ছবিটি প্রতীকী, ইন্টারনেট হতে সংগৃহীত।

বোকা মেয়ের ডায়েরি: মেয়েটি বিয়ে করছে না, কারণ...

‘‘বিয়ে করছে না মানে কী? বিয়ে আসলে হচ্ছে না। নিশ্চয়ই কোন সমস্যা আছে, এই জন্যে বিয়ে হয় না!... চেহারা দেখেছ? এই মুটকি মেয়েকে ছেলেরা কী দেখে বিয়ে করবে?... নিশ্চয়ই বাচ্চা হওয়া নিয়ে সমস্যা, নাইলে বিয়ে হবে না কেন?...এইটা মেয়ে না হিজড়া?’’ ... ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

রুমানা বৈশাখী
বিভাগীয় প্রধান (প্রিয় লাইফ)
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:১৬ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:১৬


ছবিটি প্রতীকী, ইন্টারনেট হতে সংগৃহীত।

(প্রিয়.কম) আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে বিয়ে না করা বা অবিবাহিত থেকে যাওয়া যে কারো জন্যেই একটা শক্ত সিদ্ধান্ত। শক্ত বললাম এই কারণে যে, আপনি নারী হোন বা পুরুষ, বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিলে সমাজের শত শত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবেই। বিয়ে করা কিংবা না করা যে সম্পূর্ণ একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আমাদের সমাজ এখনো সেটা বুঝতে শেখেনি। আমরাও সেটা সহজভাবে মেনে নিতে শিখিনি। কাউকে চিরকুমার বা চিরকুমারী দেখলে, কিংবা কারো বিবাহে দেরি দেখলে পরিবার তো বটেই, বলতে গেলে চারপাশের সকলেই উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে।

তবে হ্যাঁ, এখানেও কিন্তু ভিন্নতা আছে, বৈষম্য আছে। কেমন? একটু বুঝিয়ে বলি আসুন...

যে পুরুষ বিয়ে করছেন না স্বেচ্ছায়, তাঁর কথা বাদ। যখন একজন পুরুষের চেষ্টা সত্ত্বেও বিয়ে হচ্ছে না, তাঁর ক্ষেত্রেও আমরা ধরে নিই- "ইচ্ছা করেই বিয়ে করছে না। ভালো মেয়ে পেলেও করবে। যেন-তেন একটা মেয়ে ধরে বিয়ে করা যায় নাকি? জীবনের প্রশ্ন!"

উল্টো দিকে যখন কোন নারী স্বেচ্ছাতেই বিয়ে করছেন না, আমরা তখন ধরে নিই-

"আরে, বিয়ে করছে না মানে কী? বিয়ে আসলে হচ্ছে না। মেয়ে মানুষ বিয়ে ছাড়া শখ করে থাকে নাকি?"

"নিশ্চয়ই কোন সমস্যা আছে, এই জন্যে বিয়ে হয় না!"

"চেহারা দেখেছ? এই মেয়ের বিয়ে হবে কীভাবে? ছেলেরা কি অন্ধ?"

"এই শুঁটকি/মুটকি মেয়েকে ছেলেরা কী দেখে নিবে?"

"নিশ্চয়ই বাচ্চা হওয়া নিয়ে সমস্যা, নাইলে বিয়ে হবে না কেন?"

"এইটা মেয়ে না হিজড়া?" ... ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভাবছেন বানিয়ে বলছি? একদম না। বানিয়ে যে বলছি না, সেটা অনেকেই কমবেশি জানেন। কারণ এই কথা অনেককেই প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে কিংবা হচ্ছে। অনেকে আবার এইসব কথা অন্যকে বলেছেনও। দুঃখজনক হলেও সত্য যে নারীদেরকে নিয়ে এসব কুৎসিত মন্তব্য নারীরাই অধিক করেন। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। তবে কিছুক্ষণের জন্যে আমার অভিজ্ঞতা বাদ থাকুন, জানি আসুন কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা।

ফারজানা আঁখি (ছদ্মনাম)

ব্যাংকার, বয়স ৪১

আমার বিয়ে হয়েছে দেরীতে। দেরীতে মানে বেশ দেরীতে। যে কোন কারণেই হোক একটা তিক্ত অভিজ্ঞতায় মন ভেঙে গেছিল, নিজেকে আর কিছুতেই রাজি করাতে পারছিলাম না নতুন সম্পর্কের জন্য। সত্যি কথা বলতে কি, বিয়ের আগে নিজের পরিবার ও বন্ধুদের থেকেই এত সব কথা শুনেছি যে বাইরের মানুষ প্রয়োজন হয়নি। আমার নিজের ছোট বোন বলে বেড়াত- আমি বন্ধ্যা, তাই বিয়ে হচ্ছে না! আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে কেবলই এইসব কথা সইতে না পেরে।

রাবেয়া সুলতানা (ছদ্মনাম)

গৃহিণী, বয়স ৫৩

আমার মেয়েটি বিয়ে করছে না। এখন সে করতেও চায় না। লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে তারপরেই বিয়ে করতে চায়। মাত্র ২৭ বছর বয়স আমার মেয়ের, এখনই আত্মীয়স্বজন বিয়ের জন্যে পাগল। নানা জায়গা থেকে প্রস্তাব আসে, আমরা না করে দিই। ঈদের সময়েই আমার ননাস জিজ্ঞেস করল- "এত সুন্দর মেয়ে তোমার, তাহলে বিয়ে হয় না কেন? মেয়ের কি কোন সমস্যা আছে?" জবাবে আমি কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না।

নাহার তিশা (ছদ্মনাম)

শিক্ষিকা, বয়স ৩২

আমি এখনো বিয়ে করিনি। করবো না, সিদ্ধান্ত এমনটাই।কারণটা ব্যক্তিগত। জীবনের কোন মোড়ে কাউকে ভালো লেগে লেগে করতেও পারি। কিন্তু এই মুহূর্তে নয়। বোঝাতে পারবো না এই সিদ্ধান্তটির জন্যে প্রতিদিন কী সব অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। বান্ধবিরা সবাই বিবাহিতা, সন্তানের মা। আমি এখন দলছুট, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছি ক্রমশ। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও যেতে ইচ্ছে হয় না। সবাই বিয়ে না হওয়া নিয়ে সহানুভূতি দেখায়। আমি কাউকে বোঝাতে পারি না যে বিয়ে না করাটা আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, বিয়ে হচ্ছে না- ব্যাপারটি এমন নয় মোটেও।

এমন গল্প একটি/দুটি নয়, খুঁজতে গেলে আশেপাশেই মিলবে অনেক। একটু খেয়াল করলে হয়তো মনে পড়ে যাবে যে আমরা নিজেরাও হয়তো এমন কুৎসিত মন্তব্য করেছি কখনো না কখনো। বিয়ে না করা বা কোন কারণে চেষ্টা সত্ত্বেও বিয়ে না হওয়া নারীদেরকে সামাজিক ভাবে পোহাতে হয় নানান দুর্ভোগ। তাদেরকে নিয়ে লোকের কৌতূহল থাকবে, নানা জনে নানা উপদেশ দেবে আগ বাড়িয়ে, চুকচুক করে সহানুভূতি জানাবে যেন বিয়ে না হওয়াটা বিশাল বড় একটা অসুবিধা- এটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি আমরা। ধরেই নিয়েছি যে নারীর বিয়ে হচ্ছে না মানে সে সকলের করুণার পাত্র।

আমরা ভুলে গিয়েছি যে বিয়ে করা বা না করাটা একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমরা ভুলে গিয়েছি যে নারীর জীবন কেবল বিয়ে করা বা সন্তান পালনের জন্যে না। বিয়ে না করলে কিংবা সন্তান জন্ম না দিলে যেমন পুরুষের জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না, তেমনই নারীর জীবনও ব্যর্থ হয় না। জীবন একটাই আর সকলের অধিকার আছে নিজের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো নিজে নেয়ার। একজন নারীর বিয়ে হচ্ছে না মানেই সে বিয়ের জন্য মরে যাচ্ছে, এমন নয়। বিয়ে করছেন না মানেই সে বন্ধ্যা বা তাঁর কোন যৌন সমস্যা আছে, এমন নয়। বিয়ে করছেন না মানেই তাঁর জীবন ব্যর্থ আর তিনি সকলের সহানুভতির পাত্র, এমনটাও নয়।

সত্য এটাই যে বিয়ে জীবনের একটি অংশ। বেশ বড় অংশ। কিন্তু সম্পূর্ণ জীবন নয়। কেবলমাত্র একটা বিয়ে করলেই কেমন কারো জীবন সফল হয়ে যায় না। তেমনি বিয়ে না করলেও বিফল হয়ে যায় না। বরং, অন্যের কথা চাপে পড়ে করা একটা ভুল বিয়ে পুরো জীবন নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট! বিয়ে তখনই করা উচিৎ, যখন মানসিক প্রস্তুতি শতভাগ আছে। অন্যথায় নয়।

পরিশিষ্ট
আমি একবার একজন উচ্চ (!!) শিক্ষিতা ভদ্রমহিলাকে বলতে শুনেছিলাম যে- "মেয়ে মানুষের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিয়ে না হলে তাঁদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তখন শুধু অন্যদের হিংসা করে, এর-তার সংসারে আগুন দিয়ে বেড়ায়। এইসব মেয়েদের নিজের স্বামী থেকে দূরে রাখতে হয়...।"

কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে। একজন মানুষ বিয়ে করেনি বা বিয়ে হয়নি বলে সে অন্য কারো সংসার ভাঙার জন্য বেঁচে থাকে, এমন একটা ভাবনা আমরা কোথায় পাই? আর কতকাল লাগবে কেবল কাগজ-কলমে শিক্ষিত না হয়ে আমাদের ভাবনার জগতও শিক্ষিত হতে?

প্রিয় লাইফ/ আর বি

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট
রাশিদা, ইলহান: কংগ্রেসে প্রথম দুই মুসলিম নারী
রাশিদা, ইলহান: কংগ্রেসে প্রথম দুই মুসলিম নারী
বিবিসি বাংলা - ৩ দিন, ১৬ ঘণ্টা আগে