সুদীপ কুমার দীপ। ছবি: শামছুল হক রিপন। প্রিয়.কম

‘আগামী পাঁচ বছর যে গানগুলো হিট হবে, তার বেশির ভাগ আমার লেখা’

এই সময়ের আলোচিত গীতিকবিদের একজন সুদীপ কুমার দীপ। ছয় বছরের ক্যারিয়ারে ৮০টিরও বেশি ছবিতে লিখেছেন গান।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১২:১৬
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:৪৫


সুদীপ কুমার দীপ। ছবি: শামছুল হক রিপন। প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) এই সময়ের আলোচিত গীতিকবিদের একজন সুদীপ কুমার দীপ। ছয় বছরের ক্যারিয়ারে ৮০টিরও বেশি ছবিতে লিখেছেন গান। সংখ্যার হিসাবে তার লেখা গান দুই শতাধিক। সামনের দিনগুলোতে নিজেক আরও এগিয়ে নিতে চান তরুণ এ গীতিকবি।

সম্প্রতি প্রিয়.কমে এসে নিজের এমন লক্ষ্যের কথা জানান গীতিকার ও সাংবাদিক দীপ। প্রায় এক ঘণ্টার ওই আলাপে ক্যারিয়ারের ‍শুরু, বর্তমানে অবস্থানে আসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

আলাপের শুরুতে গানে আসার গল্পটা শোনান দীপ। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে যে কাজটাই করেছি, তার আগে লক্ষ্য স্থির করছি। খুলনা থেকে ২০১০ সালে ঢাকায় আসি। ঢাকায় আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। এরপর এক রুমের একটা মেসে উঠি।’

‘সেখানে আমরা পাঁচজন থাকতাম। একটা মুভিং ফ্যান ছিল, সেটা ঘুরে ঘুরে পাঁচজনের কাছে যেত। ঢাকায় আসার আগেই আমি মনে মনে গোল নির্ধারণ করেছিলাম, আমি ঢাকায় গিয়ে গান লিখব।’

এ গীতিকবি মনে করেন, কেউ যদি তার নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে, সে তার জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে গিয়ে সফল হবেই।

‘ঢাকায় এসে আমি প্রথমেই খোঁজ নিতে লাগলাম কারা কারা গান লিখেতেছে। তখন দেখলাম, কবির বুকল ভাই, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও মনিরুজ্জামান মনির সাহেবরা একের পর এক গান লিখছেন। তারা কোন ধরনের গান লিখছেন, তাও বোঝার চেষ্টা করতাম’, বলেন দীপ।

রাজু চৌধুরী নামে একজন পরিচালক প্রথম দীপকে গান লেখার বিষয়ে সাহস জোগান। শুরুতে প্রতি মাসে তিনি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পেতেন গান লিখে। কিন্তু গান লিখে যে এর চেয়েও বেশি টাকা আয় করা যায়, সেটা ওই নির্মাতার কাছ থেকে শোনার পর বিষয়টা দীপের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। 

আলাপকালে দীপ জানান, তার লেখা প্রথম গান প্রকাশ হয় ২০১১ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে মাসের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে।

‘২০১২ সালের পর থেকে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর গান নিয়ে হিসাব করে দেখবেন, যে ছবিগুলো সুপারহিট, সবগুলোতেই আমার গান আছে। এটা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আর আগামী পাঁচ বছর যে গানগুলো হিট হবে, তারও বেশির ভাগ আমার লেখা’, বলেন দীপ।

এই গীতিকারের মতে, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অন্যান্য গীতিকবিরা যে পথে হাঁটছিলেন, তার চেয়ে ভিন্নভাবে চলার চেষ্টা করতেন তিনি। আর তার ফলও পেয়েছেন অল্প সময়ে।

ছোটবেলা থেকে যে কাজটাই দীপ করেছেন তার আগে লক্ষ্য স্থির করছেন তিনি। ছবি: প্রিয়.কম

‘আমি জানি, আমি যদি আমার জ্যেষ্ঠ গীতিকবিদের মতোই গান লিখি, দর্শক আমাকে গ্রহণ করবে না। আমাকে আমার মতো লিখতে হবে, নতুন কিছু দিতে হবে। এ বিষয়টা আমার শুরু থেকেই মাথায় ছিল। আর এখনকার বড় বড় ডিরেক্টরের প্রত্যেকেই আমার সঙ্গে কাজ করছেন।’

‘আমি গানের জন্য কারো কাছে যাই নাই, কাউকে ফোনও দিই নাই। তারা আমার মধ্যে হয়তো এমন কিছু পাচ্ছে, যেটা তাদের দরকার। সে জন্যই তারা আমাকে দিয়ে গান লেখাচ্ছেন’, যোগ করেন দীপ।

কথা প্রসঙ্গে দীপের সঙ্গে আলাপের বিষয়বস্তু হিসেবে আসে গানের কথা ও সুর পরিবর্তনের বিষয়। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘এখন গানের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। গৎবাঁধা কিছু হয় না। আগে তো একটা ছকের মধ্যে লিখতে হতো। তরুণ প্রজন্মের চিন্তা-ভাবনাও পরিবর্তন হয়ে গেছে। গানও পরিবর্তন হবে, এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে।’

তরুণ এ গীতিকবি মনে করেন, বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষ গান ও তার অতীত ভুলে যায়। তার ভাষ্য, ‘এখন একটা গান ভালো লাগছে কিন্তু সে ওই গানটা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে না। মুখস্ত করে গাইবে, সে জেনারেশন এখন আর নাই। এ কারণে দেখবেন, সামনে যে গানগুলো আসতেছে, সেগুলো শুধু সাময়িক বিনোদনের গান। এ গানগুলো জাতীয় সংগীতের মতো গান আর বাংলাদেশে চলবে না।’

‘যতই আমরা বলি, আমাদের গুরুজনরা যতই অভিযোগ করুক, আমাদের গানের ভাষা ভালো না, কালজয়ী গান হচ্ছে না। ধরলাম, আমাদের দেশে কালজয়ী গান হচ্ছে না। ভারতে কী হচ্ছে? আমি জেনারেশন বুঝি। আর মোবাইল হাতের মুঠোয় আসার ফলে সবাই সব ধরনের গান জাস্টিফাই করতে পারতেছে।’

একটা সময় গানে প্রযুক্তির এত ব্যবহার হতো না। আর গানে এখন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নানা রকম মত আছে। এ বিষয়ে দীপ বলেন, ‘আমরা আবেগপ্রবণ মানুষ। প্রযুক্তির কারণ আগে যে তবলা বাজাত, কি- বোর্ড বাজাত, তাকে তো এখন আর লাগে না।’

‘একজন মিউজিক ডিরেক্টরই ঘরের মধ্যে সব করে ফেলছে। আমি মনে করি, কারো হাতের মুঠোয় যদি কোনো পজেটিভ সুযোগ আসে, সেটা তো গ্রহণ করা উচিত। বলিউডেও কিন্তু একই অবস্থা। ওদেরটা নিতে পারলে আমাদেরটা নিতে পারবেন না কেন?’

‘কিছু লোক আছে, কথায় কথায় বলে ইন্ডাস্ট্রি শেষ হইয়া গেল বলে রব তোলে। তবে যারা বলতেছে, ইন্ডাস্ট্রি শেষ হইয়া গেল, সেই লোকগুলিই কিন্তু তাদের পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্য কোনো অনুষ্ঠানে সেই গানগুলোতে বাজাচ্ছে।’

ব্যক্তিজীবনে চলার পথে দীপ যেসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, সে বিষয়গুলোই গানের কথায় উঠে আসে বলে জানান দীপ। তার ভাষ্য, ‘আমি যে গানগুলো লিখি, তা কিন্তু আমার চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই লিখি। আমি নানান মানুষের সাথে চলার সময় তার আচার-আচরণ বোঝার চেষ্টা করি। সবার আগে মাথায় রাখি, স্বতন্ত্র কোনো কিছু না হলে, সে কখনো দাঁড়াতে পারবে না।’

 দীপ মনে করেন, একটা প্রজন্ম ‘নষ্ট’ হয়ে যাচ্ছে শুধু তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারায়। ছবি: প্রিয়.কম

দীপ বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি সংবাদপত্রে বিনোদন বিভাগে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তার কাছে এই অঙ্গনে অনেকের মুখে মুখে থাকা একটি প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়।

তাকে প্রশ্ন করা হয়, কোনো কোনো নির্মাতা অভিযোগ করে বলেন, সাংবাদিকরার তাদের ক্ষমতা দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ করে গান চেয়ে নেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছে দাবি করে গান নিই না। কেউ আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলতে পারে নাই, পারবেও না।’

‘কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, এখনকার সাংবাদিক গীতিকাররা বিভিন্নজনকে মেসেজ দেয়, ‘‘ভাই, আমি আপনাকে একটা নিউজ করে দিচ্ছি, আপনি আমাকে একটা গান দিয়েন।’’ অডিও কোম্পানির মালিকদের অনেকেই আমাকে গান লেখার জন্য ফোন দিয়েছে বিভিন্ন সময়, আমি যাইনি। আমি যদি ১০০ গান লিখি ২০০ গান রিফিউজ করি।’

আলাপকালে দীপ জানান, দেশে কয়েকজন গীতিকবি রয়েছে, যাদের গান তার পছন্দ। তবে তিনি তাদের নাম বলতে চাননি। তবে বলিউডে প্রিয় গীতিকারের তালিকায় রয়েছেন অমিতাভ ভট্টাচার্য, এরশাদ কামিল, কাওসার মুনির ও কুমার।

তিনি বলেন,‘তাদের গানে নতুনত্ব আছে। এরা প্রত্যেকই হিন্দি গানকে চেঞ্জ করছে। আর আমাদের এখানে কিছু চেঞ্জ করতে গেলেই বলে, আমরা গান নষ্ট করে ফেলছি।’

এই শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকার কারণে এর অনেক কিছুই তার নখদর্পণে। দীপ মনে করেন, একটা প্রজন্ম ‘নষ্ট’ হয়ে যাচ্ছে শুধু তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘যে যেটা পারবে না, সে সেটা করতে চায়।’

‘আমাদের দেশে এখন গান লেখা সহজ হয়ে গেছে। যে কেউই লিখতে পারে। দেশের ৭০ ভাগ গীতিকার, বিশেষ করে যারা অডিওতে লিখেতেছে, তা শুনে আমার নিজেরেই খারাপ লাগে। আর বড় বড় শিল্পীরাই গাচ্ছে। কেন গাচ্ছে? আপনি একটা অশ্লীল গান লিখেন, কিন্তু তার মধ্যেও একটা মেসেজ থাকতে হবে। কিন্তু কে, কাকে এ কথা বোঝাবে!’

এখন তরুণদের মধ্যে যারা ভালো গান লিখেন, তারা সুযোগ না পেয়ে ক্যারিয়ার বদলে ফেলেছেন বলে আক্ষেপ করেন দীপ।

তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে আমরা সবসময় ভয় দেখাই, জুজুর ভয়। এ কারণে তাদের অনেকেই এ মাধ্যমে আসতে গিয়েও একটা সময় সিদ্ধান্ত বদল করে। অন্য মাধ্যমে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ছে। তা না হলে পাইপ লাইনে আরও অনেকই থাকত।’

প্রিয় বিনোদন/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে সিয়ামের বিয়ে
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
গল্পের প্রসঙ্গ অফিসে যৌন হয়রানি
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
উর্মিলা-শ্যামলের ‘একদিন ভালো থাকি’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
মাহাদীর কণ্ঠে ‘বিজয়ের গল্প’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
'বর্ণবাদী' গান্ধীর মূর্তি উৎপাটন গানায়
'বর্ণবাদী' গান্ধীর মূর্তি উৎপাটন গানায়
বিবিসি বাংলা - ১ দিন, ২৩ ঘণ্টা আগে
গুগল সার্চে কোন গানটি শীর্ষে, জানেন?
গুগল সার্চে কোন গানটি শীর্ষে, জানেন?
এনটিভি - ২ দিন, ৩ ঘণ্টা আগে
নাগরিকে বিশেষ ৬ নাটক ও ৩ সিনেমা
নাগরিকে বিশেষ ৬ নাটক ও ৩ সিনেমা
বাংলা ট্রিবিউন - ২ দিন, ৭ ঘণ্টা আগে
গানে গানে নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগ
গানে গানে নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগ
মানবজমিন - ২ দিন, ৭ ঘণ্টা আগে
গানBuzz || পর্ব ১৭ : লোকরঙ
গানBuzz || পর্ব ১৭ : লোকরঙ
https://www.prothomalo.com/ - ২ দিন, ৯ ঘণ্টা আগে