দেবীর পোস্টার

দেবী’র উত্থান

সিনেমা হলের অনেক সমস্যা থাকবে, কষ্ট করে জ্যাম ঠেলে যেতে হবে, অনেক হলে এসি না থাকায় একটু গরমও লাগবে তারপরেও সিনেমা হলে যান প্লিজ। বিশ্বাস করেন এরচেয়েও শতগুণ কষ্ট করে শিল্পী কলাকুশলীরা সিনেমা বানায়।

রেদওয়ান রনি
নির্মাতা
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৪:৫২ আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৪:৫২


দেবীর পোস্টার

সিনেমার দেবী শুরু থেকেই বেশ ঠিকঠাক সিনেমার আয়োজন নিয়ে দর্শককে নাড়া দেওয়া শুরু করলেও দর্শকের মানসপটে হুমায়ূন আহমেদের দেবী আসন গেড়ে বসায় জয়া-অনমের দেবীকে শুধু শুধুই অদ্ভুত এক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। একটা সিনেমাকে বিবেচনায় রাখার কথা শুধুই সিনেমার নিরিখে, সিনেমা আর উপন্যাসের নিজস্ব জগতের তেজ সম্পূর্ণই আলাদা। যাই হোক থাক সেসব কথা, মিথ্যা বলব না, দেবী দেখতে বসে আমার মনেও বইয়ের মিসির আলী, রানু বারবার মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারছিল বৈকি কিন্তু সিনেমার ওপেনিং সিন এতই স্ট্রং সিনেমাটিক এলিমেন্টে ভরপুর যে, বই থেকে আমাকে একটানে সিনেমার সিটেই বসিয়ে দিল দেবী।

প্রিটাইটেল সিনের ট্রিটমেন্ট আভাস দিলো নতুন কিছু দেখতে চলেছি। মিসির আলীকে দেখলাম খুটিয়ে খুটিয়ে এ কী সেই মিসির আলী যাকে আমরা একেক জন একেক কল্পনায় দেখেছি? আবারও হুমায়ূন স্যার চেপে বসা,তার উপন্যাসের শক্তিই মনোজগতে বারবার প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্দার মিসির আলী আমাকে গ্রাস করা শুরু করল উপন্যাসকে দূরে ঠেলে । চঞ্চল চৌধুরী যে কোন বয়সের কোন চরিত্র কীভাবে রপ্ত করেন মনের মধ্যে তা তিনিই জানেন। আমি দেখলাম এক আধ পাগলা এক সাইকোলজির অধ্যাপককে যিনি মুহূর্তে অপরিচিত রানুর অদ্ভুত জগতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছেন পরম মমতায়। রানু যখন মিসির আলির সামনে কথা বলা শুরু করেন তখন আমি তার প্রেমে পড়া শুরু করি। জয়া আহসানের রানু হয়ে ওঠাটা কী সাবলিল। কেমন করে জানি কথা বলে, পর্দায় তাকায় ! কী সুন্দর! কামরুল হাসান খসরুর ফটোগ্রাফি আর লাইট ডিজাইন চেনা বাস্তবতার ভিজ্যুয়ালে অচেনা জগতের ঘোর লাগা শুরু করে, রানুকে দেবীর দ্যোতনায় পর্দায় উপস্থাপন অনন্য।

অনম বিশ্বাস যে নতুন কিছু করবে প্রথম সিনেমায় সেই আস্থা তৈরি করেছেন পূর্ববর্তী নির্মাণেই। তাই তো দেবীর গল্পের পটভূমিতে বর্তমান সময়ের ফেসবুকের ব্লাফিং অন্যতম উপাদান হয়ে আসে নিলু আর আহমেদ সাবেতের গল্পে । কিছু ট্রিটমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে, রানুর সাথে দুজন অশরীরিকে আমার সব সময় দেখি বেশ দূর থেকে যা ভয়ের ফিলটাকে আরও ইফেকটিভ করে তোলে। স্টোরিটেলিংয়ের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা হলো দর্শকের সাথে গল্পটা বেশ কানেক্ট করে। আজাইরা দৃশ্যে তেনা প্যাঁচানো নাই, প্রয়োজনীয় দৃশ্যগুলোই গল্পকে এগিয়ে নেয় সাবলিলভাবে।

দেবীর অন্যতম চমৎকার দিক হলো প্রবুদ্ধ ব্যানার্জীর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও অনির্বাণ সেনগুপ্তর সাথে মিলে রিপন নাথের সাউন্ড ডিজাইন, উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলোকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে তা প্রশংসার দাবিদার। অনম ও খসরু যে ভিজ্যুয়াল ল্যাংগুয়েজে গল্পটা বলার চেষ্টা করেছে তা বাংলাদেশি সিনেমায় নতুন । চরিত্রের লুক অ্যান্ড ফিলে যে নতুন মাত্রা তার কৃতিত্ব ডিজাইনার আনিকা জাহীনের। ব্যক্তিগতভাবে আমি আনিকাকে চিনি। কাজপাগল মেধাবী ক্রিয়েটিভ তরুণী, যে চরিত্র নিয়ে ভাবতে থাকে সেটার বেস্ট আউটপুট না দেওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না, মিসির আলীর লুক বিশেষ করে চুলের রং, রানুর মধ্যেকার প্রতিমা ফিল, আনিসের সিম্পিলিসিটি আলাদা করে চোখে পড়ে।
আর্ট ডিরেকশনে সামুরাই মারুফ বেশ দেখিয়েছেন,বিশেষ করি মিসির আলীর বাসাটা, চমৎকার। প্রথম সিনেমাতেই তরুণ এডিটর সজল অলক বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

অভিনয় প্রসঙ্গে বিশদভাবে অনেক কিছুই বলা যায় তাতে লেখা বেশ লম্বাই হতে থাকবে। যার যার চরিত্রে সাবলিল অভিনয় গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে বলেই দর্শকের মনোজগতে দেবী স্থান করতে শুরু করেছে। জয়া আহসানকে আমার বরাবর দেবীই লাগে, তার অভিনয় নিয়ে আমার বলার কিছু নাই, খুব সুন্দর। মিসির আলীর উপর দর্শক প্রত্যাশার যে চাপ তা ভালোই সামলেছেন চঞ্চল চৌধুরী। আলাদা করে চোখে পড়েছে নিলুকে, শবনম ফারিয়া বাজিমাত করেছেন প্রথম ছবিতেই। আনিস অনিমেষ আইচ খুব ন্যাচারাল ছিলেন চরিত্র রূপায়নে। বিলুতে অহনা বেশ ভালো। ইরেশ যাকের আহমেদ সাবেতকে ভিন্নমাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আরেকটু দেখার ক্ষুধা তৈরি হতে হতেই শেষ হয়ে যায় চরিত্রটি।

এত্ত যে ভালো ভালো কথা বলেই গেলাম একটানা কোথাও কী কোন অতৃপ্তি নেই ? আছে, শেষটায় একটু তাড়াহুড়া মনে হয়েছে, যা পুরো সিনেমায় এত ভালো কিছুর মধ্যে খুবই নগণ্য। এই সিনেমাটা বাংলা সিনেমার বাজারে একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এত ভালোর মাঝে অল্প একটু কালো নিয়ে আলাপ করার সময় নয় এখন, সেটা পরেপাছে অনম আর জয়ার আড্ডায় আরও একটু মন খুলে বলে দেবো।

দেবীর প্রমোশনে যে নতুন চমক দেখিয়েছেন তার জন্য রুম্মান রশিদ খানকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। পাবলিসিটি ডিজাইন যে একটা সিনেমা রিলিজে কতবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা তিনি পরবর্তী অনেক সিনেমার জন্য উদাহরণ। সবশেষে টুপি খোলা সালাম জয়া আহসানের জন্য, সিনেমায় প্রপার প্রডিউসিং কী জিনিস তা তিনি দেখিয়েছেন, টাকা থাকলে অনেকেই ইনভেস্টর হতে পারে কিন্তু প্রডিউসার হওয়া কত বড় দায়িত্বের সেটা তিনি দেখিয়েই চলেছেন। জয়া’র সি তে সিনেমার জন্য শুভকামনা। একটা ভালো সিনেমার জন্য দর্শকের কিছু দায়িত্ব থাকে। সিনেমাটা সিনেমা হলে গিয়ে টাকা দিয়ে দেখুন, ফ্রি তে অনলাইনে দেখার আশায় বসে থেকে পরবর্তীতে ভালো সিনেমার সম্ভাবনায় গুড়েবালি করবেন না, আমার অনুরোধ।

সিনেমা হলের অনেক সমস্যা থাকবে, কষ্ট করে জ্যাম ঠেলে যেতে হবে, অনেক হলে এসি না থাকায় একটু গরমও লাগবে তারপরেও সিনেমা হলে যান প্লিজ। বিশ্বাস করেন এরচেয়েও শতগুণ কষ্ট করে শিল্পী কলাকুশলীরা সিনেমা বানায়। আপনার সিনেমা হলে যাওয়ার কষ্টটাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এই অনুরোধ টুকু করছি। দর্শক দর্শনীর বিনিময়ে সিনেমা দেখলেই সিনেমার সুদিন আসবে।

প্রিয় বিনোদন/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(১)

মন্তব্য করতে করুন


Arnab Kumar Ghosh
Arnab Kumar Ghosh

Last week I went to see Debi. This movie gave me more than my expectations. Casting, cinematography, music combinations are very good. Jaya Ahsan acted brilliantly. I think she is the best choice for the character Ranu. Chanchal Chowdhury acted well as Mishir Ali. You do not get the same Mishir Ali from the book. However, he is the best for this character. In my opinion, this movie will help for the resurgence of Bangladeshi film industry. We need more unique and good movies. This movie will encourage our filmmakers and producers to make more movies like this.

আরো পড়ুন
প্রিয় অবসর : ১৯ নভেম্বর ২০১৮
প্রিয় ডেস্ক ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সাফা ও ইরফানের প্রেমের গল্প
তাশফিন ত্রপা ১৮ নভেম্বর ২০১৮
জেমসের গান, পুরস্কৃত সোহানী হোসেন
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ নভেম্বর ২০১৮
তাহসান-কনার গানের ভিডিওতে মেহজাবিন
তাশফিন ত্রপা ১৮ নভেম্বর ২০১৮
ঢাকায় ‘রবিন হুড’
প্রিয় ডেস্ক ১৮ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট