খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

খালেদা জিয়া কারাগারে নাকি জাদুঘরে?

আওয়ামী কিংবা বিএনপিপন্থী নন, এমন আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়া যেখানে আছেন, সেখানে কারাগার, আদালত, জাদুঘর—সব একাকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদেরই উচিত খালেদা জিয়া কোথায় আছেন বিষয়টি পরিষ্কার করা।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:০৪ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৩১


খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। দণ্ড পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন তিনি। পরিত্যক্ত ঘোষিত এই কারাগারের একমাত্র কয়েদি খালেদা জিয়াই। ৫ সেপ্টেম্বর এ কারাগারেই বসে আদালত। সেই সঙ্গে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই এটিকে জাদুঘরে রূপ দিতে প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্প অনুযায়ী, কারাগারকে জাদুঘরে বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি বছরের জুলাই থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—কারাগারে, জাদুঘরে, নাকি আদালতে রয়েছেন খালেদা জিয়া?

আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা বলছেন, জুলাই থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারকে কারাগার বলা যাবে না। বলতে হবে পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগার। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯-এর ২ ধারা মোতাবেক সরকার প্রশাসনিক আদেশে যেকোনো জায়গায় কারাগার বসাতে পারে। অন্যদিকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বলছেন, নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারকে কারাগারই বলতে হবে।

এদিকে আওয়ামী কিংবা বিএনপিপন্থী নন, এমন আইনজীবীরা বলছেন, খালেদা জিয়া যেখানে আছেন, সেখানে কারাগার, আদালত, জাদুঘর—সব একাকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদেরই উচিত খালেদা জিয়া কোথায় আছেন বিষয়টি পরিষ্কার করা।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ‘পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন’ শিরোনামে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭.৩৬ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সুরক্ষা সেবা বিভাগের আওতায় কারা অধিদফতর এবং ই এন সিজ ব্রাঞ্চ, ওয়ার্কস ডাইরেক্টরেট, ঢাকা সেনানিবাস।

প্রকল্পটির আওতায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, চার নেতা স্মৃতি জাদুঘর সংরক্ষণ, ছয়তলা ভিতের উপর ছয়তলাবিশিষ্ট মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, যার প্লিন্থ ৩৩৬০ বর্গমিটার। দোতলা ভিতের উপর দোতলাবিশিষ্ট চক কমপ্লেক্স নির্মাণ, যার প্লিন্থ ২৮৬০ বর্গমিটার। পাঁচতলা ভিতের উপর পাঁচতলা স্কুল, যার প্লিন্থ ৭০২৩ বর্গমিটার। অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ফুটপাত, ওয়াকওয়ে ২৭,২৯৮ বর্গমিটার, ১০২০ বর্গমিটারের দুটি মসজিদ (তৃতীয়তলা ভিতের উপর দোতলা এবং দোতলা ভিতের উপর দোতলা) নির্মাণ এবং ল্যান্ডস্কেপিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম।

বাঙালি জাতির ইতিহাস তথা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, চার নেতার স্মৃতি জাদুঘর, ঢাকার মধ্যযুগের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, কারা অধিদফতরের আওতায় সরকারি জমির পরিকল্পিত ব্যবহার, উন্মুক্ত নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়া কারাগারে, আদালতে, নাকি জাদুঘরে?

কারাগারে, আদালতে, নাকি জাদুঘরে আছেন খালেদা জিয়া—এ বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী ও আওয়ামী-বিএনপিপন্থী নন এমন আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

খালেদা জিয়া কারাগারেই আছেন বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন্দ্রীয় কারাগারকে কারাগার হিসেবেই ঘোষণা দিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার করতে কেন্দ্রীয় কারাগারে আদালত স্থানান্তর করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেখানে এটিকে কারাগার হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটিকে জাদুঘর হিসেবে দেখানো হয়নি।’

মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, ‘কারাগার না হলে এখানে সবসময় যেকোনো ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারত। এত নিরাপত্তা থাকত না। অফিশিয়ালি এই কারাগারকে এখনো জাদুঘর বলা হয়নি। একনেকে কোনো প্রকল্প পাস হলে সে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হতে অনেক সময় লাগে।’

অন্যদিকে নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারকে ‘আর কারাগার বলা যাবে না’ বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এটাকে কারাগার বলা যাবে না। এটাকে বলতে হবে পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগার। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯-এর ২ ধারা মোতাবেক সরকার প্রশাসনিক আদেশে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যেকোনো স্থানে বিচারের জন্য আদালত বসাতে পারবে। সেই ক্ষমতাবলে এখানে আদালত বসানো হয়েছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য নানা ধরনের বক্তব্য আসছে।’

ইউসুফ হোসেন আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান জীবিত থাকা অবস্থায় কর্নেল তাহেরের বিচারকাজ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হয়েছিল। এগুলি বলে নিজেদের গায়ে নিজেদের কাদা লাগানো হয় আর কি। এখানে আইনজীবী, সাংবাদিক—সবারই প্রবেশের ব্যবস্থা আছে। এটাকে পাবলিক ট্রায়ালই বলা যায়।’

খালেদা জিয়া এখন কারাগারে, আদালতে, নাকি জাদুঘরে আছেন—এমন প্রশ্ন ওঠাকে ন্যায্য মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘যদি চলতি বছরের জুলাই থেকে প্রকল্পের অনুমোদন দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা তো জাদুঘর। জাদুঘরে তো উনাকে রাখা যাবে না।’

‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলছেন, খালেদার সুবিধার জন্য তাকে এখানে রাখা হয়েছে। এখানে আবার কোর্টও বসানো হয়েছে। এটা জেল, জাদুঘর, কোর্ট—সবকিছু মিলে একাকার। ফলে এটা আইনজীবী হিসেবে আমার মাথাতেও আসতেছে না। সরকারের কর্তাব্যক্তির পক্ষ থেকে বক্তব্য নিলে আমরাও শিখতে পারব খালেদা জিয়া জেলা, না কারাগারে, নাকি আদালতের ভিতর বসবাস করছেন।’

এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত ঘোষণার পর সেখানে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করা হয়েছে। আবার সম্প্রতি সেই কারাগারে আদালত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে শুনলাম সেখানে মনোরম পার্ক করা হবে। জাতীয় চার নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বন্দিসেলকে স্মৃতিবিজড়িত করতে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এখন আবার হঠাৎ কী হলো, এটা কি পাগলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি মাথা খারাপ লোক পাগল হয়ে গেছে! এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলার নাই।’

এ বিষয়ে বিএন‌পির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রিয়.কম‌কে ব‌লেন, ‘আস‌লে খা‌লেদা জিয়া‌কে কষ্ট দেওয়া, নির্মমতার ম‌ধ্যে নি‌ক্ষেপ করা, ছোট করা এই অ‌নির্বা‌চিত সরকা‌রের এক‌টি প্রক‌ল্পের অংশ। খা‌লেদা জিয়া স্বৈরাচারবি‌রোধী আ‌ন্দোলন ও দুর্নী‌তির স‌ঙ্গে কখনো আপস ক‌রে‌নি, তা‌কে আপসহীন নেত্রী বলা হয়। পক্ষান্ত‌রে শেখ হা‌সিনা স্বৈরাচার এরশা‌দ, এমন‌কি ফখরু‌দ্দীন-মইন উদ্দিনের স‌ঙ্গে আপস ক‌রে বর্তমা‌নে ক্ষমতায়, ‌যে কার‌ণে তা‌কে কখনো আপসহীন নেত্রী বলাও হয় না। সেটা একটা রাগ থাক‌তে পা‌রে।’

‘খা‌লেদা জিয়া‌কে আজ যেখা‌নে এক‌টি প‌রিত্যক্ত ও নির্জন কারাগা‌রে রাখা হ‌য়ে‌ছে, সেখা‌নে শেখ মু‌জিবও ছি‌লেন। আমরাও ছিলাম। এখন আ‌ছেন ‌দে‌শের গণতা‌ন্ত্রিক আ‌ন্দোল‌নের নেত্রী বেগম জিয়া। বা‌কি আ‌ছে শুধু সেখা‌নে শেখ হা‌সিনার যাওয়া। তি‌নি য‌দি এক‌দি‌নের জন্যও সে কারাগা‌রে থা‌কেন, তাহ‌লে হয়‌তো সেটা তার কা‌ছে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হ‌বে। আ‌মি জা‌নি না হয়‌তো প্রধানমন্ত্রী সেই বি‌বেচনা নি‌য়েই এই প্রকল্প নি‌য়ে‌ছেন কি না।’

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে কারাগার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ২৩০ বছরের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে ১৭৮৮ সালে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকায় কারাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। কালের পরিক্রমায় ও বাস্তব প্রয়োজনে নাজিমুদ্দিন রোডের এ কারাগারটি গড়ে তোলা হয় কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে। কারাগারটি শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতা এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকারী দেশপ্রেমিক অসংখ্য বাঙালির ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত স্থান।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হতে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত আন্দোলনকারী অসংখ্য দেশপ্রমিক এই কারাগারে কারাবরণ করেছেন। পুরাতন ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারটি ১৮০৬ সালে ২১.৯০ একর জমির ওপর নির্মিত হয়। কারাগারটি জরাজীর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পশ্চিম পাশে নতুনভাবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ নির্মাণ করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই কেন্দ্রীয় কারাগারের সব কয়েদিকে স্থানান্তর করা হয়।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
আস্থা রাখুন—হিন্দু সম্প্রদায়কে ফখরুল
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ১২ নভেম্বর ২০১৮
প্রথম দিন ১৩২৬টি ফরম বিক্রি করেছে বিএনপি
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ১২ নভেম্বর ২০১৮
কারাগারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বন্দী
জনি রায়হান ১২ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
কেমন আছেন খালেদা জিয়া?
কেমন আছেন খালেদা জিয়া?
জাগো নিউজ ২৪ - ৩ সপ্তাহ, ১ দিন আগে