মৃত বাবার মুখের কাপড় সরিয়ে কেঁদে ওঠে ছোট ছেলেটি। এ ছবিটিই টুইটারে ভাইরাল হয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যু: ৫১ লাখ রুপির কাহিনী

‘সাংবাদিকতার জীবনে অনেক কঠিন ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু এটা দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল। বেশ কয়েক মিনিট কথা বলতে পারিনি।’

আবু আজাদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৩১ আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৩১
প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৩১ আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৩১


মৃত বাবার মুখের কাপড় সরিয়ে কেঁদে ওঠে ছোট ছেলেটি। এ ছবিটিই টুইটারে ভাইরাল হয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ভারতের দিল্লিতে নালা পরিষ্কার করতে নেমে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে তারই ছোট ছেলে। টাকার অভাবে দেহ সৎকার করতে পারছে না বাবার লাশ। টুইটারে এমন ছবি ভাইরাল হওয়ার পর ওই পরিবারের জন্য ৫১ লাখ রুপি সাহায্য তুলেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার ব্যবহারকারী কিছু মানুষ।

বাবার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কান্নারত শিশুর ছবিটি তুলেছিলেন দিল্লির হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার রিপোর্টার শিভ সানি। যিনি পেশাগত কারণেই ওই শ্মশানে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনা শিভ সানিকে এতোটাই নাড়া দেয় যে, পত্রিকায় ছাপা না হওয়া ছবিটি তিনি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

ভারতে নালা বা টয়লেট পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যু নতুন কিছু নয়। দেশটিতে প্রতিবছর একশরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় নালা পরিষ্কার করতে গিয়ে।

যদিও গত ২৫ বছর আগে নালা বা টয়লেট পরিষ্কারের জন্য কাউকে নিয়োগ করা বেআইনি করেছে দেশটির সরকার। তবুও সেই কাজটাই গোপনে করিয়ে নেয় বহু ব্যক্তি মালিকাধীন বাড়ির মালিক। এমনকী সরকারি দফতরগুলোও এমন কাজ করিয়ে থাকে।

ঘটনার দিন ২৭ বছর বয়সী অনিল দিল্লির ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী পরিষ্কার করতে নেমেছিলেন। অনিল পেশায় রিকশাচালক হলেও একটু বাড়তি রোজগারের আশায় গত ৫ বছর ধরে নর্দমা পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছিলেন।

প্রতিদিনের মতই অনিল সেদিন ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে দড়ির সাহায্যে ময়লার মধ্যে নেমেছিলেন। কিন্তু দড়িটা হঠাৎ ছিঁড়ে নিচে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই অনিলের মৃত্যু হয়।

পরে সৎকার করতে অনিলের মরদেহ নিয়ে তার পরিবার গিয়েছিল শ্মশানে। কিন্তু সৎকারের টাকা ছিল না। তখনই ওই পরিবারটিকে নিয়ে খবর যোগাড় করতে সেখানে গিয়েছিলেন রিপোর্টার শিভ সানি।

শিভ সানি বলেন, ‘এই যারা নর্দমা পরিষ্কারের কাজ করেন, তাদের নিয়ে সম্প্রতি বেশ কিছু খবর হয়েছে আমাদের কাগজে। সেই সূত্রেই ওই পরিবারটির বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে জানতে পারি যে তারা দেহ নিয়ে শ্মশানে চলে গেছে। আমিও যাই শ্মশানে। পরিবারটিকে কিছু প্রশ্ন করব বলে সবে প্যাড, পেন বের করেছি। হঠাৎ দেখি, একটি বাচ্চা ছেলে মৃতদেহের কাছে গিয়ে মুখ থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে দিল। আর মৃতদেহটার মুখে হাত বোলাতে বোলাতে “বাবা, বাবা” বলে ডুকরে কেঁদে উঠল।’

‘সাংবাদিকতার জীবনে অনেক কঠিন ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু এটা দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল। বেশ কয়েক মিনিট কথা বলতে পারিনি।’

এরপরই মোবাইল দিয়েই কয়েকটা ছবি তোলেন শিভ সানি।

পরদিন খবরের সানির তৈরি প্রতিবেদনের সঙ্গে ওই ছবি ছাপা হয়নি। কারণ পত্রিকায় মৃতদেহ ও বাচ্চাদের ছবি ছাপা অনুচিত। কিন্তু দৃশ্যটা মন থেকে সরাতে পারেননি শিব সানি। তাই ছবিটি টুইট করে পুরো ঘটনাটি সবাইকে জানিয়ে দেন।   

সানি বলেন, ‘একটা বাচ্চা ছেলেকে বাবার মৃতদেহের সামনে ওইভাবে কাঁদতে দেখে বহু মানুষের মনকে সঙ্গে সঙ্গে নাড়া দেয়। অনেকে যোগাযোগ করে সাহায্য দেওয়ার কথা বলতে থাকেন। এদের মধ্যে নামিদামি ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে পাকিস্তান-বাংলাদেশ বা অন্য দেশেরও বহু সাধারণ মানুষ রয়েছেন।’

‘আমি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাঁদা তুলতে শুরুর উদ্যোগ নিই অনলাইনেই। কেউ যেমন ৫০ হাজার রুপি দিয়েছেন, তেমনই অনেকে আছেন যারা ১৫-২০ রুপির বেশি দিতে পারেননি। হয়তো ওইটুকুই তাদের ক্ষমতা। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও আরেকটি পরিবারের বিপদে তারাও এগিয়ে এসেছেন।’

অনিলের মৃত্যুর কয়েকদিন আগে একইভাবে দিল্লিতেই পাঁচজন মারা গেছেন।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন বেজওয়াদা উইলসন নামের এক ব্যক্তি।

উইলসন বলেন, ‘অনিল নামের ওই সাফাই কর্মচারীর জন্য বহু মানুষ এগিয়ে এসেছেন, বহু টাকা চাঁদা উঠেছে, খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু যে ছোট ছেলেটিকে কাঁদতে দেখে সবার মন ভিজে উঠেছে, সে রকম আরও শত শত শিশু রয়েছে, তাদের বাবারাও এইভাবে নোংরা পাঁক (কাঁদা) পরিষ্কার করতে গিয়েই মারা গেছেন। সেই বাচ্চাগুলোর কেউ শিশুশ্রমিক হয়ে গেছে, কাউকে বাবাদের মতো নর্দমায় নামতে হচ্ছে, অনেককে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে কাজের খোঁজে।’

ভারতে গত দুই দশকে ১ হাজার ৭৬০ জন মানুষ মারা গেছেন নর্দমার নোংরা বা টয়লেট পরিষ্কার করতে গিয়ে। শুধু ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ১২৩ জন মানুষ নালা পরিষ্কার করতে গিয়ে মারা গেছেন।

তবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর দাবি, এই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। তাদের হিসাবে শুধুমাত্র দিল্লিতেই ২০১৬ থেকে ২০১৮, এই দু’বছরে ৪২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে নালা পরিষ্কার করতে গিয়ে। যদিও এই কাজে কোনো মানুষকে নিয়োগ করা ১৯৯৩ সাল থেকেই বেআইনি।

এ ছাড়া শহরাঞ্চলে করপোরেশন বা পুরসভাগুলোর পয়প্রণালী পরিষ্কার করতে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে তার ভেতরে কোন মানুষকে নামিয়ে দেওয়া অথবা বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের জন্য কোন ব্যক্তিকে কাজে লাগানোটাও ২০১৩ সাল থেকে বেআইনি। কিন্তু ঘটনাচক্রে ভারতের সোশিও-ইকনমিক-কাস্ট সেনসাসে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ১ লাখ ৮০ হাজার পরিবার আছে, যাদের অন্তত একজন করে সদস্য এই কাজ করেন।

আবার সর্বশেষ আদমশুমারিতে দেখা গেছে, ২১ লাখ এমন বাড়ি রয়েছে, যেখান থেকে টয়লটের বর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত নালায় গিয়ে পড়ে অথবা সেইসব বাড়িতে এমন টয়লেট রয়েছে, যেগুলো পরিষ্কারের জন্য কোন মানুষকেই নিয়োগ করতে হবে।

এতেই বোঝা যাচ্ছে যে ভারতে কী পরিমাণ সাফাই কর্মী রয়েছেন। আর সবক্ষেত্রেই এদেরকে দৈনিক মজুরির ভিত্তিকে কাজে লাগানো হয়।

তাই আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে এসব কাজের জন্য নিয়োগ না করা হলেও তাদের দিয়ে কাজ করানো চলছেই বেআইনিভাবেই।

সাংবাদিক শিভ সানির টুইট।
সাংবাদিক শিভ  সানির টুইট। 

আর যেসব নারী-পুরুষ এই কাজে যুক্ত, তারা মূলত বাল্মিকী দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের তপশিলি জাতি-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

যদিও রামায়নের রচয়িতার নাম থেকেই এই গোষ্ঠী নামকরণ বলে মনে করেন অনেকে, তবে এদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করে থাকেন বেশিরভাগ মানুষই।

যে বাড়িতে সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে যান, সেখানে জল পর্যন্ত খেতে দেওয়া হয় না অনেক ক্ষেত্রে।

গলা পর্যন্ত পাঁকের মধ্যে নামানোর আগে এদের না দেওয়া হয় কোনো রকম সুরক্ষা সরঞ্জাম। এমনকি এদের স্বাস্থ্য নিয়ে কারও চিন্তাভাবনাও নেই।

ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে অতি বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে কাউকে নেমে গিয়ে সেখান থেকে বালতিতে করে ময়লা তুলে আনার কাজটা অতি বিপজ্জনক বলেই ধরা হয়। ম্যানহোলে নামার আগে এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা একটা দিয়াশলাই কাঠি ফেলে দিয়ে দেখে নেন যে আগুন ধরে যাচ্ছে কিনা। আগুন জ্বলে উঠলে তারা বুঝে যান যে বিপজ্জনক গ্যাস রয়েছে। আবার ম্যানহোলের ঢাকনা খুলতে গিয়ে যদি আরশোলা বেরিয়ে আসে, তাহলে এরা ধরে নেন যে গ্যাসের মাত্রা নিশ্চই বিপজ্জনক নয়, তাহলে আরশোলাগুলো জীবিত থাকত না।

ড. আশিস মিত্তল নামের এক চিকিৎসকের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের গড় আয়ু জাতীয় গড় আয়ুর থেকে অন্তত ১০ বছর কম। এদের বয়স বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৬০ ও পেরোয় না।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যখন ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে নিচে নামেন, তখন সেখানে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো গ্যাস মিশে বিষাক্ত করে তোলে এবং বেশিরভাগ মৃত্যু হয় ওই গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে যাওয়ার সাথে সাথেই।

এই কাজে যন্ত্র ব্যবহার করা শুরু হয়েছে ঠিকই, তবে তা খুবই অপ্রতুল। সেই যন্ত্র কিনতে যত অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় সাফাই কর্মীদের খুবই কম টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া হয় এবং কোন ক্ষেত্রেই কোনো রকম প্রোটেক্টিভ গিয়ার, অর্থাৎ নিঃশ্বাস নেওয়ার মুখোশ, গ্যাস চিহ্নিত করার যন্ত্র বা শরীর ঢাকা পোশাক, গামবুট কিছুই দেওয়া হয় না।

উইলসনের ভাষায়, ‘এত বড় সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সরকার প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় প্রকল্প স্বচ্ছ ভারত মিশনের অধীনে শুধু টয়লেট বানানোর দিকেই নজর দিচ্ছে। কিন্তু সেইসব টয়লেট তো পরিষ্কার করতে হবে নারী সাফাই কর্মচারীদের। এই দিকে কেউই নজর দেয় না। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েও লাভ হয় না।’

টুইটের পর শিভ সানি জানান, তিনি ছবিটি টুইট করার পর থেকে দুদিনে এখনও পর্যন্ত ৫১ লাখ রুপি চাঁদা উঠেছে। তিনি আবারও গিয়েছিলেন পরিবারটির কাছে। ওই মৃত সাফাই কর্মীর স্ত্রী বা তার ১১ বছরের ছেলে আর ৭ এবং ৩ বছরের মেয়ে, কেউই সম্ভবত এখনও বুঝতেই পারেনি কত অর্থ তাদের জন্য জমা হয়েছে!

তবে যে বাচ্চা ছেলেটিকে ছবিতে কাঁদতে দেখা গেছে, সে এখন ভুলে রয়েছে নতুন উপহার পাওয়া একটা সাইকেল নিয়ে। ওদের তিন ভাই বোনের ভবিষ্যতের জন্য, শিক্ষার জন্য ব্যাঙ্কে বেশিরভাগ অর্থই ফিক্সড ডিপোজিট করা হয়েছে। আর চাঁদার অর্থ থেকেই এক কামরা বাসাটার বাকি পড়ে থাকা তিনমাসের ভাড়াও মেটানো হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রিয় সংবাদ/কামরুল