মানহানির মামলায় গ্রেফতারের পর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

মানহানির মামলায় মইনুলের গ্রেফতার: কী বলছেন আইনজীবীরা

রংপুরের ওই মামলায় ঢাকা থেকে মইনুলকে গ্রেফতারের পরই চলছে নানামুখী আলোচনা। এ নিয়ে মত দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ২২:৩৮
আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ২২:৪৮


মানহানির মামলায় গ্রেফতারের পর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

(প্রিয়.কম) সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলার জেরে মানহানির অভিযোগে হওয়া মামলায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ২২ অক্টোবর, সোমবার রাতে রংপুরের ওই মামলায় ঢাকা থেকে তাকে গ্রেফতারের পরই চলছে নানামুখী আলোচনা। গ্রেফতারের আইনি ভিত্তি নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। বিশিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খোলাসা করার চেষ্টা করেছে প্রিয়.কম।

আগের রাতে গ্রেফতার হওয়া মইনুলকে ২৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম কায়সারুল ইসলামের আদালতে হাজির করে পুলিশ। শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। দুপুর থেকে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।  

কারো মানহানি হলে অন্য কেউ মামলা করতে পারে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের কাছে। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘কারো মানহানি হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা অন্য কেউ মামলা করতে পারবে কি না, সেটি লেখা নাই। তবে যদি অ্যাজ এ ক্ল্যাশ (সংঘাত হিসেবে) চেষ্টা করে, তবে মামলা করা যাবে। একজন মহিলাকে দুশ্চরিত্রা বলা বা তার  চরিত্র হরণ করা হয়, এটা যদি মহিলাদের জন্য হেনস্তাজনক হয়, তাহলে মানহানির মামলা করা যাবে। তবে একজনের ক্ষতি হলে অন্য কেউ ভুক্তভোগীর পক্ষে করতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা যাবে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘সমস্ত নারী জাতিকে উদ্দেশ্য করে উনি (মইনুল হোসেন) কথাটি বলেননি। মইনুল হোসেন টকশোতে মাসুদা ভাট্টিকে সাংবাদিক হিসেবে বলেছেন, ‘‘আপনি চরিত্রহীন বলে আমি মনে করতে চাই।’’ কথাটি মইনুল নারী সমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেন নাই। মাসুদা ভাট্টিকে সাংবাদিক হিসেবে বলেছেন। কারণ সাংবাদিক হিসেবে মাসুদা ভাট্টির আচরণ ছিল অসৌজন্যমূলক। রাগের মাথায় মইনুল এ কথাটি বলেছিলেন।’

‘এ বক্তব্য দেওয়ার পর মইনুল হোসেন মাসুদা ভাট্টির কাছে ফোন করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। লিখিতভাবেও তার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। মাসুদা ভাট্টি যদি মনে করেন, তার জন্য এটি অপমানজনক, তাহলে তিনি দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানির মামলা করতে পারেন। মানহানির মামলায় যার মানহানি করা হয়, তিনিই একমাত্র মামলাটি করতে পারেন। অন্য কেউ করতে পারেন না। ৫০০ ধারার মামলা জামিনযোগ্য অপরাধ। জামিনযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও আমলি আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। ম্যাজিস্ট্রেট আইন অমান্য করে মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।’

মানহানির মামলায় ভুক্তভোগীর পক্ষে কেউ মামলা করতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘পারে না। নিয়ম হচ্ছে, যার ডিফেমেশন (মানহানি) হয়েছে, যার মানহানি হয়েছে, তিনি মামলা করবেন। কিন্তু এখন মামলা যেভাবে হচ্ছে, আইনগতভাবে আসলে এভাবে মামলা করার এখতিয়ার নাই। কিন্তু তারপরও মামলা করে যাচ্ছে।’

এসব মামলায় আদালত সরাসরি ওয়ারেন্ট ইস্যু (গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি) করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এসব মামলায় ওয়ারেন্ট দেওয়ার আগে নরমালি নিয়ম হচ্ছে, তদন্ত করা। তার পরে যদি তদন্তে অভিযোগ পাওয়া যায়, তখন এসব মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যু (গ্রেফতারি পরোয়ানা) দেওয়া হয়। কিন্তু মইনুলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আদালত ওয়ারেন্ট দিয়ে দিয়েছে। এখন কী করবেন?’

জয়নুল আরও বলেন, ‘মাসুদা ভাট্টি তো মামলা করে ফেলছে। তারপরে অন্য কেউ তো এ মামলাগুলো করার এখতিয়ার নাই।’

মানহানির মামলা আমলযোগ্য অপরাধ কি না এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ মামলা করতে পারে কি না, এমন বিষয় জানতে চাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি  আবদুল বাসেত মজুমদারের কাছে। তিনি বলেন, ‘যার মানহানি হয়, সে-ই মামলা করবে। কিন্তু অন্য ব্যক্তি মামলা করবে কেন? এটা হলো নন কগনিজেবল অফেন্স (আমল-অযোগ্য অপরাধ)। কতগুলি আছে কগনিজেবল (আমলযোগ্য অপরাধ)। মানহানির মামলা সামনস (সমন জারি করা) ও নন কগনিজেবল (আমল অযোগ্য)। এখন কী বলব? অর্ডার দিয়ে দিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট।’

২২ অক্টোবর মিলি মায়া নামের এক মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে রংপুরে মানহানির অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন। সিআর মামলা নম্বর ৭৯৭। দণ্ডবিধির ৫০০/৫০৬/৫০৯ ধারা অনুযায়ী মামলাটি করা হয়।

মামলায় সাক্ষী হিসেবে ছয়জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন বাদী। তারা হলেন বাদী নিজে, মাসুদা ভাট্টি, একাত্তর টেলিভিশনের উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, রাজধানীর কোতোয়ালি থানার আবদুল মালেক, শাহ নয়নুর রহমান টফি ও রংপুরের পীরগঞ্জ থানার আইনুল হোসেন।

মামলার আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন নারী-বিদ্বেষী, ষড়যন্ত্রকারী, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এবং বাংলাদেশের আইন অমান্যকারী।

মামলায় ঘটনাস্থল উল্লেখ করা হয়েছে একাত্তর টিভির গুলশান স্টুডিও। সময় উল্লেখ করা রাত সোয়া ১২টা।

গত ১৬ অক্টোবর একাত্তর টেলিভিশনের টকশো একাত্তরের জার্নালে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে মাসুদা ভাট্টি প্রশ্ন করে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আপনি যে হিসেবে উপস্থিত থাকেন; আপনি বলেছেন, আপনি নাগরিক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, আপনি জামায়াতের প্রতিনিধি হয়ে সেখানে উপস্থিত থাকেন।’

মাসুদা ভাট্টির এই প্রশ্নে রেগে গিয়ে মইনুল হোসেন বলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনি চরিত্রহীন বলে আমি মনে করতে চাই।’

বাদী আরজিতে উল্লেখ করেছেন, তিনি মইনুল হোসেনের টকশোটি রংপুরের বাসায় বসে দেখেছেন। তার এমন বক্তব্যে নারী জাতির সম্মান, মর্যাদা ক্ষতি হয়েছে। তাই ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করা হয়েছে।

মামলার পর সোমবার রাত ৯টা ২৫ মিনিটে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) নেতা আ স ম আবদুর রবের বাসা থেকে বের হওয়ার পর মইনুল হোসেনকে গ্রেফতার করে। সে সময় ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম প্রিয়.কমকে জানিয়েছিলেন, তাকে (মইনুল হোসেন) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

মাহবুব আরও জানান, ব্যারিস্টার মইনুলকে রংপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

এসব মামলায় মঙ্গলবার আদালতে মইনুল হোসেনকে উপস্থাপন করা হয়। পরে তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।

এর আগে বক্তব্যের জেরে ১৬ অক্টোবর নারী সাংবাদিক ও সম্পাদকরা বিবৃতি দিয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে ক্ষমা চাইতে বলেন। এরপর তিনি দুঃখ প্রকাশ করে লিখিত ক্ষমা চাইলেও তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান তারা।

২১ অক্টোবর মইনুলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন মাসুদা ভাট্টি। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।

মাসুদা ভাট্টির করা মামলা এবং জামালপুর ও কুড়িগ্রামে করা মামলায় মইনুল হোসেন হাইকোর্ট থেকে ৫ মাসের আগাম জামিন পেয়েছিলেন।

প্রিয় সংবাদ/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট