উজবেকিস্তানে দুই হাজারেরও বেশি মসজিদ-মাজার রয়েছে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ছবি: সংগৃহীত

‘দ্বিতীয় মক্কা’ হতে চায় উজবেকিস্তান

বর্তমান সরকার মনে করে, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মের ওপর তারা নতুন করে যে জোর দিচ্ছে, তাতে তরুণরা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকবে না।

আবু আজাদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:১৩ আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:১৩


উজবেকিস্তানে দুই হাজারেরও বেশি মসজিদ-মাজার রয়েছে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বের মুসলিমদের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় উজবেকিস্তান। মুসলিমদের আকর্ষণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয় মক্কা হিসেবে পরিচিতি পেতে চায় দেশটি।

মধ্য এশিয়ার জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানে রয়েছে বহু পুরনো মসজিদ ও মাজার, যে স্থাপনাগুলো অতি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

দেশটিতে যত মসজিদ এবং মাজার রয়েছে, তার বেশির ভাগই সমরখন্দ এবং বুখারা শহরে অবস্থিত। উজবেকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ এসব মসজিদ এবং মাজারকে বিশেষ পবিত্র জ্ঞান করেন। কিন্তু দেশটির সরকার মনে করে এসব স্থাপনার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে আকর্ষণীয় করা যায়। কয়েক দশক বিচ্ছিন্ন থাকা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর উজবেকিস্তান এখন উন্মুক্ত হয়েছে।

সমরখন্দ শহরে যেসব সমাধি রয়েছে, তার মধ্যে সম্রাট তামেরলেন, জ্যোতির্বিদ উলুংবেক এবং নবী হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস-এর সমাধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মূলত কুসাম ইবনে আব্বাসই সপ্তম শতকে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছেন।

দেশটিতে অনেক বিজ্ঞানী, ধর্মীয় নেতা ও ধর্ম প্রচারকদের সমাধি রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
দেশটিতে অনেক বিজ্ঞানী, ধর্মীয় নেতা ও ধর্ম প্রচারকদের সমাধি রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সমরখন্দে একটি সমাধি আছে, যেটি অন্য সমাধিগুলোর চেয়ে আলাদা। মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ের চূড়ায় এ সমাধি অবস্থিত। প্রতিদিন সকালে হাজার-হাজার মানুষ সেখানে যায়। যারা সেখানে প্রার্থনা করতে যায়, তারা শুধুই মুসলিম নয়।

কারণ এ জায়গাটিতে দানিয়েল নামের এক ব্যক্তির সমাধি আছে, যিনি ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ঈশ্বরের একজন বার্তাবাহক বা নবী হিসেবে স্বীকৃত।

সমরখন্দের তরুণ তরুণ পর্যটক গাইড ফিরদোভাসি বলেন, ‘মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদিরা এখানে এসে নিজেদের ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করে।’

ফিরদোভাসি বলেন, ‘সেন্ট ড্যানিয়েল (দানিয়েল) ছিলেন একজন ইহুদি। কিন্তু আমাদের মুসলিমরা তাকে শ্রদ্ধা করে। কারণ তিনি আল্লাহর একজন নবী।’

দিলরাবো নামের এক নারী জানান, তিনি প্রায়ই এখানে আসেন দানিয়েল-এর জন্য প্রার্থনা করতে।

দিলরাবো বলেন, ‘তিনি (দানিয়েল) শুধু ইহুদির একজন নবী ছিলেন না, তিনি সকল মানবতার জন্য ছিলেন। আমার নাতির নাম তার নাম অনুসারে রেখেছি।’

দেশটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর কদর দিন দিন বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত
দেশটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর কদর দিন দিন বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত

দিলরাবো তার মেয়ে এবং নাতিকে নিয়ে এ সমাধিতে এসেছেন। প্রার্থনায় শেষ করার পর সমাধি কাছ থেকে দেখার জন্য তিনি দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

দানিয়েলের সমাধি একটি অনন্য স্থাপনা। প্রায় ৬৫ ফুট লম্বা এ সমাধি তৈরি করা হয়েছে বালুর রং-এর মতো ইট দিয়ে।

ইসলামের মধ্যযুগে যেসব স্থাপনা ছিল, সে আদলে এ সমাধি তৈরি করা হয়েছে। পৃথিবীর যে কয়েকটি জায়গায় বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ আসে, দানিয়েল-এর সমাধি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ইসরায়েল থেকে আসা সুজান বলেন, ‘আমি একজন ইহুদি। আমি এখানে প্রার্থনা করতে পারি। একজন খ্রিস্টানও এখানে প্রার্থনা করতে পারে। এ জায়গাটি মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে।’

দিলরাবো তার মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে এসেছেন।
দিলরাবো তার মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে দানিয়েলের সমাধিতে প্রার্থনা করতে এসেছেন। ছবি: সংগৃহীত

মস্কো থেকে আসা ক্রিস্টিনা জানান, তার বন্ধুরা এখানে এসেছিল অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে, ‘তারা এখন সুস্থ’।

উজবেকিস্তানের সংস্কৃতিতে অনেক মানুষ মনে করে রোগমুক্তি পাওয়ার জন্য এসব মাজার কিংবা পবিত্র স্থানের জাদুকরী ভূমিকা আছে।

দানিয়েলের সমাধি ১৮ মিটার লম্বা। অনেক মানুষ বিশ্বাস করে সেন্ট ড্যানিয়েল (দানিয়েল) হয়তো অনেক লম্বা ছিলেন, নতুবা তার সমাধি প্রতিবছর লম্বা হয়েছে।

উজবেকিস্তানে অনেক সমাধি আছে, যেগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

দানিয়েলের কফিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। ছবি: সংগৃহীত
দানিয়েলের কফিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। ছবি: সংগৃহীত

ধর্মীয় বিষয় নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেওয়া উজবেকিস্তানের যুবক ইয়োলডোশেভ বলেন, ‘উজবেকিস্তানের অনেক মানুষ মনে করে সেন্ট্রাল এশিয়ায় ইসলাম অনেক নমনীয়। এখানে ধর্মকে সহিষ্ণুভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। মাজার দেখতে যাওয়া এবং সেখানে প্রার্থনা করা উজবেকিস্তানের সংস্কৃতির একটি অংশ। মাজারে যাওয়া কিংবা প্রার্থনা করার সাথে রাজনৈতিক ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।’

উজবেকিস্তানে সাবেক স্বৈরশাসক ইসলাম করিমভ-এর জামানায় ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার হয়েছে। তিনি প্রায় ২৬ বছর দেশ শাসন করেছেন। সে সময় অনেক মুসলিমকে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন উজবেকিস্তান পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিওয়েভ ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ইসলাম করিমভের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন।

১৯৯০-এর দশকে উজবেকিস্তানের বহু তরুণ হতাশার বশবর্তী হয়ে তালিবান এবং আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়েছিল।

বর্তমান সরকার মনে করে, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মের ওপর তারা নতুন করে যে জোর দিচ্ছে, তাতে তরুণরা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকবে না।

দেশটির বুখারায় অবস্থিত বিখ্যাত একটি মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত
দেশটির বুখারায় অবস্থিত বিখ্যাত একটি মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

উজবেকিস্তানে কতগুলো মাজার রয়েছে, সে হিসাব কেউ দিতে পারেননি। তবে কিছু সরকারি কর্মকর্তার ধারণা, মাজারের সংখ্যা দুই হাজারের কম হবে না।

এর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে লাভজনক করা যাবে বলে মনে দেশটির সরকার। সে জন্য উজবেকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উজবেকিস্তান ট্যুরিজম কমিটির উপ-প্রধান আবদুলাজিজ আক্কুলভ বলেন, ‘বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং পণ্ডিত ইমাম বুখারি এবং বাহাউদ্দিন নকসবন্দকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং ভারত থেকে অনেক পর্যটক এখানে আসতে পারে।’

উজবেকিস্তানে পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

১৪ শতকের সুফি নেতা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ-এর বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি অনুসারী আছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রিয় সংবাদ/শান্ত 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কোথায়, কীভাবে
প্রদীপ দাস ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
২৯ সেপ্টেম্বরের পর জাতীয় ঐক্যের কমিটি
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
নারায়ণগঞ্জে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ সাজুসহ গ্রেফতার ৪
ইমামুল হাসান স্বপন ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
খুলনার নবনির্বাচিত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ
শেখ নোমান ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের ১০ দফা দাবি
প্রিয় ডেস্ক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট