শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশে নিচে মানুষের বসবাস। ছবি: সংগৃহীত

পদ্মার ভাঙনে খোলা আকাশের নিচে কয়েকশ পরিবার

গত এক মাসে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়েছে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এম.এ ওয়াদুদ মিয়া
কন্ট্রিবিউটর, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:৩১ আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৬


শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশে নিচে মানুষের বসবাস। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) চলতি বর্ষায় শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর, কেদারপুর ইউনিয়ন এবং নড়িয়া পৌরসভার প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে নড়িয়া উপজেলা শহরের মানচিত্র। এ উপজেলার অপেক্ষাকৃত গরীব লোকদের পাশাপাশি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের বসতবাড়ি হারিয়ে  অন্যের জমি অথবা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে শতাধিক পরিবার নড়িয়ার সাবেক পৌর মেয়র হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নিয়েছেন।

গত এক মাসে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়েছে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, মসজিদ, মন্দির, পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ লাইনসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এসব এলাকার কয়েকশ পরিবার তাদের মাথা গোজার ঠাঁই হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তারা সহায় সম্বলহীন হয়ে নড়িয়ার সাবেক পৌর মেয়র হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা এখন অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করছে। উপজেলা প্রশাসন চাহিদার তুলনায় অল্পপরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে তাদের পাশে দাড়ালেও তাদের জন্য খোলা হয়নি কোন আশ্রয় কেন্দ্র। 

naria
পদ্মায় ঘরবাড়ি হারিয়ে নড়িয়ার সাবেক পৌর মেয়র হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নিয়েছেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আবদুল কাদের। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে উপজেলা প্রশাসন বলছে, নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষা বিভাগ বলছেন, এ বিষয়ে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

ভাঙন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা ভাঙন কবলিত অসহায় মানুষের হাহাকার। সেখানে প্রশাসনের দেয়া বক্তব্যের সাথে ক্ষতিগ্রস্থদের কথার কোন মিল পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যে ২৮টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে, তাতে সরকারি নির্দেশনা না থাকায় কোন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার আশ্রয় নিতে পারেনি। সরকারের প্রতি পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের দাবি জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্থরা।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি জাজিরার কুন্ডেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার এলাকায় পদ্মার ডান তীর প্রতিরক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি। বর্তমানে ভাঙন কবলিত এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক কাজ করার জন্য ২০ কোটি টাকার আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদন পাওয়া গেছে মাত্র ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু এতো টাকা খরচ করেও কোন ফল আসছে না।

নড়িয়ার সাবেক পৌর মেয়র হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নেয়া ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আবদুল কাদের ফকির বলেন, ‘আমার বাড়ি ছিলো কেদারপুর ইউনিয়নে। পদ্মা নদী আমার বাড়িঘর জমিজমা সব কেড়ে নিয়েছে। আমি এখন নিঃস্ব। আমার বলতে আমি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি এখন হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে থাকি। আমার ঘর নেই। রাতে এই ছাবরার ভিতরে ঘুমাই। আর দিনের বেলা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। এখানে আমার মতো আরও ২৬টি পরিবার আছে। সরকারিভাবে একদিন ২৫ কেজি চাল পাইছি। আর কিছু পাইনি।’

naria
উপজেলার কয়েকটি অফিস পদ্মার ভাঙনের বিলীনের হওয়ার পথে। ছবি: সংগৃহীত

হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নেয়া ৫৮ বছরের আরেক বৃদ্ধ শাহাবুদ্দিন বেপারী বলেন, ‘আমার ঘরবাড়ি সব ছিলো। এখন কিছুই নেই। পদ্মা সব গিলে খাইছে। আমরা এহন খোলা মাডে নিজে থাকি। সরকার যদি আমাদের জন্য একটি আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতো তাহলে কতই না ভালো হতো।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ানের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার সব ছিলো। এখন কিছুই নেই। আমি এখন নিঃস্ব। আমি আশ্রয় নিয়েছি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে। প্রশাসনের কাছে আমার জোর দাবি নড়িয়াকে যেন দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।’

ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা এবং স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক এ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ (গেরিলা আজাদ)’র সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ২ তারিখে প্রথম বৈঠকে একনেকের সভায় পদ্মার ডান তীর রক্ষার জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দেয়া হলেও একটি মহলের অবহেলার কারণে গত শুস্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেনি। এখন জরুরি ভিত্তিতে যে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে তা অপরিকল্পিত। এতে কোন উপকার হচ্ছে না। নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে আমাদের নড়িয়া সদরের অস্তিত্ব আগামী এক মাসের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। ছোট হয়ে যাবে নড়িয়া উপজেলার মানচিত্র।

naria
পদ্মার ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে নারী-শিশুসহ শত শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

নড়িয়া পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু রাড়ি বলেন, ‘এ বছরের ভাঙনে নড়িয়া পৌরসভার ২ এবং ৪ নং ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৭ শতটি পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি আর রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়হীনতার কারণে আজ আমরা আমাদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছি। এখনো যদি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু না করা হয়, তাহলে নড়িয়া বাজারসহ অন্তত ২০টি স্কুল-কলেজ, পৌর ভবন, উপজেলা কমপ্লেক্স, হাসপাতাল, খাদ্য গুদাম সব কিছু বিলীন হয়ে যাবে।’

এ ব্যাপারে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় প্রতিরক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ বাড়ানো হবে।’

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা ইয়াছমিন বলেন, ‘আমরা ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের কাছে ৩০ কেজি করে ত্রাণের চাল বিতরণ করেছি। পাশাপাশি ঘর তোলার জন্য ৭০০ পরিবারকে দুই বান্ডেল করে ঢেউ টিন বরাদ্দ দিয়েছি।’

প্রিয় সংবাদ/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কোথায়, কীভাবে
প্রদীপ দাস ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
২৯ সেপ্টেম্বরের পর জাতীয় ঐক্যের কমিটি
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
নারায়ণগঞ্জে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ সাজুসহ গ্রেফতার ৪
ইমামুল হাসান স্বপন ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
খুলনার নবনির্বাচিত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ
শেখ নোমান ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের ১০ দফা দাবি
প্রিয় ডেস্ক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট