রাজধানীর ফার্মগেটে বিআরটিসির দুই বাসের রেষারেষি। ছবি: প্রিয়.কম

থামছে না বাসচালকদের ‘শক্তির মহড়া’

‘দুই বিআরটিসি বাসে তেমন যাত্রী ছিল না। তবে আজও মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।’

জনি রায়হান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:১৬ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:৫৩


রাজধানীর ফার্মগেটে বিআরটিসির দুই বাসের রেষারেষি। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) রাজধানীর তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিবের হাত শুধু নয়, প্রাণও কেড়ে নিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস। এরপর জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষির পর একটির চাপায় শহিদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল স্কুল-কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সে সময় সড়কে নৈরাজ্য কিছুটা কমার আশা জেগেছিল। কিন্তু রাজধানীতে বাসচালকদের রেষারেষি বন্ধ না হওয়ায় পুরনো শঙ্কাই ফিরে এসেছে। 

রাজধানীর ফার্মগেটে আজও (১৩ সেপ্টেম্বর) দেখা গেছে বিঅারটিসির দুটি বাসের রেষারেষির দৃশ্য। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে  ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজের পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাস। ওই সময় পেছন থেকে বিআরটিসির অপর একটি দোতলা বাস এসে দাঁড়ায় তার ঠিক পাশে। এতে প্রথম বাসের চালক বিরক্ত হয়ে অপর বাসটিকে মূল সড়কে চাপিয়ে দিলে দুই বাসের সামনের দিকের অংশ একসঙ্গে লেগে যায়। এতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনির সৃষ্টি হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাস দুটির যাত্রীরা। পরে আশপাশের লোকজন বাসের ও বাসচালকদের ছবি তোলার চেষ্টা করলে দ্রুত দু্জন গাড়ির গতি বাড়িয়ে স্থান ত্যাগ করে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এস কে আরিফ নামের একজন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি পাশের একটা বাসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি দুই বিআরটিসি বাসের চালক রেস করছে। ওই সময় ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজারের দিকে আসার রাস্তায় জ্যাম ছিল। রেসের সময় একটু সামনের রাস্তা ফাঁকা হওয়ায় দ্রুত চলে যায় বাস দুটি।’

‘দুই বিআরটিসি বাসে তেমন যাত্রী ছিল না। তবে আজও মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।’

শৃঙ্খলা মানছে না চালকরা

শুধু ফার্মগেট নয়, রাজধানীর আরও কিছু এলাকায় বাসচালকদের এমন রেষারেষি দেখা গেছে। বাংলামোটর, শাহবাগ, মতিঝিল, মিরপুর, গাবতলী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বাসচালকদের বিশৃঙ্খল আচরণ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) চলমান কর্মসূচির মধ্যেও বেপরোয়াভাবে বাস চলাচ্ছেন তারা।

যেসব এলাকায় পুলিশ কড়া নজরদারি ও জেল-জরিমানা করছে, সেগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রেখে গাড়ি চালাতে দেখা যায় বাসচালকদের। আবার যেসব এলাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট নেই বা রাস্তা ফাঁকা থাকে, সেসব এলাকায় বিশৃঙ্খলাভাবে গাড়ি চালাতে দেখা যায়।

আমিরুল ইসলাম নামের এক বাসযাত্রী জানান, শ্যামলী এলাকা থেকে সাভার যাওয়ার উদ্দেশে তিনি মিনিট দশেক মূল সড়কে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এর মধ্যে তার সামনে এসে একটি বাস ‘সাভার, সাভার’ বলে ডাকছিল। সে বাসে ওঠার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু চোখের পলকেই ওই বাসের ঘা ঘেঁষে সামনে এসে দাঁড়ায় অপর একটি বাস। সেই বাসের হেলপারও ‘সাভার, সাভার’ বলে ডাকছিল। মুহূর্তেই ভয় পেয়ে যান তিনি।

সড়কে এভাবে রেসে মেতে থাকে বহু বাস ড্রাইভার। ছবি: প্রিয়.কম
সড়কে এভাবে রেষারেষিতে মেতে থাকে বহু বাসচালক। ছবি: প্রিয়.কম

অল্পের জন্য দুই বাসের চাপা থেকে বেঁচে গেছেন বলে জানান আমিরুল ইসলাম।

দিনে শৃঙ্খল আচরণ, রাত নামলেই বিশৃঙ্খলা

ট্রাফিক পুলিশের চলমান কড়া আইনি তৎপরতার কারণে দিনে বাসচালকরা বাধ্য হয়ে শৃঙ্খল আচরণ করেন। কিন্তু রাত নামলেই তারা আবার হয়ে ওঠেন বিশৃঙ্খল। কারণ রাত ১০টার পর অনেক সড়কে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা থাকেন না। মূল সড়কে যানবাহনও চলাচল করে কম। তাই এই সময়ে বাসের চালকরা নিজেদের ইচ্ছামতো গাড়ি চালান। মূলত রাতে বাসচালকরা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলেন। অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আগে নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। 

রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব দৃশ্য দেখা যায়।

হাসিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন রাত ১১টায় বাসায় ফিরি। অফিস থেকে বাসায় ফিরি নিজের বাইকে। গভীর রাত তাই স্বাভাবিকভাবেই খুব অল্প সময়ে বাসায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় খালি জায়গাগুলোতে বাসচালকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে আমি খুব অল্প গতিতে বাইক চালিয়ে আসি।’

‘আবার কোথাও কোথাও এই বাসচালকরা অযথাই যাত্রীর জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে। এসব কিছু করে, কারণ হলো ১০টার পরে রাস্তায় তেমন ট্রাফিক পুলিশ থাকে না।’

এত দুর্ঘটনার পরও বোধ জাগেনি বাসচালকদের। ছবি: প্রিয়.কম

গণপরিবহনগুলো এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি

সড়কে যানবাহনের চালকদের এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদের প্রশাসন যত ব্যবস্থাই নিচ্ছে, কিন্তু বাসগুলোকে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের তৎপরতার কারণে আমাদের বাইক আরোহী ও প্রাইভেট যানবাহনের আরোহীরা অনেকটা সচেতন হচ্ছেন।’

‘কিন্তু আমাদের বেশির ভাগ মানুষের দাবি ছিল যে, গণপরিবহনের নিয়ন্ত্রণ। সেটা এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গণপরিবহনগুলো রাস্তার মাঝেই থেমে যাচ্ছে, যেখানে-সেখানে যাত্রী নিচ্ছে, নামাচ্ছে। আবার নিজেদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা, সেটা কিন্তু চলছেই।’

শাকিল আরও বলেন, ‘আমাদের প্রশাসন থেকে শুরু করে অনেক ব্যক্তিরাই বলেছেন যে, আমাদের যাত্রীরা সচেতন না। সেটা আমরা মেনে নিচ্ছি যে, সচেতনতার হার অনেক কম, সেটা বাড়াতে হবে। তবে পরিবহনগুলোকে যে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।’

‘বেসরকারি বাস নয় শুধু, সরকারি বিআরটিসি বাস একটি অপরটির সাথে লেগে যাচ্ছে। সে জন্য আমরা কীভাবে রাজিবকে দোষ দিব। একটা আরেকটার সামনে যাওয়ার জন্য কেন প্রতিযোগিতা করবে?’

মামলা-জরিমানার পরও...

রাজধানীতে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। এসব অভিযানে প্রতিদিনই হচ্ছে শত শত মামলা, জরিমানা করা হচ্ছে লক্ষাধিক টাকাও। কিন্তু এরপরও অনেক চালক আইন মানতে চান না।

১২ সেপ্টেম্বর দিনভর ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ অভিযানকালে ৪ হাজার ৫৭৮টি মামলায় ৩৩ লাখ ৬৯ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করে। ওই দিন অভিযানে ৪৯টি গাড়ি ডাম্পিং ও ৭৮১টি গাড়ি রেকার করা হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ওবায়দুর রহমান এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানায়, উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কারণে ৩৮৭টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করার দায়ে ৪১টি, হুটার ও বিকন লাইট ব্যবহার করার জন্য ৫টি এবং মাইক্রোবাসে কালো গ্লাস লাগানোর জন্য ১৪টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রাস্তা পারাপারেও দেখা যাচ্ছে অসতর্কতা। ছবি: প্রিয়.কম
রাস্তা পারাপারেও দেখা যাচ্ছে অসতর্কতা। ছবি: প্রিয়.কম

এ ছাড়াও ওই সময় ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে দুই হাজার মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা ও ১১৯টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অপরাধে ভিডিও দেখে একটি মামলা ও ২০টি সরাসরি মামলা দেওয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

সম্প্রতি বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর ‘নিরাপদ সড়ক’ ও সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট চূড়ান্ত অনুমোদন পায় ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ আইন।

সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সাজার বিধান রেখে বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওই আইনের ধারা ৩০৪ (বি) অনুযায়ী, ‘বেপরোয়া যানবাহন চালানোর কারণে মৃত্যু ঘটলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।’

সড়কের নৈরাজ্য দূর করতে আইন তৈরি করা হলেও চালকদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। নিজেদের শক্তির জানান দিতে কে, কার আগে বাস স্টপেজ থেকে বেশি যাত্রী তুলতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতা এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন চালকরা। 

প্রিয় সংবাদ/হাসান/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
আদালতে তোলা হচ্ছে রফিকুল ইসলাম মিয়াকে
আমিনুল ইসলাম মল্লিক ২১ নভেম্বর ২০১৮
শোডাউনকারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না: মির্জা ফখরুল
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২১ নভেম্বর ২০১৮
তিন জেলায় গুলিতে নিহত ৪
আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন ২১ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
তিন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
তিন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
বণিক বার্তা - ১ দিন, ২২ ঘণ্টা আগে
পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
বণিক বার্তা - ১ week, ১ দিন আগে
ফায়ার সার্ভিস নেবে ১২৩ জন চালক
ফায়ার সার্ভিস নেবে ১২৩ জন চালক
https://www.prothomalo.com/ - ১ week, ১ দিন আগে
চার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
চার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬
বণিক বার্তা - ২ সপ্তাহ, ২ দিন আগে
ট্রেন্ডিং