রামু বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তূপ। ফাইল ছবি

রামু হামলার ৬ বছর: সাক্ষীর অভাবে মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রামু থানায় আটটি, উখিয়ায় সাতটি, টেকনাফে দুটি ও কক্সবাজার সদর থানায় দুটি মামলা হয়েছে।

ইতি আফরোজ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:০০ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:০০
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:০০ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:০০


রামু বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তূপ। ফাইল ছবি

(ইউএনবি) রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা ও অগ্নি সংযোগের ছয় বছরে ১৮টি মামলার মধ্যে একটি মামলারও বিচার কাজ শেষ হয়নি। ফলে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

২৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার রামু সহিংসতার ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে।

এসব মামলার আইনি কার্যক্রম নিয়ে সংশয় কাটছে না বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। তবে বিচারকার্য নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটা কাটিয়ে উঠছে।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার, ২৬টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় আরও ছয়টি বৌদ্ধ বিহার এবং শতাধিক বসতঘরে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরদিন (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উখিয়া ও টেকনাফে আরও চারটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালানো হয়। এতে পুড়ে যায় এসব বিহারে থাকা হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

এ ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রামু থানায় আটটি, উখিয়ায় সাতটি, টেকনাফে দুটি ও কক্সবাজার সদর থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয় ১৫ হাজার ১৮২ জনকে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ছিল ৩৭৫ জন।

পরবর্তী সময়ে এসব মামলায় ৯৯৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এর মধ্যে রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের কোর্ট পরিদর্শক কাজী দিদারুল ইসলাম জানান, ১৯টি মামলার মধ্যে রামু থানায় জনৈক সুধাংশু বড়ূয়ার করা মামলাটি দুই পক্ষের আপোস মীমাংসার ভিত্তিতে খারিজ করে দেয় আদালত। বাকি ১৮টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। এর মধ্যে পাঁচটি মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে দেওয়া হয়।

অধিকতর তদন্ত শেষে, ২০১৬ সালের শেষের দিকে তিনটি মামলার অভিযোগপত্রও আদালতে দাখিল করে পিবিআই। ১৮টির মধ্যে বর্তমানে ১৪টি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে। চারটি ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ৪২৬ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ১০৬ জন পলাতক আছে বলেও জানান দিদারুল ইসলাম।

হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের পর রামু বৌদ্ধ বিহার। ফাইল ছবি

কক্সবাজার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক কৈশানু মার্মা জানান, রামুর উখিয়ারঘোনা জেতবন বৌদ্ধ বিহার, লট উখিয়ারঘোনা জাদীপাড়া আর্যবংশ বৌদ্ধ বিহার ও ফতেখাঁরকুলের লালচিং, সাদাচিং ও মৈত্রী বিহার এবং চাকমারকুল ইউনিয়নের অজান্তা বৌদ্ধ বিহার এবং উখিয়ার একটি মামলা আদালত থেকে অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়।

মোট পাঁচটি মামলা তাদের কাছে পাঠানো হলেও এর মধ্যে চারটি মামলা অধিকতর তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র ২০১৬ সালের শেষের দিকে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি একটি মামলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করানোর নির্দেশনা ছিল আদালতের। কিন্তু ওই সময় এ পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা কক্সবাজার পিবিআইয়ে না থাকায় তদন্তকাজ সম্পন্ন করা যায়নি। তাই পরবর্তী সময়ে জবাব লিখে মামলাটি আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সাক্ষ্য না দেওয়া প্রসঙ্গে এ কর্মকর্তা আরও জানান, সাক্ষী পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে অনেককে শনাক্ত করে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদালত চাইলে এদের শাস্তি দিতে পারে।

কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন জানান, মূলত সাক্ষীর অভাবে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এসব মামলার সাক্ষী বেশির ভাগই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। তারা ভয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না। বেশির ভাগ সাক্ষী অনুপস্থিত থাকায় এসব মামলার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।

রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের আহ্বায়ক রজত বড়ুয়া রিকু জানান, ১৮টি মামলার বাদীই পুলিশ। পুলিশ কাকে আসামি করেছে, কাকে বাদ দিয়েছে, কিছুই বৌদ্ধ সম্প্রদায় জানে না। এমনকি যারা মিছিলের সামনের সারিতে ছিল, যারা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছে, এরা কেউই পুলিশের অভিযোগপত্রে নেই। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পুলিশকে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও প্রকৃত অপরাধীদের অনেকের অভিযোগপত্রে নাম আনা হয়নি। এ অবস্থায় বর্তমানে ভয়ে সাক্ষীরাও সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না।

এ ছাড়া ঘটনার পর থেকে সরকার এবং সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন বৌদ্ধ বিহার ও বাড়িঘর নির্মাণসহ পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে সরকারের প্রতি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই বলেও জানান রজত বড়ুয়া রিকু।

রামুর বৌদ্ধ বিহারের অগ্নি সংযোগ। ফাইল ছবি

বর্তমানেও সরকারের পক্ষ থেকে নানা সহযোগিতা অব্যাহত আছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের অনেকেই আইনের আওতায় না আসায় ঘটনায় দায়ীদের বিচার আদৌ হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়।

কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, এই ছয় বছরে তারা ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতনসহ অনেক কিছুর মুখোমুখি হয়েছেন। এ ঘটনায় রামুর হাজার বছরের গর্বের ধন ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে’ যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা আস্তে আস্তে কেটে উঠছে। 

পুরোটা ফিরে আসতে সময় লাগবে। তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় সুষ্ঠু বিচারের পাশাপাশি সম্প্রীতির জায়গাটাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে হবে। সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রিয়ভাবে বা তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন জানান, বর্তমানে মামলাগুলোর মূল সমস্যা হচ্ছে সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো নিরাপত্তার বিষয়টি ভেবে অনেকে সাক্ষী দিতে রাজি হচ্ছেন না। সাক্ষীদের সব ধরনের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পুলিশের। যদি কোনো অভিযোগ আসে সাক্ষীদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বিভীষিকাময় রামু সহিংসতার ছয় বছর অতিক্রান্তে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ শ্রীকুল লাল চিং-মৈত্রী কমপ্লেক্স চত্বরে দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৮টায় জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় সংঘদান ও অষ্ট উপকরণ দান, ধর্মসভা, বেলা ১২টায় অতিথি ভোজন, দুপুর ২টায় মৈত্রী র‌্যালি, বিকেল ৩টায় ধর্মসভা এবং ৫টায় দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন ও সমবেত প্রার্থনা।

এ ছাড়া স্মরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন একুশে পদকপ্রাপ্ত রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ উপসংঘরাজ পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...