‘সেই রাতে আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম।’ ছবি: বিবিসি বাংলা

‘আমার ক্লায়েন্ট ৩২-৩৪ বছর বয়সী এক বিবাহিতা নারী’

বয়সে অনেক বড় এক মহিলা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুমি জানো কোথায় এসেছো? এখানে শরীর কেনাবেচা হয়, বুঝেছো?’

আবু আজাদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:০০
আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৪৬


‘সেই রাতে আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম।’ ছবি: বিবিসি বাংলা

(প্রিয়.কম) ‘একটা আধো অন্ধকার ঘর। নীল, গোলাপি আলো জ্বলছিল। ওই ঘরটাতেই নিজেকে বিক্রি করতে গিয়েছিলাম আমি।’

‘বয়সে অনেক বড় এক মহিলা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তুমি জানো কোথায় এসেছো? এখানে শরীর কেনাবেচা হয়, বুঝেছো?”’

‘সব জেনে-শুনেই গিয়েছিলাম ওখানে। তাই জবাব দিয়েছিলাম, “হ্যাঁ। দেখতেই পাচ্ছি। তবে রোজগারের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।”’

‘ওই মহিলা যখন জবাব দিয়েছিলেন, তখন খেয়াল করলাম ভালো করে, উনি নারী নন, হিজড়া। বলেছিলেন, “বেশ ভাব নিচ্ছ তো! এসব এখানে চলবে না, বুঝলে!”’

‘আমি যে পরিবার থেকে এসেছি, সেখানে কেউ কখনো ভাবতেই পারবে না যে আমি এই জায়গায় নিজেকে বেচতে এসেছি। দিনের বেলায় ৯-১০ ঘণ্টা একটা আইটি কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কিন্তু আমি বাধ্য হয়েছিলাম ওখানে যেতে।’

‘ওই হিজড়া বলেছিলেন, “যা, অফিসই কর তাহলে। এখানে কী করছিস?”’

‘বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার উপায় হয়তো ছিল, কিন্তু আমি তো ফিরে যাবার জন্য আসিনি!’

‘হঠাৎই ওই হিজড়া বেশ নরম হয়ে আমাকে বলেছিলেন, “তোর ছবি তুলতে হবে। ছবি না পাঠালে কেউ কথাও বলবে না এই মার্কেটে।”’

‘ছবি তোলার কথা শুনে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। যদি কোনো আত্মীয়স্বজনের হাতে আমার ছবি পড়ে, তাহলে তো সর্বনাশ!কিন্তু যে কাজে নেমেছি, সেই নিয়ম তো মানতেই হবে। একবার ডান দিকে মুখ করে, একবার বাঁ দিকে মুখ করে কয়েকটা ছবি তোলা হলো। কয়েকটা “বোল্ড” ছবিও তোলা হলো।’

‘আমার সামনেই ওই ছবিগুলো হোয়াটস্অ্যাপে পাঠানো হলো কাউকে। সঙ্গে লেখা হলো, “নতুন মাল। রেট বেশি লাগবে। কম পয়সার লাগলে অন্য ছেলের ছবি পাঠাচ্ছি।”’

‘আমার রেট ঠিক হচ্ছিল। মুহূর্তেই আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা, আইটি কোম্পানিতে চাকরি করা এক যুবক, ওদের কাছে নতুন পরিচিতি পেলাম, “মাল” বলে।’

‘আমার দর ঠিক হলো পাঁচ হাজার টাকা।’

‘ক্লায়েন্টের সঙ্গে সবকিছু করতে হবে, এমনই নির্দেশ। কোনো ফিল্ম নয়, এটা যে আমার নিজের জীবনেই ঘটতে চলেছে, সেটাই ভাবছিলাম তখন।’

‘একটা হলুদ ট্যাক্সিতে চেপে কলকাতার একটা ধনীলোকদের পাড়ায় একটা বাড়িতে পৌঁছিয়েছিলাম। বসার ঘরে ঢুকে দেখলাম, একটা বিরাট বড় টিভি আর ফ্রিজ আছে। ফ্রিজে মদের বোতল ভর্তি। আমার ক্লায়েন্ট ৩২-৩৪ বছর বয়সী এক বিবাহিতা নারী। মদ খেতে খেতে কথা বলছিলাম আমরা।’

উনি বলছিলেন, ‘আমি তো ভুল জায়গায় ফেঁসে গেছি। আমার স্বামী সমকামী। আমেরিকায় থাকে। ডিভোর্সও দিতে পারছি না। বিবাহ বিচ্ছেদ একজন মেয়েকে কে বিয়ে করবে? এদিকে আমারও তো ইচ্ছা-অনিচ্ছা রয়েছে! তুমিই বলো আমি কী করব?’

মদ খেতে খেতেই ওই মহিলা হিন্দি গান চালিয়ে দিয়ে নাচ করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে বসার ঘর থেকে আমাকে বেডরুমে নিয়ে গেলেন।

সবকিছু শেষ হওয়া পর্যন্ত বেশ নরম সুরে আদুরে গলায় কথা বলছিলেন। কিন্তু যে-ই কাজ শেষ হলো, তখনই হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার ভাগ এখান থেকে।’

টিপস হিসেবে উনি কিছু টাকা বেশি দিয়েছিলেন। তাকে বলেছিলাম, ‘আমি এই কাজ বাধ্য হয়ে করছি।’

‘এই বাধ্য হয়ে এই লাইনে আসার শুরুটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে আমার বাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। জন্মের পরেই বাবার চাকরিটা চলে গিয়েছিল। যত বড় হচ্ছিলাম পরিবারের সঙ্গে দূরত্বটা বেড়েই চলেছিল। আমার স্বপ্ন ছিল এমবিএ পড়ব, কিন্তু জোর করে আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হলো। চাকরি পেলাম কলকাতায়।’

‘অফিসে সবাই বাংলা বলে। আমি বলতে পারি না। তার ওপরে রয়েছে অফিসের রাজনীতি। আমি সেই চক্রের শিকার হলাম। অভিযোগ করেছিলাম, কোনো লাভ হয়নি।’

‘বাথরুমে গিয়ে কাঁদতাম। আমি যতক্ষণ সিটে থাকতাম না, সেই সময়টাও কেউ নোট করে বসকে বলে দিত যে “এ এই সময় থেকে এই সময় অবধি সিটে ছিল না”।’

‘আমার আত্মবিশ্বাসটা ভেঙে যাচ্ছিল। ডিপ্রেশন শুরু হলো আমার মধ্যে। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তখনই ঠিক করি যে এমবিএ পড়তেই হবে। তার জন্য চাই টাকা।’

‘কীভাবে রোজগার করা যায় বাড়তি টাকা, ইন্টারনেটে সেসবই সার্চ করতাম। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হবে। ইন্টারনেটেই প্রথম দেখতে পাই “মেল এসকর্ট” বা জিগোলো হওয়ার রাস্তা। ফিল্মে দেখেছি জিগোলো ব্যাপারটা কী। কয়েকটা ওয়েবসাইট আছে, যেখানে জিগোলো হতে চাইলে নিজের প্রোফাইল দেওয়া যায়।’

‘নিজের প্রোফাইল লিখতে বেশ ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না কী লিখব। কিন্তু আমার সামনে তখন দুটো পথ, আত্মহত্যা করা বা জিগোলো হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিলাম।’

‘যেসব নারীদের সঙ্গে আমাকে কাজ করতে হয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন বিবাহিতা মহিলা ছিলেন, তেমনই ডিভোর্সি, বিধবা বা অবিবাহিত মেয়েরাও ছিল।’

‘সবার কাছেই আমি “মাল” হয়ে উঠেছিলাম। মানুষ বলে গণ্যই করত না কেউ। যতক্ষণ তাদের সব ইচ্ছে পূরণ করতে না পারতাম, ততক্ষণ ছাড়া পেতাম না।’

‘তবে সবাই কত ভালো ভালো কথা বলত! কেউ কেউ বলত স্বামীকে ডিভোর্স করে আমার সঙ্গেই নাকি থাকবে। তবে বেডরুমে যতটা সময় কাটাতাম, তারপরেই সব ভাব-ভালোবাসা শেষ। সব প্রেম ভুলে গিয়ে কেউ বলত, “চল বেরো এখান থেকে”, কেউ বলত “টাকা ওঠা, কেটে পড়।” গালিগালাজও কম খাইনি।’

‘এই সমাজ আমাদের কাছ থেকে মজাও লুটবে, আমার প্রস্টিটিউট বলে গালিও দেবে!’

‘একবার স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসঙ্গে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। লোকটি সোফায় বসে মদ খাচ্ছিল, আর আমি তার স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায় ছিলাম। দুজনে যে ভেবে-চিন্তেই আমাকে একসঙ্গে ডেকেছে, সেটা বুঝতেই পারছিলাম। হয়তো কোনো গোপন ডিজায়ার থাকবে এদের মনে।’

‘একজন মহিলা আমার ক্লায়েন্ট ছিলেন। বয়স প্রায় ৫০। তার কাছে গেলেই আমার অন্য রকম অনুভূতি হতো।’

‘প্রায় সারা রাত উনি আমার সঙ্গে “বেটা” “বেটা” বলে ডাকতেন। আমাকে বলতেন যে উনার নিজের ছেলে আর ছেলের বউ ওনার দেখাশোনা করে না। দূরে সরিয়ে রেখেছে। উনিই একবার বলেছিলেন, “বেটা, এই ধান্দা থেকে যত তাড়াতাড়ি পারো সরে যাও। এসব অনুচিত কাজ।”’

‘সেই রাতে শুধু কথাই বলেছিলাম উনার সঙ্গে, অন্য কিছু হয়নি। সকালবেলা উনি আমার যা রেট, সেই টাকাটা দিয়েছিলেন। অনেকটা যেন মায়েরা যখন স্কুলে যাওয়ার সময়ে বাচ্চাদের হাতে কিছু টাকা দেয়, সে রকম।’

‘কয়েক দিন পরে, বেশ মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম আমি। মাথাও গরম ছিল। সেদিন নিজের মাকে ফোন করেছিলাম।’

‘জোর গলায় মাকে বলেছিলাম, “তুমি জিজ্ঞাসা করতে না মা, এত টাকা কীভাবে পাঠাচ্ছি তোমাদের! শুনে রাখো, ধান্দা করি আমি...ধান্দা!” মা বলেছিল, “তুই চুপ কর। মদ খেয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলিস না।”’

‘মা ফোন রেখে দিয়েছিল। আমি তো সত্যিটাই বলেছিলাম। কিন্তু মা শুনেও বিশ্বাস করল না। আমার পাঠানো টাকাগুলো বাড়িতে ঠিক সময়ে পৌঁছিয়ে যেত তো!’

‘সেই রাতে আমি ভীষণ কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল, মায়ের কাছেও আমার দাম শুধু কত টাকা পাঠাচ্ছি, সেটাই? তারপর আর কোনোদিন মাকে এ বিষয়ে কিছু বলিনি।’

‘তবে আমি পেশায় রয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে আরও টাকা রোজগার করতে হবে বলে! মার্কেটে আমার চাহিদাও বাড়ছিল। ঠিক করেছিলাম, চাকরি তো করতেই হবে, তার সঙ্গে যতক্ষণ না এমবিএ পড়ার সুযোগ পাচ্ছি, এই কাজটাই চালিয়ে যাব।’

‘তবে আঘাতও আসত শরীর-মন দুয়ের ওপরেই। সমাজ যে চোখেই দেখুক না কেন, এই আঘাত যে কী, সেটা যারা শরীর বিক্রি করে, একমাত্র তারাই বোঝে।’

‘তবে এখন আর আফসোস করি না ওই পেশায় ছিলাম বলে। আমি এমবিএ পাস করেছি। আর সেই রেজাল্টের জোরেই কলকাতা থেকে অনেক দূরে একটা নতুন শহরে চাকরি করছি। ভালোই আছি। নতুন বন্ধু হয়েছে। আমরা একসঙ্গে ঘুরতে যাই, সিনেমা দেখি।’

‘রানী মুখার্জির “লাগা চুনরি মে দাগ: সিনেমাটা আমার খুব প্রিয়। নিজের জীবনের সঙ্গে ওই সিনেমার গল্পটা বেশ মিলে যায়।’

‘বন্ধুরা আমার অতীত নিয়ে যদিও কিছু জানে না। শুধু ওরা কেন, আমার ওই ছেড়ে আসা পেশার ব্যাপারটা আমি কাউকেই জীবনে বলতে পারব না।’

‘ওই সময়টায় যা করতে হয়েছে, তা নিয়ে এখন আমার খারাপ লাগে। তবে আমি মারা যাওয়ার পরেও ওই পেশাটা এ রকমই থেকে যাবে হয়তো।’

[এক পুরুষ দেহোপজীবীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদন। বিবিসি হিন্দি বিভাগের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ‘হিজ চয়েস’-এ আধুনিক ভারতের ১০ জন এমন পুরুষকে নিয়ে প্রতিবেদন করা হচ্ছে, যারা নিজেদের জীবনে এমন কিছু করেন বা করেছেন, যেটাকে সমাজ এখনো মেনে নেয়নি। কিন্তু বাস্তব তো বাস্তবই।]

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট