রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবন। ছবি: প্রিয়.কম

ভোটার সমতায় বড় বৈষম্য

সীমানা পুনঃনির্ধারণের খসড়া তালিকায় ঢাকা-১৯ আসন ছোট করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি ইসি।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪২ আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪২
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪২ আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪২


রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবন। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্প্রতি তৈরি ওই তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে ঢাকা-১৯ আসনে। আসনটিতে ভোটার সংখ্যা সাত লাখ ৪৭ হাজার ৩০১ জন।

এই হিসাবে আসনটির একজন প্রার্থী তিন লাখ ৭৩ হাজার ৬৫১ ভোট পেলে তার জয় নিশ্চিত হবে (প্রার্থী দুইজনের বেশি হলে এই সংখ্যা আরও কমবে)। অন্যদিকে এই জেলারই ঢাকা-৪ আসনের একজন প্রার্থী এমপি হবেন এক লাখ ২২ হাজার ৯৫৫টি ভোট পেলেই। এই দুই আসনে জয়ী প্রার্থীর মধ্যে বৈষম্য হবে দুই লাখ ৮৪ হাজার ২৫৮ ভোটের।

অথচ চলতি বছরের ১৪ মার্চ প্রকাশিত সীমানা পুনঃনির্ধারণের খসড়া তালিকায় ঢাকা-১৯ আসন ছোট করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি ইসি। খসড়ায় উল্লেখ ছিল ঢাকা-১৯ আসন হবে সাভারের শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া ও পাথালিয়া—এই পাঁচ ইউনিয়ন এবং সাভার ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে। কিন্তু ৩০ এপ্রিল সীমানা পুনঃনির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকায় তা পরিবর্তন করে সাভার, বিরুলিয়া, ধামসোনা, শিমুলিয়া, আশুলিয়া, ইয়ারপুর, পাথালিয়া ও বনগাঁও—এই আট ইউনিয়ন নিয়ে তৈরি করা হয় ঢাকা-১৯ আসন।

চলতি বছরের ১ আগস্ট পর্যন্ত আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। এই হিসাবে ৩০০ আসনে গড় ভোটার প্রায় তিন লাখ ৪৭ হাজার ৩০২ জন। ৩০০ আসনের মধ্যে দুই লাখের নিচে ভোটার রয়েছে এমন আসনের সংখ্যা চারটি। পাঁচ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে ১২টি আসনে। ১২টির মধ্যে তিনটি আসন (নোয়াখালী-৪, কুমিল্লা-১০ ও নারায়ণগঞ্জ-৪) পুনঃনির্ধারণের পরও এই বৈষম্য রয়ে গেছে।

যদিও দ্য ডেলিমিটেশন অব কনস্টিটুয়েন্সিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর ৬ নম্বর ধারার ২ উপ-ধারায় বলা আছে, প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জনসংখ্যার বিভাজনকে যতদূর সম্ভব বিবেচনায় রেখে প্রত্যেক নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।

নির্বাচনি আসনে ভোটারের সমতা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছে ইসি। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বাংলাদেশে সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছে ২০১১ সালে। বর্তমানে কোনো আদমশুমারি না থাকায় নির্বাচনি আসনে ভোটারের বিভাজন দূর করা সম্ভব হয়নি।

ভোটার বৈষম্য থাকার কারণে নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞের মত, ভোট বৈষ্যমের কারণে কোনো প্রার্থীর প্রচার ব্যয় বাড়বে, প্রচারের সুযোগ কম থাকবে; আবার কোনো প্রার্থীর ব্যয় কমবে, প্রচারের সুযোগ বাড়বে। এতে একপক্ষ সুবিধা পাবে, অন্যপক্ষ পিছিয়ে থাকবে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েল অনুযায়ী, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৪৪বি ধারা ৩ উপ-ধারায় বলা আছে, মনোনয়ন দেওয়া রাজনৈতিক দল থেকে পাওয়া খরচসহ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় ২৫ লাখ টাকার বেশি হবে না। নির্বাচনি ব্যয় ভোটার প্রতি নির্ধারিত হওয়ার বিধান রয়েছে। সেই হিসাবে ভোটার প্রতি ৮ টাকা খরচের বিধান রাখা হয়।

ভোটার প্রতি আট টাকার হিসাবে ঢাকা-১৯ আসনের প্রত্যেক প্রার্থীর খরচ হবে ৫৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪০৮ টাকা। ফলে প্রার্থীর পক্ষে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব নয়।

সেই সঙ্গে যে সব আসনে তিন লাখ ১২ হাজার ৫০০-এর বেশি ভোটার রয়েছে, তাদের পক্ষেও ২৫ লাখ টাকার বিধান মানা হবে অসম্ভব। আর এই হিসাবে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৯২টির প্রার্থীর পক্ষেই নির্বাচনি আইন মানা সম্ভব হবে না। কারণ ১৯২টি আসনেই তিন লাখ ১২ হাজার ৫০০-এর বেশি ভোটার রয়েছে।

বৈষম্য রয়েছে ঢাকা জেলার অন্য আসনগুলোতেও। ঢাকা-৬ ও ৮ আসনে ভোটার যথাক্রমে দুই লাখ ৬৯ হাজার ২৭৬ এবং দুই লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৩ জন। অন্যদিকে ঢাকা-১৮ আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৩ জন।

কেবল রাজধানী নয়, বিভাগীয় ও জেলা শহরের আসনগুলোতেও এরকম বৈষম্য রয়ে গেছে। ময়মনসিংহ-৩ আসনে যেখানে ভোটার রয়েছে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৮ জন, সেখানে ময়মনসিংহ-৪ আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৬ জন।

আবার জেলা শহর যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে যেখানে যশোর-৬ আসনের ভোটার এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৩৪ জন, সেখানে যশোর-৩ আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫৬১ জন।

সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে, যার ভোটার সংখ্য এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৫ জন। দুই লাখের নিচে ভোটারের মধ্যে রয়েছে যশোর-৬ আসনে এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৩৪ জন, পিরোজপুর-৩ আসনে এক লাখ ৮৯ হাজার ৭৬৩ জন এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪২৮ জন।

পাঁচ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে ১২টি আসনে। সেগুলো হলো যশোর-৩ আসনে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫৬১ জন, ময়মনসিংহ-৪ আসনে পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৬ জন, ঢাকা-১৮ আসনে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৩ জন, ঢাকা-১৯ আসনে সাত লাখ ৪৭ হাজার ৩০১ জন, গাজীপুর-১ আসনে ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৪ জন, গাজীপুর-২ আসনে সাত লাখ ৪৫ হাজার ৮৪১ জন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ছয় লাখ ৫১ হাজার ১২৩ জন, সিলেট-১ আসনে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩০ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে পাঁচ লাখ ১৫ হাজার ১১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৪ জন, নোয়াখালী-৪ আসনে পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৩২৯ জন এবং চট্টগ্রাম-১১ আসনে পাঁচ লাখ সাত হাজার ৩৫৫ জন।

তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৩২৯ জন এবং নারী ভোটার পাঁচ কোটি ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ১৫১ জন।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ভোটারের সমতা বিধানের বিষয়টা আমি আইন অনুযায়ী তখনই করতে পারব যদি সেনসাস (আদমশুমারি) হয়। অন্য দুইটা জিনিস প্রশাসনিক সুবিধা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা দিয়ে দেখেছিলাম। আমাদের দেখার ক্ষমতা ছিল আইন অনুযায়ী। ভোটার সমতা করার বিধানটা আদমশুমারি না হলে প্রযোজ্য করতে পারি না। তার জন্য আমরা হাত দিতে পারি নাই।’

দুটি কারণে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা আছে বলেও উল্লেখ করেন এই কমিশনার। রফিকুল ইসলাম জানান, কারণ দুটির একটি হলো প্রার্থীরা যাতে বেশি টাকা খরচ করতে না পারে। অন্যটি ভৌগোলিকগত।

ভৌগোলিকগত বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদাহরণ টেনে তিনি জানান, পুরো বান্দরবান জেলা নিয়ে একটি আসন। সেখানে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে খরচ বেশি হবে। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে চিত্রটা পুরো উল্টো। ঢাকার প্রার্থীরা একটি বাড়িতে গেলেই ৫০ থেকে ৬০ জন ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। আর বান্দরবানে ৫০ থেকে ৬০ জন ভোটারের সঙ্গে জনসংযোগ করতে হলে দুইটি গ্রামে যেতে হবে।

ঢাকা-১৯ আসনের বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খসড়া প্রকাশ করে আমরা উন্মুক্ত শুনানি নিয়েছি। এরপরে পুরো কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তকেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’

তবে ওই উন্মুক্ত শুনানির কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়নি নির্বাচন কমিশন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘যতটুকু সম্ভব এগুলো সুষম করার দরকার ছিল। বড় ধরনের বৈষম্য না রাখার জন্য তো সীমানা পুনঃনির্ধারণ। এখন তো সেটা হয়নি।’

প্রিয় সংবাদ/রুহুল/আশরাফ

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...