পশ্চিমবঙ্গে এই বৃদ্ধকেই মারধর করেছিলেন তার পাশে বসা ছেলে। ছবি: সংগৃহীত

সন্তানের মারধর বনাম বাবার ভালোবাসা

পৃথিবীর সবচেয়ে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের একটি বাবাকে কাঁদতে দেখা।

ফুয়াদ খন্দকার
লেখক
প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৩৩ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৩৩
প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৩৩ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৩৩


পশ্চিমবঙ্গে এই বৃদ্ধকেই মারধর করেছিলেন তার পাশে বসা ছেলে। ছবি: সংগৃহীত

‘আমার কুকুর আমাকে বলে ঘেউ’ প্রবাদটা কি কখনো শুনেছেন? এর অর্থ হলো আপনজনের বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হওয়া। গত দুই দিন ধরে একটা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার আশোকনগরে প্রদীপ বিশ্বাস তার মাকে মিষ্টি খাওয়ানোর অপরাধে বাবাকে মারধর করেন।

একজন নবতিপর লোককে কেউ প্রহার করছে, আর সেটা যদি হয় তার নিজের সন্তান, তাহলে দৃশ্যটা যে কতটা মর্মান্তিক হতে পারে, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। যেকোনো সুস্থ মানুষ এ ভিডিও দেখলে ঠিক থাকতে পারবে না। হয়েছেও ঠিক তাই। এর প্রতিবাদে ভারতে তো বটেই, সঙ্গে বাংলাদেশের সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেছে।

প্রদীপ বিশ্বাসকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছে। একজন বাবার গায়ে তার সন্তান কীভাবে হাত তুলতে পারে, সেটা আমার মাথাতেই আসে না।

আমরা কি তাহলে দিনকে দিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছি? ভিডিওটা দেখার পর থেকেই কিছুতেই দৃশ্যগুলো মাথা থেকে নামাতে পারছি না। বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখেছেন? আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের একটি বাবাকে কাঁদতে দেখা।

একবার ইউনিভার্সিটির এক ছোট বোনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমাকে বলল, ‘ভাইয়া আমার কোনো ভাই-বোন নেই। আমি খুব একা।’ আমি তখন ঠাট্টা করে বললাম, ‘এটা তো তোমার দোষ না। তোমার বাবা-মায়ের দোষ।’

পরে ‘ভাইয়া আমার বাবা নেই। আমার জন্মের ছয় মাস আগেই তিনি মারা গেছেন’ কথাটা শুনে বিরাট এক ধাক্কা খেলাম। এতদিন ধরে মেয়েটাকে চিনি। তার বাবা নেই, আমার জানা ছিল না। কিছুক্ষণ আগে তামাশা করতে যাওয়াটা আমার কাছে তখন বিরাট অপরাধের বোঝা বলে মনে হলো।

একজন মানুষ কোনোদিন তার বাবার আদর পায়নি, কোনোদিন তার বাবার কোলে উঠতে পারেনি। কোনোদিন বাবা বলে ডাকতেও পারেনি। কথাগুলো ভাবতেই আমার অসম্ভব খারাপ লাগতে শুরু করল।

অন্য আরেকটা ঘটনা বলি। আমি নিয়মিত লেখালেখি করি। আমার গল্পের একজন পাঠক ছিলেন। খুব সম্ভবত কুমিল্লাতে বাড়ি। গল্পের কোথাও যদি বাবা একটু কাঁদতেন অথবা কষ্ট পেতেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে মেসেজ দিতেন, ‘ভাইয়া বাবাকে কাঁদালেন কেন? বাবাকে কষ্ট দিলেন কেন?’

আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, একজন বাবার গল্পের কান্নাও যে সহ্য করতে পারে না, সে তার বাবাকে কী পরিমাণ ভালোবাসতে পারে।

আসলে জন্মের পর থেকে বাবারা শুধু আমাদের দিয়েই যান। বাবা এক হার না মানা যোদ্ধার নাম। তিনি তার সবটুকু বিসর্জন দিয়ে শুধু সন্তানের মুখে হাসিই ফুটিয়ে যান। বেশির ভাগ সময় এই বাবার গায়ে থাকে দুই/তিন বছর আগের শার্ট আর পায়ে জোড়াতালি দেওয়া স্যান্ডেল। কখনো তাদেরকে নিজের জন্য ভাবতে দেখা যায় না।

আমার বাবাকে দেখতাম, সবসময় পুরনো কাপড় আর জুতা দিয়েই বেশির ভাগ ঈদ করতেন। কিন্তু আমরা সবসময় নতুন কাপড়ই পরেছি। সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অফিস শেষে যখন ঘেমে বাসায় ফিরতেন, তখন দেখতাম হাতে বাজারের ব্যাগ অথবা আমাদের জন্য কোনো খাবার নিয়ে এসেছেন। কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে যদি খাবারের প্যাকেট দেওয়া হতো, তিনি কখনো খেতেন না। আমাদের জন্য বাসায় নিয়ে আসতেন।

আসলে বাবাদেরকে সবসময় এ রকম হতে হয় কেন? পৃথিবীতে নাকি কোন খারাপ বাবা নেই। কিন্তু আমরা সন্তানরা এই বাবাদের জন্য কতটুকুই করতে পারি? এ জন্যই বৃদ্ধাশ্রমে আজ শুধু বাবাদের ভিড়।

আজকে শুনলাম, সে বাবা নাকি আদালত থেকে তার ছেলেকে ছাড়িয়ে এনেছেন। এত কিছুর পরেও তিনি তার ছেলের জন্য শুধু ভালোই চেয়েছেন; একবারও খারাপ চাননি।

প্রদীপ বিশ্বাসের স্ত্রী নাকি বলেছে, বাবার গায়ে হাত তোলাটা সে রকম কোনো ব্যাপার না। আমি অবাক হয়ে যাই, কীভাবে এ ধরনের কথা মানুষ বলতে পারে। হয়তো এই বাবাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্তই মার খেয়ে যেতে হবে।

আগে প্রকাশ্যে মারধর করত, এখন হয়তো আড়ালে করবে। তা ছাড়া এ রকম কয়জন বাবার ভিডিও আমরা দেখতে পাই? কত মানুষের ঘরে আরও কত বৃদ্ধ বাবা কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন, উপরওয়ালাই ভালো বলতে পারবেন।

এ ধরনের কুলাঙ্গার সন্তানেরা কুকুরের চেয়েও অধম। তাদের জন্যই শুরুর প্রবাদটা শত ভাগ শ্রেয়। 

এসব ঘটনা দেখলে আমি  বাসায় এসে শুধু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার বাবার আজ বয়স হয়েছে। গত চার/পাঁচ বছর ধরে বাসাতেই আছেন। শরীরটাও এখন দুর্বল। বেশির ভাগ সময় বিছানাতেই থাকেন। চামড়ায় ভাঁজ পড়া এই মানুষটার চেহারায় আমি অন্যরকম এক ভালোবাসা খুঁজে পাই, মায়া খুঁজে পাই। অনেক অনেক মায়া।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]