরের বিভিন্নস্থানে শুটিং করলে একটু ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতেই হয়। ওটার সাথে আমিরা সবাই অভ্যস্ত। তবে বড় ধরনের কোনো জটিলতা হয়নি।’

ইরানের বাণিজ্যিক ঘরানার ছবির ব্যস্ত নির্মাতা নার্গিস অবইয়ার। তার নির্মিত ‘ট্র্যাক ১৪৩’ ছবিটি ইরানের ঐতিহ্যবাহী ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে বেশ প্রসংশিত হয়। এ পর্যন্ত নার্গিস তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ইরানে সাহিত্যিক হিসেবেও তার রয়েছে বিশেষ সুনাম। লিখেছেন ৩১টি উপন্যাস। সে কথাও আড্ডায় জানান।

চলচ্চিত্রে মানুষের গল্প বলতে চান নার্গিস অবইয়ার। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম 

বাংলাদেশের ফিল্ম নিয়ে তার মূল্যায়নটা এমন-‘একবার চীনের সাংহাইতে গিয়েছিলাম একটি চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখান যাওয়ার পর বাংলাদেশের একটি সিনেমা দেখেছিলাম। সিনেমাটি বিচারকদের বিবেচনায় বেশ প্রংশসিত হয়েছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশের সিনেমা সম্পর্কে মোটামুটি জেনেছি। এরপর আর্মেনিয়াতে আরেকটি উৎসবে বাংলাদেশি একটি ছবি দেখেছিলাম। সেখানেই একই ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সিনেমার বিষয়ে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই।’

বাংলাদেশের পাশাপাশি ইরান ও পাকিস্তানে শুটিং হবে ‘শাবি কে মহ কমেল শোদ’ ছবিটির। তাকে যদি সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা কর হয়, তাহলে আইন মেনে বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে তার।

বাংলাদেশের পরিচালকরা দেশের বাইরে মাঝেমধ্যেই যান নতুন লোকেশনের খোঁজে কিংবা শুটিংয়ে। তবে ভিনদেশের নির্মাতাদের বাংলাদেশে আসার ঘটনা খুব একটা চোখে পড়ে না। বাংলাদেশে যে যে লোকেশনে কাজ করছেন, তা তো অন্য দেশেও করতে পারতেন, এর পিছনে ভিন্ন কী কারণ রয়েছে? এ প্রশ্নেরও ব্যাখা দিয়েছেন নার্গিস।

তিনি বলেন, ‘গল্পের জন্যই বাংলাদেশে কাজ করতে আসা। এখানে অন্তত ১০ ভাগ কিংবা তারও বেশি অংশের শুটিং হবে। তবে ভিন্ন কোনো কারণ নেই। এ দেশের নিজস্ব কালচার রয়েছে। আমি বিশ্বের অনেকগুলো দেশে গিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যে জীবনধারা, আচার-আচারণ এখানে এসে দেখেছি তা আমার গল্পের প্রয়োজনে খুব বেশি দরকার ছিল।’

আব্বস কিয়রোস্তামি, মোহসেন মাখমালবফ, জাফর পানাহি, মাজিদ মাজিদির মতো ইরানি নির্মাতাদের ছবির বাংলাদেশে বেশ প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘদিনের চর্চায় দর্শক-ভক্ত-অনুসারীও গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে তার ভাষ্য,‘নির্মাতারা সিনেমা নির্মাণ করেন দর্শক-ভক্ত, অনুসারীদের জন্য। তারা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে। তারা তাদের সিনেমাগুলো শুধু বুক সেলফে তুলে রাখার জন্য নির্মাণ করেন না। আর সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রযোজক কিংবা পরিচালকদের একটা লক্ষ্য থাকে।’

বাংলাদেশের মানুষের স্বতস্ফূর্ত হাসি তাদের পুরো টিমকেই অবাক করেছে। ছবি: শামছুল হক রিপন, প্রিয়.কম

বাংলা ভাষা, ঢাকায় এসে শুটিং,সংস্কৃতি, পোশাক, খাবার, মানুষের আচার, আচারণ নিয়ে নার্গিস মূল্যায়ন করছিলেন এভাবেই, ‘এখন পর্যন্ত এখান থেকে বড় যে সম্পদটি আমি নিয়ে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে সেটি হচ্ছে এখানকার মানুষের স্বতস্ফূর্ত হাসি। এটা পুরো টিমকেই অবাক করেছে। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানকার মানুষ তাদের কৃষ্টি-কালচার এখনো ধরে রেখেছে।

আমার মনে হয় বাংলাদেশ হচ্ছে একজন নির্মাতার জন্য ফিল্ম নির্মাণের উর্বর ভূমি। তবে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে সেগুলা পরিবর্তন করা সম্ভব। যখন বাংলাদেশে কেউ পদার্পণ করবেন তখনই মনে হবে ভিন্ন একটি জগতে পদার্পণ করেছেন। যদি আমার মতো একজন নির্মাতা হন তাহলে তার জন্য বাংলাদেশ হবে একটি আকর্ষণীয় জায়গা।’

‘তখনো আমি সিনেমা নির্মাণ শুরু করিনি। হলিউড, ফ্রান্সের নির্মাতাদের ছবিগুলো দেখতাম। একটা সময় মনে হলো আমার কিছু একটা করা উচিত। একদিন বাহমান কোবাদির (বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার) ‘কচ্ছপগুলো আকাশে উড়ে যায়’ দেখতেছিলাম তখন ছবিটি আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছিল। চলচ্চিত্রের ভাষা তো সর্বজনীন। আমি সেই ভাষাতে আমার কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। আমার সিনেমাতে মানুষের গল্প বলতে চাই।’ যোগ করেন নার্গিস।

নারীরা তাদের মেধা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে যতই ভালো হিসেবে বিবেচিত হোক না কেন, নারী হবার কারণে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এমন অভিযোগ অনেক নারীই বিভিন্ন সময়ে করেছেন। তার কাছে জানতে চাওয়া ছিল, তিনি এমন ধরনের কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন কি না? নার্গিসের উত্তর, ‘পৃথিবীর সব দেশেই মেয়েদের জন্য কাজ করা বেশ কঠিন। একজন নারী পুরুষের তুলনায় দশ গুণ কষ্ট করে।

তারপরে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। এরপর সে তার সমাজের পুরুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে দেশভিত্তিক কোনো ভিন্নতা নেই। ক্যারিয়ারের শুরুর সময় আমি বেশ কষ্ট করেছি। ওই সময়টা অতিক্রম করেছি। এখন আমি ইরানে সব শ্রেণীর মানুষের কাছে নারী বা পুরুষ হিসেবে নয় একজন নির্মাতা হিসেবে পরিচিতি হয়েছি।

যদি নিজেকে মা হিসেবে ভাবি। আমি যদি গর্ভধারণ করতে পারি তাহলে আমার দ্বারা পৃথিবীর অন্যান্য সব কাজ করাও সম্ভব। গর্ভধারণ করা পৃথিবীর সব চাইতে কঠিন কাজ। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি সব সময় শুকরিয়া করি কারণ আমি একজন নারী। নারীর দিক থেকে পৃথিবীকে দেখার যে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেটা পুরুষের দিক থেকে দেখা সম্ভব নয়।’

৯০ তম অস্কারে বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে প্রতিযোগিতা করেছে নার্গিস অবইয়ারের ইরান-ইরাক যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ব্রেথ’। এতে ১৯৮০ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধ দেখানো হয়েছে। নার্গিসের স্বামী মোহাম্মাদ হোসেইন কাশেমি ছবিটি প্রযোজনা করেছেন। 

প্রিয় বিনোদন/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে সিয়ামের বিয়ে
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
গল্পের প্রসঙ্গ অফিসে যৌন হয়রানি
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
উর্মিলা-শ্যামলের ‘একদিন ভালো থাকি’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
মাহাদীর কণ্ঠে ‘বিজয়ের গল্প’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে নামছে বাংলাদেশ
সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে নামছে বাংলাদেশ
সময় টিভি - ২ দিন, ৩ ঘণ্টা আগে
আগে ভাষানটেক পরে চলচ্চিত্র
আগে ভাষানটেক পরে চলচ্চিত্র
https://samakal.com/ - ২ দিন, ৩ ঘণ্টা আগে