জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: প্রিয়.কম

জাহাঙ্গীরনগরে পাস লাগে না পোষ্য কোটায়!

পোষ্য কোটায় কোনো একটি বিভাগে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে কিংবা কতটি আসন থাকবে, তা নির্ধারণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মো. ইউসুফ জামিল
কন্ট্রিবিউটর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:২৮ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৫৪
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:২৮ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৫৪


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিভিন্ন অনুষদভুক্ত বিভাগে ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষা হয়। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষা হয় ৮০ নম্বরের। আর এসএসসি ও এইচএসসির পয়েন্ট মিলে ১০ করে ২০ যুক্ত হয়। বিভিন্ন বর্ষে এসব পরীক্ষায় কোটাবিহীন শিক্ষার্থীদের মেধা তালিকায় থাকতে হলে পঞ্চাশের বেশি নম্বর পেতে হয়। বিপরীতে লিখিত পরীক্ষার নম্বরের মাত্র ৩৩ শতাংশ (২৬.২৪ নম্বর) পেয়েই ভর্তির সুযোগ পান পোষ্য কোটাধারীরা। 

জাবির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান ও ভাই-বোনদের জন্য নির্ধারিত কোটা হলো পোষ্য। এই কোটায় কোনো একটি বিভাগে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে কিংবা কতটি আসন থাকবে, তা নির্ধারণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে পাস করলেই আবেদন করা বিভাগে ভর্তি হতে পারেন পোষ্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে (৪৭তম আবর্তন) ১০৭ জন পোষ্য কোটায় আবেদন ফরম পূরণ করেন। তাদের মধ্যে ৭৭ জনকে ভর্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। এদের মধ্য ৭৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

ওই ৭৪ জনের প্রাপ্ত নম্বরের তালিকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার কাছে দীর্ঘ দুই মাস ঘোরাঘুরির পরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পোষ্য কোটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে ক্যাম্পাসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন। তথ্যের জন্য আবেদন করা হলে সেই আবেদনপত্রটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

১৯৯৩ সালের ২৬ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তির অধ্যাদেশে পোষ্য ভর্তির কথা উল্লেখ করা হয়। শুরুতে পোষ্যদের জন্য লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ছিল ৪০ শতাংশ। কিন্তু ২০১৩-২০১৪ সেশনে পাস নম্বর কমিয়ে ৪০ থেকে ৩৫ শতাংশ করা হয়। আবার ২০১৫-২০১৬ সেশনে আবার তা কমিয়ে ৩৫ থেকে ৩৩ শতাংশ করা হয়। ২০১৬-১৭ সেশনে শুধু পোষ্যদের জন্য আবশ্যিক বিষয়ে পাস নম্বর পাওয়ার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়া হয়।

ভর্তি পরীক্ষায় আবশ্যিক বিষয় হলো বাংলা ও ইংরেজি। এই ‍দুই বিষয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট নম্বর পেতে হয়। সেটা না পেলে তাদের অকৃতকার্য ধরা হয়। কিন্তু পোষ্য কোটাধারীদের ক্ষেত্রে আবশ্যিক এই নম্বরের বাধ্যবাধকতা নেই। 

জাবির সদ্যবিদায়ী রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে। যেখানে পোষ্য কোটায় ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায়, সেখানে দায়িত্বশীল ব্যক্তির মেয়ে সে নম্বর অর্জন করতে পারেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০১১-১২ সালে মেয়েকে ১০ নম্বরের বেশি গ্রেস দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান তিনি।

জাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতি/নাতনি কোটায় ১৪৪ জন, উপচার্যের কোটায় ২০, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অনগ্রসর সম্প্রদায় কোটায় ২৫, দলিত সম্প্রদায় কোটায় ৫, প্রতিবন্ধী কোটায় ১৫ এবং খেলোয়াড় কোটায় আটজন ভর্তি হতে পারেন। কিন্তু  পোষ্য কোটাধারীদের ক্ষেত্রে এ রকম কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাবির একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রের গড় বার্ষিক ব্যয় ৯৯ হাজার টাকা। এই টাকা দেওয়া হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য। কিন্তু সেই ব্যয়ের সুফলভোগী হন পোষ্যরাও।

১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তির অধ্যাদেশে পোষ্য ভর্তির করার বিষয়ে উল্লেখ করা আছে। এতে বলা হয়, ‘ক্যাম্পাসে উক্ত ব্যক্তি (শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী) অথবা অন্য কোনো শিক্ষক/কর্মকর্তা/কর্মচারী বাসায় থাকিবার অনুমতি প্রাপ্তিসাপেক্ষে ভর্তি করা যাইতে পারে। তাদের হলে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের আবাসিক কয়েকজন ছাত্রের অভিযোগ, পোষ্যধারী অনেকেই হলে অবস্থান করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। 

পোষ্য কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের তালিকায় দেখা যায়, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে পোষ্য কোটায় ৬৭ জন, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ৮৫ জন, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ৮৯ জন, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ৪০ জন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ৬৮ জন ও ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ৪১ জনকে ভর্তি করানো হয়। 

ছয় শিক্ষাবর্ষে মোট ৩৯০ জন পোষ্য কোটায় ভর্তি হন। এদিকে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে ২০১৬ সালে সরকার ৯৯ হাজার টাকা খরচ করলে ৩৯০ জন শিক্ষার্থীর পেছনে এক বছরে তিন কোটি ৮৬ লাখ টাকা খরচ হয়। 

প্রতি বছর বিভিন্ন বিভাগে নির্ধারিত আসন সংখ্যার বাইরে ১১, ১৩, ১৭—এমন সংখ্যার শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয় পোষ্য কোটায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে বিভাগটির অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ১৭ জনকে পোষ্য কোটায় ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে (৪৭তম আবর্তন) বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে ১২ জন পোষ্য কোটায় ভর্তির সুযোগ লাভ করে।

পোষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। এ বিষয়ে জাবির ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ পোষ্য কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আসন, নম্বর গ্রেস না দেওয়া এবং পোষ্য কোটার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার দাবি জানিয়ে আসছি। আমরা আশা করছি, মাননীয় উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম এ নিয়মের অবসান ঘটাবেন এবং পোষ্য কোটার আসন সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে দিবেন।’

পোষ্য কোটার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করার দাবি জানিয়ে ৪০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মাসরুকুর রহমান বলেন, ‘পোষ্য কোটার সংস্কার শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রাণের দাবি। এই কোটায় ভর্তির কোনো নীতিমালা নেই, এমনি সংখ্যাও সুনির্দিষ্ট করা নেই। পোষ্য কোটার শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়া নয়, বরঞ্চ দেশের সবচেয়ে ভালো পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী।’

‘অথচ এদের প্রাধিকার দেওয়া মানেই দেশের গরিব জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা চায় পোষ্য কোটার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং পোষ্য কোটার সংখ্যা থাকবে সুনির্দিষ্ট।’

পোষ্য কোটার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘পোষ্য কোটার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং পোষ্য কোটার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো কথা হয় নাই। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলতে পারব না।’

জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

প্রিয় সংবাদ/হিরা/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...